তরুণ চক্রবর্তী

রুপালি পর্দার তারকা কিংবা খেলার মাঠের স্টাররাই ভোটের বাজারে সবচেয়ে দামি। ভারতের পাঁচ রাজ্যের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থী তালিকায় চোখ রাখলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভোট তো মামুলি বিষয়; দক্ষিণ ভারতে প্রিয় চিত্রতারকাদের একবার চোখের দেখা দেখতে ভক্তরা প্রাণ পর্যন্ত বিসর্জন দিতে রাজি থাকেন! অতীতে সেখানে প্রিয় তারকার মৃত্যুতে আত্মহত্যার হিড়িক পড়ে যেতেও দেখা গিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গেও চিত্রতারকারা ভোটের ময়দানে ঈর্ষণীয় সাফল্য পেয়েছেন। এবারও তাই দলীয় প্রার্থী তালিকায় তাঁদের রমরমা অব্যাহত। সর্বভারতীয় রাজনীতিতে অমিতাভ বচ্চনও এক সময় খেল দেখিয়েছিলেন। তিনি রাজনীতিকে বিদায় জানালেও শত্রুঘ্ন সিনহা, পরেশ রাওয়াল, গোবিন্দা, হেমা মালিনী, জয়া প্রদা বা জয়া বচ্চনরা সর্বভারতীয় রাজনীতিতে বেশ পরিচিত মুখ। অতীতে সুনীল দত্ত বা বৈজয়ন্তীমালাও একইভাবে রাজনীতিতে সমাদৃত ছিলেন।
আগামী ৯ এপ্রিল থেকে শুরু হচ্ছে ভারতের পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন। পশ্চিমবঙ্গে ২৩ ও ২৯ এপ্রিল দুই দফায় ভোট হবে। আসাম, কেরলম (কেরালার নতুন নাম) ও পুদুচেরিতে ভোট ৯ এপ্রিল এবং তামিলনাড়ুতে ২৩ এপ্রিল। এই পাঁচ রাজ্যেরই ভোট গণনা হবে ৪ মে। রাজ্যগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় পশ্চিমবঙ্গ (মোট আসন ২৯৪টি)। এরপর রয়েছে তামিলনাড়ু (২৩৪), কেরলম (১৪০), আসাম (১২৬) এবং পুদুচেরি (৩০)। এই পাঁচ রাজ্যের মধ্যে একমাত্র আসামেই বিজেপি ক্ষমতায় রয়েছে; পুদুচেরিতে ক্ষমতায় আছে তাদের শরিক দল। বামপন্থীরা ক্ষমতায় রয়েছে একমাত্র কেরলমে। তামিলনাড়ুতে ক্ষমতায় রয়েছে কংগ্রেসের শরিক দল ডিএমকে। আর পশ্চিমবঙ্গে টানা ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় রয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস।
দক্ষিণ ভারতের রাজনীতিতে চিরকালই চিত্রতারকারা বেশি গুরুত্ব পেয়েছেন। এম জি রামচন্দ্রন, এন টি রামারাও, এম করুণানিধি, জয়ললিতা—তাঁরা সকলেই রুপালি পর্দা থেকে এসে রাজনীতির রঙ্গমঞ্চ আলোকিত করেছেন। করুণানিধির ছেলে এম কে স্ট্যালিন এখন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী। আর তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছেন বিখ্যাত চিত্রতারকা জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর (যিনি শুধুই 'বিজয়' নামে পরিচিত)। তিনি বর্তমানে ভারতের সবচেয়ে দামি অভিনেতা এবং তামিলনাড়ু ও পুদুচেরিতে জনপ্রিয়তার শীর্ষে রয়েছেন। সম্প্রতি তিনি গঠন করেছেন রাজনৈতিক দল ‘তামিলগা ভেট্রি কাজাগাম’ (টিভিকে)। গত বছর ২৭ সেপ্টেম্বর তামিলনাড়ুর কারুরে দলটির আত্মপ্রকাশের সময় ভিড়ের চাপে ৪১ জন পদপিষ্ট হয়ে প্রাণ হারান। এবার সেই টিভিকে তামিলনাড়ুর ২৩৪ এবং পুদুচেরির ৩০ আসনে একাই লড়বে। তাঁকে রুখতে শাসক দল ডিএমকে এবং বিরোধী দল বিজেপির জোটও একাধিক চিত্রতারকার ওপর ভরসা রাখছে।
দক্ষিণ ভারতের কেরলমে গত লোকসভা নির্বাচনে প্রথম আসন জেতে বিজেপি। চিত্রতারকা সুরেশ গোপী ত্রিচুর থেকে জয়ী হয়ে ভারত সরকারের মন্ত্রী হন। এবারও তাই চিত্রতারকাদের ওপরই বাড়তি ভরসা বিজেপির। মূল প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেস জোট ও বামেরাও বেশ কয়েকটি আসনে একই পথে হাঁটছে।

আসামেও অসমিয়া চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতি জগতের প্রতিনিধিরা যথারীতি ভোটের ময়দানে হাজির। প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন উদাংশ্রী নারজারি, যতীন বরা প্রমুখ। তবে সরাসরি ভোটের ময়দানে না থেকেও আসামের নির্বাচনী প্রচারে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি নাম অকালপ্রয়াত সংগীতশিল্পী জুবিন গর্গ। তাঁর মৃত্যুর রহস্য আসামের নির্বাচনে এবার বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে। এছাড়াও সেখানে দেখা যাচ্ছে দলবদলুদের রমরমা। আসামে বিজেপির ৮৮ জন প্রার্থীর মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মাসহ ৩০ জনই অন্য দল থেকে আসা।
এবার আসা যাক পশ্চিমবঙ্গে। বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে, চতুর্থবারের মতো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বেই তৃণমূল সরকার গঠিত হতে চলেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজে প্রচারে নেমে বিজেপিকে জেতানোর চেষ্টা করলেও খুব একটা সুবিধা করতে পারবেন বলে ভোট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে লড়ছেন কলকাতার ভবানীপুর আসনে। বিজেপি সেখানে প্রার্থী করেছে একসময়ের মমতার অনুগত এবং বর্তমান বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীকে। শুভেন্দু অবশ্য মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামেও প্রার্থী হয়েছেন। এই নন্দীগ্রামেই গত বিধানসভা নির্বাচনে মমতা শুভেন্দুর কাছে হেরে গিয়েছিলেন। এবার সেখানে প্রতিশোধ নিতে তৃণমূলের প্রার্থী হয়েছেন শুভেন্দুরই একসময়কার অনুগত পবিত্র কর। লড়াই তাই বেশ জমে উঠেছে। রাজ্যের অন্যত্রও নিজেদের দুর্গ অক্ষত রাখতে মমতা ও তাঁর ভাইপো তথা দলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবারের ভোটেও সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়াজগতের প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্বদের ওপর ভরসা রেখেছেন। ২৯৪ আসনের রাজ্য বিধানসভায় এবারও বেশ কিছু তারকা মুখ রয়েছে শাসক দলের তালিকায়।
২০০৯ সালের লোকসভা ভোটে শতাব্দী রায় আর তাপস পালকে প্রার্থী করে রাজ্য রাজনীতিতে বড় ধরনের সাফল্য পান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এর আগে কংগ্রেস মৌসুমি চট্টোপাধ্যায় কিংবা সিপিএম অনিল চট্টোপাধ্যায় ও বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়দের রাজনীতিতে আনলেও তেমন একটা সাফল্য পায়নি। ২০১১ সালে তৃণমূল প্রার্থী হিসেবে বাংলা সিনেমার জনপ্রিয় নায়িকা দেবশ্রী রায় হারিয়ে দিয়েছিলেন সিপিএমের দাপুটে নেতা কান্তি গাঙ্গুলিকে। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে দীপক অধিকারী (দেব), সন্ধ্যা রায় ও মুনমুন সেন সাংসদ নির্বাচিত হন। রাজ্য বিধানসভায় গায়ক ইন্দ্রনীল সেন ও ক্রিকেটার লক্ষ্মীরতন শুক্লা ভোটে জিতে পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রী হয়েছিলেন। সাবেক ফুটবলার রহিম নবিও তৃণমূলের বিধায়ক হন। ২০১৯ সালে নুসরত জাহান ও মিমি চক্রবর্তী সাংসদ হয়ে চমক দেখিয়েছিলেন। ২০২১ সালের বিধানসভায় সোহম চক্রবর্তী, জুন মালিয়া, কৌশানী মুখোপাধ্যায়, লাভলি মৈত্র, কাঞ্চন মল্লিক ও অদিতি মুন্সিরা ছিলেন তৃণমূলের প্রার্থী।

এবারেও তৃণমূলের প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন—নদিয়ার করিমপুরে অভিনেতা সোহম চক্রবর্তী, উত্তর ২৪ পরগনার ব্যারাকপুরে চলচ্চিত্র পরিচালক রাজ চক্রবর্তী, হুগলির বরানগরে অভিনেত্রী সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতার রাজারহাট গোপালপুরে সংগীতশিল্পী অদিতি মুন্সি, দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুর দক্ষিণে অভিনেত্রী লাভলি মৈত্র, কলকাতার মানিকতলায় প্রয়াত তৃণমূল বিধায়ক সাধন পাণ্ডের মেয়ে তথা চলচ্চিত্র জগতের শ্রেয়া পাণ্ডে, হুগলির চন্দননগরে গায়ক ইন্দ্রনীল সেন, বর্ধমানের সপ্তগ্রামে সাবেক ফুটবলার বিদেশ বসু, জলপাইগুড়ি জেলার রাজগঞ্জে এশিয়াডে সোনাজয়ী অ্যাথলিট স্বপ্না বর্মন এবং কোচবিহার জেলার তুফানগঞ্জে সাবেক ক্রিকেটার শিবশঙ্কর পাল। দেবদীপ পুরোহিত ও কুণাল ঘোষের মতো সাংবাদিকরাও রয়েছেন এবারের শাসক দলের প্রার্থী তালিকায়।
গত লোকসভা ভোটেও তৃণমূলের টিকিটে সাবেক আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার কীর্তি আজাদ ও ইরফান পাঠান, সিনেমা জগতের তারকা শত্রুঘ্ন সিনহা, সায়নী ঘোষ ও রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়রা লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। সদ্য সমাপ্ত রাজ্যসভার ভোটেও অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিক, সংগীতশিল্পী বাবুল সুপ্রিয়, প্রাক্তন পুলিশ অফিসার রাজীব কুমার ও সমকামী আন্দোলনের নেত্রী তথা বিশিষ্ট আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী তৃণমূলের টিকিটে জয়লাভ করেছেন। এর আগেও রাজ্যসভার ভোটে জিতেছিলেন সাংবাদিক সাগরিকা ঘোষ ও নাট্য ব্যক্তিত্ব অর্পিতা ঘোষ।
অন্যদিকে, বিজেপির প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন একসময়ের টেলিভিশনের জনপ্রিয় ধারাবাহিক 'মহাভারত'-এর দ্রৌপদী খ্যাত অভিনেত্রী রূপা গঙ্গোপাধ্যায়। তিনি অবশ্য আগে রাজ্যসভার সদস্যও ছিলেন। এবারের ভোটে রূপা ছাড়াও বিজেপির প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন চলচ্চিত্র জগতের তারকা হিরণ চট্টোপাধ্যায়, পাপিয়া অধিকারী, রুদ্রনীল ঘোষ ও শর্বরী মুখোপাধ্যায়। এর আগে বিজেপির টিকিটেই অভিনেত্রী লকেট চট্টোপাধ্যায়, ভিক্টর বন্দ্যোপাধ্যায়, সাবেক পুলিশ অফিসার ভারতী ঘোষ এবং জাদুকর পি সি সরকাররা নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন।
দুই মূল প্রতিদ্বন্দ্বী তৃণমূল ও বিজেপি তারকা প্রার্থীদের ওপর আস্থা রাখলেও বামেদের আস্থা তরুণ প্রজন্মের শিক্ষিত প্রতিনিধিদের ওপর। বামেদের প্রার্থী তালিকায় অধ্যাপক ও গবেষকরাই বেশি স্থান পেয়েছেন। বেশ কয়েকজন উদীয়মান তরুণ নেতা-নেত্রীও রয়েছেন লড়াইয়ের ময়দানে। উল্লেখ্য, টানা ৩৪ বছর পশ্চিমবঙ্গ শাসন করলেও গত বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করেও বামেরা একটি আসনও পায়নি। এবার বামেদের বাদ দিয়ে কংগ্রেস একাই লড়ছে। বামেরা আঞ্চলিক দল আইএসএফ-এর সঙ্গে জোট করলেও মূল লড়াই হচ্ছে তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে। এবারের নির্বাচনে টিকিট পাননি ৭৪ জন বর্তমান বিধায়ক। বাদ পড়েছেন এক ডজনেরও বেশি মন্ত্রী। তালিকায় নতুন মুখ একশোরও বেশি এবং শতকরা ৪০ ভাগ বিধায়কের কেন্দ্র বদল হয়েছে।
গ্ল্যামারাস তারকা প্রার্থীরা, নাকি রোদ-জল-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে সারা বছর মানুষের পাশে থেকে লড়াই করা রাজনীতিবিদরাই জনগণের বেশি পছন্দের? এই জটিল প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর মিলবে আগামী ৪ মে। আপাতত তারকাদের নিয়ে ভারতের ৫ রাজ্যেই নির্বাচনী প্রচার জমে উঠেছে।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলকাতা (ভারত)

রুপালি পর্দার তারকা কিংবা খেলার মাঠের স্টাররাই ভোটের বাজারে সবচেয়ে দামি। ভারতের পাঁচ রাজ্যের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থী তালিকায় চোখ রাখলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভোট তো মামুলি বিষয়; দক্ষিণ ভারতে প্রিয় চিত্রতারকাদের একবার চোখের দেখা দেখতে ভক্তরা প্রাণ পর্যন্ত বিসর্জন দিতে রাজি থাকেন! অতীতে সেখানে প্রিয় তারকার মৃত্যুতে আত্মহত্যার হিড়িক পড়ে যেতেও দেখা গিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গেও চিত্রতারকারা ভোটের ময়দানে ঈর্ষণীয় সাফল্য পেয়েছেন। এবারও তাই দলীয় প্রার্থী তালিকায় তাঁদের রমরমা অব্যাহত। সর্বভারতীয় রাজনীতিতে অমিতাভ বচ্চনও এক সময় খেল দেখিয়েছিলেন। তিনি রাজনীতিকে বিদায় জানালেও শত্রুঘ্ন সিনহা, পরেশ রাওয়াল, গোবিন্দা, হেমা মালিনী, জয়া প্রদা বা জয়া বচ্চনরা সর্বভারতীয় রাজনীতিতে বেশ পরিচিত মুখ। অতীতে সুনীল দত্ত বা বৈজয়ন্তীমালাও একইভাবে রাজনীতিতে সমাদৃত ছিলেন।
আগামী ৯ এপ্রিল থেকে শুরু হচ্ছে ভারতের পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন। পশ্চিমবঙ্গে ২৩ ও ২৯ এপ্রিল দুই দফায় ভোট হবে। আসাম, কেরলম (কেরালার নতুন নাম) ও পুদুচেরিতে ভোট ৯ এপ্রিল এবং তামিলনাড়ুতে ২৩ এপ্রিল। এই পাঁচ রাজ্যেরই ভোট গণনা হবে ৪ মে। রাজ্যগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় পশ্চিমবঙ্গ (মোট আসন ২৯৪টি)। এরপর রয়েছে তামিলনাড়ু (২৩৪), কেরলম (১৪০), আসাম (১২৬) এবং পুদুচেরি (৩০)। এই পাঁচ রাজ্যের মধ্যে একমাত্র আসামেই বিজেপি ক্ষমতায় রয়েছে; পুদুচেরিতে ক্ষমতায় আছে তাদের শরিক দল। বামপন্থীরা ক্ষমতায় রয়েছে একমাত্র কেরলমে। তামিলনাড়ুতে ক্ষমতায় রয়েছে কংগ্রেসের শরিক দল ডিএমকে। আর পশ্চিমবঙ্গে টানা ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় রয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস।
দক্ষিণ ভারতের রাজনীতিতে চিরকালই চিত্রতারকারা বেশি গুরুত্ব পেয়েছেন। এম জি রামচন্দ্রন, এন টি রামারাও, এম করুণানিধি, জয়ললিতা—তাঁরা সকলেই রুপালি পর্দা থেকে এসে রাজনীতির রঙ্গমঞ্চ আলোকিত করেছেন। করুণানিধির ছেলে এম কে স্ট্যালিন এখন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী। আর তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছেন বিখ্যাত চিত্রতারকা জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর (যিনি শুধুই 'বিজয়' নামে পরিচিত)। তিনি বর্তমানে ভারতের সবচেয়ে দামি অভিনেতা এবং তামিলনাড়ু ও পুদুচেরিতে জনপ্রিয়তার শীর্ষে রয়েছেন। সম্প্রতি তিনি গঠন করেছেন রাজনৈতিক দল ‘তামিলগা ভেট্রি কাজাগাম’ (টিভিকে)। গত বছর ২৭ সেপ্টেম্বর তামিলনাড়ুর কারুরে দলটির আত্মপ্রকাশের সময় ভিড়ের চাপে ৪১ জন পদপিষ্ট হয়ে প্রাণ হারান। এবার সেই টিভিকে তামিলনাড়ুর ২৩৪ এবং পুদুচেরির ৩০ আসনে একাই লড়বে। তাঁকে রুখতে শাসক দল ডিএমকে এবং বিরোধী দল বিজেপির জোটও একাধিক চিত্রতারকার ওপর ভরসা রাখছে।
দক্ষিণ ভারতের কেরলমে গত লোকসভা নির্বাচনে প্রথম আসন জেতে বিজেপি। চিত্রতারকা সুরেশ গোপী ত্রিচুর থেকে জয়ী হয়ে ভারত সরকারের মন্ত্রী হন। এবারও তাই চিত্রতারকাদের ওপরই বাড়তি ভরসা বিজেপির। মূল প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেস জোট ও বামেরাও বেশ কয়েকটি আসনে একই পথে হাঁটছে।

আসামেও অসমিয়া চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতি জগতের প্রতিনিধিরা যথারীতি ভোটের ময়দানে হাজির। প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন উদাংশ্রী নারজারি, যতীন বরা প্রমুখ। তবে সরাসরি ভোটের ময়দানে না থেকেও আসামের নির্বাচনী প্রচারে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি নাম অকালপ্রয়াত সংগীতশিল্পী জুবিন গর্গ। তাঁর মৃত্যুর রহস্য আসামের নির্বাচনে এবার বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে। এছাড়াও সেখানে দেখা যাচ্ছে দলবদলুদের রমরমা। আসামে বিজেপির ৮৮ জন প্রার্থীর মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মাসহ ৩০ জনই অন্য দল থেকে আসা।
এবার আসা যাক পশ্চিমবঙ্গে। বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে, চতুর্থবারের মতো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বেই তৃণমূল সরকার গঠিত হতে চলেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজে প্রচারে নেমে বিজেপিকে জেতানোর চেষ্টা করলেও খুব একটা সুবিধা করতে পারবেন বলে ভোট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে লড়ছেন কলকাতার ভবানীপুর আসনে। বিজেপি সেখানে প্রার্থী করেছে একসময়ের মমতার অনুগত এবং বর্তমান বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীকে। শুভেন্দু অবশ্য মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামেও প্রার্থী হয়েছেন। এই নন্দীগ্রামেই গত বিধানসভা নির্বাচনে মমতা শুভেন্দুর কাছে হেরে গিয়েছিলেন। এবার সেখানে প্রতিশোধ নিতে তৃণমূলের প্রার্থী হয়েছেন শুভেন্দুরই একসময়কার অনুগত পবিত্র কর। লড়াই তাই বেশ জমে উঠেছে। রাজ্যের অন্যত্রও নিজেদের দুর্গ অক্ষত রাখতে মমতা ও তাঁর ভাইপো তথা দলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবারের ভোটেও সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়াজগতের প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্বদের ওপর ভরসা রেখেছেন। ২৯৪ আসনের রাজ্য বিধানসভায় এবারও বেশ কিছু তারকা মুখ রয়েছে শাসক দলের তালিকায়।
২০০৯ সালের লোকসভা ভোটে শতাব্দী রায় আর তাপস পালকে প্রার্থী করে রাজ্য রাজনীতিতে বড় ধরনের সাফল্য পান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এর আগে কংগ্রেস মৌসুমি চট্টোপাধ্যায় কিংবা সিপিএম অনিল চট্টোপাধ্যায় ও বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়দের রাজনীতিতে আনলেও তেমন একটা সাফল্য পায়নি। ২০১১ সালে তৃণমূল প্রার্থী হিসেবে বাংলা সিনেমার জনপ্রিয় নায়িকা দেবশ্রী রায় হারিয়ে দিয়েছিলেন সিপিএমের দাপুটে নেতা কান্তি গাঙ্গুলিকে। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে দীপক অধিকারী (দেব), সন্ধ্যা রায় ও মুনমুন সেন সাংসদ নির্বাচিত হন। রাজ্য বিধানসভায় গায়ক ইন্দ্রনীল সেন ও ক্রিকেটার লক্ষ্মীরতন শুক্লা ভোটে জিতে পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রী হয়েছিলেন। সাবেক ফুটবলার রহিম নবিও তৃণমূলের বিধায়ক হন। ২০১৯ সালে নুসরত জাহান ও মিমি চক্রবর্তী সাংসদ হয়ে চমক দেখিয়েছিলেন। ২০২১ সালের বিধানসভায় সোহম চক্রবর্তী, জুন মালিয়া, কৌশানী মুখোপাধ্যায়, লাভলি মৈত্র, কাঞ্চন মল্লিক ও অদিতি মুন্সিরা ছিলেন তৃণমূলের প্রার্থী।

এবারেও তৃণমূলের প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন—নদিয়ার করিমপুরে অভিনেতা সোহম চক্রবর্তী, উত্তর ২৪ পরগনার ব্যারাকপুরে চলচ্চিত্র পরিচালক রাজ চক্রবর্তী, হুগলির বরানগরে অভিনেত্রী সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতার রাজারহাট গোপালপুরে সংগীতশিল্পী অদিতি মুন্সি, দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুর দক্ষিণে অভিনেত্রী লাভলি মৈত্র, কলকাতার মানিকতলায় প্রয়াত তৃণমূল বিধায়ক সাধন পাণ্ডের মেয়ে তথা চলচ্চিত্র জগতের শ্রেয়া পাণ্ডে, হুগলির চন্দননগরে গায়ক ইন্দ্রনীল সেন, বর্ধমানের সপ্তগ্রামে সাবেক ফুটবলার বিদেশ বসু, জলপাইগুড়ি জেলার রাজগঞ্জে এশিয়াডে সোনাজয়ী অ্যাথলিট স্বপ্না বর্মন এবং কোচবিহার জেলার তুফানগঞ্জে সাবেক ক্রিকেটার শিবশঙ্কর পাল। দেবদীপ পুরোহিত ও কুণাল ঘোষের মতো সাংবাদিকরাও রয়েছেন এবারের শাসক দলের প্রার্থী তালিকায়।
গত লোকসভা ভোটেও তৃণমূলের টিকিটে সাবেক আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার কীর্তি আজাদ ও ইরফান পাঠান, সিনেমা জগতের তারকা শত্রুঘ্ন সিনহা, সায়নী ঘোষ ও রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়রা লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। সদ্য সমাপ্ত রাজ্যসভার ভোটেও অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিক, সংগীতশিল্পী বাবুল সুপ্রিয়, প্রাক্তন পুলিশ অফিসার রাজীব কুমার ও সমকামী আন্দোলনের নেত্রী তথা বিশিষ্ট আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী তৃণমূলের টিকিটে জয়লাভ করেছেন। এর আগেও রাজ্যসভার ভোটে জিতেছিলেন সাংবাদিক সাগরিকা ঘোষ ও নাট্য ব্যক্তিত্ব অর্পিতা ঘোষ।
অন্যদিকে, বিজেপির প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন একসময়ের টেলিভিশনের জনপ্রিয় ধারাবাহিক 'মহাভারত'-এর দ্রৌপদী খ্যাত অভিনেত্রী রূপা গঙ্গোপাধ্যায়। তিনি অবশ্য আগে রাজ্যসভার সদস্যও ছিলেন। এবারের ভোটে রূপা ছাড়াও বিজেপির প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন চলচ্চিত্র জগতের তারকা হিরণ চট্টোপাধ্যায়, পাপিয়া অধিকারী, রুদ্রনীল ঘোষ ও শর্বরী মুখোপাধ্যায়। এর আগে বিজেপির টিকিটেই অভিনেত্রী লকেট চট্টোপাধ্যায়, ভিক্টর বন্দ্যোপাধ্যায়, সাবেক পুলিশ অফিসার ভারতী ঘোষ এবং জাদুকর পি সি সরকাররা নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন।
দুই মূল প্রতিদ্বন্দ্বী তৃণমূল ও বিজেপি তারকা প্রার্থীদের ওপর আস্থা রাখলেও বামেদের আস্থা তরুণ প্রজন্মের শিক্ষিত প্রতিনিধিদের ওপর। বামেদের প্রার্থী তালিকায় অধ্যাপক ও গবেষকরাই বেশি স্থান পেয়েছেন। বেশ কয়েকজন উদীয়মান তরুণ নেতা-নেত্রীও রয়েছেন লড়াইয়ের ময়দানে। উল্লেখ্য, টানা ৩৪ বছর পশ্চিমবঙ্গ শাসন করলেও গত বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করেও বামেরা একটি আসনও পায়নি। এবার বামেদের বাদ দিয়ে কংগ্রেস একাই লড়ছে। বামেরা আঞ্চলিক দল আইএসএফ-এর সঙ্গে জোট করলেও মূল লড়াই হচ্ছে তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে। এবারের নির্বাচনে টিকিট পাননি ৭৪ জন বর্তমান বিধায়ক। বাদ পড়েছেন এক ডজনেরও বেশি মন্ত্রী। তালিকায় নতুন মুখ একশোরও বেশি এবং শতকরা ৪০ ভাগ বিধায়কের কেন্দ্র বদল হয়েছে।
গ্ল্যামারাস তারকা প্রার্থীরা, নাকি রোদ-জল-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে সারা বছর মানুষের পাশে থেকে লড়াই করা রাজনীতিবিদরাই জনগণের বেশি পছন্দের? এই জটিল প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর মিলবে আগামী ৪ মে। আপাতত তারকাদের নিয়ে ভারতের ৫ রাজ্যেই নির্বাচনী প্রচার জমে উঠেছে।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলকাতা (ভারত)