উত্তরায় হামলা-লুটপাট
আব্দুস সবুর

রিকশাচালক ও নিরাপত্তাকর্মীদের বাগবিতণ্ডার সুযোগে স্থানীয় তৃতীয় পক্ষ ‘গুজব ছড়িয়ে’ উত্তরা স্কয়ার শপিংমলে হামলা ও লুটপাট করেছে। এ ঘটনায় কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি, রাতভর সংঘর্ষে আর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়েছে। এ ঘটনায় ১২ জনকে আটক করা হয়েছে। রিকশাচালককে পিটিয়ে হত্যার খবর ছড়িয়ে ‘তৃতীয়’ একটা পক্ষ নিজেদের ফায়দা লুটেছে বলে ধারণা প্রশাসন ও ব্যবসায়ীদের। প্রাথমিকভাবে রিকশাচালককে মেরে ফেলার ঘটনাকে গুজব হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। যদিও ঘটনার প্রায় ২০ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও রিকশাচালকের কোনো অবস্থার কথা জানাতে পারেনি পুলিশ ও রিকশাচালক সমিতির নেতারা।
গতকাল রোববার (১৫ মার্চ) রাত ১১টা থেকে আজ সোমবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত শপিংমলজুড়ে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। বর্তমানে শপিংমলের নিরাপত্তায় শতাধিক পুলিশ মোতায়েন করা রয়েছে।
স্থানীয় দোকানের কর্মচারী জুয়েল ইসলাম বলেন, “রোববার (১৫ মার্চ) রাত ১১টায় জোরে চিৎকারের আওয়াজ, তারপর চারদিক থেকে মানুষের ছোটাছুটি শুরু, এরপর দৌড়াদৌড়ি আর চিৎকার। একটু পর আরও বিভিন্ন দিক থেকে রিকশাচালকরা ছুটে আসেন। তারপর রাত ১১টা ২০ মিনিটের পর থেকে ভাংচুর শুরু হয়। কিছুক্ষণ পর পুলিশ এসে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলে (সাউন্ড) গ্রেনেড ছুড়ে বিক্ষুব্ধ জনতাকে শান্ত করে।”
রিকশাচালক সমিতির নেতা আবু বক্কর বলেন, “আমরা অনেক গ্যারেজে খোঁজ নিয়ে এখনো কারো মৃত্যুর খবর জানতে পারিনি। তবে একটা মহল রিকশাচালকদের উসকিয়ে নিজেদের ফায়দা লুটেছে।”
সরেজমিনে দেখা যায়, সোমবার দুপুর ১২টায় উত্তরা স্কয়ারের মানে শতাধিক পুলিশ সদস্য অবস্থান করছেন। অন্যদিকে বিভিন্ন দিক থেকে আসা রিকশাচালকরা তাদের হারিয়ে যাওয়া চালকদের সন্ধান চাইছে। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আরেকবার রিকশাচালক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা যায়। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। ওই শপিংমলের দুদিকের দুই তলা পর্যন্ত বাইরের সব গ্লাস ভাঙা দেখা যায়। এ ছাড়া নিচতলার বিভিন্ন দোকানের জিনিসপত্র ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকাতে দেখা গেছে।
যেভাবে সূত্রাপাত ও হামলা-ভাংচুর
স্থানীয় দোকানি ও ব্যবসায়ীরা জানান, গতকাল রোববার দুপুরে শপিংমলের সামনে রিকশাচালক ও নিরাপত্তাকর্মীদের মধ্য বাগবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে নিরাপত্তাকর্মীর গায়ে হাত তুলে একজন রিকশাচালক চলে যান। এই ঘটনা এখানে থামলেও রাত ১১টায় একই ধরনের আরেকটা ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে একটি রিকশায় করে দুই নারী শপিংমলে আসেন এবং রিকশাচালককে অপেক্ষায় রেখে ভেতরে যান। এ সময় দ্বিতীয়বারের মতো রিকশাচালক ও নিরাপত্তাকর্মীদের বাগবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে রিকশাচালককে আঘাত করেন এক নিরাপত্তাকর্মী। এতে রিকশাচালক মাটিতে পড়ে যান। তারপর থেকে এখন পর্যন্ত তিনি নিখোঁজ। এই ঘটনার পর কোনো এক পক্ষ স্থানীয় লোকজনকে ডাকলে স্থানীয়রা এসে শপিংমলের সামনে হট্টগোল শুরু করে। রাত ১১টা ২০ মিনিটের পর শপিংমলের ভেতরে লোকজন ঢুকে হামলা ও লুটপাট শুরু করে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে গেলে বিক্ষুব্ধদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের কয়েক দফা পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে পুলিশসহ ৫০ জনেরও বেশি আহত হয়। তাদের উত্তরার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পরও রাতে কয়েক দফা হামলা ও লুটপাট হয়েছে বলে দাবি ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আজিজুল হক বলেন, “আমরা দূর থেকে দেখি কিছু লোক জড়ো হয়েছে। তারপর শুনি একজন রিকশাচালককে মেরে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাই রিকশাচালকরা এসে হামলা শুরু করে।”
চা দোকানি রফিক মিয়া বলেন, “দোকান নিয়ে ব্যস্তই ছিলাম। ১১টার পর হট্টগোল দেখি। কিন্তু সেখানে যাইনি। একটু পর দেখি আরও অনেক মানুষ জড়ো হয়েছে। সাড়ে ১১টার আগ পর্যন্ত কোনো ধরনের হামলা হয়নি। হুট করে কিছু মানুষ চিৎকার করে ভাংচুর শুরু করেন।”
ওই শপিংমলের একটি দোকানের সেলসম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা কাস্টোমারদের নিয়ে ব্যস্তই ছিলাম। কিন্তু সাড়ে ১১টার পর একটু হট্টগোলের শব্দ শুনি। এর পরই আমাদের শপেরই মেইন গেট ম্যানেজার বন্ধ করে দেয়। পরে ইলেকট্রিসিটিও চলে যায়। অনেক জোরে মানুষের ঝাঁকির শব্দ শুনি। পরে রাত ১২টার পর পুলিশ আসলে পিছনের গেট দিয়ে আমরা বের হয়েছি।”
ভুক্তভোগী নিখোঁজ, তাই ‘গুজব’ ছড়িয়ে লুটপাট
শপিংমলের সামনের ঘটনাকে পুঁজি করে রিকশাচালককে মেরে ফেলার ‘গুজব’ ওই দুই নারী বা স্থানীয় একটা পক্ষ ছড়িয়েছে বলে অভিযোগ অনেকের। এর পর বিভিন্ন দিক থেকে দলে দলে মানুষ ও রিকশাচালকরা আসতে থাকে। একপর্যায়ে একদল শপিংমলে ঢুকে পড়ে এবং আরেক দল দফায় দফায় হামলা চালায়।
কে জেড গেজেটের একজন সেলসম্যান বলেন, “আমাদের দোকান সব সময় প্রচুর কাস্টমারে ব্যস্ত থাকে। তাই আমরা শুরুতে কিছু বুঝে উঠতে পারিনি। সাড়ে ১১টার সময় বাইরের হট্টগোলের কারণে আমাদের ম্যানেজার মেইন গেট অফ করে দেয়। পরে আরো অনেক হট্টগোলের শব্দ শুনে ভয় পাই। একপর্যায়ে ইলেকট্রিসিটি চলে যায়, আর আমরা বেজমেন্টের মাধ্যমে পিছনের গেট দিয়ে বের হই। সোমবার সকালে এসে দেখি আমাদের দোকানের অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।”
স্থানীয় জাতীয়তাবাদী রিকশাচালক সমিতির সহসভাপতি সুলতান চরচাকে বলেন, “আমরা অনেক খোঁজ–খবর নিয়েছি। আমাদের কোনো চালক এখনো মারা যায়নি। কিন্তু এখানে একজন চালক মার খেয়েছে, যা নিয়ে গুজব ছড়িয়ে অনেক লুটপাট করা হয়েছে।”
স্কয়ার শপিংমলে রিকশাচালককে মারধর করে হত্যার ঘটনাটি ‘গুজব’ বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার এন এস নজরুল ইসলামও।
সোমবার মার্কেটটি পরিদর্শন শেষে নজরুল ইসলাম বলেন, “রিকশাচালককে পিটিয়ে হত্যা ও মরদেহ গুমের যে অভিযোগ ছড়ানো হয়েছে, সেটি যাচাই করে এখন পর্যন্ত কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। গুজবকে কেন্দ্র করে একটি উচ্ছৃঙ্খল দল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে মব তৈরি করে মার্কেটে হামলা ও লুটপাটের চেষ্টা চালিয়েছে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করা হবে এবং দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে।”
সেই রিকশাচালক এখনো নিখোঁজ
রোববার রাতে যে রিকশাচালককে নিরাপত্তাকর্মী মারধর করেন, তার নাম-ঠিকানা যেমন, তেমনি তার খোঁজও এখন পর্যন্ত মেলেনি। একইসঙ্গে তিনি যে মারা গেছেন, এমন কোনো প্রমাণও নেই।
নাম প্রকাশ না করে এক স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, যে চালককে নিরাপত্তাকর্মীরা মেরেছে, তার খোঁজ এখনো পাওয়া যায়নি। সেই রিকশাচালককে মেরে ফেলার খবর শুনে অনেক রিকশাচালক ও নানা ধরনের মানুষ এখানে জড়ো হয়।
সোমবার পরিদর্শন শেষে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার ওয়াহিদুল ইসলাম ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের বলেন, “একজন নিখোঁজ (রিকশাচালক) থাকার কথা বলা হলেও তার নাম-ঠিকানা এখনো পাওয়া যায়নি। কেউ নিহত হয়েছেন কি না, সেটিও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিষয়টি নিশ্চিত হতে সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করা হবে।”
খোঁজ নেওয়া হয় স্থানীয় থানায়। উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী মো. রাকিব আহমেদ বলেন, ‘‘এ ঘটনা এখনো শেষ হয়নি। বিভিন্ন মানুষের চাপ চলমান রয়েছে। আমরা প্রাথমিক তদন্তের জন্য ১২ জনকে আটক করেছি। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের পর আমরা বলতে পারব কারা হামলা ও লুটপাটের সঙ্গে জড়িত।”
রিকশাচালকের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এখনো তার কোনো খোঁজ–খবর পাওয়া যায়নি। তবে তার মৃত্যুর ঘটনাকে আমরা প্রাথমিকভাবে গুজব হিসেবে চিহ্নিত করছি।”
পুলিশ কেন মৃত্যুর ঘটনাকে ‘গুজব’ বলছে, তার উত্তর পাওয়া গেল এন এস নজরুল ইসলামের কথায়। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “নিরাপত্তাকর্মী লাঠি দিয়ে একটা বাড়ি দিয়েছিল। এখন পর্যন্ত কে মারা গেছে, তার নাম কী, বাড়ি কোথায়, তার কিছু কেউ বলতে পারে না। প্রাথমিকভাবে রিকশাঅলাকে মারছে–এই কথা ছড়িয়ে গেলে, তারা ইউনাইটেড হয়। তাদের এই ক্ষোভকে একটা কুচক্রী মহল ব্যবহার করেছে। এখন পর্যন্ত সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষায় মত্যুর কোনো বিষয় আমরা পাইনি। বাকিটা আরও তদন্তে পাওয়া যাবে।”

রিকশাচালক ও নিরাপত্তাকর্মীদের বাগবিতণ্ডার সুযোগে স্থানীয় তৃতীয় পক্ষ ‘গুজব ছড়িয়ে’ উত্তরা স্কয়ার শপিংমলে হামলা ও লুটপাট করেছে। এ ঘটনায় কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি, রাতভর সংঘর্ষে আর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়েছে। এ ঘটনায় ১২ জনকে আটক করা হয়েছে। রিকশাচালককে পিটিয়ে হত্যার খবর ছড়িয়ে ‘তৃতীয়’ একটা পক্ষ নিজেদের ফায়দা লুটেছে বলে ধারণা প্রশাসন ও ব্যবসায়ীদের। প্রাথমিকভাবে রিকশাচালককে মেরে ফেলার ঘটনাকে গুজব হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। যদিও ঘটনার প্রায় ২০ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও রিকশাচালকের কোনো অবস্থার কথা জানাতে পারেনি পুলিশ ও রিকশাচালক সমিতির নেতারা।
গতকাল রোববার (১৫ মার্চ) রাত ১১টা থেকে আজ সোমবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত শপিংমলজুড়ে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। বর্তমানে শপিংমলের নিরাপত্তায় শতাধিক পুলিশ মোতায়েন করা রয়েছে।
স্থানীয় দোকানের কর্মচারী জুয়েল ইসলাম বলেন, “রোববার (১৫ মার্চ) রাত ১১টায় জোরে চিৎকারের আওয়াজ, তারপর চারদিক থেকে মানুষের ছোটাছুটি শুরু, এরপর দৌড়াদৌড়ি আর চিৎকার। একটু পর আরও বিভিন্ন দিক থেকে রিকশাচালকরা ছুটে আসেন। তারপর রাত ১১টা ২০ মিনিটের পর থেকে ভাংচুর শুরু হয়। কিছুক্ষণ পর পুলিশ এসে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলে (সাউন্ড) গ্রেনেড ছুড়ে বিক্ষুব্ধ জনতাকে শান্ত করে।”
রিকশাচালক সমিতির নেতা আবু বক্কর বলেন, “আমরা অনেক গ্যারেজে খোঁজ নিয়ে এখনো কারো মৃত্যুর খবর জানতে পারিনি। তবে একটা মহল রিকশাচালকদের উসকিয়ে নিজেদের ফায়দা লুটেছে।”
সরেজমিনে দেখা যায়, সোমবার দুপুর ১২টায় উত্তরা স্কয়ারের মানে শতাধিক পুলিশ সদস্য অবস্থান করছেন। অন্যদিকে বিভিন্ন দিক থেকে আসা রিকশাচালকরা তাদের হারিয়ে যাওয়া চালকদের সন্ধান চাইছে। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আরেকবার রিকশাচালক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা যায়। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। ওই শপিংমলের দুদিকের দুই তলা পর্যন্ত বাইরের সব গ্লাস ভাঙা দেখা যায়। এ ছাড়া নিচতলার বিভিন্ন দোকানের জিনিসপত্র ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকাতে দেখা গেছে।
যেভাবে সূত্রাপাত ও হামলা-ভাংচুর
স্থানীয় দোকানি ও ব্যবসায়ীরা জানান, গতকাল রোববার দুপুরে শপিংমলের সামনে রিকশাচালক ও নিরাপত্তাকর্মীদের মধ্য বাগবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে নিরাপত্তাকর্মীর গায়ে হাত তুলে একজন রিকশাচালক চলে যান। এই ঘটনা এখানে থামলেও রাত ১১টায় একই ধরনের আরেকটা ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে একটি রিকশায় করে দুই নারী শপিংমলে আসেন এবং রিকশাচালককে অপেক্ষায় রেখে ভেতরে যান। এ সময় দ্বিতীয়বারের মতো রিকশাচালক ও নিরাপত্তাকর্মীদের বাগবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে রিকশাচালককে আঘাত করেন এক নিরাপত্তাকর্মী। এতে রিকশাচালক মাটিতে পড়ে যান। তারপর থেকে এখন পর্যন্ত তিনি নিখোঁজ। এই ঘটনার পর কোনো এক পক্ষ স্থানীয় লোকজনকে ডাকলে স্থানীয়রা এসে শপিংমলের সামনে হট্টগোল শুরু করে। রাত ১১টা ২০ মিনিটের পর শপিংমলের ভেতরে লোকজন ঢুকে হামলা ও লুটপাট শুরু করে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে গেলে বিক্ষুব্ধদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের কয়েক দফা পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে পুলিশসহ ৫০ জনেরও বেশি আহত হয়। তাদের উত্তরার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পরও রাতে কয়েক দফা হামলা ও লুটপাট হয়েছে বলে দাবি ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আজিজুল হক বলেন, “আমরা দূর থেকে দেখি কিছু লোক জড়ো হয়েছে। তারপর শুনি একজন রিকশাচালককে মেরে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাই রিকশাচালকরা এসে হামলা শুরু করে।”
চা দোকানি রফিক মিয়া বলেন, “দোকান নিয়ে ব্যস্তই ছিলাম। ১১টার পর হট্টগোল দেখি। কিন্তু সেখানে যাইনি। একটু পর দেখি আরও অনেক মানুষ জড়ো হয়েছে। সাড়ে ১১টার আগ পর্যন্ত কোনো ধরনের হামলা হয়নি। হুট করে কিছু মানুষ চিৎকার করে ভাংচুর শুরু করেন।”
ওই শপিংমলের একটি দোকানের সেলসম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা কাস্টোমারদের নিয়ে ব্যস্তই ছিলাম। কিন্তু সাড়ে ১১টার পর একটু হট্টগোলের শব্দ শুনি। এর পরই আমাদের শপেরই মেইন গেট ম্যানেজার বন্ধ করে দেয়। পরে ইলেকট্রিসিটিও চলে যায়। অনেক জোরে মানুষের ঝাঁকির শব্দ শুনি। পরে রাত ১২টার পর পুলিশ আসলে পিছনের গেট দিয়ে আমরা বের হয়েছি।”
ভুক্তভোগী নিখোঁজ, তাই ‘গুজব’ ছড়িয়ে লুটপাট
শপিংমলের সামনের ঘটনাকে পুঁজি করে রিকশাচালককে মেরে ফেলার ‘গুজব’ ওই দুই নারী বা স্থানীয় একটা পক্ষ ছড়িয়েছে বলে অভিযোগ অনেকের। এর পর বিভিন্ন দিক থেকে দলে দলে মানুষ ও রিকশাচালকরা আসতে থাকে। একপর্যায়ে একদল শপিংমলে ঢুকে পড়ে এবং আরেক দল দফায় দফায় হামলা চালায়।
কে জেড গেজেটের একজন সেলসম্যান বলেন, “আমাদের দোকান সব সময় প্রচুর কাস্টমারে ব্যস্ত থাকে। তাই আমরা শুরুতে কিছু বুঝে উঠতে পারিনি। সাড়ে ১১টার সময় বাইরের হট্টগোলের কারণে আমাদের ম্যানেজার মেইন গেট অফ করে দেয়। পরে আরো অনেক হট্টগোলের শব্দ শুনে ভয় পাই। একপর্যায়ে ইলেকট্রিসিটি চলে যায়, আর আমরা বেজমেন্টের মাধ্যমে পিছনের গেট দিয়ে বের হই। সোমবার সকালে এসে দেখি আমাদের দোকানের অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।”
স্থানীয় জাতীয়তাবাদী রিকশাচালক সমিতির সহসভাপতি সুলতান চরচাকে বলেন, “আমরা অনেক খোঁজ–খবর নিয়েছি। আমাদের কোনো চালক এখনো মারা যায়নি। কিন্তু এখানে একজন চালক মার খেয়েছে, যা নিয়ে গুজব ছড়িয়ে অনেক লুটপাট করা হয়েছে।”
স্কয়ার শপিংমলে রিকশাচালককে মারধর করে হত্যার ঘটনাটি ‘গুজব’ বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার এন এস নজরুল ইসলামও।
সোমবার মার্কেটটি পরিদর্শন শেষে নজরুল ইসলাম বলেন, “রিকশাচালককে পিটিয়ে হত্যা ও মরদেহ গুমের যে অভিযোগ ছড়ানো হয়েছে, সেটি যাচাই করে এখন পর্যন্ত কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। গুজবকে কেন্দ্র করে একটি উচ্ছৃঙ্খল দল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে মব তৈরি করে মার্কেটে হামলা ও লুটপাটের চেষ্টা চালিয়েছে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করা হবে এবং দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে।”
সেই রিকশাচালক এখনো নিখোঁজ
রোববার রাতে যে রিকশাচালককে নিরাপত্তাকর্মী মারধর করেন, তার নাম-ঠিকানা যেমন, তেমনি তার খোঁজও এখন পর্যন্ত মেলেনি। একইসঙ্গে তিনি যে মারা গেছেন, এমন কোনো প্রমাণও নেই।
নাম প্রকাশ না করে এক স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, যে চালককে নিরাপত্তাকর্মীরা মেরেছে, তার খোঁজ এখনো পাওয়া যায়নি। সেই রিকশাচালককে মেরে ফেলার খবর শুনে অনেক রিকশাচালক ও নানা ধরনের মানুষ এখানে জড়ো হয়।
সোমবার পরিদর্শন শেষে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার ওয়াহিদুল ইসলাম ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের বলেন, “একজন নিখোঁজ (রিকশাচালক) থাকার কথা বলা হলেও তার নাম-ঠিকানা এখনো পাওয়া যায়নি। কেউ নিহত হয়েছেন কি না, সেটিও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিষয়টি নিশ্চিত হতে সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করা হবে।”
খোঁজ নেওয়া হয় স্থানীয় থানায়। উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী মো. রাকিব আহমেদ বলেন, ‘‘এ ঘটনা এখনো শেষ হয়নি। বিভিন্ন মানুষের চাপ চলমান রয়েছে। আমরা প্রাথমিক তদন্তের জন্য ১২ জনকে আটক করেছি। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের পর আমরা বলতে পারব কারা হামলা ও লুটপাটের সঙ্গে জড়িত।”
রিকশাচালকের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এখনো তার কোনো খোঁজ–খবর পাওয়া যায়নি। তবে তার মৃত্যুর ঘটনাকে আমরা প্রাথমিকভাবে গুজব হিসেবে চিহ্নিত করছি।”
পুলিশ কেন মৃত্যুর ঘটনাকে ‘গুজব’ বলছে, তার উত্তর পাওয়া গেল এন এস নজরুল ইসলামের কথায়। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “নিরাপত্তাকর্মী লাঠি দিয়ে একটা বাড়ি দিয়েছিল। এখন পর্যন্ত কে মারা গেছে, তার নাম কী, বাড়ি কোথায়, তার কিছু কেউ বলতে পারে না। প্রাথমিকভাবে রিকশাঅলাকে মারছে–এই কথা ছড়িয়ে গেলে, তারা ইউনাইটেড হয়। তাদের এই ক্ষোভকে একটা কুচক্রী মহল ব্যবহার করেছে। এখন পর্যন্ত সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষায় মত্যুর কোনো বিষয় আমরা পাইনি। বাকিটা আরও তদন্তে পাওয়া যাবে।”