Advertisement Banner

এশিয়া টাইমসের বিশ্লেষণ

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আসলে কতদূর যায়?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আসলে কতদূর যায়?
ক্ষেপণাস্ত্র। ছবি: রয়টার্স

ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা বা সক্ষমতা আসলে কতটুকু?

২০২৬ সালের ২০ মার্চ ভারত মহাসাগরের ডিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপে ইরান দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে বলে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ইসরায়েলি কর্মকর্তারা জানিয়েছে। উল্লেখ্য, এই দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যৌথ সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।

ক্ষেপণাস্ত্র দুটির মধ্যে একটি উড্ডয়নকালেই ভেঙে পড়ে এবং অন্যটি মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে ইরান এই হামলার দায় অস্বীকার করেছে। ডিয়েগো গার্সিয়া ইরান থেকে প্রায় দুই হাজার ৫০০ মাইল (৪,০০০ কিলোমিটার) দূরে অবস্থিত। যা ইরানের ঘোষিত সর্বোচ্চ ক্ষেপণাস্ত্র পাল্লার প্রায় দ্বিগুণ। পশ্চিম ইউরোপ, এশিয়া এবং আফ্রিকার বেশ কিছু অংশ ইরান থেকে এই দুই হাজার ৫০০ মাইলের ব্যাসার্ধের মধ্যে পড়ে। যা এই অঞ্চলগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে।

তবে, ইরান নতুন কোনো ধরণের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে বা তারা দীর্ঘ পাল্লায় আঘাত হানতে সক্ষম, এমন কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ এখনো নেই। সম্ভবত ইরান তাদের বিদ্যমান কোনো ক্ষেপণাস্ত্রের উন্নত সংস্করণ ব্যবহার করেছে। তবে একটি ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা বৃদ্ধি করা বেশ চ্যালেঞ্জিং কাজ।

ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের প্রাথমিক ধারণা

একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রকেটের সাহায্যে উৎক্ষেপণ করা হয় এবং রকেট থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর এটি মূলত মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হয়। ‘ব্যালিস্টিক’ নামটি এসেছে মূলত এই ধরণের প্রজেক্টাইল বা বস্তুর বিশেষ এক প্রকার ধনুকাকৃতি পথ (আরক) থেকে, যা মূলত মাধ্যাকর্ষণ দ্বারা নির্ধারিত হয়। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর পাল্লা বা রেঞ্জ নির্ভর করে রকেটের আকারের ওপর।

স্বল্প পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (এসআরবিএম): এগুলো প্রায় তিন শ থেকে ছয় শ মাইল (৫০০ থেকে ১,০০০ কি.মি.) পর্যন্ত উড়তে পারে এবং ‘মোবাইল ট্রাক’ থেকে উৎক্ষেপণ করা যায়। এগুলো সাধারণত রাডারের মতো গুরুত্বপূর্ণ রক্ষণাত্মক অবকাঠামো ধ্বংস করতে ব্যবহৃত হয়।

মধ্যম পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (এমআরবিএম): এগুলোর পাল্লা প্রায় ছয় শ থেকে এক হাজার ৮০০ মাইল (১,০০০ থেকে ৩,০০০ কি. মি.)। এগুলো কৌশলগত লক্ষ্যবস্তু, যেমন কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টারে হামলার জন্য ব্যবহৃত হয়।

ইন্টারমিডিয়েট বা মধ্যবর্তী পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ( আইআরবিএম): এগুলো প্রায় এক হাজার ৮০০ থেকে তিন হাজার ৪০০ মাইল (৩,০০০ থেকে ৫,৫০০ কি. মি.) দূরত্ব পর্যন্ত কার্যকর, যা অনেক বড় ভৌগোলিক অঞ্চলকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়।

আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম): এগুলোর পাল্লা প্রায় তিন হাজার ১০০ থেকে ছয় হাজার ২০০ মাইল (৫,০০০ থেকে ১০,০০০ কি. মি.), যার ফলে বিশাল এলাকার যেকোনো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা সম্ভব। এই দীর্ঘ পাল্লার অস্ত্রগুলোর জন্য একাধিক রকেট স্টেজের প্রয়োজন হয়। এগুলো বায়ুমণ্ডল ছেড়ে মহাকাশে প্রবেশ করে এবং তারপর পুনরায় পৃথিবীর দিকে ধাবিত হয়।

স্নায়ুযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র, উভয় দেশের কাছেই একে অপরের দিকে তাক করা হাজার হাজার পারমাণবিক অস্ত্রধারী আইসিবিএম ছিল। এ ধরণের প্রতিটি অস্ত্র একটি পুরো শহরকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে সক্ষম। পারমাণবিক আইসিবিএম মূলত ‘মিউচুয়ালি অ্যাসিউর্ড ডেসট্রাকশন’ (পারস্পরিক নিশ্চিত ধ্বংস) ধারণার ভিত্তি ছিল। যার ফলে কোনো পক্ষই এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারে সাহস পেত না।

ফাতাহ, শাহাব এবং জুলফিকার

ইরানের একটি বিস্তৃত ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রোগ্রাম রয়েছে। দেশটি বহু বছর ধরে বেশ কিছু স্বল্প পাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল তৈরি করছে। এই অস্ত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে ফাতাহ, শাহাব-২ এবং জুলফিকার সিস্টেম।

এই মিসাইলগুলোর পাল্লা সর্বোচ্চ পাঁচশ মাইল (৮০০ কি. মি.)। ইরান থেকে সরাসরি ইসরায়েলে ব্যবহারের জন্য যা অপর্যাপ্ত। কারণ দুই দেশের মধ্যে নিকটতম দূরত্ব প্রায় ৫৫০ মাইল (৯০০ কি. মি.)। তবে, ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়ারা লেবানন এবং সিরিয়ার মতো প্রতিবেশী দেশগুলোতে এই অস্ত্রগুলো মোতায়েন করেছে এবং সেখান থেকে ইসরায়েলের ওপর হামলা চালিয়েছে।

ইরান শাহাব-৩, সেজিল এবং খোররামশাহের মতো মধ্যবর্তী পাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইলও তৈরি করেছে। এই মিসাইলগুলোর পাল্লা এক হাজার ২৫০ মাইল (২,০০০ কিমি) পর্যন্ত, যার অর্থ এগুলো ইরান থেকে সরাসরি ইসরায়েলে আঘাত হানতে সক্ষম।

স্বল্প পাল্লা থেকে মাঝারি বা মধ্যবর্তী পাল্লায় উন্নীত হওয়ার জন্য বড় থেকে আরও বড় রকেটের প্রয়োজন হয়, যা বেশ কিছু কঠিন প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। বড় রকেটগুলো আরও বেশি গতিশীল কম্পন সৃষ্টি করে। যা মিসাইলের কাঠামো এবং এর সমস্ত যন্ত্রাংশকে সহ্য করতে হয়। এর জন্য উন্নত উৎপাদন এবং পরীক্ষা কাঠামোর প্রয়োজন।

রকেটের আকার নির্ধারণ করে, মিসাইলটি কতটুকু পে-লোড বা বিস্ফোরক বহন করতে পারবে। এই চ্যালেঞ্জটি অ্যাপোলো মিশনে ব্যবহৃত বিশাল স্যাটার্ন ফাইভ রকেটের মাধ্যমে খুব ভালোভাবে বোঝা যায়। সেটির মোট উৎক্ষেপণ ভরের মধ্যে মাত্র ২ শতাংশের কম অংশ চাঁদের পৃষ্ঠে পৌঁছাতে পেরেছিল, বাকি ভরের প্রায় পুরোটাই ছিল প্রপেলান্ট বা জ্বালানি।

ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

আইসিবিএম এবং নির্ভুলতা

আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক মিসাইলগুলোর পে-লোড ক্ষমতাও সীমিত থাকে, আর একারণেই সামরিক বাহিনী এতে সাধারণ রাসায়নিক বিস্ফোরকের বদলে পারমাণবিক ওয়ারহেড ব্যবহারের দিকে বেশি ঝুঁকে থাকে। ওজনের তুলনায় পারমাণবিক ওয়ারহেড অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক প্রভাব তৈরি করতে পারে। হাজার হাজার মাইল দূরে একটি আইসিবিএম পাঠিয়ে কেবল একটি সাধারণ দালান ধ্বংস করা সাধারণত ব্যয়বহুল এবং অলাভজনক।

পরিশেষে, মিসাইলের পাল্লা বাড়ার সাথে সাথে সেটির নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা এবং লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুলভাবে আঘাত করা কঠিন হয়ে পড়ে। জাইরোস্কোপের ওপর ভিত্তি করে তৈরি নেভিগেশন সিস্টেমে সময়ের সাথে সাথে সামান্য ত্রুটি দেখা দেয় এবং জিপিএস-নির্ভর মিসাইলগুলো জ্যামিংয়ের শিকার হতে পারে।

ইরানের সীমাবদ্ধ ক্ষমতা

দ্বি-স্তর বিশিষ্ট রকেট ব্যবহার করে মহাকাশে সফলভাবে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের পর, ইরান সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে মিসাইলের পাল্লা বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। এটি হয়তো খুব একটা বিস্ময়কর নয়। একটি মিসাইলের পাল্লা বাড়ানোর সহজ উপায় হলো এর পে-লোড বা ওয়ারহেডের ওজন কমিয়ে দেওয়া।

খোররামশাহর মিসাইলের ক্ষেত্রে ইরান এটি করেছে বলে জানা গেছে। ছোট ওয়ারহেড ব্যবহারের ফলে এর পাল্লা এক হাজার ৮০০ মাইল (৩,০০০ কি. মি.) পর্যন্ত পৌঁছেছে। কিছু পর্যবেক্ষক মনে করেন, ইরান ডিয়েগো গার্সিয়াতে যে মিসাইলগুলো ছুড়েছিল সেগুলো সম্ভবত আরও আধুনিক খোররামশাহর ছিল। তবে, ডিয়েগো গার্সিয়া আক্রমণে একটি মিসাইল মাঝপথে ব্যর্থ হয় এবং অন্যটি মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দ্বারা ধ্বংস হয় বলে মনে করা হয়।

এই ব্যর্থতা ইঙ্গিত দেয়, ইরান সম্ভবত এই সিস্টেমগুলোকে এমন দূরত্বে পরিচালনা করার চেষ্টা করছে যা তাদের সক্ষমতার বাইরে। মার্কিনীদের এই মিসাইল ঠেকিয়ে দেওয়ার সক্ষমতা থেকে বোঝা যায়, ইরানের মধ্যবর্তী পাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইলগুলো খুব বড় কোনো সামরিক হুমকি নয়। এই সিদ্ধান্তটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ইরানের একটি বড় হামলার মাধ্যমে আরও দৃঢ় হয়েছে। যেখানে তারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে শত শত মিসাইল এবং ড্রোন পাঠিয়েছিল। ইসরায়েলি এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সমন্বয়ে সেগুলোর প্রায় সবই ভূপাতিত করা হয়েছিল।

বিস্ময়কর কিন্তু খুব একটা হুমকিস্বরূপ নয়

ডিয়েগো গার্সিয়াতে ইরানের দূরপাল্লার এই আক্রমণ বিশ্বকে অবাক করে দিলেও, এটি সম্ভবত প্রকৃত সামরিক হুমকির চেয়ে মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক প্রভাব তৈরির উদ্দেশ্যেই চালানো হয়েছিল।

এখানে মনে রাখা প্রয়োজন, মধ্যপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো এর উচ্চমূল্য, যা রকেটের আকারের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে। একটি দুই স্তরের রকেট, যা দুই হাজার ৫০০ মাইল (৪,০০০ কি. মি.) পাড়ি দিতে সক্ষম, তা সম্ভবত ইরানের ভাণ্ডারে থাকা সবচেয়ে দামি অস্ত্রগুলোর একটি।

ফলস্বরূপ, তাদের কাছে এই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র খুব বেশি থাকার সম্ভাবনা কম। যখন এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো অল্প সংখ্যায় বা ছোট ‘সালভো’তে (একঝাঁক) উৎক্ষেপণ করা হয়। তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের অত্যাধুনিক বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে এগুলোকে প্রতিহত করা বেশ সহজ হয়ে পড়ে। তবুও, এই আক্রমণটি নিশ্চিতভাবেই বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং ইরানের সাথে সংঘাত দ্রুত নিরসনে কূটনৈতিক উদ্যোগের ওপর চাপ বাড়িয়ে দিতে পারে।

সম্পর্কিত