Advertisement Banner

বিরিয়ানি, কাবাব, হোয়াটসঅ্যাপ আপডেট: যেমন ছিল ইসলামাবাদ টকস

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
বিরিয়ানি, কাবাব, হোয়াটসঅ্যাপ আপডেট: যেমন ছিল ইসলামাবাদ টকস
ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনার আগে সাংবাদিকরা একটি গণমাধ্যম সহায়তা কেন্দ্রে কাজ করছেন। ছবি: রয়টার্স

আমেরিকা-ইরানের শান্তি আলোচনাকে কেন্দ্র করে গতকাল শনিবার বিশ্বের শত শত সাংবাদিকের গন্তব্য ছিল ইসলামাবাদ। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু জিন্নাহ কনভেনশন সেন্টারকে রূপান্তর করা হয়েছিল এক বিশাল মিডিয়া হাবে। তবে এই জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের আড়ালে সাংবাদিকদের সময় কেটেছে দীর্ঘ প্রতীক্ষায়।

আলোচনা যখন আধা কিলোমিটার দূরে রুদ্ধদ্বার কক্ষে চলছিল, তখন মিডিয়া সেন্টারে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের জন্য ছিল এলাহি কারবার। পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ব্র্যান্ডিংয়ে কোনো কমতি ছিল না। কফির কাপেও শোভা পাচ্ছে বিশেষ ট্যাগলাইন ‘শান্তির জন্য কফি’। শহরজুড়ে পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পতাকাসংবলিত বিশেষ লোগো জানান দিচ্ছিল এই আয়োজনের গুরুত্ব।

বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, শনিবার ভোরে মেঘলা আকাশের নিচে ইসলামাবাদকে প্রায় ভুতুড়ে শহর মনে হচ্ছিল। প্রশস্ত রাজপথগুলোতে সাধারণ যানবাহনের চলাচল ছিল প্রায় শূন্য। হাতে গোনা যে কয়েকটি গাড়ি চোখে পড়ছিল, সেগুলো ছিল সশস্ত্র পোশাকধারী বাহিনীর, যারা শহরজুড়ে টহল দিচ্ছিল।

তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত হওয়া সত্ত্বেও কনভেনশন সেন্টারের বাইরের চেকপোস্টে প্রায় এক ঘণ্টা আটকে থাকতে হয় বেশ কয়েকজন সাংবাদিককে। ঠিক সেই সময় ভিআইপিদের একটি গাড়িবহর দ্রুতগতিতে অনুষ্ঠানস্থলের দিকে এগিয়ে যায়।

ভেতরে সাংবাদিকদের জন্য অপেক্ষা করছিল রাজকীয় আয়োজন। সেখানে বিয়ের অনুষ্ঠানের মতো বিরিয়ানি, কাবাব ও মিষ্টির পসরা সাজানো ছিল। সেই সঙ্গে ছিল ব্রাজিল ও ইথিওপিয়ান কফি বিন থেকে তৈরি উন্নতমানের গুরমে কফি।

এত আয়োজন করা হয়েছিল মূলত এই এক দিনের কথা ভেবেই। স্টল পরিচালনাকারী এক ব্যক্তি বলেন, “আমরা শুধু এই দিনের কথা মাথায় রেখেই ‘শান্তির জন্য কফি’ ব্র্যান্ডিংটি করেছি।” একপাশে লোকজ সংগীতের মূর্ছনা ছড়াচ্ছিলেন সেতার বাদক আমির হোসেন খানের মতো পেশাদার শিল্পীরা।

মার্কিন সংবাদমাধ্যমের জন্য বিশাল মূল মঞ্চের ঠিক সামনে বিশেষ আসনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। অন্য দেশের সাংবাদিকদের পাঠানো হয়েছিল ভিন্ন জায়গায়। ইরানি গণমাধ্যমের সংবাদকর্মীরা অবস্থান নিয়েছিলেন হলের বিপরীত প্রান্তে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সাংবাদিক বলেন, “আমি চরম বিরক্ত হয়ে গেছি।” অন্য একজন সাংবাদিকও একই সুরে বলেন, “এখানে করার মতো তেমন কিছুই নেই।” মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স রাজধানীতে পৌঁছানোর কয়েক ঘণ্টা পরও, প্রায় দুপুর ২টার আগে কোনো ধরনের আপডেট আসেনি।

বিশাল জিন্নাহ কনভেনশন সেন্টারের বড় স্ক্রিনজুড়ে তখন রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের ফুটেজ প্রচারিত হচ্ছিল। সেখানে দেখা যাচ্ছিল মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টের আগমন এবং পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের উষ্ণ অভ্যর্থনার দৃশ্য। অভ্যর্থনাকারীদের মধ্যে সামনের সারিতেই ছিলেন চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস এবং সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসিম মুনির।

এত বড় আয়োজনে সাধারণত মিডিয়া ব্রিফিংয়ের চল থাকলেও এখানে আপডেট দেওয়ার প্রক্রিয়া ছিল ভিন্ন। কোনো প্রথাগত ব্রিফিং নয়, বরং হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে পাঠানো প্রেস রিলিজ বা সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমেই তথ্য জানানো হচ্ছিল।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে একটি ‘উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন’ মার্কিন প্রতিনিধি দল পাকিস্তানে এসেছে। এই দলে বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনারও রয়েছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশাক দার তাদের স্বাগত জানান এবং স্থায়ী আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তি অর্জনে ওয়াশিংটনের ‘অঙ্গীকারের’ ভূয়সী প্রশংসা করেন।

কয়েক ঘণ্টা পর সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। বৈঠকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, এই আলোচনা টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।

তবে হলের ভেতরে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের কাছে এই বক্তব্য খুব একটা আকর্ষণীয় বা বড় কোনো শিরোনাম হওয়ার মতো ছিল না। অথচ এই সংবাদ সংগ্রহের জন্যই তারা হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে এসেছেন।

স্পিডটেস্ট ডট নেট-এর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির পরিসংখ্যান অনুযায়ী পাকিস্তানে ইন্টারনেটের গড় গতি ২৫ এমবিপিএস। তবে কনভেনশন সেন্টারে সাংবাদিকদের জন্য ছিল উচ্চগতির ওয়্যারলেস ইন্টারনেট, যার গতি ১৫০ এমবিপিএস-এরও বেশি বলে জানায় এএফপি।

কর্তৃপক্ষের এই বিশেষ ব্যবস্থা সাংবাদিকদের নজর এড়ায়নি। সাংবাদিক নাদির গুরামানি বলেন, “তারা বলছে সংবাদমাধ্যমকে সব ধরনের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে তারা ফাইভ-জি গতির ইন্টারনেট দিয়েছে। কিন্তু জিন্নাহ কনভেনশন সেন্টারের ভেতরে থাকা মিডিয়া টিমগুলো জানেই না আসলে কী ঘটছে।”

নিরাপত্তা ব্যবস্থা এই পরিবেশকে আরও অদ্ভুত করে তুলেছিল। এএফপি-র একজন সাংবাদিককে বলা হয়, কফি নিয়ে মূল হলের ভেতরে প্রবেশ করা যাবে না। একজন নিরাপত্তারক্ষী রহস্যজনকভাবে বলেন, “বিদেশি গণমাধ্যম এখানে আছে এবং তারা সবকিছু দেখছে।”

সূর্যাস্ত নাগাদ ‘ইসলামাবাদ টকস’ থেকে পাওয়া গেল কিছু প্রেস রিলিজ, মনে রাখার মতো রাজকীয় খাবার এবং প্রযুক্তিগত সংকটে জর্জরিত একটি দেশে অবিশ্বাস্য গতির ইন্টারনেট।

তবে এর বাইরে বাস্তবিক অর্থে বড় কোনো অর্জন এই আলোচনা থেকে এসেছিল কি না—হলের ভেতরে থাকা সাংবাদিকদের কাছে তা তখনও ছিল ধরাছোঁয়ার বাইরে।

সম্পর্কিত