নজরুল জাহিদ

যা আমি বুঝতে পারি না, তা খারাপ–এমন বলার অধিকার আমার নেই। আমি বুঝতে পারি না, কারণ, হয়ত বোঝার জন্যে প্রয়োজনীয় শিক্ষা আমার নেই। যেমন পিকাসোর গোয়ের্নিকা দেখে আমি হয়ত কিছু বুঝি না, তার মানে গোয়ের্নিকা খারাপ, এমন নয়। তার মানে আমি গোয়ের্নিকা দেখার মতো উপযুক্ত হয়ে উঠিনি এখনো।
তাছাড়া কোনো শিল্পকর্ম সকলকে বুঝতে হবে, এমনও নয়। শিল্পের উঠোনে এমন অধরা মাধুরী ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। শিল্প কি কেবল শিল্পের অন্তর্গত তাগিদে জন্ম নেওয়া এক অনিবার্য উপাদান, নাকি তা জীবনের প্রাত্যহিক দৈনন্দিনতার জন্যে তৈরি এক জরুরি উপকরণ-এ বিষয়ে তাই মানুষ একমত হতে পারে না।
‘শিল্পের জন্য শিল্প’ যারা মনে করেন তাদের মতে, শিল্পের অস্তিত্ব কেবল তার নিজস্ব নান্দনিক সৌন্দর্যের জন্য। এর কোনো যুক্তির প্রয়োজন নেই। অন্যদিকে, ‘জীবনের জন্য শিল্প’ যারা ভাবেন তাদের মতে শিল্প যদি বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানে কাজ না করে, সেই শিল্পের দরকার নেই।
নন্দনতত্ত্বের এই প্রাচীন বিতর্ক আর ‘রইদ’ নিয়ে ইতোমধ্যে প্রকাশিত রিভিউগুলো ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে আসুন আমরা ‘রইদ’কে একটু সাদা চোখে দেখি। আসলেই কি এই সিনেমা খুব উচ্চমার্গীয়, সাধারণের বোধবুদ্ধির বাইরে? নাকি আমার মত একজন আম-দর্শকও এই সিনেমা দেখে খুশি মনে হল থেকে বের হতে পারবে?
রিভিউগুলোতে দেখলাম, কেউ ইহুদি পুরাণ ও লোককাহিনীর চরিত্র লিলিথ বা ভার্জিন মেরি বা ইভের সাথে সাধুর বউয়ের মিল পেয়েছেন। দর্শকের স্বাধীনতা অসীম। তারা অনেক কিছুর সাথেই অনেক কিছুর মিল পেতে পারেন। কিন্তু আমি যে লিলিথকে জানি, তার সাথে সাধুর বউয়ের মিল নেই। ইহুদি লোকগাথা ‘অ্যালফাবেট অব বেন সিরা’তে আছে, ঈশ্বর আদমকে মাটি থেকে যেভাবে তৈরি করেছেন, ঠিক একইভাবে লিলিথকেও তৈরি করেছেন। ফলে লিলিথ নিজেকে আদমের সমান মনে করতেন। তাই যৌনমিলনের সময় নিচে শুতে অস্বীকার করেন। প্রতিবাদের এক পর্যায়ে ইডেন গার্ডেন ত্যাগ করে চলে যান এবং পিশাচ ও ডাইনি হয়ে ওঠেন।
‘রইদে’ও সাধুর বউকে যৌনমিলনে অসম্মত দেখা যায়। কিন্তু তা সমতার দাবিতে এমন মনে হয় না। বস্তুত ওই রাতে সাধু যেমন তীব্র কামনাকাতর ছিল তাতে বউ ‘বিপরীত বিহার’ করতে চাইলে সে রাজি হতো, তার মেল শোভেনিজম আহত হতো না। সুতরাং অণ্ডকোষে লাথি মেরে মিলনোদ্যত সাধুকে প্রত্যাখ্যান করার কারণ আর যাই হোক, সমতা প্রতিষ্ঠা নয়। বরং সাধুর প্রতি স্পষ্ট বার্তা, “আমার যোনিতে প্রবেশের যোগ্যতা তোমার হয়নি এখনো।” এছাড়া সাধুর বউকে কখনোই অশুভ আত্মা বা ডাইনি হিসেবেও মনে করার কোনো কারণ ঘটে না। চরিত্রটি বরং অজস্র বুলিংয়ের শিকার নিরীহ ছেলেমানুষীতে ভরা এক দুঃখী নারীর। যে এমনই সরল যে তরকারিতে লবণ বেশি হলে নিজের আর স্বামীর উভয়ের খাবারে পানি ঢেলে লবণ হালকা করে নেয়। লবণ-ঝাল ছাড়া তালের পিঠা বানানো যায় বলে স্বস্তি প্রকাশ করে, “আমার মাছেরা পেট ভরে খাবে”, ভেবে সব ফিশফিড একবারে পানিতে ঢেলে দেয়। সুতরাং লিলিথের সাথে সাধুর বউয়ের মিল একটা কষ্টকল্পনা বলেই আমার মনে হয়েছে।
সাধুর সাথে তার যৌনমিলন হয়নি, তাহলে গর্ভের সন্তান কার-এই প্রশ্নের জবাবে সে বলে, “আল্লাহ দিয়েছে।” এই কারণেই কেউ কেউ ভার্জিন মেরি বা মরিয়মের সাথে তার মিল খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু আমাদের সমাজে এমন একজন ভালনারেবল মেয়ে, স্বামী যাকে ফেলে আসে বারবার, বাচ্চারা যাকে নিত্য ত্যক্ত করে, নারীরা যাকে চোর বলে হেনস্থা করে, লোকে যার ঘরে আগুন দেয়, এমনও তো হতে পারে যে, তার গর্ভের দায় সে “আল্লাহ দিয়েছে” বলে এই সমাজ এই দেশ আর এই ‘অবিচারের ঈশ্বর-ব্যবস্থা’র উপরেই দিতে চেয়েছে। আমি বরং এখানে সাধুর বউয়ের সাথে হর্ষ দত্তের উপন্যাসের ময়ূরাক্ষীর মিল পাই। বাংলা সাহিত্যে ময়ূরাক্ষী যা করেছে তা একমাত্র তার পক্ষেই সম্ভব, বাংলা সিনেমায় সাধুর বউ যা করেছে সেও তার পক্ষেই সম্ভব। স্ফিত তলপেট তার দায় নয়, দ্রোহ।
পুরাণ ও লোককথায় ষাঁড় হলো অকৃত্রিম পৌরুষ আর কৃষিপ্রাচুর্যের প্রতীক। ষাঁড়ের পুরুষাঙ্গটি প্রকৃতি ও সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখা ‘প্রাণশক্তি’। সিনেমায় আমরা দেখি ষাঁড়ের শক্ত পুরুষাঙ্গ একটার পর একটা গাভীকে গাভীন করে যায়। সিনেমায় আমরা এও দেখি, পাথরের মত ‘পুরুষালি’ দেহ থাকলেও সাধু নারীর পাশে শক্ত হয়ে দাঁড়াতে পারে না।
সেই সাধু, তালের পিঠার স্বাদ ভুলতে না পারা সাধু, অবশেষে একটা অজুহাত খুঁজে পায়। একবার সে এক বাউল ফকিরকে জিজ্ঞেস করে, “আমি কি গন্ধম খাইছি?” যেন গন্ধম খাওয়ার ‘পাপ’ এর কারণেই তার বউ হারিয়ে গেছে! এই ‘তাল-রূপ গন্ধম’ আসলে তার ‘পাপ’ নয়; আধ্যাত্মিক মোড়কের ধূম্রজাল সরলে দেখা যায়, এ তার দুর্বলতা। নারীর পাশে পুরুষ হিসেবে সমান ভাবে দাঁড়াতে না পারার দুর্বলতা।
তাই তালকে গন্ধম নয়; তাল হিসাবেই দেখা যেতে পারে। এই দেশে তাল লোকসংস্কৃতির সাথে জড়িয়ে থাকা একটি মিথোলজিক্যাল ফল। শ্রীকৃষ্ণের জন্মমাস ভাদ্রে এই দেশে তাল পাকে। তালের তৈরি নানা মিষ্টি পদ ও তালের বড়া কৃষ্ণের অতি প্রিয় বলে বিশ্বাস করা হয়। এ কারণে জন্মাষ্টমী ও নন্দোৎসবে তালের পিঠা খেয়ে লোকে গায়, “…ও নন্দ নাচে রে, তালের বড়া খাইয়া নন্দ নাচে রে, কী আনন্দ হলো রে গোকূলে…।” কৃষ্ণের ভাই বলরামের রথের চূড়ায় তালের প্রতীক থাকে, তার রথের নাম ‘তালধ্বজ’। বাংলায় ‘তালনবমী’ নামে ব্রত ও উৎসব পালিত হয়। তাই তালকে বরং ‘রইদ’ এর থিমথট আর প্রাচ্য সংস্কৃতির অংশভাক হিসাবে বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখেছি।
সিনেমাটিতে ছোটোখাটো কিছু গরমিল চোখে পড়েছে। যেমন তালগাছটি যে এঙ্গেলে দাঁড়িয়ে, তাল পড়েছে তার থেকে বেশ দূরে। ছোট কুলসুমের মাথায় সাদা দাগ ছিল না, বড় কুলসুমের মাথায় আছে। নড়াইল অঞ্চলের আঞ্চলিক কথার টোনের সাথে পাহাড়ি লোকেশন ঠিক মানায় নি। কাশবন আসল নয় তা বোঝা গেছে।
সব মিলিয়ে, সিনেমাটি দেখে আসার পর মনে হচ্ছে তিনটি কারনে ‘রইদ’ দেখা দরকার। এক, বিনোদনের জন্যে। কারণ, একটা স্বপ্নঘোর লাগা অন্যরকম প্রেম-বাস্তবতা এই ছবিতে আছে। মানুষের চোখ যে বড় দৃশ্যকে ধারণ করার জন্যে তৈরি, তা এই সিনেমায় বুঝতে পারা যায়। ল্যান্ডস্কেপ, মিউজিক, আলো-ছায়ার খেলা আছে এমন সিনেমা চোখের আরাম। মনেরও প্রশান্তি।
দুই, চিন্তার খোরাকের জন্যে সিনেমাটা ‘মাস্ট ওয়াচ’। এই সিনেমায় এমন কিছু দৃশ্য আছে, আপনি যতদিন বেঁচে থাকবেন, ভুলতে পারবেন না। যেমন কুলসুমের শরীর থেকে ছিলে নেওয়া কালো চামড়ার উপর তার স্তন থেকে গড়িয়ে পড়া ফোঁটা ফোঁটা সাদা দুধ বা সাধুর গোগ্রাসে কুলসুমের মাংস ভক্ষণ…বাংলা সিনেমা তো বটেই, বিশ্বসিনেমার কোথাও এমন হৃদয় বিদীর্ণ করা, চরাচর স্তব্ধ করা দৃশ্য আছে বলে মনে হয় না।
তিন, চাকবুম ধরনের ছবির বিপরীতে ‘অন্যরকম’ সিনেমা যেন চলে, এমন সিনেমা যেন আরও তোলা হয়, তার উৎসাহ দেওয়ার সামাজিক দায়িত্ব হিসাবে সিনেমাটি দেখা দরকার। আপনি আমি না দেখলে, আলোচনা না করলে, বাংলাদেশের সিনেমায় বৈচিত্রের সৌন্দর্য হারিয়ে যাবে।
লেখক: গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী

যা আমি বুঝতে পারি না, তা খারাপ–এমন বলার অধিকার আমার নেই। আমি বুঝতে পারি না, কারণ, হয়ত বোঝার জন্যে প্রয়োজনীয় শিক্ষা আমার নেই। যেমন পিকাসোর গোয়ের্নিকা দেখে আমি হয়ত কিছু বুঝি না, তার মানে গোয়ের্নিকা খারাপ, এমন নয়। তার মানে আমি গোয়ের্নিকা দেখার মতো উপযুক্ত হয়ে উঠিনি এখনো।
তাছাড়া কোনো শিল্পকর্ম সকলকে বুঝতে হবে, এমনও নয়। শিল্পের উঠোনে এমন অধরা মাধুরী ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। শিল্প কি কেবল শিল্পের অন্তর্গত তাগিদে জন্ম নেওয়া এক অনিবার্য উপাদান, নাকি তা জীবনের প্রাত্যহিক দৈনন্দিনতার জন্যে তৈরি এক জরুরি উপকরণ-এ বিষয়ে তাই মানুষ একমত হতে পারে না।
‘শিল্পের জন্য শিল্প’ যারা মনে করেন তাদের মতে, শিল্পের অস্তিত্ব কেবল তার নিজস্ব নান্দনিক সৌন্দর্যের জন্য। এর কোনো যুক্তির প্রয়োজন নেই। অন্যদিকে, ‘জীবনের জন্য শিল্প’ যারা ভাবেন তাদের মতে শিল্প যদি বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানে কাজ না করে, সেই শিল্পের দরকার নেই।
নন্দনতত্ত্বের এই প্রাচীন বিতর্ক আর ‘রইদ’ নিয়ে ইতোমধ্যে প্রকাশিত রিভিউগুলো ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে আসুন আমরা ‘রইদ’কে একটু সাদা চোখে দেখি। আসলেই কি এই সিনেমা খুব উচ্চমার্গীয়, সাধারণের বোধবুদ্ধির বাইরে? নাকি আমার মত একজন আম-দর্শকও এই সিনেমা দেখে খুশি মনে হল থেকে বের হতে পারবে?
রিভিউগুলোতে দেখলাম, কেউ ইহুদি পুরাণ ও লোককাহিনীর চরিত্র লিলিথ বা ভার্জিন মেরি বা ইভের সাথে সাধুর বউয়ের মিল পেয়েছেন। দর্শকের স্বাধীনতা অসীম। তারা অনেক কিছুর সাথেই অনেক কিছুর মিল পেতে পারেন। কিন্তু আমি যে লিলিথকে জানি, তার সাথে সাধুর বউয়ের মিল নেই। ইহুদি লোকগাথা ‘অ্যালফাবেট অব বেন সিরা’তে আছে, ঈশ্বর আদমকে মাটি থেকে যেভাবে তৈরি করেছেন, ঠিক একইভাবে লিলিথকেও তৈরি করেছেন। ফলে লিলিথ নিজেকে আদমের সমান মনে করতেন। তাই যৌনমিলনের সময় নিচে শুতে অস্বীকার করেন। প্রতিবাদের এক পর্যায়ে ইডেন গার্ডেন ত্যাগ করে চলে যান এবং পিশাচ ও ডাইনি হয়ে ওঠেন।
‘রইদে’ও সাধুর বউকে যৌনমিলনে অসম্মত দেখা যায়। কিন্তু তা সমতার দাবিতে এমন মনে হয় না। বস্তুত ওই রাতে সাধু যেমন তীব্র কামনাকাতর ছিল তাতে বউ ‘বিপরীত বিহার’ করতে চাইলে সে রাজি হতো, তার মেল শোভেনিজম আহত হতো না। সুতরাং অণ্ডকোষে লাথি মেরে মিলনোদ্যত সাধুকে প্রত্যাখ্যান করার কারণ আর যাই হোক, সমতা প্রতিষ্ঠা নয়। বরং সাধুর প্রতি স্পষ্ট বার্তা, “আমার যোনিতে প্রবেশের যোগ্যতা তোমার হয়নি এখনো।” এছাড়া সাধুর বউকে কখনোই অশুভ আত্মা বা ডাইনি হিসেবেও মনে করার কোনো কারণ ঘটে না। চরিত্রটি বরং অজস্র বুলিংয়ের শিকার নিরীহ ছেলেমানুষীতে ভরা এক দুঃখী নারীর। যে এমনই সরল যে তরকারিতে লবণ বেশি হলে নিজের আর স্বামীর উভয়ের খাবারে পানি ঢেলে লবণ হালকা করে নেয়। লবণ-ঝাল ছাড়া তালের পিঠা বানানো যায় বলে স্বস্তি প্রকাশ করে, “আমার মাছেরা পেট ভরে খাবে”, ভেবে সব ফিশফিড একবারে পানিতে ঢেলে দেয়। সুতরাং লিলিথের সাথে সাধুর বউয়ের মিল একটা কষ্টকল্পনা বলেই আমার মনে হয়েছে।
সাধুর সাথে তার যৌনমিলন হয়নি, তাহলে গর্ভের সন্তান কার-এই প্রশ্নের জবাবে সে বলে, “আল্লাহ দিয়েছে।” এই কারণেই কেউ কেউ ভার্জিন মেরি বা মরিয়মের সাথে তার মিল খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু আমাদের সমাজে এমন একজন ভালনারেবল মেয়ে, স্বামী যাকে ফেলে আসে বারবার, বাচ্চারা যাকে নিত্য ত্যক্ত করে, নারীরা যাকে চোর বলে হেনস্থা করে, লোকে যার ঘরে আগুন দেয়, এমনও তো হতে পারে যে, তার গর্ভের দায় সে “আল্লাহ দিয়েছে” বলে এই সমাজ এই দেশ আর এই ‘অবিচারের ঈশ্বর-ব্যবস্থা’র উপরেই দিতে চেয়েছে। আমি বরং এখানে সাধুর বউয়ের সাথে হর্ষ দত্তের উপন্যাসের ময়ূরাক্ষীর মিল পাই। বাংলা সাহিত্যে ময়ূরাক্ষী যা করেছে তা একমাত্র তার পক্ষেই সম্ভব, বাংলা সিনেমায় সাধুর বউ যা করেছে সেও তার পক্ষেই সম্ভব। স্ফিত তলপেট তার দায় নয়, দ্রোহ।
পুরাণ ও লোককথায় ষাঁড় হলো অকৃত্রিম পৌরুষ আর কৃষিপ্রাচুর্যের প্রতীক। ষাঁড়ের পুরুষাঙ্গটি প্রকৃতি ও সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখা ‘প্রাণশক্তি’। সিনেমায় আমরা দেখি ষাঁড়ের শক্ত পুরুষাঙ্গ একটার পর একটা গাভীকে গাভীন করে যায়। সিনেমায় আমরা এও দেখি, পাথরের মত ‘পুরুষালি’ দেহ থাকলেও সাধু নারীর পাশে শক্ত হয়ে দাঁড়াতে পারে না।
সেই সাধু, তালের পিঠার স্বাদ ভুলতে না পারা সাধু, অবশেষে একটা অজুহাত খুঁজে পায়। একবার সে এক বাউল ফকিরকে জিজ্ঞেস করে, “আমি কি গন্ধম খাইছি?” যেন গন্ধম খাওয়ার ‘পাপ’ এর কারণেই তার বউ হারিয়ে গেছে! এই ‘তাল-রূপ গন্ধম’ আসলে তার ‘পাপ’ নয়; আধ্যাত্মিক মোড়কের ধূম্রজাল সরলে দেখা যায়, এ তার দুর্বলতা। নারীর পাশে পুরুষ হিসেবে সমান ভাবে দাঁড়াতে না পারার দুর্বলতা।
তাই তালকে গন্ধম নয়; তাল হিসাবেই দেখা যেতে পারে। এই দেশে তাল লোকসংস্কৃতির সাথে জড়িয়ে থাকা একটি মিথোলজিক্যাল ফল। শ্রীকৃষ্ণের জন্মমাস ভাদ্রে এই দেশে তাল পাকে। তালের তৈরি নানা মিষ্টি পদ ও তালের বড়া কৃষ্ণের অতি প্রিয় বলে বিশ্বাস করা হয়। এ কারণে জন্মাষ্টমী ও নন্দোৎসবে তালের পিঠা খেয়ে লোকে গায়, “…ও নন্দ নাচে রে, তালের বড়া খাইয়া নন্দ নাচে রে, কী আনন্দ হলো রে গোকূলে…।” কৃষ্ণের ভাই বলরামের রথের চূড়ায় তালের প্রতীক থাকে, তার রথের নাম ‘তালধ্বজ’। বাংলায় ‘তালনবমী’ নামে ব্রত ও উৎসব পালিত হয়। তাই তালকে বরং ‘রইদ’ এর থিমথট আর প্রাচ্য সংস্কৃতির অংশভাক হিসাবে বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখেছি।
সিনেমাটিতে ছোটোখাটো কিছু গরমিল চোখে পড়েছে। যেমন তালগাছটি যে এঙ্গেলে দাঁড়িয়ে, তাল পড়েছে তার থেকে বেশ দূরে। ছোট কুলসুমের মাথায় সাদা দাগ ছিল না, বড় কুলসুমের মাথায় আছে। নড়াইল অঞ্চলের আঞ্চলিক কথার টোনের সাথে পাহাড়ি লোকেশন ঠিক মানায় নি। কাশবন আসল নয় তা বোঝা গেছে।
সব মিলিয়ে, সিনেমাটি দেখে আসার পর মনে হচ্ছে তিনটি কারনে ‘রইদ’ দেখা দরকার। এক, বিনোদনের জন্যে। কারণ, একটা স্বপ্নঘোর লাগা অন্যরকম প্রেম-বাস্তবতা এই ছবিতে আছে। মানুষের চোখ যে বড় দৃশ্যকে ধারণ করার জন্যে তৈরি, তা এই সিনেমায় বুঝতে পারা যায়। ল্যান্ডস্কেপ, মিউজিক, আলো-ছায়ার খেলা আছে এমন সিনেমা চোখের আরাম। মনেরও প্রশান্তি।
দুই, চিন্তার খোরাকের জন্যে সিনেমাটা ‘মাস্ট ওয়াচ’। এই সিনেমায় এমন কিছু দৃশ্য আছে, আপনি যতদিন বেঁচে থাকবেন, ভুলতে পারবেন না। যেমন কুলসুমের শরীর থেকে ছিলে নেওয়া কালো চামড়ার উপর তার স্তন থেকে গড়িয়ে পড়া ফোঁটা ফোঁটা সাদা দুধ বা সাধুর গোগ্রাসে কুলসুমের মাংস ভক্ষণ…বাংলা সিনেমা তো বটেই, বিশ্বসিনেমার কোথাও এমন হৃদয় বিদীর্ণ করা, চরাচর স্তব্ধ করা দৃশ্য আছে বলে মনে হয় না।
তিন, চাকবুম ধরনের ছবির বিপরীতে ‘অন্যরকম’ সিনেমা যেন চলে, এমন সিনেমা যেন আরও তোলা হয়, তার উৎসাহ দেওয়ার সামাজিক দায়িত্ব হিসাবে সিনেমাটি দেখা দরকার। আপনি আমি না দেখলে, আলোচনা না করলে, বাংলাদেশের সিনেমায় বৈচিত্রের সৌন্দর্য হারিয়ে যাবে।
লেখক: গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী