ইন্দ্রজিৎ পারমার

কার্ল মার্কসের ২০৮তম জন্মবার্ষিকী আজ। ১৮১৮ সালের ৫ মে প্রুশিয়ার ট্রায়ারে জন্মগ্রহণকারী এই মহান চিন্তাবিদকে প্রায়শই কেবল ইউরোপকেন্দ্রিক তাত্ত্বিক হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু মার্কস ও তার আজীবনের সহযোগী ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস উপনিবেশ এবং দাসত্বের শিকার মানুষের সংগ্রামকে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করেছিলেন। বিশেষ করে আয়ারল্যান্ড, ১৮৫৭ সালের ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং আমেরিকায় দাসপ্রথা নিয়ে তাদের বিশ্লেষণ প্রমাণ করে যে, তারা শোষিত মানুষের মুক্তিকে বিশ্বজুড়ে শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখেছিলেন।
মার্কস ও এঙ্গেলস কেবল বিমূর্ত তত্ত্ব প্রদান করেননি, বরং তারা তৎকালীন বৈশ্বিক ঘটনাপ্রবাহ অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাদের বিবর্তন– ইউরোপকেন্দ্রিক প্রাথমিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে একটি ধারালো উপনিবেশবাদবিরোধী অবস্থানে রূপান্তর। তাদের বৌদ্ধিক সততা ও বস্তুনিষ্ঠ বাস্তবতার প্রতি দায়বদ্ধতারই পরিচয় দেয়।
আয়ারল্যান্ডের ক্ষেত্রে মার্কস ও এঙ্গেলস একে ইংল্যান্ডের প্রথম উপনিবেশ এবং ব্রিটিশ ক্ষমতার প্রধান ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। এঙ্গেলস নিজে আয়ারল্যান্ড ভ্রমণ করেছিলেন এবং তার সঙ্গী মেরি বার্নস ও লিজির অভিজ্ঞতা থেকে আইরিশ শ্রমিকদের দুরবস্থা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তারা দেখেছিলেন কীভাবে ইংল্যান্ড আয়ারল্যান্ডের ভূমি দখল, জবরদস্তি স্থানান্তর এবং অর্থনৈতিক অধীনতার মাধ্যমে দেশটিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে ১৮৪৫-১৮৫২ সালের মহাদুর্ভিক্ষের সময়, যখন আয়ারল্যান্ডে মানুষ না খেয়ে মরছিল, তখন ব্রিটেন সেখান থেকে খাদ্য রপ্তানি করছিল।
মার্কস তার অমর গ্রন্থ ‘ক্যাপিটাল’-এ দেখিয়েছেন কীভাবে আয়ারল্যান্ডের শোষণ ইংরেজ পুঁজি সঞ্চয়ের জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছে। শুরুতে তাঁরা ভেবেছিলেন ইংল্যান্ডের শ্রমিকরাই হয়তো আয়ারল্যান্ডের মুক্তি আনবে, কিন্তু ১৮৬৯ সালে মার্কস এঙ্গেলসকে চিঠিতে লেখেন যে, ইংরেজ শ্রমিক শ্রেণি ততদিন কিছু অর্জন করতে পারবে না যতদিন তারা আয়ারল্যান্ডকে মুক্ত না করবে। অর্থাৎ, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত নড়িয়ে দিতে আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতা ছিল একটি কৌশলগত পূর্বশর্ত। তারা আইরিশ বিপ্লবী ‘ফেনিয়ান’দের সমর্থন দিয়েছিলেন এবং আন্তর্জাতিক শ্রমিক সমিতিতে (ফার্স্ট ইন্টারন্যাশনাল) আইরিশ জাতীয় দাবিকে শ্রমিকদের আন্তর্জাতিকতাবাদের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন।
মার্কস ব্রিটিশদের ভণ্ডামির কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি সিপাহিদের নৃশংসতার নিন্দা করলেও একে ব্রিটিশদের নিজস্ব আচরণের প্রতিফলন হিসেবে বর্ণনা করেন।
ভারতের প্রেক্ষাপটে মার্কসের দৃষ্টিভঙ্গির বিবর্তন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৮৫০-এর দশকের শুরুতে নিউইয়র্ক ডেইলি ট্রিবিউন-এ লেখা নিবন্ধগুলোতে মার্কস ব্রিটিশ শাসনকে অনেকটা ধ্বংসাত্মক হলেও প্রগতিশীল বলে মনে করেছিলেন। কারণ তা সামন্ততান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে দিচ্ছিল। কিন্তু ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ বা ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ তাদের চিন্তাধারায় পরিবর্তন আনে। মার্কস ব্রিটিশদের ভণ্ডামির কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি সিপাহিদের নৃশংসতার নিন্দা করলেও একে ব্রিটিশদের নিজস্ব আচরণের প্রতিফলন হিসেবে বর্ণনা করেন।
মার্কস দেখিয়েছেন যে, ব্রিটিশ শাসনে নির্যাতন ছিল একটি ‘স্বতঃসিদ্ধ’ ঘটনা। বিদ্রোহ দমনে ব্রিটিশদের গণহত্যা, ফাঁসি এবং গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাগুলোকে তিনি বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন। তিনি সিপাহি বিদ্রোহকে নিছক কোনো সামরিক বিদ্রোহ নয়, বরং একটি ‘জাতীয় বিদ্রোহ’ হিসেবে অভিহিত করেন। এঙ্গেলস এই যুদ্ধের সামরিক কৌশলগুলো বিশ্লেষণ করেন এবং মার্কস ব্রিটিশদের ‘ভাগ করো এবং শাসন করো’ নীতির মুখোশ উন্মোচন করেন। তাদের এই কভারেজ প্রমাণ করে যে, তারা উপনিবেশিত জনগণকে ইতিহাসের কেবল শিকার নয়, বরং ইতিহাসের নির্মাতা হিসেবে দেখতেন।
আমেরিকার দাসপ্রথাকে মার্কস ও এঙ্গেলস পুঁজিবাদের একটি অপরিহার্য স্তম্ভ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। তাদের মতে, চ্যাটেল দাসত্ব কোনো সামন্ততান্ত্রিক ধ্বংসাবশেষ ছিল না, বরং তা ছিল আধুনিক পুঁজিবাদের– বিশেষ করে ব্রিটিশ শিল্পের তুলা সরবরাহের প্রধান উৎস। ১৮৬১-৬৫ সালের আমেরিকার গৃহযুদ্ধকে তারা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। মার্কস আব্রাহাম লিঙ্কনের ‘মুক্তি ঘোষণা’ (Emancipation Proclamation) এবং কৃষ্ণাঙ্গ সেনাদের সশস্ত্র অংশগ্রহণকে স্বাগত জানান। তিনি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছিলেন যে, শ্বেতাঙ্গ শ্রমিকেরা নিজেদের মুক্ত করতে পারবে না যতক্ষণ না কৃষ্ণাঙ্গদের দাসত্বের ছাপ মুছে যাচ্ছে।
কার্ল মার্কস কেবল অর্থনৈতিক তাত্ত্বিক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন বিশ্বজুড়ে নিপীড়িত ও অধিকারবঞ্চিত মানুষের সবচেয়ে সোচ্চার কণ্ঠস্বর। ২০৮ বছর পরেও তার দর্শন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী প্রতিটি লড়াইয়ের আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করছে।
দাসের শ্রমের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা দক্ষিণের সামাজিক ব্যবস্থা এবং উত্তরের মুক্ত শ্রমের মধ্যে এই যুদ্ধকে তারা সমাজব্যবস্থার লড়াই হিসেবে দেখেছিলেন। মার্কস ও এঙ্গেলস অনুধাবন করেছিলেন যে, দাসত্বের বিলুপ্তিই আমেরিকার শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনের পথ প্রশস্ত করবে। এই গৃহযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ শাসক শ্রেণির কনফেডারেটদের প্রতি সহমর্মিতাকে তারা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন এবং উত্তরের শ্রমিকদের পাশে দাঁড়ানোর ডাক দেন।
মার্কস ও এঙ্গেলস ছিলেন প্রকৃত আন্তর্জাতিকতাবাদী। তারা শ্রমিক আন্দোলনের ভেতরে কোনো ধরনের উগ্র দেশপ্রেম বা জাতীয়তাবাদ সমর্থন করেননি। তাদের মতে, সাম্রাজ্যের কেন্দ্রে থাকা শ্রমিকদের উচিত উপনিবেশিত মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে সমর্থন করা। এটি কেবল দয়া নয়, বরং নিজের মুক্তিরই একটি কৌশলগত অংশ। তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি লেনিন থেকে শুরু করে গ্লোবাল সাউথের অসংখ্য বিপ্লবী চিন্তাবিদকে অনুপ্রাণিত করেছে।
বর্তমান বিশ্বে যখন বৈষম্য তীব্রতর হচ্ছে এবং নয়া-সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন দানা বাঁধছে, তখন মার্কস ও এঙ্গেলসের এই তাত্ত্বিক উত্তরাধিকার আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। কিউবা, ভেনিজুয়েলা, ইরান, গাজা থেকে শুরু করে আয়ারল্যান্ড পর্যন্ত আজ যে উপনিবেশবাদবিরোধী সংগ্রাম চলছে, তার বৌদ্ধিক ভিত্তি মার্কস ও এঙ্গেলস অনেক আগেই স্থাপন করে গেছেন। কার্ল মার্কস কেবল অর্থনৈতিক তাত্ত্বিক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন বিশ্বজুড়ে নিপীড়িত ও অধিকারবঞ্চিত মানুষের সবচেয়ে সোচ্চার কণ্ঠস্বর। ২০৮ বছর পরেও তার দর্শন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী প্রতিটি লড়াইয়ের আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করছে।
লেখক: লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিটি সেন্ট জর্জেস-এর স্কুল অফ পলিসি অ্যান্ড গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স-এর আন্তর্জাতিক রাজনীতির অধ্যাপক এবং গবেষণার সহযোগী ডিন। তিনি একাডেমি অফ সোশ্যাল সায়েন্সেস-এর একজন ফেলো।
(লেখাটি ভারতের অনলাইন গণমাধ্যম দ্য ওয়্যার-এর সৌজন্যে প্রকাশিত।)

কার্ল মার্কসের ২০৮তম জন্মবার্ষিকী আজ। ১৮১৮ সালের ৫ মে প্রুশিয়ার ট্রায়ারে জন্মগ্রহণকারী এই মহান চিন্তাবিদকে প্রায়শই কেবল ইউরোপকেন্দ্রিক তাত্ত্বিক হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু মার্কস ও তার আজীবনের সহযোগী ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস উপনিবেশ এবং দাসত্বের শিকার মানুষের সংগ্রামকে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করেছিলেন। বিশেষ করে আয়ারল্যান্ড, ১৮৫৭ সালের ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং আমেরিকায় দাসপ্রথা নিয়ে তাদের বিশ্লেষণ প্রমাণ করে যে, তারা শোষিত মানুষের মুক্তিকে বিশ্বজুড়ে শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখেছিলেন।
মার্কস ও এঙ্গেলস কেবল বিমূর্ত তত্ত্ব প্রদান করেননি, বরং তারা তৎকালীন বৈশ্বিক ঘটনাপ্রবাহ অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাদের বিবর্তন– ইউরোপকেন্দ্রিক প্রাথমিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে একটি ধারালো উপনিবেশবাদবিরোধী অবস্থানে রূপান্তর। তাদের বৌদ্ধিক সততা ও বস্তুনিষ্ঠ বাস্তবতার প্রতি দায়বদ্ধতারই পরিচয় দেয়।
আয়ারল্যান্ডের ক্ষেত্রে মার্কস ও এঙ্গেলস একে ইংল্যান্ডের প্রথম উপনিবেশ এবং ব্রিটিশ ক্ষমতার প্রধান ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। এঙ্গেলস নিজে আয়ারল্যান্ড ভ্রমণ করেছিলেন এবং তার সঙ্গী মেরি বার্নস ও লিজির অভিজ্ঞতা থেকে আইরিশ শ্রমিকদের দুরবস্থা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তারা দেখেছিলেন কীভাবে ইংল্যান্ড আয়ারল্যান্ডের ভূমি দখল, জবরদস্তি স্থানান্তর এবং অর্থনৈতিক অধীনতার মাধ্যমে দেশটিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে ১৮৪৫-১৮৫২ সালের মহাদুর্ভিক্ষের সময়, যখন আয়ারল্যান্ডে মানুষ না খেয়ে মরছিল, তখন ব্রিটেন সেখান থেকে খাদ্য রপ্তানি করছিল।
মার্কস তার অমর গ্রন্থ ‘ক্যাপিটাল’-এ দেখিয়েছেন কীভাবে আয়ারল্যান্ডের শোষণ ইংরেজ পুঁজি সঞ্চয়ের জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছে। শুরুতে তাঁরা ভেবেছিলেন ইংল্যান্ডের শ্রমিকরাই হয়তো আয়ারল্যান্ডের মুক্তি আনবে, কিন্তু ১৮৬৯ সালে মার্কস এঙ্গেলসকে চিঠিতে লেখেন যে, ইংরেজ শ্রমিক শ্রেণি ততদিন কিছু অর্জন করতে পারবে না যতদিন তারা আয়ারল্যান্ডকে মুক্ত না করবে। অর্থাৎ, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত নড়িয়ে দিতে আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতা ছিল একটি কৌশলগত পূর্বশর্ত। তারা আইরিশ বিপ্লবী ‘ফেনিয়ান’দের সমর্থন দিয়েছিলেন এবং আন্তর্জাতিক শ্রমিক সমিতিতে (ফার্স্ট ইন্টারন্যাশনাল) আইরিশ জাতীয় দাবিকে শ্রমিকদের আন্তর্জাতিকতাবাদের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন।
মার্কস ব্রিটিশদের ভণ্ডামির কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি সিপাহিদের নৃশংসতার নিন্দা করলেও একে ব্রিটিশদের নিজস্ব আচরণের প্রতিফলন হিসেবে বর্ণনা করেন।
ভারতের প্রেক্ষাপটে মার্কসের দৃষ্টিভঙ্গির বিবর্তন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৮৫০-এর দশকের শুরুতে নিউইয়র্ক ডেইলি ট্রিবিউন-এ লেখা নিবন্ধগুলোতে মার্কস ব্রিটিশ শাসনকে অনেকটা ধ্বংসাত্মক হলেও প্রগতিশীল বলে মনে করেছিলেন। কারণ তা সামন্ততান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে দিচ্ছিল। কিন্তু ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ বা ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ তাদের চিন্তাধারায় পরিবর্তন আনে। মার্কস ব্রিটিশদের ভণ্ডামির কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি সিপাহিদের নৃশংসতার নিন্দা করলেও একে ব্রিটিশদের নিজস্ব আচরণের প্রতিফলন হিসেবে বর্ণনা করেন।
মার্কস দেখিয়েছেন যে, ব্রিটিশ শাসনে নির্যাতন ছিল একটি ‘স্বতঃসিদ্ধ’ ঘটনা। বিদ্রোহ দমনে ব্রিটিশদের গণহত্যা, ফাঁসি এবং গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাগুলোকে তিনি বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন। তিনি সিপাহি বিদ্রোহকে নিছক কোনো সামরিক বিদ্রোহ নয়, বরং একটি ‘জাতীয় বিদ্রোহ’ হিসেবে অভিহিত করেন। এঙ্গেলস এই যুদ্ধের সামরিক কৌশলগুলো বিশ্লেষণ করেন এবং মার্কস ব্রিটিশদের ‘ভাগ করো এবং শাসন করো’ নীতির মুখোশ উন্মোচন করেন। তাদের এই কভারেজ প্রমাণ করে যে, তারা উপনিবেশিত জনগণকে ইতিহাসের কেবল শিকার নয়, বরং ইতিহাসের নির্মাতা হিসেবে দেখতেন।
আমেরিকার দাসপ্রথাকে মার্কস ও এঙ্গেলস পুঁজিবাদের একটি অপরিহার্য স্তম্ভ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। তাদের মতে, চ্যাটেল দাসত্ব কোনো সামন্ততান্ত্রিক ধ্বংসাবশেষ ছিল না, বরং তা ছিল আধুনিক পুঁজিবাদের– বিশেষ করে ব্রিটিশ শিল্পের তুলা সরবরাহের প্রধান উৎস। ১৮৬১-৬৫ সালের আমেরিকার গৃহযুদ্ধকে তারা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। মার্কস আব্রাহাম লিঙ্কনের ‘মুক্তি ঘোষণা’ (Emancipation Proclamation) এবং কৃষ্ণাঙ্গ সেনাদের সশস্ত্র অংশগ্রহণকে স্বাগত জানান। তিনি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছিলেন যে, শ্বেতাঙ্গ শ্রমিকেরা নিজেদের মুক্ত করতে পারবে না যতক্ষণ না কৃষ্ণাঙ্গদের দাসত্বের ছাপ মুছে যাচ্ছে।
কার্ল মার্কস কেবল অর্থনৈতিক তাত্ত্বিক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন বিশ্বজুড়ে নিপীড়িত ও অধিকারবঞ্চিত মানুষের সবচেয়ে সোচ্চার কণ্ঠস্বর। ২০৮ বছর পরেও তার দর্শন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী প্রতিটি লড়াইয়ের আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করছে।
দাসের শ্রমের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা দক্ষিণের সামাজিক ব্যবস্থা এবং উত্তরের মুক্ত শ্রমের মধ্যে এই যুদ্ধকে তারা সমাজব্যবস্থার লড়াই হিসেবে দেখেছিলেন। মার্কস ও এঙ্গেলস অনুধাবন করেছিলেন যে, দাসত্বের বিলুপ্তিই আমেরিকার শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনের পথ প্রশস্ত করবে। এই গৃহযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ শাসক শ্রেণির কনফেডারেটদের প্রতি সহমর্মিতাকে তারা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন এবং উত্তরের শ্রমিকদের পাশে দাঁড়ানোর ডাক দেন।
মার্কস ও এঙ্গেলস ছিলেন প্রকৃত আন্তর্জাতিকতাবাদী। তারা শ্রমিক আন্দোলনের ভেতরে কোনো ধরনের উগ্র দেশপ্রেম বা জাতীয়তাবাদ সমর্থন করেননি। তাদের মতে, সাম্রাজ্যের কেন্দ্রে থাকা শ্রমিকদের উচিত উপনিবেশিত মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে সমর্থন করা। এটি কেবল দয়া নয়, বরং নিজের মুক্তিরই একটি কৌশলগত অংশ। তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি লেনিন থেকে শুরু করে গ্লোবাল সাউথের অসংখ্য বিপ্লবী চিন্তাবিদকে অনুপ্রাণিত করেছে।
বর্তমান বিশ্বে যখন বৈষম্য তীব্রতর হচ্ছে এবং নয়া-সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন দানা বাঁধছে, তখন মার্কস ও এঙ্গেলসের এই তাত্ত্বিক উত্তরাধিকার আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। কিউবা, ভেনিজুয়েলা, ইরান, গাজা থেকে শুরু করে আয়ারল্যান্ড পর্যন্ত আজ যে উপনিবেশবাদবিরোধী সংগ্রাম চলছে, তার বৌদ্ধিক ভিত্তি মার্কস ও এঙ্গেলস অনেক আগেই স্থাপন করে গেছেন। কার্ল মার্কস কেবল অর্থনৈতিক তাত্ত্বিক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন বিশ্বজুড়ে নিপীড়িত ও অধিকারবঞ্চিত মানুষের সবচেয়ে সোচ্চার কণ্ঠস্বর। ২০৮ বছর পরেও তার দর্শন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী প্রতিটি লড়াইয়ের আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করছে।
লেখক: লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিটি সেন্ট জর্জেস-এর স্কুল অফ পলিসি অ্যান্ড গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স-এর আন্তর্জাতিক রাজনীতির অধ্যাপক এবং গবেষণার সহযোগী ডিন। তিনি একাডেমি অফ সোশ্যাল সায়েন্সেস-এর একজন ফেলো।
(লেখাটি ভারতের অনলাইন গণমাধ্যম দ্য ওয়্যার-এর সৌজন্যে প্রকাশিত।)