১৯৭৪ সালের ২০ জুলাই ভারত সরকার ঘোষণা করে সিনেমাটি সেরা চলচ্চিত্র ও সেরা চিত্রগ্রহণ বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাচ্ছে।
সুদীপ্ত সালাম

জীবনে মাত্র একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা তৈরি করেছিলেন তিনি, যা এখনো বলিউডের অন্যতম ‘ক্লাসিক’ হিসেবে বিবেচিত। ১৯৭৪ সালের ২০ জুলাই ২১তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আসরে ছবিটিকে সেরা হিন্দি সিনেমা হিসেবে নির্বাচন করা হয়। এর কয়েক ঘণ্টা পর মাত্র ৩৫ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়।
বলছি পরিচালক অবতার কৃষ্ণ কৌলের কথা। মণি কৌল ও মৃণাল সেনের সমসাময়িক হলেও তার নাম সিনেমাপ্রেমীদের অনেকেই শোনেনি। ১৯৭৪ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটির নাম ‘টুয়েন্টি সেভেন ডাউন’। এটি তৈরি করা হয়েছিল হিন্দি কথাসাহিত্যিক রমেশ বকশির ‘আঠারহ সূরজ কে পৌধে’ উপন্যাস অবলম্বনে। সিনেমাটি পরিচালনা ছাড়াও চিত্রনাট্য ও প্রযোজনা তিনিই করেছিলেন।
কেন্দ্রীয় চরিত্র সঞ্জয়ের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন এম কে রাইনা। আরো আছেন রাখি ও ওম শিবপুরি। সঞ্জয় চরিত্রের অন্তর্জগৎ ও বহির্জগতের যাত্রাই এই সিনেমার মূল বিষয়। সে একজন ট্রেন কন্ডাক্টর। তার আত্ম-অন্বেষণমূলক জীবনকাহিনিই সিনেমার কাহিনি। সিনেমার একটা বড় অংশ মুম্বাই-বারাণসী রুটের ট্রেনে শুট করা।
ট্রেন এখানে একটি প্রতীক। সঞ্জয়ের জীবনের প্রতীক। সঞ্জয় তার প্রাক্তন প্রেমিকা শালিনীকে বলছে, “তুমি তো জানো শালিনী, আমি যা হতে চেয়েছিলাম, তা হতে পারিনি। আমি একটি লম্বা চলার পথ চেয়েছিলাম। কিন্তু পেলাম রেললাইন। এই রেললাইনের গন্তব্য আগে থেকেই নির্ধারিত, লাইনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। আমি এখন ক্লান্ত।” সে আরো ভাবে, “যখনই আমার মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হয়, যখনই আমার কাছে প্রশ্নের জবাব থাকে না, তখন মনে হয়, চলন্ত ট্রেনই আমার ভরসা। জানি না কেন মনে হয়, এই বেগবান যাত্রাই সঠিক, বাকি সব মিথ্যা। আজব এক চক্র। শুধুই ছুটে চলা।” সিনেমাটি ট্রেন দিয়ে শুরু, ট্রেনেই শেষ।
পিতার কঠোর শাসনের মধ্যে বড় হয় শিল্পমনা সঞ্জয়। পিতার ইচ্ছে অনুযায়ী, নিজের সব স্বপ্ন জলাঞ্জলি দিয়ে রেলওয়ের চাকরিতে ঢুকতে হয় তাকে। ফলে তার অনুশোচনার শেষ থাকে না। ইতালির নিওরিয়ালিজম থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে পঞ্চাশের দশকে ভারতে যে প্যারালাল বা নিউ ইন্ডিয়ান সিনেমা আন্দোলন শুরু হয়েছিল। সেই আন্দোলনকে আরো এগিয়ে নিয়ে যায় অবতার কৃষ্ণ কৌলের এই ‘টুয়েন্টি সেভেন ডাউন’।
প্রথম ছবিতেই আলোচনার ঝড় তোলেন তিনি। চলচ্চিত্র সমালোচকরা ভীষণ প্রশংসা করেন। তারই ধারাবাহিকতায় ছবিটি লোকার্নো চলচ্চিত্র উৎসবে ইকিউমেনিক্যাল পুরস্কার এবং মানহাইম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ডুলকাট পুরস্কার অর্জন করে।
১৯৭৪ সালের ২০ জুলাই ভারত সরকার ঘোষণা করে সিনেমাটি সেরা চলচ্চিত্র ও সেরা চিত্রগ্রহণ বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাচ্ছে। তার কয়েক ঘণ্টা পরই মুম্বাইয়ের বালকেশ্বর এলাকায় একটি মেয়েকে পানিতে ডুবে যাওয়া থেকে বাঁচাতে গিয়ে নিজে ডুবে মারা যান।
অবতার কৃষ্ণ কৌলের জন্ম ১৯৩৯ সালে, জম্মু-কাশ্মীরের শ্রীনগরে। শুরুতে অবতার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কাজ করতেন। পরে তাকে পাঠানো হয় নিউইয়র্কে ভারতীয় দূতাবাসে। ১৯৬০ সালে সেই চাকরি ছেড়ে তিনি সিনেমা তৈরি শিখতে ভর্তি হন নিউইয়র্কের ইনস্টিটিউট অব ফিল্ম টেকনিকস-এ। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি টেক্সি চালাতেন। ১৯৭০ সালে তিনি বিখ্যাত পরিচালক জেমস আইভরির ‘বম্বে টকি’ সিনেমায় সহকারী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৪ বছর প্রবাস-জীবন শেষে তিনি ভারতে ফিরে মাত্র ২ লাখ টাকায় নির্মাণ করেছিলেন তার প্রথম এবং শেষ সিনেমাটি।
তথ্যসূত্র:
দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া, ২০ জুলাই ২০২৫
দ্য হিন্দু, ১৭ জানুয়ারি ২০২৫
আনন্দবাজার ডটকম, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫

জীবনে মাত্র একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা তৈরি করেছিলেন তিনি, যা এখনো বলিউডের অন্যতম ‘ক্লাসিক’ হিসেবে বিবেচিত। ১৯৭৪ সালের ২০ জুলাই ২১তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আসরে ছবিটিকে সেরা হিন্দি সিনেমা হিসেবে নির্বাচন করা হয়। এর কয়েক ঘণ্টা পর মাত্র ৩৫ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়।
বলছি পরিচালক অবতার কৃষ্ণ কৌলের কথা। মণি কৌল ও মৃণাল সেনের সমসাময়িক হলেও তার নাম সিনেমাপ্রেমীদের অনেকেই শোনেনি। ১৯৭৪ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটির নাম ‘টুয়েন্টি সেভেন ডাউন’। এটি তৈরি করা হয়েছিল হিন্দি কথাসাহিত্যিক রমেশ বকশির ‘আঠারহ সূরজ কে পৌধে’ উপন্যাস অবলম্বনে। সিনেমাটি পরিচালনা ছাড়াও চিত্রনাট্য ও প্রযোজনা তিনিই করেছিলেন।
কেন্দ্রীয় চরিত্র সঞ্জয়ের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন এম কে রাইনা। আরো আছেন রাখি ও ওম শিবপুরি। সঞ্জয় চরিত্রের অন্তর্জগৎ ও বহির্জগতের যাত্রাই এই সিনেমার মূল বিষয়। সে একজন ট্রেন কন্ডাক্টর। তার আত্ম-অন্বেষণমূলক জীবনকাহিনিই সিনেমার কাহিনি। সিনেমার একটা বড় অংশ মুম্বাই-বারাণসী রুটের ট্রেনে শুট করা।
ট্রেন এখানে একটি প্রতীক। সঞ্জয়ের জীবনের প্রতীক। সঞ্জয় তার প্রাক্তন প্রেমিকা শালিনীকে বলছে, “তুমি তো জানো শালিনী, আমি যা হতে চেয়েছিলাম, তা হতে পারিনি। আমি একটি লম্বা চলার পথ চেয়েছিলাম। কিন্তু পেলাম রেললাইন। এই রেললাইনের গন্তব্য আগে থেকেই নির্ধারিত, লাইনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। আমি এখন ক্লান্ত।” সে আরো ভাবে, “যখনই আমার মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হয়, যখনই আমার কাছে প্রশ্নের জবাব থাকে না, তখন মনে হয়, চলন্ত ট্রেনই আমার ভরসা। জানি না কেন মনে হয়, এই বেগবান যাত্রাই সঠিক, বাকি সব মিথ্যা। আজব এক চক্র। শুধুই ছুটে চলা।” সিনেমাটি ট্রেন দিয়ে শুরু, ট্রেনেই শেষ।
পিতার কঠোর শাসনের মধ্যে বড় হয় শিল্পমনা সঞ্জয়। পিতার ইচ্ছে অনুযায়ী, নিজের সব স্বপ্ন জলাঞ্জলি দিয়ে রেলওয়ের চাকরিতে ঢুকতে হয় তাকে। ফলে তার অনুশোচনার শেষ থাকে না। ইতালির নিওরিয়ালিজম থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে পঞ্চাশের দশকে ভারতে যে প্যারালাল বা নিউ ইন্ডিয়ান সিনেমা আন্দোলন শুরু হয়েছিল। সেই আন্দোলনকে আরো এগিয়ে নিয়ে যায় অবতার কৃষ্ণ কৌলের এই ‘টুয়েন্টি সেভেন ডাউন’।
প্রথম ছবিতেই আলোচনার ঝড় তোলেন তিনি। চলচ্চিত্র সমালোচকরা ভীষণ প্রশংসা করেন। তারই ধারাবাহিকতায় ছবিটি লোকার্নো চলচ্চিত্র উৎসবে ইকিউমেনিক্যাল পুরস্কার এবং মানহাইম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ডুলকাট পুরস্কার অর্জন করে।
১৯৭৪ সালের ২০ জুলাই ভারত সরকার ঘোষণা করে সিনেমাটি সেরা চলচ্চিত্র ও সেরা চিত্রগ্রহণ বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাচ্ছে। তার কয়েক ঘণ্টা পরই মুম্বাইয়ের বালকেশ্বর এলাকায় একটি মেয়েকে পানিতে ডুবে যাওয়া থেকে বাঁচাতে গিয়ে নিজে ডুবে মারা যান।
অবতার কৃষ্ণ কৌলের জন্ম ১৯৩৯ সালে, জম্মু-কাশ্মীরের শ্রীনগরে। শুরুতে অবতার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কাজ করতেন। পরে তাকে পাঠানো হয় নিউইয়র্কে ভারতীয় দূতাবাসে। ১৯৬০ সালে সেই চাকরি ছেড়ে তিনি সিনেমা তৈরি শিখতে ভর্তি হন নিউইয়র্কের ইনস্টিটিউট অব ফিল্ম টেকনিকস-এ। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি টেক্সি চালাতেন। ১৯৭০ সালে তিনি বিখ্যাত পরিচালক জেমস আইভরির ‘বম্বে টকি’ সিনেমায় সহকারী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৪ বছর প্রবাস-জীবন শেষে তিনি ভারতে ফিরে মাত্র ২ লাখ টাকায় নির্মাণ করেছিলেন তার প্রথম এবং শেষ সিনেমাটি।
তথ্যসূত্র:
দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া, ২০ জুলাই ২০২৫
দ্য হিন্দু, ১৭ জানুয়ারি ২০২৫
আনন্দবাজার ডটকম, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫