Advertisement Banner

দাদার হজযাত্রা

দাদার হজযাত্রা
ছবি: এআই দিয়ে বানানো

দাদা মোট চারবার হজ করেছেন।

প্রথমবার যখন হজে যান, তখন দাদার বয়স ছিল আঠারো বছর।

শুনে আমি বললাম, মাত্র আঠারো বছর!

দাদা বললেন, হ দাদা। পয়লা যেই বচ্ছর হজে গেলাম, আমার বয়েস আছিল্ আডারো বচ্ছর। মায়েরে না জানাইয়া চুপেচাপে গেছিলাম গা।

আমি অবাক হয়ে বললাম, না জানাইয়া গেছিলেন!

হ।

জানাইলে যাইতে দিতো না?

না।

ক্যান?

ডরে।

কীসের ডর?

যদি ফিরা আইতে না পারি।

ফিরতে পারবেন না ক্যান?

অহন হজে যাওনের অনেক সুবিদা। উড়াল জাহাজ আছে। আমি গেছি ইংরাজ আমলে౼পরথম মহাযুদ্দু লাগনের দুই বচ্ছর আগে (১৯১২ সাল)। তহন তো পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ আর পূবে বর্মামুল্লুক মিলাইয়া এট্টাই দ্যাশ আছিল౼বিটিশ-ভারত। বোম্বাই গোনে পানির জাহাজে চইড়া যাইতে হইতো। যাওন-আহন মিলাইয়া তিন-চাইর মাস লাইগ্যা যাইতো।

আমি অবাক হয়ে বললাম, এত দিন!

হ দাদা। যারা যাইতো হগোলতে ফিরা আইতো না। কেওই মরতো অসুক-বিমারে, কেওই থাইক্কা যাইতো মক্কায়।

মক্কায় থাকত কেমনে?

হেই হগোল দিনে থাকতে পারতো। তোমার এক ফুবু আছে, আমার চাচতো ভাই ইসুপ মোলবীর (ইউসুফ মৌলভী) বড়ো মাইয়্যা। নাম আমেনা। মক্কাতে বাড়ি আছে। কাবা শরিফের বোগলে।

মক্কায় বাড়ি!

হ। আমেনার বিয়া হইছিল এক মাল্লুমের লগে।

মাল্লুম কী দাদা?

মাল্লুমরা (মুয়াল্লেম) মক্কায় হাজিগো থাকোন-খাওন, মিনা-আরাফার ময়দানে তাঁবুর বন্দোবস্ত করে। অসুক-বিসুকে ডাক্তার-কবিরাজ দেহায়।

সেই ফুফা কি আরবের লোক?

না। আমাগো দ্যাশের।

তাইলে মাল্লুম হইলো কেমনে?

খালি আরব দ্যাশের না, অন্য দ্যাশে গোন আরবে গেছে এমুন মাইনষেও মাল্লুমগিরি করতো। তোমার হেই ফুবার বাবা মোসলেম মুন্সি হজে যাইয়া পয়লা নিজে মাল্লুম হইছে। পরে বানাইছে ছেইলারে।

কেমনে মাল্লুম হইছিল?

হুনছি মোসলেম মুন্সি হজে যাইয়া অসুকে পড়ছিল । বিরাট অসুক। যায় যায় অবস্তা।

হজ করতে পারে নাই?

পারছে। হজের পর অসুকে ধরছিল। তাগো মাল্লুম আছিল মুর্শিদাবাদের লোক। খুব ভালো মানুষ। মাল্লুম সাব মোসলেম মুন্সিরে ডাক্তারখানায় লইয়া গেল। ওষুদ-পথ্যের ব্যবস্তা করলো। অসুক যহন ভালো হইলো, দ্যাশে আহনের ব্যবস্তা নাই। হজ ছাড়া জাহাজ চলে না। টাহা-পয়সাও ব্যাবাক খরচা হইয়া গ্যাছে।

আমি বললাম, তখন কী করলো?

হজের সমায় ছাড়া তাগো কাম-কাইজ থাকে না। এক হজে যা কামায়, হেই টাহা দিয়া বচ্ছরের খয়খরচা চালায়। মুর্শিদাবাদী মাল্লুম পরের হজ তমাত মোসলেম মুন্সির থাকোন খাওনের ব্যবস্তা করলো। যহন হজ আইলো মাল্লুমের লগে থাইক্যা তারে কামে সাহাইয্য করলো। পরে নিজেই মাল্লুমের কাম আরাম্ভ কইরা দিলো। মুর্শিদাবাদী মাল্লুমই কাগজপাতির ব্যবস্তা কইরা দিছিল ।

আমি বললাম, তারপর?

দাদা বললেন, যেই বচ্ছর ইসুপ মোলবী পয়লা বার হজে গেল, মোসলেম মুন্সি তাগো মাল্লুম আছিল। ইসুপ মোলবী বড়ো আলেম। মোসলেম মুন্সির লগে খাতির হইতে দেরি হইলো না। মাল্লুম সাব ইসুপ মোলবীরে দ্যাশে গোন হাজি ন্যাওনের পরামিশ (পরামর্শ) দিলো। ইসুপ মোলবী কইলকাত্তার মাদ্রাসায় লেহাপড়া করছে। বুজদার মানুষ। হজে গোন ফিরা আইলো। পরের সন গ্রামে গোন হাজি ন্যাওন শুরু করলো। পিত্তি বচ্ছরই মোসলেম মুন্সি মাল্লুমের নামে হাজি নিতো। পরে মোসলেম মুন্সির পোলার লগে আমেনারে বিয়া দিলো।

আমি জানতে চাইলাম, আপনে কি আমেনা ফুফুর মক্কার বাড়িতে গেছেন?

দাদা বললেন, শ্যাষ যেইবার হজে গেছিলাম, হেই সুম আমেনার বাইত্তেই আছিলাম।

বিভিন্ন সময় শুনেছি আগে মানুষ হজে যেত পায়ে হেঁটে। তাতে যেতে আসতে প্রায় এক বছর লাগতো। এ বিষয়ে দাদার কাছে জানতে চাইলাম, আগে কি মানুষ হাইট্টা হজে যাইতো?

দাদা বললেন, কে জানে, ক্যামনে কই; আমি তো দেহি নাই। তয় হুনছি। দাদা পরদাদার আমলে যাইতে পারে।

আপনে কেমনে গেছিলেন?

হেইডা এক বিরাট ইতিহাস। হুনবা?

আমি মাথা নেড়ে সায় দিলাম। দাদা তার প্রথম হজযাত্রার ‘বিরাট ইতিহাস’ বলতে শুরু করলেন౼

ইসুপ মোলবী আছিল্ আমার নয়-দশ বচ্ছরের বড়ো। বড়ো চাচার বড়ো ছেইলা। কইলকাত্তা গোন টাইটেল পাশ কইরা যহন দ্যাশে আইলো, গেরামের মাইনসে খুব ইজ্জত দিলো। আশেপাশের পাঁচ-দশ গেরামে হ্যার লাহান ভালো আলেম আছিল না। ইসুপ মোলবী এই গেরাম হেই গেরাম ঘুরতো। মাফিলে ওয়াজ করতো। দূরে হাইট্টা যাইতে কষ্ট হয় বইল্যা একদিন হাডে গোনে এট্টা ঘোড়া কিন্না আনলো। বহুত তাগড়া ঘোড়া। মোলবীর ঘোড়া যহন ছুডে, গেরামের পোলাপান পিছন পিছন দৌড় পারে। একবার কী হইছে... বলে দাদা থামলেন।

আমি বললাম, কী?

চৈত মাসের গরমে ইসুপ মোলবী ঘোড়ায় চইড়া গাঙ্গে গেছে নাইতে। লগে চাইর বচ্ছরের পোলা। ঘোড়া ছাইড়া দিয়া মোলবী পানিতে নামছে। ঘোড়া নদীর ধারে ঘাস-পাতা খাইতে লাগছে। এদিকে পোলাডা খ্যালতে খ্যালতে ঘোড়ার লাগামের দড়ি গতরে প্যাঁচাইয়া হালাইছে। আৎকা দড়িতে লাগছে টান। লগে লগে ঘোড়া দিছে দৌড়। পোলা গেছে মাডিতে পইড়া। গতরে গোন দড়ি ছুডাইতে পারে নাই। ঘোড়া পোলাডারে টাইন্যা-ছ্যাচড়াইয়া নিয়া গেছে বহুত দূরে। যহন থামলো, রক্তে পোলাডার গাও ভাইস্যা গেছে।

ছেলেটির মর্মান্তিক মৃত্যু আমার অনুভূতিকে নাড়িয়ে দিলো। দৃশ্যটি যেন নিজের চোখে দেখতে পেলেম। আমার কষ্ট হতে লাগলো। কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে এলো, আহারে!

দাদা বললেন, হেই ঘটনার পর ইসুপ মোলবী এক্কেরে থুম ধইরা গেল । গেরামের মাফিলে যায় না, মাইনষের লগে মন খুইল্যা কতাও কয় না। বেশির ভাগ সমায় মসজিদ ঘরে পইড়া থাকে। মাঝে মইদ্দে তবলিগ জমাতে যায়। একবার এক চিল্লায় গোন ফিরা আইসা কইলো হজে যাইবো।

হজ কইরা ফেরনের পর থিকা পেত্তেক বছর হজের সুম গেরামের মানুষ গুছাইয়া হজে নিতে লাগলো। আমি একবার হ্যারে কইলাম, “মিয়া ভাই, হজে যামু নিয়াইত করছি।”হে কইলো, “আলহামদুলিল্লাহ। রব্বুল আ’লামিন তোমার নিয়াইত কবুল করুক। টাকা-পয়সা গুছাইছোনি?” কইলাম, গুছাইন্নাই আছে।

আমি বললাম, কত টাকা দাদা?

দাদা বললেন, চাইরশোতেই হইয়া যাইতো। আমি গুছাইছিলাম পাসশো টাহা।

অবাক হয়ে বললাম, মাত্র চাইরশো টাকায় হজ হইয়া যাইতো!

দাদা বললান, হ দাদা, হেই আমলে একমণ চাউলের দাম আছিল্ তিন-চাইর টাহা। সোনার ভরি কত হুনবা?

কত?

পোচিশ-তিরিশ টাহা।

আমি অবাক হয়ে বললাম, এত কম!

হ দাদা, তহন জিনিসপত্রের দাম আছিল কম, টাহার দাম আছিল বেশি।

কবে রওনা করলেন?

হেই সন হজ হইছিল আগুন (অগ্রহায়ণ) মাসে (১৯১২ সালের হজ: ১৯ থেকে ২৫ নভেম্বরের মধ্যে)। আমরা পাড়ায় দুই মাস আগে আশ্বিন মাসে ম্যালা করছিলাম। একদিন হাইজ্যাকালে (সন্ধ্যাবেলা) গাট্টি-বোচকা, টাহা-পয়সা লইয়া বিসমিল্লাহ বইল্যা বাইত্তে গোন বাইর হইলাম। হাইট্টা চইলা গেলাম কাডালবাড়ির ঘাডে।

কাঁঠালবাড়ির ঘাট কোথায়?

আমাগো গেরামে গোন দু-ত্তিন মাইল উত্তরে। হেইসুম পদ্মানদী দিয়া ইস্টিমার যাইতো গোয়ালন্দ। নারায়ণগঞ্জ গোন ছাইড়া, চানপুর ঘুইড়া আইতো। কাডালবাড়ির ঘাডে জাহাজ ভিড়লো দুফুর রাইতে। দোতালা জাহাজ। দুই ধারে চাক্কার লাহান বড়ো বড়ো দুইডা পাংখা। হেই পাংখা ঘুইড়া ঘুইড়া পানি কাডে আর জাহাজ সামনে দৌড়ায়।

আমি বললাম, এই জাহাজের ছবি আমি দেখছি।

দাদা বললেন, কই দেকলা?

আমার বইতে। স্টিমার। পানি গরম কইরা বাষ্প বানায়। এই বাষ্পেই স্টিমার চলে।

দাদা আবার বলতে লাগলেন, আমরা দলে-বলে আছিলাম বাইশ জন। আল্লার নাম লইয়া জাহাজে উটলাম। দেহি পিছিঞ্জারে গিজগিজ করতাছে। কোনো রহমে গাদাগাদি কইরা বইলাম। একজন আরেকজনের গতরে ঢ্যালান দিয়া ঝিমাইতে ঝিমাইতে রাইত পার করলাম।

জাহাজ কখন ভিড়লো?

বিয়ানে। ফজর নমাজের পর যহন ফস্যা হইছে, জাহাজ তহন ভিড়লো গোয়ালন্দ ঘাডে। জাহাজে গোন নাইম্যা দেহি কইলকাত্তা যাওনের টেরেন ‘গোয়ালন্দ মেইল’ সামনেই খাড়াই রইছে। ঘাডে অনেক মাইনষের ভিড়। যারা টেরেনে চইড়া আইছে হ্যারা উটলো জাহাজে। যাইবো ঢাহা মিহি। ইসুপ মোলবী আমাগো ডাক দিলো। গোল কইরা খাড়া করাইয়া নিজে মইদ্দে খাড়াইয়া কইলো, “মিয়ারা ট্রেন ছাড়নে অহনও অনেক দেরি। ট্রেনে উঠার পর থিকা আল্লায় আনলে দেশে ফিরা আহোনের আগ পর্যন্ত নাইয়া জুইত পাইবা না। তাই পরাণ ভইরা পদ্মার পানিতে ডুবাইয়া নেও।” আমরা হগোলে গাঙ্গের পানিতে ডুবাইলাম। ঘাডে আছিল অনেক খাওয়ার হোডল। নাইয়া উইট্টা ঢুকলাম এক হোডলে। ইলশা মাছের পাতলা ঝোলের সালুন আর ধুমাউডা ভাত౼কী কমু দাদা, হেই স্বোয়াদ অহনো মুকে লাইগ্যা রইছে!

দাদার কথায় মনে হলো কেবলই তিনি পাতলা ঝোলের ইলিশ মাছ দিয়ে ধোঁয়া-ওঠা ভাত খেয়ে উঠলেন।

আমি বললাম, কলিকাতা কখন পৌঁইছাই ছিলেন?

“কইলকাত্তা?” বলে দাদা থামলেন। একটু ভেবে বললেন, কইলকাত্তার ইস্টিশনে নাইম্যা মগরেবের নমাজ পড়লাম। হেইহান গোনে ঘোড়ার গাড়িতে আমাগো নিয়া গেল হাজি ক্যাম্পে।

হাজি ক্যাম্প কী?

গাঙ্গের ধারে বিরাট এক গোডাউন। বাংলা, আসাম, বর্মামুল্লুক গোন আইয়া হাজিরা পরথম এই জাগায় জমা হইতো। এইডাই হাজি ক্যাম্প। জাগাডার নাম অহন মনে আইতাছে না (উত্তর কোলকাতায় হুগলী নদীর তীরে কামারহাটি হাজি ক্যাম্প।)

বিয়ানে ক্যাম্পে গোনে বাইর হইলাম। টাউন দেইক্যা চোক কপালে ওডনের জোগাড়। কত্তো বড়ো টাউন কইলকাত্তা! মানুষ আর মানুষ! বড়ো বড়ো দালান, রাস্তাঘাট, গাড়িঘোড়া।

আমি বললাম, ঢাকার থিকাও বড়ো?

দাদা বললেন, হ দাদা, ঢাহা গোনেও ডাঙ্গর। বাইরে আইয়া পরথমে গেলাম পোস্টাফিসে। ক্যাম্পের বোগলেই পোস্টাফিস। মায়েরে চিডি লেকতে হইবো। পোস্টকাড কিনলাম।

আমি বললাম, কী লেখলেন?

ল্যাকলাম౼আল্লার নামে হজে ম্যালা করছি। চিন্তা কইরো না মা, মিয়া ভাই লগে আছে। দোয়া কইরো য্যান হজ কইরা সহি-সালামতে ফিরা আইতে পারি।

চিঠি পাইছিল ?

চিডি যাইতে সমায় লাগবো না? তহন পায় নাই। পরে পাইছে।

কলিকাতায় কী করলেন?

কত্তো কী; পরথমেই দিলো টিকা।

কীসের টিকা?

কলেরা আর বসন্তর। হেই হগোল দিনে গেরামে কলেরা আইলে মানুষ মইরা গেরাম সাফা হইয়া যাইতো। এক গেরামে কলেরা লাগলে আশেপাশের গেরামের মানুষ পলাইতো।

আমিও টিকা নিয়েছি। পৌরসভার লোক বাসায় এসে গুটিবসন্তের টিকা দিয়েছিল । স্কুলে দিয়েছিল কলেরা আর যক্ষ্মার। কলেরার ইঞ্জেকশনে হাত ফুলে ব্যথায় জ্বর চলে এসেছিল । সে রাতে মা হারিকেনে ন্যাকড়া গরম করে ছ্যাক দিলেও ব্যথা কমেনি। স্পিরিট ল্যাম্পে সুঁই পুড়িয়ে যেদিন যক্ষ্মার টিকা দিচ্ছিলো, খুব ভয় পেয়েছিলাম। তবে বেশি ব্যথা লাগেনি চামড়ার সামান্য নিচে দিয়েছিল বলে। স্কুলে টিকা দিতে এলে অনেকে ভয়ে ক্লাস থেকে দৌড়ে পালাতো। পৌর প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময় একদিন জানালা দিয়ে দেখলাম দুজন লোক স্কুলের দিকে আসছে। একজনের হাতে একটা সাদা বক্স। বুঝলাম টিকা দিতে আসছে। স্যার তখন ব্ল্যাকবোর্ডে লিখছিলেন। হঠাৎ রাজা বেঞ্চ থেকে বইখাতা বগলদাবা করে দৌড়ে ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেল। স্যার চিৎকার করে উঠলেন౼ঐ গাধা, যাস কই! রাজার দেখাদেখি অন্য ক্লাসের কয়েকজনও দৌড়ে পালিয়ে গেল। পরের দিন স্যার রাজাকে তুমুল ধোলাই দিলেন। বেঞ্চের ওপর কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখলেন।

আমি দাদাকে আমার হাতে টিকার দাগ দেখিয়ে বললাম, এই দেখেন।

দাগ দেখে দাদা মুচকি হেসে বললেন, টিকা ন্যাওনের পর আমাগো হগোলতের হাতে এট্টা কাগজ দিলো। ইসুপ মোলবী কইলো, “সবাই যার যার কাগজ সেইত্তা (যত্ন করে) রাইখো। এই কাগজ হারাইলে বোম্বাইতে আবার টিকা দেওন লাগবো।” টিকা দেওনের দুইদিন পর আমাগো হজের পাস দিলো।

হজের পাস কী?

এইডাই আসল। এই কাগজটা না থাকলে জাহাজে উডোন যাইবো না। পাস হাতে পাইয়া কইলাম আলহামদুলিল্লাহ। দুই রাকাত শুকরানা নমাজ পড়লাম। হাজি ক্যাম্পে গোনেই কে কোন মাল্লুমের দলে হজ করবো হেইডা ঠিক করতে হইতো। ইসুপ মোলবী আমাগো মাল্লুম ঠিক করলো? এই হগোল কাম শ্যাষ হইতে সাত-আষ্ট দিন লাগলো। বদ্ধ জাগায় থাইক্যা আমাগো দলের দুই-একজন অস্থির হইয়া গেল । দিনরাইত প্যানা পাড়ে। আমরা কইলাম, “এত প্যানা পাড়ো ক্যা মিয়া। যাইতে না চাইলে বাইত্তে যাও গা।”

আমি বললাম, তারা কি বাড়ি চইলা গেছিলো?

না, ইসুপ মোলবী হ্যাগো বুজাইলো। কইলো, “হজে যাইতাছো, অহনই এত অধৈর্য্য হইলে হজ করবা ক্যামনে মিয়া! হজ হইলো কষ্ট আর ধৈর্য্যের ইবাদত।” ইসুপ মোলবীর কতায় হ্যারা চুপ হইলো।

আমি বললাম, তারপর?

দাদা বললেন, জাহাজের টিকিট কিনলাম।

কত লাগলো টিকেট কিনতে?

দু-ত্তিন রহম টিকিট আছিল । ফাস্ট কেলাস, সেকেন্ড কেলাস আর ডেক। যাইতে-আইতে ফাস্ট কেলাসের ভাড়া দুইশো, সেকেন্ড কেলাসের দ্যাসশো। আমরা কাটছিলাম ডেকের টিকিট। ৫০ টাহা। টিকিট কাডার পরদিন গেলাম নিউমার্কেটে।

আমি বললাম, কেনাকাটা করতে?

দাদা বললেন, হ। নিউমার্কেট যাওনের সুম হইলো এক কাণ্ড! দাদার মুখে হাসির রেখা ফুটে উঠলো।

আমি বললাম, কী?

দাদা বললেন, রিকশা-গাড়ির লগে কইলকাত্তার রাস্তায় অনেক টেরামবাস চলে।

‘টেরামবাস’কী দাদা? আমি জানতে চাইলাম।

দাদা বললেন, এইডাও একরহম বাস। তয় চাকাগুনি রেলগাড়ির লাহান। কারেন্টে চলে। টুং টুং ঘণ্টি বাজায়। রাস্তায় গোন পিছিঞ্জার উডায়। আমরা টেরামবাসে উটলাম... বলে থামলেন। তারপর ইতস্তত করে বললেন, আমার পাশের সিট খালি পাইয়া এক মাইয়্যাছেলে উইঠ্যা বইস্যা পড়লো। আমি তো র্শমে মরি। বলে দাদা লাজুক হাসি দিলেন।

দাদার দিকে তাকিয়ে আমিও হেসে দিলাম।

দাদা বললেন, নিউমার্কেট গোনে আমরা এহরামের কাপড় কিনলাম। বাড়ি থিকা আনা চিড়া-মুড়ি শ্যাষ হইয়া গেছিল, চিড়া-মুড়ি কিনলাম। আরো কিছু টুমটাম। দশ দিনের দিন কইলকাত্তা ছাইড়া বোম্বাই ম্যালা করলাম। কইলকাত্তায় রেল ইস্টিশন দুইডা౼শিয়ালদা আর হাওড়া। হাওড়া ইস্টিশন থিকা টেরেন ছাড়লো, হাজি ইসপেশাল টেরেন।

হাজি স্পেশাল ট্রেন?

হ, এই টেরেনে খালি হাজিরা যাইবো; কিন্তু কীয়ের কী, হাজি ছাড়াও এত মানুষ উটলো যে পাও হালানের জাগা নাই। লম্বা বেঞ্চে গাদাগাদি কইরা বইতে হইলো। চাইদ্দর বিছাইয়া নিচে বইলো কতক। গাড়ি ছাড়লো। দিন যায়, রাইত যায়। রেলগাড়ি দৌড়ায়। জালনার বাইরে মাঠ, জঙ্গল, পাহাড় পিছন দিকে দৌড়ায়। গাড়িই আমাগো ঘরবাড়ি। এক বিয়ালে টেরেন আস্তে আস্তে ঢুকলো এক ইস্টিশনে। ইঞ্জিল বদলাইতে থামলো।

আমি বললাম, ইঞ্জিন বদলাইবো ক্যান! ইঞ্জিন কি নষ্ট হইয়া গেছিল ?

না দাদা, নষ্ট হয় নাই। বোম্বাই তো ম্যালা দূর। ইঞ্জিল একবারে এত দূর দৌড়াইতে পারবো না বইল্যা অন্য ইঞ্জিল লাগাইবো। সুবিদা পাইয়া ইসুপ মোলবীর পিছন পিছন আমরা কতক নামলাম। কতক গাড়িতে রইলো। পেলাটফরমে মাইষের ভিড় আর শোরগোল। সামনে যাইয়া দেহি দুইডা বড়ো ঠিল্যা (কলস)। লাইন দিয়া মাইনষে পানি খাইতাছে। দুই ঠিল্যার পাশে খাড়াইয়া দুইজন চিল্লাইতাছে। একজন কইতাছে౼“হিন্দু পানি ইধার”, আরেকজন কইতাছে౼“ইধার মুসলিম পানি।”

আমি অবাক হয়ে জানতে চাইলাম, হিন্দু পানি, মুসলিম পানি কী দাদা?

দাদা বললেন, আমিও বুজি নাই౼হিন্দু পানি, মোসলমান পানি౼কয় কী! ইসুপ মোলবীরে জিগাইলাম, “বিষয়ডা কী মিয়া ভাই?” হে কইলো, “এইগুলা ব্যাবাক ইংরাজগো শয়তানী। জাত-পাত, ছোঁয়াছুঁয়ির ভয় দেহাইয়া হিন্দু-মোসলমান আলাদা করতে এই ব্যবস্থা౼ভেন্ন ভেন্ন পানির কলস। দুই ধর্মের মাইনষেরে আলাদা কইরা রাকতে পারলে দ্যাশ শাসন করতে সুবিধা (Divide and Rule).”

আমি বললাম, ইংরেজরা এত শয়তান আছিল?

হ দাদা। আরো কত কী করছে, বড়ো হইলে সব জানতে পারবা।

বোম্বাই কবে পৌঁছাইলেন।

চাইরদিন পর এক বিয়ানে রেলগাড়ি থামলো বোম্বাই ইস্টিশনে (ভিক্টোরিয়া টার্মিনাস, বর্তমানে ছত্রপতি শিবাজী টার্মিনাল)। হেইডা এক এলাহি কাণ্ড, হাজার হাজার মানুষ! নানান চেহারা, নানান ভাষা!

দাদা একটু থামলেন, যেন সেইসব দিন চোখের সামনে এসে হাজির হয়েছে౼বোম্বাইয়ের সেদিনের সেই কোলাহল, অপরিচিত হাজার মানুষের মুখ, ভিড়ভাট্টা সবই দেখতে পাচ্ছেন।

তিনি আবার বলতে শুরু করলেন, ইসুপ মোলবী সবাইরে সাবধান কইরা কইলো, “খবরদার, কেওই হারাইয়া যাইও না। যার যার মাল-সামানা সামলাইয়া রাইখো, কুলিরা টানাটানি করবো। দালালরা হাত ধইরা টানবো...।”

আমি বললাম, দালালরা টানবো ক্যান?

দাদা বললেন, বোম্বাইতে হাজিগো থাকোনের অনেক হোডল আছে। দালালরা হাজিগো হোডলে নিতে পারলে বকশিস পাইবো।

আপনেরা কোন হোটেলে উঠছিলেন?

আমরা হোডলে উডি নাই, উটছিলাম এক মুসাফিরখানায় (মুহাম্মদ হাজি সাবু সিদ্দিক মুসাফিরখানা)। ইস্টিশনের বোগলেই। হেই বচ্ছরই চালু হইছিল। গুদাম ঘরের লাহান বড়ো দালান। ভিত্রে কত মানুষ౼কতক বইয়া রইছে, কতক হুইয়া রইছে। কেওই মাল-সামানা গুছায়। নানান জাগার মানুষ౼বাংলার, বিহারের, উত্তরের, দক্ষিণের, কেওই আরও দূরের। কতক বাংলায় কতা কয়, কতক হিন্দিতে, কেওই আবার অন্য ভাষায়।

মুসাফিরখানায় খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা কী?

দাদা বললেন, হাজিগো খাওন-দাওনের কয়েক রহম ব্যবস্তা আছিল। ধনী সদাগর আর নবাবরা মিল্যা লঙ্গরখানা চালাইতো। বড়ো বড়ো ড্যাগে খেচুড়ি পাক হইতো, রুডি-ডাইলও খাওয়াইতো। বিনা পয়সার খাওন। পরথম দুই-একদিন আমরা লঙ্গরখানার খাওন খাইছি। ওই হানে মানুষ বেশি বইল্যা পরে নিজেরাই রান্দোনের বন্দোবস্ত করছিলাম। ছোড ছোড খাওয়ার হোডলও আছিল। কতক মানুষ আবার ম্যাসে (মেস) খাইতো।

আমি বললাম, বোম্বাইতেও অনেকদিন থাকতে হইছিল?

হ দাদা, নয়-দশদিন।

এত দিন থাকতে হইছিল ক্যান?

দুই কারণে౼যেই জাহাজে টিকিট কাটছি হেই জাহাজ আইতে হইবো। আর যাওনের আগে ফের হাজিগো স্বাইস্থ্য পরীক্ষা করবো।

আবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা? কলিকাতায় না একবার করলো?

করছে, তবু দেখবো কোনো হাজি অসুকে পড়ছেনি।

ওইখানে সারাদিন কী করতেন?

কী আর করুম? পাক-শাক করতাম, খাওয়া-দাওয়া, নমাজ আর অবসর সমায়ে দোয়াদরুদ পড়তাম। মুসাফিরখানা তো মানুষে বোজাই। রোজ দলে দলে চইল্যা যায়, আবার নতুন দল আহে। ভিত্রে ঠিক মতো পরিষ্কার করে না। দমবন্দকরা অবস্তা। তাই হাওয়া খাইতে এদিক-ওদিক যাই। একদিন আসরের নমাজ পইড়া বাইর হইলাম। হাইট্টা চইল্যা গেলাম জাহাজ ঘাডে।

জাহাজ ঘাটে?

হ, আমরা যেইহানে থাকতাম, জাহাজ ঘাডা (প্রিন্সেস ডক) তার থিকা বেশি দূরে আছিল না। গিয়া দেহি, সুবহানাল্লাহ౼মানুষ আর মানুষ, মানুষে পিলপিল করতাছে। মনে হয় দুইন্যার সব মানুষ ঘাডে জমা হইছে। কেওই কানতাছে, কেওই দোয়া পড়তাছে, কেওই আত্মীয়স্বজনের কাছ থিকা বিদায় নিতাছে। মায়ের কথা মনে পইড়া আমার চোকে পানি চইলা আইলো౼চুপেচাপে বাড়ি থিকা আইছি, কে জানে মায় কেমুন আছে! আমার চিডি পাইছে কি না।

ঘাডে বান্দা বিরাট জাহাজ। উচা নল দিয়া কালা ধুমা বাইর হইতাছে। দেইক্কা বুকের মইধ্যে মোচড়াইয়া উটলো౼এমুন জাহাজে কইরাই দইরা পাড়ি দিতে হইবো! জাহাজ ঘাডা গোনে মসাফিরখানায় ফিরতে পতে দেখলাম শোরগোল। বোগলে যাইয়া দেহি ঝগড়া লাগছে। একজন বাঙ্গালীরে পাগড়ি পরা দুইজন মানুষ উর্দুতে গাইল পারতাছে। চিল্লাইয়া চিল্লাইয়া কইতাছে౼“তুম বাঙ্গাল, তুম উল্লু হো...।” আমরা তো উর্দু বুজি না। ইসুপ মোলবী ভালো উর্দু জানে। বোগলে যাইয়া হ্যাগো ঠান্ডা করলো। আমরা জিগাইলাম, “ঝগড়া লাগছে কী নিয়া?” ইসুপ মোলবী হেই কতা কিছু কইলো না। খালি কইলো, “হগোল সুম দলেবলে থাকবা। কেউ একলা কোথাও যাইবা না। বাঙ্গালী ছাড়া অন্য ভাষার মাইনষের লগে বাৎচিত করতে যাইবা না। ”

আমি বললাম, জাহাজে কবে উঠছিলেন?

দাদা বললেন, একদিন হুনলাম ডাক্তারি পরীক্ষা হইবো। বুজলাম আমাগো যাওনের সমায় কাছাইছে। মনে আনন্দ আইলো, আবার ভয়ও।

ভয় কীসের?

ডাক্তারী পরীক্ষায় আটকাইয়া গ্যালে তো বাইত্তে ফেরত যাওন লাগবো! বোম্বাই গোন যারা বাইত্তে ফিরা যাইতো তাগো কী কইতো জানো দাদা?

আমি বললাম, কী?

দাদা বললেন, তাগো কইতো বোম্বাইয়া হাজি।

আপনেগো দলে কোনো ‘বোম্বাইয়া হাজি’ আছিল?

না। আমাগো দলের হগোলতেই জাহাজের পাস পাইছিল। ইসুপ মোলবী কাগজপত্র দেহাইয়া জাহাজের পিছিঞ্জার লিস্টিতে আমাগো নাম উডাইলো। পরদিন দুফুরে সোম্বাদ আইলো আমরা যেই জাহাজের টিকিট কিনছি হেই জাহাজ ঘাডে ভিড়ছে। আছরের নমাজ পইড়া বাজারে গেলাম কেনাকাটা করতে।

কী কেনাকাটা?

জাহাজের খানা-খাইদ্য। চিড়া, মুড়ি, গুড়, চাউল, ডাইল আলু, নুন, ত্যাল, পিয়াইজ, মরিচ এইগুলা। রাইতে কেওইর ভালো ঘুম হইলো না। মনের মইদ্দে ভয়। আনন্দও কম না౼খোদার ঘরে ম্যালা করছি! শ্যাষ রাইতে উইঠ্যা তাহাজ্জুদ পড়লাম। ফজর পইড়া গাট্টিবোচকা মাতায় মুসাফিরখানায় গোন আল্লার নামে বাইর হইলাম। জাহাজ ঘাডায় আইসা দেহি হুলস্থুল কাণ্ড౼বড়ো বড়ো টিনের ট্রাঙ্ক, কাডের বাক্স, বিছনা-বালিশ এদিক-ওদিক ছড়াইয়া আছে। কুলিগো শোরগোল, পুলিশের তালাশি...। আমাগো মাল-সামানা ওজন করলো। কাগজ দ্যাকলো। জাহাজে উডোনের লিগা সিঁড়ি লাগাইছে। হাজিরা লাইন ধইড়া জাহাজে উটতাছে। বুড়া জুয়ান হগোলতে। খাড়া সিঁড়ি বাইয়া উটতে বুড়া মানুষের কী যে কষ্ট। দেইক্যা ভয় করতাছিল, যদি পইড়া যায়!

সিঁড়িতে পাও দিতেই বুকের মইদ্দে ছ্যাৎ কইরা উঠলো। বিসমিল্লাহ বইলা জাহাজে উটলাম। দেহি আরেক দুনিয়া! কেওই জাগা দখল করতাছে, কেওই চট বিছাইতাছে। আমরাও এক ধারে জাগা লইলাম। নিচে ইঞ্জিন-ঘরে গোন ঘড়-ঘড় শব্দ আইতাছে। রেলিং ধইরা খাড়াইয়া দেখলাম ঘাডে হৈ চৈ, ধাক্কাধাক্কি, দৌড়াদৌড়ি।

আমি বললাম, জাহাজের নাম কি মনে আছে?

দাদা কিছুক্ষণ বিড়বিড় করে জাহাজের নাম মনে করার চেষ্টা করলেন। তারপর বললেন, হ মনে পড়ছে। জাহাজের নাম আছিল আকবর (মোগল লাইন-এর এস এস আকবর। ব্রিটিশ কোম্পানি ‘টার্নার মরিসন’ এটি পরিচালনা করত)। সাইরেন বাজাইয়া জাহাজ যহন ঘাটলা ছাড়লো, হাজিরা জোড়ে জোড়ে তালবিয়া পড়তে শুরু করলো౼“লাব্বায়েক, আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক...।” ঘাডের মানুষ রুমাল নাড়াইয়া সবাইরে বিদায় দিলো। বোম্বাই শহর আস্তে আস্তে দূরে চইল্যা গেল । ঘাডের মানুষগুলারে পিঁপড়ার লাহান ছোড দেহাইতে লাগলো।

আমি বললাম, জাহাজে উঠতেই তো প্রায় এক মাস লাগলো!

দাদা বললেন, হ পরায় এক মাসইত্তো লাগলো জাহাজে উটতে। জাহাজ যহন মাঝ দইরায় আইলো, চাইরমিহি খালি পানি আর পানি। পাড়পুড় কিচ্ছু দ্যাহা যায় না। দইরার কিনারে পানির রং আছিল্ সবুজ, অহন হইছে নীল। আসমান-পানি এক হইয়া গেছে। দুইন্যাইতে পানি ছাড়া মনে হয় কিচ্ছুই নাই౼না জনমুনিষ্যি, না গাছগাছালি, মাডি-ক্যাদা। খোদার রহম ছাড়া মানুষ কত অসহায়, কত নিরুপায়! রাইতে আসমানে তারা দেইক্যা মনডার মইদ্দে মোচড়াইয়া উটতো। খোদাতালা যে কত্তো বড়ো হেইডা মালুম হইতো। আহ্হারে, দুইন্যাইতে কত কি নিয়া আমরা কাইজ্জা-ফ্যাসাদ করি! আল্লা-খোদার কথা মনে করি না!

রাইতে আসমানের দিক চাইয়া কেওই কানতো, কেওই দুই হাত তুইলা আল্লার কাছে তোবা (তওবা) করতো। বিয়ানে যহন সূর্য উটতো মনে হইতো পানির বুক ফাইড়া সূর্যডা উঠতাছে, আবার হাইজ্যাকালে ওই পানির মধ্যেই ডুব দিতো। দইরার পানি রক্তের লাহান রাঙ্গা অইয়া যাইতো। খোদার কী মহিমা, চোক্কে না দেকলে বুজবা না দাদা!౼দাদা থামলেন।

আমি বললাম, বাড়ির কথা মনে পড়তো না?

দাদা বললেন, ক্ষণে ক্ষণেই মনে পড়তো। তহন মনের মইদ্দে খালি-খালি লাগতো। মনে হইতো౼কী য্যান নাই। আবার মনে হইতো আমরা হগোলতে জাহাজে বন্দি। খোদার ঘরে যাইতাছি মনে করলে কষ্ট-মষ্ট দূর হইয়া যাইতো।

জাহাজে কী করতেন?

পাঁচওক্ত নমাজ পড়তাম, কোরান পড়তাম, দোয়া-দুরূদ পড়তাম। মইদ্দে মইদ্দে ইসুপ মোলবীর বয়ান হুনতাম। খুব ভালো বয়ান করতে পারতো ইসুপ মোলবী। অন্য দলের আলেম গো বয়ানও হুনতাম। আমাগো দলের একজন পুতি (পুঁথি) পড়তে জানতো। হে মইদ্দে মইদ্দে পড়তো౼নবীজির কাহিনি, আদম-হাওয়ার কাহিনি।

আমি বললাম, খাওয়া দাওয়া কোথায় করতেন?

একটু ভেবে দাদা বললেন, বিয়ানে চিড়া ভিজাইয়া খাইতাম। দুফুর আর রাইতে রাইন্দা খাইতাম। জাহাজে রান্দোনের জাগা আছিল । ইসুপ মোলবী তিনজন কইরা পাকের দল বানাই দিছিল। একদল একদিন পাক করে। দইরায় ঢেউ উটলে খাওন যাইতো না, উকাল (বমি) আইতো। ঢেউয়েরসুম হুইয়া থাকতাম। হুইয়া থাকলে উকাল ভাব কমতো। অ্যামনে যাইতে যাইতে তিনদিনের দিন জাহাজ করাচী থামলো।

আমি বললাম, করাচী থামলো ক্যান?

দাদা বললেন, করাচী গোন আরো হাজি উডাইলো।

আরো হাজি?

হ দাদা, জাহাজ এক্কেরে মানুষে ঠাসাঠাসি হইয়া গেল । জাহাজ আবার ছাড়লো। এক দিন, দুই দিন, তিন দিন... জাহাজ খালি যায় আর যায়। এই কয়দিনে কতক মানুষ অসুখে পড়লো౼জ্বর, দাস্তো। জাহাজের ডাক্তার দেখলো, অষুদ দিলো।

আমি বললাম, আপনের কোনো অসুখ হইছিল?

দাদা বললেন, আল্লাহর রহমে আমার কিছু হয় নাই। তয় একদিন দইরায় খুব ডেউ আছিল। আমি উকাল করছিলাম। হেইদিন আর কিছু খাই নাই। পরদিন ঠিক হইয়া গেছিল। করাচী গোন ছাড়ার সাত-আষ্ট দিনের মাতায় জাহাজ আর একটা ঘাডে থামলো। মনে করলাম আরব দ্যাশ আইয়া পড়ছে। পরে হুনলাম, না, অহনও দূর আছে।

আমি বললাম, আবার থামছিল ক্যান, আরো হাজি নিতে?

দাদা বললেন, আর হাজি নিবো ক্যামনে, জাহাজে জাগা আছেনি?

তাইলে?

কয়লা আর খাওনের পানি নিলো। জাহাজ তো কয়লা পোড়াইয়া চলতো। বোম্বাই থিকা যে কয়লা নিছিল তা দিয়া পুরা পত যাওয়া যাইতো না। হের লিগা কয়লা নিলো। খাওনের পানির ডেরাম উডাইলো। জাহাজে বেশি পানি খাইতে দিতো না। কত মানুষ। কই পাইবো এত পানি?

ওই জায়গার নাম কী?

দাদা নাম মনে করার চেষ্টা করলেন। একটু ভেবে বললেন, নামডা মনে আইতাছে না দাদা (ইয়েমেনের এডেন বন্দর)।

আমি বললাম, আপনেরা নামছিলেন?

হ, জাহাজ ছাড়ার পর দিন দশেক হইয়া গেল আমরা পানিতে। ব্যাবাকতে অস্থির। মাডি না পাড়াইলে ভাল্ ঠ্যাহে? জাহাজে কয়লা উডাইতে সমায় লাগবো বইল্যা জাহাজে গোন নামতে দিছিল। ঘাডে ভিড়ে নাই জাহাজ। ছোড ছোড নাও দিয়া পয়লা নামাইলো কেবিনের হাজিগো। পরে ডেকের হাজিগো লাইন দিয়া নায়ে উডাইলো।

নাইমা কী করলেন?

কী আর করুম? ঘাডেই ঘোরাঘুরি করলাম। কিছু সওদাপাতিও করলাম౼খোরমা খেজুর, কিসমিস, লেবু এইগুলা। এই দ্যাশে অনেক পাত্থরের পাহাড়। হুনছি পাহাড়ের গায়ে বিষ্টির পানি আটকাইয়া পুকুর বানাইছে। কেবিনের হাজিগো দেকতে নিয়া গেছিল ।

আপনে গো নেয় নাই?

আমরা হস্তার পিছিঞ্জার। আমাগো নিবো ক্যা! কয়লা ভরা শ্যাষে ঘাট ছাইড়া একদিন পর জাহাজ আবার থামলো।

আমি বললাম, আবার?

দাদা বললেন, জাহাজে গোন হাজিগো নায়ে কইরা নামাই নিলো।

কোথায় নিলো?

পাশেই এক চডানে (চটান অর্থ উঁচু স্থান)। হাজিগো জ্বরজারি আছি কিনা, গতরে গোডা-গাডি উটছে কিনা দ্যাকবো। সাদা পোশাকের সেপাইরা হাজিগো লাইন ধইরা খাড়া করাইলো। ডাক্তাররা একজন একজন কইরা পরীক্ষা করে। যাগো শরীলে রোগ-বালাই পাইলো তাগো দূরে সরাই নিলো। যাগো পাইলো না হগলতের কাপুড়-চুপুড় ধুমার মইদ্দে দিয়া জীবাণু মাইরা জাহাজে উডাইলো। অসুইক্কা গো আটকাই রাকলো (কামারান দ্বীপে কোয়ারেন্টাইন)।

আমি বললাম, তারা হজ করতে পারবো না?

অসুক ভালো হইলে পরের কোনো জাহাজে উডাই দিবো।

আপনেগো দলে কেউ আটকা পড়ছিল?

না দাদা, আল্লার রহমে আমাগো বাইশজনই জাহাজে উটলাম। ইসুপ মোলবী কইলো, “আলহামদলিল্লাহ, আর কোনো চিন্তা নাই।” আমরা দুই রাকাত শুকরানা নমাজ পইড়া আল্লার শোকর আদায় করলাম। পরদিন জহুরক্তের পর জাহাজে সাইরেন বাইজ্যা উঠলো।

সাইরেন বাজলো ক্যান?

হাজিগো জানাইলো সামনে মিকাত, এহরাম পড়তে হইবো।

মিকাত কী দাদা?

আরবে ইয়ালামলাম বইল্যা একটা জাগা আছে। জাহাজ হেই সোজা আইলে হাজিগো এহরাম পরতে হয়। সিলাই ছাড়া দুই টুকরা সাদা কাপুড়౼এক টুকরা পরে নিচে౼লুঙ্গির লাহান, এক টুকরা গায়ে দেয়। মাতা ঢাকোন যাইবো না।

টুপিও না?

টুপি, পাগড়ি কিচ্ছু না। মাতা থাকবো উদাম। বাসনা সাবান, আতর কিছুই লাগান যাইবো না।

ক্যান?

এইডাই আল্লার হুকুম। আমরা দল বাইন্দা নাইয়া এহরাম পরলাম। তারপর দুই রাকাত নমাজ পইড়া “লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক...” পড়তে লাগলাম। এইবার সত্য-সত্যই নিজেরে হাজি মনে হইতে লাগলো। এহরাম পরা হাজিগো দেইক্কা মনে হইলো হাশরের ময়দানে সাদা কাফন পইরা আমরা আল্লাহর সামনে হাজির হইছি।

এশার নমাজের পর খাওন-দাওন শ্যাষে হগোলতে ঘুমাই পড়লো। আমার ঘুম আহে না। মায়ের কতা মনে পড়ে। মা কেমুন আছে কে কইবো! মায়েরে না জানায়া আইয়া ভালো করি নাই। আমার বাপ-দাদা হগোলতেই হজ করছে। দাদা আহাদ্দি হাজি আছিল বড়ো আলেম। মা হজ করতে না করবো ক্যা! কষ্টে আমার মনডা পুড়তে লাগলো।

তহনও সুবেসাদেক হয় নাই। তাহাজ্জুদ পড়তে উঠছি। জাহাজের শব্দের মইদ্দেও কানে আইলো౼ “লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক...।” বিষয় কী, এই রাইতে তালবিয়া পড়ে ক্যা! দূরে চাইয়া দেহি সারিসারি বাত্তি মিটমিট কইরা জ্বলতাছে। বুঝলাম আরব দ্যাশের আলো। আমার চোক ভিজ্যা গেল । এক মাসের উপরে বাড়ি গোন বাইর হইছি। পতে কত কষ্ট౼ঘুমের কষ্ট, খাওনের কষ্ট, নাওনের কষ্ট। দূরের ওই বাত্তি ব্যাবাক কষ্ট দূর কইরা দিলো। আমাগো দলের হগোলতেরে ডাক দিয়া কইলাম, উডো মিয়ারা, দ্যাহো আরব দ্যাশের বাত্তি দ্যাহা যায়! জাহাজের হাজিরা ঘুম থিকা উইট্টা “লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক...” পড়তে লাগলো।

সূর্য ওডার পর জাহাজ জেদ্দা ঘাডের কাছাকাছি গেরাফি (নোঙর) হালাইলো। অনেক ডিঙ্গি নাও জাহাজের মিহি ছুইট্টা আইলো। ইসুপ মোলবী এট্টা নাও কেরাই (কেরায়া অর্থাৎ ভাড়া) করলো। মাল-সামানা লইয়া আমরা এক নায়ে উটলাম। পাড়ে আবার তালাশি। অফিচাররা গাট্টি বোচকা, টেরাঙ্ক-বাক্স ব্যাবাক খুইল্যা দেকলো। ডাক্তাররা দেকলো কেওইর জ্বর-জারি আছে কিনা। অসুক পাইলে সোজা চালান কইরা দিতো হেই চডানে (কামারান দ্বীপের কোয়ারেন্টাইনে)।

আমি বললাম, বন্দর থিকা মক্কা যাওয়ার ব্যবস্থা কী?

দাদা বললেন, উট আছে, খচ্চর আছে। যাগো টাহা-পয়সা কম হ্যারা হাইট্টাও যাইতো।

আমি বললাম, আপনেরা কেমনে গেছিলেন?

আমরা গেছিলাম উটে চইড়া। এক উটে দুইজন। উটের পিডে ছোট্ট খাঁচা। উপুরে কাপড়ের ঢাকনা দেওয়া, যাতে রোইদ না লাগে (শিকদফ)। চতুরমিহি বালি আর বালি। গাছ নাই, ছেওয়া নাই। ফজর পইড়া শুরু কইরা বেলা চড়নের আগ তমাত উট চলতো। হ্যার পর জিরান, খাওয়া, নমাজ। আসর পইড়া বেলা হেলোনের পর আবার শুরু হইতো। মরুভূমিতে ডাকাইতের ভয় আছিল। ব্যাবাক উট দল বাইন্দা যাইতো। পানির কষ্টের কথা কী কমু দাদা! জাহাজেও মাইপ্পা খাইতে হইছে, এহেনে আরো বেশি। ডোবা-পুষ্কুনি নাই, খাল-নদী নাই, কুয়া থাকলেই ক্যাল পানি পাওয়া যায়। এত দিন আছিল্ এক রহমের কষ্ট, অহন অন্য রহম। মনে হয়, বন্দি থাকলেও জাহাজেই ভালো আছিলাম।

এমনে যাইতে যাইতে তিন দিন তিন রাইত পর একদিন বিয়ানে পাহাড় দেহা গেল। হগোলতে শোর পাইরা উটলো౼ওইত্তো মক্কা আইয়া পড়ছে౼“লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা অন্নিয়িমাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকালাক।”

বাইত্তের থোন ম্যালা করার দেড় মাস পর মক্কায় পৌঁছাইলাম। পরথমে দ্যাহা হইলো মাল্লুম সাবের লগে। হেই মাল্লুম, যার ছেইলার লগে আমেনার বিয়া হইছিল। এক ভাড়া করা বাসায় আমাগো উডাইলো। পতে তিনদিন নাই নাই (গোছল করিনি)। আমরা নাইলাম, জহুর নমাজের পর খানা খাইলাম। গতরে জুইত নাই, মনেও শান্তি পাই না। মন আইডাই করে।

আমি বললাম, মন আইঢাই করে ক্যান?

করবো না! দ্যাড় মাস এত ঝঞ্ঝাট কইরা আইলাম। অহনো খোদার ঘর দ্যাকতে পারলাম না। ইসুপ মোলবী কইলো আসরের নমাজ আমরা হারাম শরিফে পড়মু। তারপর খোদার ঘর তোয়াফ, সাফা মারওয়া সায়ি কইরা ওমরা শ্যাষ করুম।

আসরের আজান পড়ার আগেই আমরা বাইর হইলাম। তালবিয়া পড়তে পড়তে মক্কার চিপাচাপা গলি পার হইয়া যাইতে লাগলাম। হঠাৎ চোকে পড়লো কালা গিলাফ দেওয়া খোদার ঘর। আমার গতর ঝাঁকি দিয়া উঠলো। কত দ্যাশের হাজি! চেহারা ভেন্ন, ভাষা ভেন্ন, গতরের রং ভেন্ন। হগোলতেই ছুটতাছে ওই এক দিকে। এতদিন ক্যাল কানেই হুনছি, আইজ চোকের সামনে খোদার ঘর! মায়ের কতা, বাবার কতা, দাদার কতা মনে পড়লো। দাদা, বাপ-চাচারা হগোলতেই আইছে এই ঘরে। আইজ আমারও তৌফিক হইলো। খোদার দরবারে শোকর।

আসরের নমাজ শ্যাষ হইলে আমরা মাতাফে আইলাম। তওয়াফ শুরু করলাম। কাবা ঘরের সামনে দোয়া পড়লে দোয়া কবুল হয়। আমি দোয়া পড়তে লাগলাম। আমার দুই চোক ভাইস্যা গেল ।

আমি বললাম, এত কষ্ট কইরা মানুষ হজে যাইতো? হজ শেষ কইরা ফিরতে কয়দিন লাগছিল?

দাদা বললেন, ফেরনে এত দিন লাগে নাই। জাহাজে পনারো দিন, আর বোম্বাই গোনে বাড়ি তোরি দিন সাতেক। তয় একবার কী হইলো হুনবা?

আমি বললাম, কী?

হজে গোন ফেরার সুম দইরায় উঠলো তুফান। চাইরধার আন্দার। আকাশ আর দইরা এক হইয়া গেল । বাতাস এমন হোশাইতে লাগলো, মাবুদে এলাহি, মনে হইতাছিল কিয়ামত আইসা পড়ছে। পাহাড়ের লাগান বিরাট বিরাট ঢেউ౼জাহাজ গিল্লা খাইতে চায়। একেকটা ঢেউ আইসা জাহাজরে এমন পাছাড় দেয়, মনে হয় এই বুঝি শ্যাষ! জাহাজ এই ডুবে, এই ভাসে, এই কাইত হয়, আবার সোজা হয়। হাজিরা কান্দে। কেউ কালেমা পড়ে, কেউ দুই হাত তুইলা আল্লারে ডাকে౼ইয়া আল্লা, বাঁচাও।

ছয়দিন ছয়রাইত একটানা এই তুফান! না ঘুম, না খাওয়া౼খালি মরণের অপেক্ষা। জাহাজ যে কই লইয়া গেছিল, আল্লা মালুম। দিশা-মিশা কিছুই বোঝা যাইতেছিল না। যহন তুফান থামলো, তহনও কেউ বিশ্বাস করতে পারতেছিল না আমরা বাঁইচা রইছি। দেহা গেল, জাহাজ আরেক দিক গেছেগা। আল্লার রহমত ছাড়া বাঁচোন সম্ভব আছিল না। ঢেউয়ের ঠ্যালায় জাহাজের দুলনিতে উকাল করতে করতে সবাই পরায় আধামরা।

ঝড়ের কথা শুনে আমার নিজের ভয় করতে লাগলো। মনে হলো, যদি সেদিন জাহাজ ডুবে যেতো তাহলে তো আমার জন্মই হতো না। দাদা এত বার হজে না গেলে তো আর সামুদ্রিক ঝড়ে পড়তেন না। আমি বললাম, এত বার হজ করলেন ক্যান?

দাদা বললেন, পরথম বার করলাম আমার নামে। পরেরবার করলাম মায়ের নামে। তার পর করলাম তোমার দাদীর নামে।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, আর শেষ বার?

মুচকি হাসি দিয়ে দাদা বললেন, শ্যাষ বার আমার নামেই করলাম। শ্যাষ বার যহন গেলাম, তোমার আব্বার বয়স তহন তিন বচ্ছর (১৯৩৪ সাল)।

তখন আপনার বয়স কত আছিল?

চল্লিশ বচ্ছর।

দাদার হজের কাহিনি শুনতে শুনতে মসজিদ থেকে আজানের শব্দ ভেসে এলো।

দাদা বললেন, আছরক্ত হইয়া গেল। যাই নমাজ পইড়া আহি।

দাদা চলে গেলেন মসজিদের পথে, আমি মাঠের দিকে হাঁটতে হাঁটতে ভাবতে লাগলাম౼দাদার বয়স এখন বিরাশি বছর। এত বছর পরেও সবকিছু কী নিখুঁতভাবে মনে রেখেছেন, ভাবতেই অবাক লাগে! অথচ আমার স্কুলের পড়াই মনে থাকে না।

আহসান হাবিব: কবি ও লেখক

সম্পর্কিত