জশুয়া কার্লানজিক

২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে বাংলাদেশে ব্যাপক গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এর নেতৃত্বে ছিল মূলত শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি ছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের ক্রমবর্ধমান স্বৈরাচারী শাসনের অবসান এবং সরকারি বিভিন্ন সংস্থায় নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা প্রথার কারণে দুর্নীতির বিলোপ।
এই আন্দোলন ক্রমান্বয়ে বড় আকার ধারণ করে। এর আগে হাসিনা সরকার ভিন্নমত কঠোরভাবে দমন করলেও, তখনকার বিক্ষোভ শেষ পর্যন্ত হাসিনাকে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য করতে সফল হয় (কারণ সেনাবাহিনী তাকে সমর্থন দিতে অস্বীকার করেছিল)। এর ফলে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। শিক্ষার্থীদের পরামর্শে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসকে সেই সরকারের প্রধান করা হয়।
শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর ঢাকা এবং অন্যান্য স্থানে যে উদযাপনের জোয়ার দেখা দিয়েছিল, তার ধারাবাহিকতায় এই অন্তর্বর্তী সরকারের লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশে সংস্কারের এক নতুন যুগের সূচনা করা। এই সংস্কারের উদ্দেশ্য ছিল সহিংস রাজনৈতিক মেরুকরণ কমিয়ে আনা, রাষ্ট্র পুনর্গঠন করা, দুর্নীতি হ্রাস করা এবং গত কয়েক দশক ধরে রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তারকারী দ্বিদলীয় শাসনের অবসান ঘটানো।
আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)—এই দুই দলের মধ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আওয়ামী লীগেরই একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। তবে অতীতে বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন তারাও দুর্নীতিগ্রস্ত, স্বজনপ্রীতিমূলক এবং স্বৈরাচারী আচরণ দেখিয়েছিল।

বিপ্লব-পরবর্তী সময়ের শুরু থেকেই আমার মনে সন্দেহ ছিল যে, কেবল হাসিনাকে হটিয়ে দিলেই খুব বেশি কিছু পরিবর্তন হবে কি না। বাংলাদেশের সামনে অতিক্রম করার মতো পাহাড়সম বাধা ছিল, রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়েছিল এবং অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে সময় ছিল খুবই কম।
বিক্ষোভ এবং হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার তিন মাস পর আমি লিখেছিলাম, ‘‘আগস্ট এবং সেপ্টেম্বরের শুরুতে জনসেবা ব্যবস্থা যেভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল (প্রায় ব্যর্থ রাষ্ট্রের পর্যায়ে), সেই তুলনায় নিরাপত্তা ও জনসেবার কিছুটা উন্নতি হলেও পরিস্থিতি এখনো অনেকটাই নাজুক। পুলিশ বাহিনী মূলত আগস্টেই ভেঙে পড়েছিল এবং এখন তারা ঘুরে দাঁড়াতে হিমশিম খাচ্ছে।... এছাড়া, ইউনূস দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোতে যে ব্যাপক সংস্কারের পরিকল্পনা করছেন, তা প্রয়োজনীয় হলেও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী এবং দুটি শক্তিশালী প্রধান রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে বিশাল বাধার সম্মুখীন হতে হবে। যদি সেই প্রধান দুই দলের একটি জয়ী হয়, তবে অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী সংস্কারগুলোও দীর্ঘস্থায়ী হবে বলে কল্পনা করা কঠিন।’’
বাস্তবেও তা-ই ঘটেছে। অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা, সরকার এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে যে আমূল সংস্কার আনতে চেয়েছিল, তারা নানামুখী বাধা অতিক্রম করে সেই সব পরিবর্তন বাস্তবায়ন করতে পারেনি। এর মধ্যেই সাধারণ জনগণ (এবং সেনাবাহিনী) নতুন নির্বাচনের জন্য উন্মুখ হয়ে ওঠে।
অন্তর্বর্তী সরকার গত বছর দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে দিয়ে একটি সনদে সই করাতে সক্ষম হয়। ওই সনদে শেখ হাসিনার মতো স্বৈরাচারী শাসনের পুনরাবৃত্তি রোধে বিভিন্ন রক্ষাকবচ ও বিধান রাখা হয়েছে। এটিই ছিল এই সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য। তবে অর্থনীতি পরিচালনার পদ্ধতি পরিবর্তন করা, নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা, কিংবা গণমাধ্যম, নারী ও অন্যান্য প্রান্তিক গোষ্ঠীর সুরক্ষায় কাঙ্ক্ষিত সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে তারা ব্যর্থ হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের মতে, সনদে সই করলেও বিএনপি কিছু নির্দিষ্ট পয়েন্টে ‘ভিন্নমত’ (নোটস অব ডিসেন্ট) পোষণ করেছে। এতে সংশয় তৈরি করেছে যে তারা নির্বাচিত হলে আদৌ এই সংস্কারগুলো এগিয়ে নিয়ে যাবে কি না।
শেষ পর্যন্ত, জনপ্রিয়তা হ্রাস পাওয়া এবং কোনো নির্বাচনী ম্যান্ডেট না থাকায় গত সপ্তাহে নির্বাচন আয়োজন করতে বাধ্য হয় অন্তর্বর্তী সরকার।
হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুতকারী বাংলাদেশের এই গণবিক্ষোভ এশিয়ায় জেন-জি (জেন জি) প্রজন্মের প্রথম বড় ধরনের প্রতিবাদের সাফল্য ছিল। এটি নেপাল (যেখানে বিক্ষোভের মুখে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেন), ইন্দোনেশিয়া (যেখানে বিক্ষোভ থমকে গিয়েছিল) এবং অন্যান্য স্থানেও একই ধরনের প্রচেষ্টাকে অনুপ্রাণিত করেছে। তাদের এই প্রভাব মাদাগাস্কার, আফ্রিকার অন্যান্য অংশ এবং ক্যারিবীয় অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছেছে। এটি জেন-জি’র বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক উত্থানের একটি অংশ হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে, যা প্রমাণ করে যে জেনারেশন জেড সবখানেই রাজনীতিতে তাদের প্রভাবের জানান দিতে যাচ্ছে।

তবে জেন-জি'দের আন্দোলন বিশ্বব্যাপী যেমন ছড়িয়ে পড়েছিল, তারা সেই বিক্ষোভগুলোকে ব্যালট বাক্সে রাজনৈতিক সাফল্যে বা নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে রূপান্তর করতে ব্যর্থ হয়েছে। গত সপ্তাহে থাইল্যান্ডের নির্বাচনে জেন-জি প্রজন্মের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় দল ‘পিপলস পার্টি’ বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়ে। জনমত জরিপের তুলনায় তাদের নির্বাচনী ফলাফল ছিল খুবই হতাশাজনক। বিপরীতে সেখানকার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক শক্তি এবং সামরিক ঘরানার দল ‘ভুমজাইথাই’ নির্বাচনে আধিপত্য বিস্তার করে। এই মুহূর্তে পিপলস পার্টির থাই শাসক জোটে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম এবং দলটির নেতারা এখন নিজেদের মধ্যে কাদা ছোঁড়াছুড়িতে লিপ্ত। গত সপ্তাহে জাপানেও প্রথাগত শক্তিশালী দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) জেন-জি নেতৃত্বাধীন বিভিন্ন নতুন দলের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে বিশাল জয় পেয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে, শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হলেও নির্বাচনে আন্দোলনের তরুণ নেতাদের গড়া দল বা অন্য কোনো সংস্কারপন্থী দল ভালো করতে পারেনি। বরং জয়ী হয়েছে দীর্ঘদিনের দ্বিদলীয় শাসনের অন্য অংশ বিএনপি। ভূমিধস জয় পাওয়া বিএনপির মুখে ইতিবাচক পরিবর্তনের কথা বললেও অনেক বাংলাদেশিই তাদের বিশ্বাস করতে পারছেন না।
বিবিসি যেমনটি উল্লেখ করেছে, “যদিও বিএনপি দেশে পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে যখন তারা শেষবার ক্ষমতায় ছিল, তখন দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে দলটি সমালোচিত হয়েছিল।”
নির্বাচনে দ্বিতীয় অবস্থানে এসেছে ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী, যারা নির্বাচনের জন্য নিজেদের ভাবমূর্তি পরিবর্তনের চেষ্টা করলেও অতীতে মারাত্মক রাজনৈতিক সহিংসতার সাথে তাদের সংশ্লিষ্টতা ছিল এবং তারা স্পষ্টভাবেই নারীবিদ্বেষী। যদিও এই নির্বাচনটি ছিল অবাধ ও সুষ্ঠু। তবে ভোটের আগে এবারও বেশ কিছু রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। ২০২৪-এর ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের দ্বারা গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) মাত্র ৬টিতে জয়ী হয়েছে, যা অত্যন্ত দুর্বল একটি ফলাফল।
তবে বিএনপিকে পুনরায় ক্ষমতায় বসালেও বাংলাদেশিরা দেশের সংবিধানের বড় ধরনের পরিবর্তনের পক্ষে ব্যাপক ভোট দিয়েছেন। এই পরিবর্তনগুলোর বেশিরভাগই গণতন্ত্রকে আরও সুরক্ষিত করা, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুযোগ বৃদ্ধি এবং দুর্নীতি কমানোর লক্ষ্যে পরিকল্পিত। এখন পার্লামেন্টে আধিপত্য বিস্তারকারী বিএনপি কি এই পরিবর্তনগুলো বাস্তবায়িত হতে দেবে? তারা এটি করবে কি না—তার ওপরই নির্ভর করছে বিএনপি আদতে বদলেছে কি না। আর যদি তারা বদলাতে না পারে, তবে অন্তত আপাতত বাংলাদেশের রাজনীতি হাসিনা পালানোর আগের সেই পুরোনো সমস্যাগুলোতেই আটকে থাকবে।
লেখক: কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস (সিএফআর)-এর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার সিনিয়র ফেলো
(লেখাটি কাউন্সিল অন ফরেইন রিলেশনসের (সিএফআর) নিবন্ধ থেকে অনূদিত)

২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে বাংলাদেশে ব্যাপক গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এর নেতৃত্বে ছিল মূলত শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি ছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের ক্রমবর্ধমান স্বৈরাচারী শাসনের অবসান এবং সরকারি বিভিন্ন সংস্থায় নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা প্রথার কারণে দুর্নীতির বিলোপ।
এই আন্দোলন ক্রমান্বয়ে বড় আকার ধারণ করে। এর আগে হাসিনা সরকার ভিন্নমত কঠোরভাবে দমন করলেও, তখনকার বিক্ষোভ শেষ পর্যন্ত হাসিনাকে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য করতে সফল হয় (কারণ সেনাবাহিনী তাকে সমর্থন দিতে অস্বীকার করেছিল)। এর ফলে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। শিক্ষার্থীদের পরামর্শে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসকে সেই সরকারের প্রধান করা হয়।
শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর ঢাকা এবং অন্যান্য স্থানে যে উদযাপনের জোয়ার দেখা দিয়েছিল, তার ধারাবাহিকতায় এই অন্তর্বর্তী সরকারের লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশে সংস্কারের এক নতুন যুগের সূচনা করা। এই সংস্কারের উদ্দেশ্য ছিল সহিংস রাজনৈতিক মেরুকরণ কমিয়ে আনা, রাষ্ট্র পুনর্গঠন করা, দুর্নীতি হ্রাস করা এবং গত কয়েক দশক ধরে রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তারকারী দ্বিদলীয় শাসনের অবসান ঘটানো।
আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)—এই দুই দলের মধ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আওয়ামী লীগেরই একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। তবে অতীতে বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন তারাও দুর্নীতিগ্রস্ত, স্বজনপ্রীতিমূলক এবং স্বৈরাচারী আচরণ দেখিয়েছিল।

বিপ্লব-পরবর্তী সময়ের শুরু থেকেই আমার মনে সন্দেহ ছিল যে, কেবল হাসিনাকে হটিয়ে দিলেই খুব বেশি কিছু পরিবর্তন হবে কি না। বাংলাদেশের সামনে অতিক্রম করার মতো পাহাড়সম বাধা ছিল, রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়েছিল এবং অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে সময় ছিল খুবই কম।
বিক্ষোভ এবং হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার তিন মাস পর আমি লিখেছিলাম, ‘‘আগস্ট এবং সেপ্টেম্বরের শুরুতে জনসেবা ব্যবস্থা যেভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল (প্রায় ব্যর্থ রাষ্ট্রের পর্যায়ে), সেই তুলনায় নিরাপত্তা ও জনসেবার কিছুটা উন্নতি হলেও পরিস্থিতি এখনো অনেকটাই নাজুক। পুলিশ বাহিনী মূলত আগস্টেই ভেঙে পড়েছিল এবং এখন তারা ঘুরে দাঁড়াতে হিমশিম খাচ্ছে।... এছাড়া, ইউনূস দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোতে যে ব্যাপক সংস্কারের পরিকল্পনা করছেন, তা প্রয়োজনীয় হলেও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী এবং দুটি শক্তিশালী প্রধান রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে বিশাল বাধার সম্মুখীন হতে হবে। যদি সেই প্রধান দুই দলের একটি জয়ী হয়, তবে অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী সংস্কারগুলোও দীর্ঘস্থায়ী হবে বলে কল্পনা করা কঠিন।’’
বাস্তবেও তা-ই ঘটেছে। অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা, সরকার এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে যে আমূল সংস্কার আনতে চেয়েছিল, তারা নানামুখী বাধা অতিক্রম করে সেই সব পরিবর্তন বাস্তবায়ন করতে পারেনি। এর মধ্যেই সাধারণ জনগণ (এবং সেনাবাহিনী) নতুন নির্বাচনের জন্য উন্মুখ হয়ে ওঠে।
অন্তর্বর্তী সরকার গত বছর দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে দিয়ে একটি সনদে সই করাতে সক্ষম হয়। ওই সনদে শেখ হাসিনার মতো স্বৈরাচারী শাসনের পুনরাবৃত্তি রোধে বিভিন্ন রক্ষাকবচ ও বিধান রাখা হয়েছে। এটিই ছিল এই সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য। তবে অর্থনীতি পরিচালনার পদ্ধতি পরিবর্তন করা, নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা, কিংবা গণমাধ্যম, নারী ও অন্যান্য প্রান্তিক গোষ্ঠীর সুরক্ষায় কাঙ্ক্ষিত সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে তারা ব্যর্থ হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের মতে, সনদে সই করলেও বিএনপি কিছু নির্দিষ্ট পয়েন্টে ‘ভিন্নমত’ (নোটস অব ডিসেন্ট) পোষণ করেছে। এতে সংশয় তৈরি করেছে যে তারা নির্বাচিত হলে আদৌ এই সংস্কারগুলো এগিয়ে নিয়ে যাবে কি না।
শেষ পর্যন্ত, জনপ্রিয়তা হ্রাস পাওয়া এবং কোনো নির্বাচনী ম্যান্ডেট না থাকায় গত সপ্তাহে নির্বাচন আয়োজন করতে বাধ্য হয় অন্তর্বর্তী সরকার।
হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুতকারী বাংলাদেশের এই গণবিক্ষোভ এশিয়ায় জেন-জি (জেন জি) প্রজন্মের প্রথম বড় ধরনের প্রতিবাদের সাফল্য ছিল। এটি নেপাল (যেখানে বিক্ষোভের মুখে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেন), ইন্দোনেশিয়া (যেখানে বিক্ষোভ থমকে গিয়েছিল) এবং অন্যান্য স্থানেও একই ধরনের প্রচেষ্টাকে অনুপ্রাণিত করেছে। তাদের এই প্রভাব মাদাগাস্কার, আফ্রিকার অন্যান্য অংশ এবং ক্যারিবীয় অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছেছে। এটি জেন-জি’র বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক উত্থানের একটি অংশ হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে, যা প্রমাণ করে যে জেনারেশন জেড সবখানেই রাজনীতিতে তাদের প্রভাবের জানান দিতে যাচ্ছে।

তবে জেন-জি'দের আন্দোলন বিশ্বব্যাপী যেমন ছড়িয়ে পড়েছিল, তারা সেই বিক্ষোভগুলোকে ব্যালট বাক্সে রাজনৈতিক সাফল্যে বা নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে রূপান্তর করতে ব্যর্থ হয়েছে। গত সপ্তাহে থাইল্যান্ডের নির্বাচনে জেন-জি প্রজন্মের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় দল ‘পিপলস পার্টি’ বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়ে। জনমত জরিপের তুলনায় তাদের নির্বাচনী ফলাফল ছিল খুবই হতাশাজনক। বিপরীতে সেখানকার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক শক্তি এবং সামরিক ঘরানার দল ‘ভুমজাইথাই’ নির্বাচনে আধিপত্য বিস্তার করে। এই মুহূর্তে পিপলস পার্টির থাই শাসক জোটে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম এবং দলটির নেতারা এখন নিজেদের মধ্যে কাদা ছোঁড়াছুড়িতে লিপ্ত। গত সপ্তাহে জাপানেও প্রথাগত শক্তিশালী দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) জেন-জি নেতৃত্বাধীন বিভিন্ন নতুন দলের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে বিশাল জয় পেয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে, শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হলেও নির্বাচনে আন্দোলনের তরুণ নেতাদের গড়া দল বা অন্য কোনো সংস্কারপন্থী দল ভালো করতে পারেনি। বরং জয়ী হয়েছে দীর্ঘদিনের দ্বিদলীয় শাসনের অন্য অংশ বিএনপি। ভূমিধস জয় পাওয়া বিএনপির মুখে ইতিবাচক পরিবর্তনের কথা বললেও অনেক বাংলাদেশিই তাদের বিশ্বাস করতে পারছেন না।
বিবিসি যেমনটি উল্লেখ করেছে, “যদিও বিএনপি দেশে পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে যখন তারা শেষবার ক্ষমতায় ছিল, তখন দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে দলটি সমালোচিত হয়েছিল।”
নির্বাচনে দ্বিতীয় অবস্থানে এসেছে ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী, যারা নির্বাচনের জন্য নিজেদের ভাবমূর্তি পরিবর্তনের চেষ্টা করলেও অতীতে মারাত্মক রাজনৈতিক সহিংসতার সাথে তাদের সংশ্লিষ্টতা ছিল এবং তারা স্পষ্টভাবেই নারীবিদ্বেষী। যদিও এই নির্বাচনটি ছিল অবাধ ও সুষ্ঠু। তবে ভোটের আগে এবারও বেশ কিছু রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। ২০২৪-এর ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের দ্বারা গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) মাত্র ৬টিতে জয়ী হয়েছে, যা অত্যন্ত দুর্বল একটি ফলাফল।
তবে বিএনপিকে পুনরায় ক্ষমতায় বসালেও বাংলাদেশিরা দেশের সংবিধানের বড় ধরনের পরিবর্তনের পক্ষে ব্যাপক ভোট দিয়েছেন। এই পরিবর্তনগুলোর বেশিরভাগই গণতন্ত্রকে আরও সুরক্ষিত করা, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুযোগ বৃদ্ধি এবং দুর্নীতি কমানোর লক্ষ্যে পরিকল্পিত। এখন পার্লামেন্টে আধিপত্য বিস্তারকারী বিএনপি কি এই পরিবর্তনগুলো বাস্তবায়িত হতে দেবে? তারা এটি করবে কি না—তার ওপরই নির্ভর করছে বিএনপি আদতে বদলেছে কি না। আর যদি তারা বদলাতে না পারে, তবে অন্তত আপাতত বাংলাদেশের রাজনীতি হাসিনা পালানোর আগের সেই পুরোনো সমস্যাগুলোতেই আটকে থাকবে।
লেখক: কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস (সিএফআর)-এর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার সিনিয়র ফেলো
(লেখাটি কাউন্সিল অন ফরেইন রিলেশনসের (সিএফআর) নিবন্ধ থেকে অনূদিত)