নাইর ইকবাল

পয়লা বৈশাখ বাঙালির উৎসবের দিন, এক মিলনমেলার উপলক্ষ। কিন্তু এই দিনটির আছে রাজনৈতিক গুরুত্ব। দিনটিকে যদি শুধু ঋতুভিত্তিক বা বর্ষবরণকেন্দ্রিক আনন্দ-উৎসবের উপলক্ষ বলে ধরে নেওয়া হয়, সেটি হবে বড় ভুল। বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনা ও স্বাধিকারের ইতিহাসের সঙ্গে মিশে আছে পয়লা বৈশাখ। এটি শুরু থেকেই বাঙালির এক অবিনাশী রাজনৈতিক প্রতীকের নাম। পাকিস্তান আমলে বাঙালি পয়লা বৈশাখ দিয়েই সাংস্কৃতিক শোষণ ও জাতিগত নিগ্রহের বিরুদ্ধে আত্মপরিচয় রক্ষার লড়াইটা জারি রেখেছিল। দিনটি তাই সব সময়ই হয়ে উঠেছে বাঙালির প্রতিরোধের হাতিয়ার।
রমনা বটমূলে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন ছায়ানট খুব ছোট্ট পরিসরে ১৯৬৭ সালে শুরু করেছিল বর্ষবরণ উৎসব। কালের আবহে সেটি আজ মহীরূহ এক আয়োজন। সাতষট্টি সালে যে উৎসবের শুরু, সেটি মাঝখানে শুধু বন্ধ থেকেছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ আর ২০২০ ও ২০২১ সালে কোভিড অতিমারির কারণে। একটি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের আয়োজনই হয়ে উঠল একটি জাতীয় উৎসব। এখন তো পয়লা বৈশাখের সকালে রমনার বটমূলে গিয়ে না দাঁড়ালে উদ্যাপনই হয় না। ১৯৬৭ সালের সেই ছোট্ট আয়োজনে কতজনই বা ছিল? সেই আয়োজনই প্রায় ষাট বছর পর লাখো মানুষের মিলনমেলা।
ছায়ানটের বর্ষবরণ উৎসব হঠাৎ করেই শুরু হয়নি। এর রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক গুরুত্বের শেকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। পূর্ব বাংলায় বর্ষবরণের শুরুটা সেই ১৯৫১ সালে। ঢাকার ওয়ারিতে অবস্থিত মাহবুব আলী ইনস্টিটিউটই মূলত পূর্ববঙ্গে নববর্ষ উদ্যাপনের আঁতুড় ঘর। সেখানে ‘লেখক-শিল্পী-মজলিশ’–এর উদ্যোগে আয়োজিত নববর্ষের অনুষ্ঠানটি ছিল মাইলফলকই। সেদিন কে জানত, সাধারণ একটি উদ্যোগই হয়ে উঠবে বাঙালির জাতীয়তাবাদী উন্মেষের হাতিয়ার। প্রখ্যাত সাংবাদিক জহুর হোসেন চৌধুরী, শিক্ষাবিদ মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা নেতৃত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানটি ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রে পূর্ববঙ্গের বাঙালিদের সাংস্কৃতিক জীবনের শক্ত ভিত্তি প্রতিষ্ঠার প্রথম সুগঠিত প্রয়াস।
পয়লা বৈশাখকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক লড়াইটা মূলত ছিল বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর আদর্শিক সংঘাত। সে সময় বাংলা বর্ষবরণ আয়োজনকে খুবই নিচু চোখে দেখত পাকিস্তানি আমলাশ্রেণি। এটিকে ‘হিন্দু’ ও ‘শিখ’ সংস্কৃতির প্রতিরূপ হিসেবে চিহ্নিত করার অপচেষ্টাও হয়েছে। জহুর হোসেন চৌধুরীর এক স্মৃতিচারণে ব্যাপারটি উঠে এসেছে। তিনি লিখেছেন, “পাকিস্তানিদের সেই উন্নাসিকতার মূলে ছিল বাঙালিদের দীর্ঘ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে অস্বীকার করার এক হীন চেষ্টা। অথচ, বাংলা পঞ্জিকা বর্ষ শুরুই হয়েছিল মূঘল আমলে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর এই নির্লিপ্ততা ও সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতাই মূলত বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত শক্ত করেছিল।”

ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে ১৯৫১ সালের সেই নববর্ষ উদ্যাপনের গুরুত্ব অপরিসীম। এ নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশই নেই। এর পরের বছরই ছিল বাঙালির ভাষা আন্দোলনের বছর। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের সূচনা বিন্দু মনে করেন অনেকেই। অথচ, তারও এক বছর আগে নববর্ষ উদ্যাপনের মধ্য দিয়ে পূর্ব বাংলার বাঙালিরা নিজেদের স্বরূপ সন্ধান শুরু করেছিল। সেই আন্দোলনের পুরোধা ছিলেন তিন শিক্ষাবিদ–মুনীর চৌধুরী, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী। কাকতালীয় হোক আর যা-ই হোক, এ তিনজনই ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালি সংস্কৃতি বিরোধী রাজাকার-আলবদরদের হাতে খুন হয়েছিলেন। এটি কী প্রমাণ করে না যে, এ ভূখণ্ডের সাংস্কৃতিক মুক্তি ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা ছিল একই সূত্রে গাঁথা।
১৯৫৩ সালে অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী পয়লা বৈশাখকে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণার দাবি তুলেছিলেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে পয়লা বৈশাখকে প্রাদেশিক ছুটির দিন ঘোষণার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। বাঙালির হৃদয়ে দিনটির গুরুত্ব ও এ দিনটি নিয়ে এক ধরনের চেতনা বেড়েই চলছিল। পাকিস্তানের সামরিক স্বৈরাচার ফিল্ড মার্শাল আইয়ূব খানের সময় রবীন্দ্র সংগীত নিষিদ্ধকরণের উদ্যোগসহ বাঙালি সংস্কৃতির ওপর নানা ধরনের আঘাত এলে ১৯৬৭ সালে তারই প্রতিবাদে ছায়ানট রমনা বটমূলে বাংলা বর্ষবরণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। ছায়ানটের সেই উদ্যোগ ও এতে সাধারণের সম্পৃক্ততা ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে এক বিরাট সাংস্কৃতিক চ্যালেঞ্জ।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের পর পয়লা বৈশাখ উদ্যাপন সার্বজনীন চেহারা নেয় দারুণভাবে। দিনটিকে বাংলাদেশের জাতীয় উৎসবের দিন হিসেবেই ঘোষণা করা হয়। দিনটি হয়ে যায় বাঙালিত্বের চেতনা ধারণের এক অবিস্মরণীয় তারিখ। হয়ে যায় বাঙালি জাতিসত্ত্বার স্তম্ভ।
স্বাধীন বাংলাদেশে নববর্ষের উদ্যাপনে যুক্ত হয় নতুন মাত্রা। আশির দশকে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে এটি হয়ে যায় প্রতিবাদের হাতিয়ার। ১৯৮৯ সালে দেশ যখন হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের স্বৈরশাসনে বন্দী, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের একদল ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষকের উদ্যোগে শুরু হয় এক বর্ণিল শোভাযাত্রা। শুরুতে এর নাম ছিল ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’। এর অনেক পরে এর নাম বদলে হয় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। এই নামকরণের নেপথ্যে একটা ভাবনা ছিল, সেটি ছিল ‘অশুভ শক্তির বিনাশ’ ও ‘শুভবোধের জাগরণের’ এক শৈল্পিক রূপ। পুরো বিষয়টিই প্রতীকী। বিশালকায় সব লোকজ কাঠামো–পাখি, বাঘ, হাতি, আর রঙিন মুখোশের সেই মিছিলে ফুটে ওঠে বাঙালির হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্য। ২০১৬ সালে ইউনেস্কো এই ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’কে ‘বিশ্বের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর এর গুরুত্ব আজ আন্তর্জাতিক পরিসরেও স্বীকৃত। এই অর্জন প্রমাণ করে যে, বাঙালির পয়লা বৈশাখ আজ আর কেবল ভৌগোলিক সীমায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি বিশ্ব-মানবতার এক উজ্জ্বল সম্পদ।

তবে পয়লা বৈশাখ বাঙালির সার্বজনীন উৎসবের উপলক্ষ হলেও সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প স্বাধীন বাংলাদেশেই বারবার এই উৎসবকে শঙ্কার মধ্যে ফেলেছে। এর সার্বজনীন চেহারা বিনষ্টের চেষ্টা হয়েছে। ২০০১ সালে রমনা বটমূলে উগ্রবাদীদের বোমা হামলা বিমূঢ় করে দিয়েছিল বাংলাদেশের মানুষকে। একটা সাধারণ উৎসব, যেখানে বর্ণিল সাজে সেজে সাধারণ মানুষ যোগ দেয়, সূরের মূর্চ্ছনায় নিজেদের উৎসবকে রাঙাতে চায়, সেখানেই বোমা হামলা করে হত্যা করা হয়েছিল ১০ জন নিরীহ মানুষকে। আহত হয়েছিলেন আরও জনা কুড়ি। আহত কেউ কেউ আজীবনের জন্য বরণ করেছিল পঙ্গুত্ব। কিন্তু এই উৎসবের মহিমা এমনই, ২০০২ সালে পয়লা বৈশাখ উদ্যাপিত হয়েছিল আরও বর্ণাঢ্যভাবে, আরও স্বতঃস্ফূর্তভাবে। লাখো মানুষের ঢল নেমেছিল রমনা বটমূল ঘিরে। তবে আজ থেকে ২৫ বছর আগের সেই বোমা হামলা নির্ভেজাল এই উৎসবকে শঙ্কার ঘেরাটোপে বন্দী করে ফেলেছে চিরদিনের জন্য। সার্বজনীন এই উৎসবেই এখন সন্ত্রাস দমনের বাহিনী মোতায়েন করতে হয়। গত কয়েক বছর ধরে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নিয়েও চলছে নানা বিতর্ক। পুরো বিষয়টিকে ‘ধর্মবিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যদিও ধর্মের সঙ্গে সাধারণ একটি শোভাযাত্রার যোগ কতটুক–সেটি নিয়ে বেশিরভাগ মানুষের মধ্যেই সন্দেহ আছে। সেই বিতর্ক চলছে দিনের পর দিন। মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে বিতর্ক এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে যুদ্ধসাজে সজ্জিত বাহিনীর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে চলেছে এই মঙ্গল শোভাযাত্রা। দুর্ভাগ্য বোধহয় এটাকেই বলে।
এবারও মঙ্গল শোভাযাত্রা, বৈশাখী শোভাযাত্রা কিংবা আনন্দ শোভাযাত্রা–চারুকলার এই আনন্দ মিছিলকে কী নামে ডাকা হবে, সেটা নিয়ে চলেছে বিতর্ক। তবে নামে কী-ইবা এসে যায়! পয়লা বৈশাখ যেভাবে বাঙালির চিরকালীন উৎসবের দিন হয়ে উঠেছে, তাতে এসব রাজনৈতিক বিতর্ককে বাঙালি, বাংলাদেশের মানুষ অপ্রয়োজনীয়ই মনে করে। যে উৎসবে আনন্দ আর আটপৌরে অনুভূতি মিশে থাকে, যে দিনটা প্রতিটি বাঙালিকে তার শেকড়ের সঙ্গে সংযুক্ত করে, তাতে রাজনৈতিক বিতর্কে কিছুই যায় আসে না।
তাই তো ধর্মীয় উগ্রবাদ বা অসহিষ্ণুতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে পয়লা বৈশাখ আজও আমাদের বড় ভরসার জায়গা। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষ হিসেবে আমাদের আসল পরিচয় আমাদের সংস্কৃতিতে, আমাদের অসাম্প্রদায়িক জীবনবোধে।
লেখক: সাংবাদিক

পয়লা বৈশাখ বাঙালির উৎসবের দিন, এক মিলনমেলার উপলক্ষ। কিন্তু এই দিনটির আছে রাজনৈতিক গুরুত্ব। দিনটিকে যদি শুধু ঋতুভিত্তিক বা বর্ষবরণকেন্দ্রিক আনন্দ-উৎসবের উপলক্ষ বলে ধরে নেওয়া হয়, সেটি হবে বড় ভুল। বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনা ও স্বাধিকারের ইতিহাসের সঙ্গে মিশে আছে পয়লা বৈশাখ। এটি শুরু থেকেই বাঙালির এক অবিনাশী রাজনৈতিক প্রতীকের নাম। পাকিস্তান আমলে বাঙালি পয়লা বৈশাখ দিয়েই সাংস্কৃতিক শোষণ ও জাতিগত নিগ্রহের বিরুদ্ধে আত্মপরিচয় রক্ষার লড়াইটা জারি রেখেছিল। দিনটি তাই সব সময়ই হয়ে উঠেছে বাঙালির প্রতিরোধের হাতিয়ার।
রমনা বটমূলে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন ছায়ানট খুব ছোট্ট পরিসরে ১৯৬৭ সালে শুরু করেছিল বর্ষবরণ উৎসব। কালের আবহে সেটি আজ মহীরূহ এক আয়োজন। সাতষট্টি সালে যে উৎসবের শুরু, সেটি মাঝখানে শুধু বন্ধ থেকেছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ আর ২০২০ ও ২০২১ সালে কোভিড অতিমারির কারণে। একটি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের আয়োজনই হয়ে উঠল একটি জাতীয় উৎসব। এখন তো পয়লা বৈশাখের সকালে রমনার বটমূলে গিয়ে না দাঁড়ালে উদ্যাপনই হয় না। ১৯৬৭ সালের সেই ছোট্ট আয়োজনে কতজনই বা ছিল? সেই আয়োজনই প্রায় ষাট বছর পর লাখো মানুষের মিলনমেলা।
ছায়ানটের বর্ষবরণ উৎসব হঠাৎ করেই শুরু হয়নি। এর রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক গুরুত্বের শেকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। পূর্ব বাংলায় বর্ষবরণের শুরুটা সেই ১৯৫১ সালে। ঢাকার ওয়ারিতে অবস্থিত মাহবুব আলী ইনস্টিটিউটই মূলত পূর্ববঙ্গে নববর্ষ উদ্যাপনের আঁতুড় ঘর। সেখানে ‘লেখক-শিল্পী-মজলিশ’–এর উদ্যোগে আয়োজিত নববর্ষের অনুষ্ঠানটি ছিল মাইলফলকই। সেদিন কে জানত, সাধারণ একটি উদ্যোগই হয়ে উঠবে বাঙালির জাতীয়তাবাদী উন্মেষের হাতিয়ার। প্রখ্যাত সাংবাদিক জহুর হোসেন চৌধুরী, শিক্ষাবিদ মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা নেতৃত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানটি ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রে পূর্ববঙ্গের বাঙালিদের সাংস্কৃতিক জীবনের শক্ত ভিত্তি প্রতিষ্ঠার প্রথম সুগঠিত প্রয়াস।
পয়লা বৈশাখকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক লড়াইটা মূলত ছিল বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর আদর্শিক সংঘাত। সে সময় বাংলা বর্ষবরণ আয়োজনকে খুবই নিচু চোখে দেখত পাকিস্তানি আমলাশ্রেণি। এটিকে ‘হিন্দু’ ও ‘শিখ’ সংস্কৃতির প্রতিরূপ হিসেবে চিহ্নিত করার অপচেষ্টাও হয়েছে। জহুর হোসেন চৌধুরীর এক স্মৃতিচারণে ব্যাপারটি উঠে এসেছে। তিনি লিখেছেন, “পাকিস্তানিদের সেই উন্নাসিকতার মূলে ছিল বাঙালিদের দীর্ঘ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে অস্বীকার করার এক হীন চেষ্টা। অথচ, বাংলা পঞ্জিকা বর্ষ শুরুই হয়েছিল মূঘল আমলে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর এই নির্লিপ্ততা ও সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতাই মূলত বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত শক্ত করেছিল।”

ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে ১৯৫১ সালের সেই নববর্ষ উদ্যাপনের গুরুত্ব অপরিসীম। এ নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশই নেই। এর পরের বছরই ছিল বাঙালির ভাষা আন্দোলনের বছর। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের সূচনা বিন্দু মনে করেন অনেকেই। অথচ, তারও এক বছর আগে নববর্ষ উদ্যাপনের মধ্য দিয়ে পূর্ব বাংলার বাঙালিরা নিজেদের স্বরূপ সন্ধান শুরু করেছিল। সেই আন্দোলনের পুরোধা ছিলেন তিন শিক্ষাবিদ–মুনীর চৌধুরী, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী। কাকতালীয় হোক আর যা-ই হোক, এ তিনজনই ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালি সংস্কৃতি বিরোধী রাজাকার-আলবদরদের হাতে খুন হয়েছিলেন। এটি কী প্রমাণ করে না যে, এ ভূখণ্ডের সাংস্কৃতিক মুক্তি ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা ছিল একই সূত্রে গাঁথা।
১৯৫৩ সালে অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী পয়লা বৈশাখকে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণার দাবি তুলেছিলেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে পয়লা বৈশাখকে প্রাদেশিক ছুটির দিন ঘোষণার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। বাঙালির হৃদয়ে দিনটির গুরুত্ব ও এ দিনটি নিয়ে এক ধরনের চেতনা বেড়েই চলছিল। পাকিস্তানের সামরিক স্বৈরাচার ফিল্ড মার্শাল আইয়ূব খানের সময় রবীন্দ্র সংগীত নিষিদ্ধকরণের উদ্যোগসহ বাঙালি সংস্কৃতির ওপর নানা ধরনের আঘাত এলে ১৯৬৭ সালে তারই প্রতিবাদে ছায়ানট রমনা বটমূলে বাংলা বর্ষবরণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। ছায়ানটের সেই উদ্যোগ ও এতে সাধারণের সম্পৃক্ততা ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে এক বিরাট সাংস্কৃতিক চ্যালেঞ্জ।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের পর পয়লা বৈশাখ উদ্যাপন সার্বজনীন চেহারা নেয় দারুণভাবে। দিনটিকে বাংলাদেশের জাতীয় উৎসবের দিন হিসেবেই ঘোষণা করা হয়। দিনটি হয়ে যায় বাঙালিত্বের চেতনা ধারণের এক অবিস্মরণীয় তারিখ। হয়ে যায় বাঙালি জাতিসত্ত্বার স্তম্ভ।
স্বাধীন বাংলাদেশে নববর্ষের উদ্যাপনে যুক্ত হয় নতুন মাত্রা। আশির দশকে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে এটি হয়ে যায় প্রতিবাদের হাতিয়ার। ১৯৮৯ সালে দেশ যখন হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের স্বৈরশাসনে বন্দী, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের একদল ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষকের উদ্যোগে শুরু হয় এক বর্ণিল শোভাযাত্রা। শুরুতে এর নাম ছিল ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’। এর অনেক পরে এর নাম বদলে হয় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। এই নামকরণের নেপথ্যে একটা ভাবনা ছিল, সেটি ছিল ‘অশুভ শক্তির বিনাশ’ ও ‘শুভবোধের জাগরণের’ এক শৈল্পিক রূপ। পুরো বিষয়টিই প্রতীকী। বিশালকায় সব লোকজ কাঠামো–পাখি, বাঘ, হাতি, আর রঙিন মুখোশের সেই মিছিলে ফুটে ওঠে বাঙালির হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্য। ২০১৬ সালে ইউনেস্কো এই ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’কে ‘বিশ্বের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর এর গুরুত্ব আজ আন্তর্জাতিক পরিসরেও স্বীকৃত। এই অর্জন প্রমাণ করে যে, বাঙালির পয়লা বৈশাখ আজ আর কেবল ভৌগোলিক সীমায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি বিশ্ব-মানবতার এক উজ্জ্বল সম্পদ।

তবে পয়লা বৈশাখ বাঙালির সার্বজনীন উৎসবের উপলক্ষ হলেও সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প স্বাধীন বাংলাদেশেই বারবার এই উৎসবকে শঙ্কার মধ্যে ফেলেছে। এর সার্বজনীন চেহারা বিনষ্টের চেষ্টা হয়েছে। ২০০১ সালে রমনা বটমূলে উগ্রবাদীদের বোমা হামলা বিমূঢ় করে দিয়েছিল বাংলাদেশের মানুষকে। একটা সাধারণ উৎসব, যেখানে বর্ণিল সাজে সেজে সাধারণ মানুষ যোগ দেয়, সূরের মূর্চ্ছনায় নিজেদের উৎসবকে রাঙাতে চায়, সেখানেই বোমা হামলা করে হত্যা করা হয়েছিল ১০ জন নিরীহ মানুষকে। আহত হয়েছিলেন আরও জনা কুড়ি। আহত কেউ কেউ আজীবনের জন্য বরণ করেছিল পঙ্গুত্ব। কিন্তু এই উৎসবের মহিমা এমনই, ২০০২ সালে পয়লা বৈশাখ উদ্যাপিত হয়েছিল আরও বর্ণাঢ্যভাবে, আরও স্বতঃস্ফূর্তভাবে। লাখো মানুষের ঢল নেমেছিল রমনা বটমূল ঘিরে। তবে আজ থেকে ২৫ বছর আগের সেই বোমা হামলা নির্ভেজাল এই উৎসবকে শঙ্কার ঘেরাটোপে বন্দী করে ফেলেছে চিরদিনের জন্য। সার্বজনীন এই উৎসবেই এখন সন্ত্রাস দমনের বাহিনী মোতায়েন করতে হয়। গত কয়েক বছর ধরে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নিয়েও চলছে নানা বিতর্ক। পুরো বিষয়টিকে ‘ধর্মবিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যদিও ধর্মের সঙ্গে সাধারণ একটি শোভাযাত্রার যোগ কতটুক–সেটি নিয়ে বেশিরভাগ মানুষের মধ্যেই সন্দেহ আছে। সেই বিতর্ক চলছে দিনের পর দিন। মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে বিতর্ক এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে যুদ্ধসাজে সজ্জিত বাহিনীর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে চলেছে এই মঙ্গল শোভাযাত্রা। দুর্ভাগ্য বোধহয় এটাকেই বলে।
এবারও মঙ্গল শোভাযাত্রা, বৈশাখী শোভাযাত্রা কিংবা আনন্দ শোভাযাত্রা–চারুকলার এই আনন্দ মিছিলকে কী নামে ডাকা হবে, সেটা নিয়ে চলেছে বিতর্ক। তবে নামে কী-ইবা এসে যায়! পয়লা বৈশাখ যেভাবে বাঙালির চিরকালীন উৎসবের দিন হয়ে উঠেছে, তাতে এসব রাজনৈতিক বিতর্ককে বাঙালি, বাংলাদেশের মানুষ অপ্রয়োজনীয়ই মনে করে। যে উৎসবে আনন্দ আর আটপৌরে অনুভূতি মিশে থাকে, যে দিনটা প্রতিটি বাঙালিকে তার শেকড়ের সঙ্গে সংযুক্ত করে, তাতে রাজনৈতিক বিতর্কে কিছুই যায় আসে না।
তাই তো ধর্মীয় উগ্রবাদ বা অসহিষ্ণুতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে পয়লা বৈশাখ আজও আমাদের বড় ভরসার জায়গা। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষ হিসেবে আমাদের আসল পরিচয় আমাদের সংস্কৃতিতে, আমাদের অসাম্প্রদায়িক জীবনবোধে।
লেখক: সাংবাদিক