ফজলে রাব্বি

রাজধানীর খামারবাড়ির কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে বিদ্যুৎ খাতের জন্য এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ সাজানো হয়েছিল। বিদ্যুৎ বিতরণ ও সঞ্চালন কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে বিদ্যুতের পাইকারি মূল্য, খুচরা দাম এবং সঞ্চালন চার্জ (উইলিং চার্জ) বৃদ্ধির প্রস্তাবের ওপর দুই দিনব্যাপী এই গণশুনানির আয়োজন করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। একদিকে দাম বাড়ানোর পক্ষে সরকারি ও বেসরকারি কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তাদের টেকনিক্যাল যুক্তির পসরা, অন্যদিকে বিচারকের আসনে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ ও কমিশনের সদস্যরা। কিন্তু যে সাধারণ ভোক্তাদের ভাগ্য নির্ধারিত হতে যাচ্ছে এই শুনানির মধ্য দিয়ে, তাদের পক্ষের সবচেয়ে সোচ্চার ও তাত্ত্বিক কণ্ঠটিই এবার অনুপস্থিত ছিল।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলমের অনুপস্থিতিতে বিদ্যুতের পাইকারি, খুচরা ও সঞ্চালন চার্জ বৃদ্ধির এই গণশুনানি রূপ নিয়েছিল এক প্রাণহীন, একপেশে আনুষ্ঠানিকতায়। শুনানির শুরুতেই বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ যখন ক্যাবের বয়কট-সংক্রান্ত লিখিত বিবৃতিটি পাঠ করছিলেন, মিলনায়তনে উপস্থিত সবার চোখ খুঁজে বেড়াচ্ছিল এক চশমা পরা দৃঢ়চেতা প্রবীণ অধ্যাপককে–যিনি প্রতিবার তথ্যের পাহাড় আর অকাট্য যুক্তির বাণে জর্জরিত করতেন বিতরণ ও সঞ্চালন কোম্পানির কর্মকর্তাদের। কিন্তু এবার সেখানে ছিল কেবলই শূন্যতা। দুদিনের শুনানিতে বারবার ঘুরেফিরে এসেছে তার নাম, তার আগের শুনানির রেফারেন্স। অধ্যাপক শামসুল আলমের অনুপস্থিতি স্পষ্ট করে দিয়েছে–ভোক্তা অধিকারের লড়াইয়ে তার কণ্ঠ কতটা অপরিহার্য।
কেন এই বয়কট?
বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির এই বহুমাত্রিক প্রস্তাবের মুখে ক্যাবের গণশুনানি বয়কটের সিদ্ধান্তটি ছিল এক দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও নীতিগত আপসহীনতার বহিঃপ্রকাশ। ক্যাবের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, বিদ্যুৎ খাতের অভ্যন্তরীণ অদক্ষতা, সিস্টেম লস এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণের ক্ষেত্রে বিগত দেড় দশকের ‘লুণ্ঠনমূলক’ ব্যয়ের বোঝা সাধারণ মানুষের ওপর চাপানোর এই প্রক্রিয়া একটি প্রহসন ছাড়া আর কিছু নয়।

অধ্যাপক শামসুল আলমের দেখানো পথ ধরেই ক্যাব প্রশ্ন তুলেছে–বিগত বছরগুলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বা অযৌক্তিক ব্যয়ের নামে লোপাট হয়েছে এবং সঞ্চালন লাইনের ধীরগতির কারণে যে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, বিইআরসি কেন তার হিসাব খতিয়ে দেখছে না? বিতরণ ও সঞ্চালন কোম্পানিগুলোর দুর্নীতি, অপচয় ও সিস্টেম লস বন্ধ না করে বারবার খুচরা ও পাইকারি পর্যায়ে জনগণের পকেট কাটার এই গণবিরোধী শুনানিতে অংশ নেওয়াকে নীতিগতভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে ক্যাব। তাদের মতে, এই শুনানি জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের স্পিরিট ও জনআকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী। গণশুনানি বয়কট করলেও লিখিত বক্তব্যে ভোক্তার স্বার্থের কথা মনে করিয়ে দিতে ভোলেনি সংস্থাটি। বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের ওপর অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে লিখিত সুপারিশ ও তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছে ক্যাব। গণশুনানির দুই দিনই শুরুতে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ তা পাঠ করেন।
লিখিত বক্তব্যে ক্যাব দাবি করে, গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর এই প্রস্তাবকে ক্যাব সম্পূর্ণভাবে বয়কট করছে। তারা এটিকে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের পকেট কাটার একটি অন্যায্য উদ্যোগ হিসেবে মনে করে। আইন সংশোধনের মাধ্যমে অবিলম্বে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির এই প্রক্রিয়া থেকে বিইআরসি-কে সরে আসার আহ্বান জানানো হয়। ক্যাব মনে করে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমলেও দেশের সাধারণ ভোক্তারা তার কোনো পূর্ণ সুবিধা পাচ্ছেন না। তাই বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় যৌক্তিকভাবে পুনর্মূল্যায়ন না করে এই ধরনের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সবচেয়ে বড় কথা, বিদ্যুৎ খাতের অভ্যন্তরীণ অদক্ষতা, সিস্টেম লস, বিলম্বিত প্রকল্প, অতিরিক্ত ব্যয় এবং বিশেষ করে ক্যাপাসিটি চার্জের বিশাল আর্থিক বোঝা সাধারণ মানুষের ওপর চাপানো অন্যায় বলে মনে করে ভোক্তার স্বার্থ নিয়ে কাজ করা সংস্থাটি। তারা মনে করে, বিদ্যুতের দাম বাড়লে শিল্প, কৃষি, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় ব্যয় বাড়বে, যা চূড়ান্তভাবে সব ধরনের দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে দেবে। সাধারণ মানুষের আয় বৃদ্ধির তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় এমনিতেই অনেক বেশি। এর ওপর নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে তা জনজীবনে তীব্র চাপ সৃষ্টি করবে। দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা: বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় হ্রাসে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নবায়ণযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, সঞ্চালন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং অপচয় কমানো জরুরি।
ক্যাব স্পষ্ট ভাষায় জানায়, বাজার পরিস্থিতি, উৎপাদন ব্যয়, ক্যাপাসিটি চার্জ, সিস্টেম লস ও বিদ্যুৎ খাতের সার্বিক আর্থিক ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে পর্যালোচনা করে একটি বাস্তবসম্মত ও ভোক্তা-বান্ধব মূল্যনীতি প্রণয়ন করতে হবে।
বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে, বিইআরসির গণশুনানিগুলোকে আমলাতান্ত্রিক আইনি ফ্রেমওয়ার্ক থেকে বের করে সাধারণ মানুষের দরবারে নিয়ে আসার একক কৃতিত্ব অধ্যাপক শামসুল আলমের। তিনি কেবল একজন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বা শিক্ষক নন, তিনি ভোক্তাদের অধিকারের এক জীবন্ত প্রতীক।
বিগত সরকারের আমলে যখন বিশেষ আইনের দোহাই দিয়ে গণশুনানি ছাড়াই নির্বাহী আদেশে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তখন অধ্যাপক শামসুল আলমই রাজপথে এবং আদালতে এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। তিনি তথ্য-উপাত্ত দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন কীভাবে সরকারি কোম্পানির মুনাফার হার আইনি সীমা ছাড়িয়ে জনগণের ওপর বোঝা চাপানো হয়েছে। তিনি বারবার দাবি তুলেছেন, বিইআরসি আইনের অধীনে সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের নিয়ে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে ‘জ্বালানি অপরাধীদের’ বিচার করতে হবে।
খামারবাড়ির শুনানির টেবিলে আমলারা যখন টেকনিক্যাল শব্দের বেড়াজালে পাইকারি ও খুচরা মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতা প্রমাণের চেষ্টা করছিলেন, অধ্যাপক শামসুল আলম তখন একেকটি অডিট রিপোর্ট ও ব্যয়ের অসঙ্গতি তুলে ধরে তাদের সেই যুক্তি গুঁড়িয়ে দিতেন। বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন চার্জ কিংবা বিতরণের প্রতিটি স্তরের শুভঙ্করের ফাঁকি ধরে ফেলার ক্ষেত্রে তার জেরা ছিল কোম্পানির কর্মকর্তাদের জন্য এক আতঙ্কের নাম। তার কাছ থেকেই বারবার আলোকিত হন এই খাত নিয়ে কাজ করা সংবাদকর্মীরাও।
নিষ্প্রাণ শুনানির শূন্যতা
এবারের দুই দিনের শুনানিতে সেই ধারালো জেরা ছিল না, ছিল না তথ্যের গভীরে গিয়ে সঞ্চালন ও বিতরণ চার্জের শুভঙ্করের ফাঁকি ধরে ফেলার মতো কোনো বিকল্প কণ্ঠ। ফলে কোম্পানিগুলো তাদের প্রস্তাব পেশ করেছে প্রায় বিনা বাধায়। উপস্থিত অন্যান্য অংশীজনরা ক্ষোভ প্রকাশ করলেও অধ্যাপক শামসুল আলমের মতো তাত্ত্বিক গভীরতা আর আইনি ভিত্তির অভাব ছিল স্পষ্ট।
শুনানি শেষে করিডোরে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ফারহান নূর আক্ষেপ করে বলছিলেন, “শামসুল আলম স্যার থাকলে কোম্পানির কর্মকর্তারা বিদ্যুতের পাইকারি আর সঞ্চালন চার্জের নামে এভাবে পার পেয়ে যেতে পারতেন না। তিনি টেবিল চাপড়ে হিসাব আদায় করতেন।” কেবল তাই নয়; দুই দিনের শুনানিতে কমিশন এবং ভোক্তার পক্ষের অন্তত ৬ জন বক্তা ঘুরেফিরেই উত্থাপন করেছেন অধ্যাপক শামসুল আলমের কথা।
বিদ্যুতের পাইকারি, খুচরা ও সঞ্চালন চার্জ নির্ধারণের এই গণশুনানি মানে শুধু দুই পক্ষের উপস্থিতির আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি ভোক্তার বাঁচা-মরার লড়াইয়ের মঞ্চ। আর সেই মঞ্চে অধ্যাপক শামসুল আলমের অনুপস্থিতি শুধু ক্যাবের একটি শূন্য পদ নয়, বরং দেশের কোটি কোটি সাধারণ ভোক্তার অভিভাবকহীনতার প্রতিচ্ছবি। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে সুশাসন ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে হলে অধ্যাপক শামসুল আলমের মতো লড়াকু কণ্ঠের উপস্থিতি কতটা জরুরি, খামারবাড়ির এই দুই দিনের নিস্তেজ গণশুনানি তা আরও একবার প্রমাণ করে গেল।

রাজধানীর খামারবাড়ির কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে বিদ্যুৎ খাতের জন্য এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ সাজানো হয়েছিল। বিদ্যুৎ বিতরণ ও সঞ্চালন কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে বিদ্যুতের পাইকারি মূল্য, খুচরা দাম এবং সঞ্চালন চার্জ (উইলিং চার্জ) বৃদ্ধির প্রস্তাবের ওপর দুই দিনব্যাপী এই গণশুনানির আয়োজন করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। একদিকে দাম বাড়ানোর পক্ষে সরকারি ও বেসরকারি কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তাদের টেকনিক্যাল যুক্তির পসরা, অন্যদিকে বিচারকের আসনে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ ও কমিশনের সদস্যরা। কিন্তু যে সাধারণ ভোক্তাদের ভাগ্য নির্ধারিত হতে যাচ্ছে এই শুনানির মধ্য দিয়ে, তাদের পক্ষের সবচেয়ে সোচ্চার ও তাত্ত্বিক কণ্ঠটিই এবার অনুপস্থিত ছিল।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলমের অনুপস্থিতিতে বিদ্যুতের পাইকারি, খুচরা ও সঞ্চালন চার্জ বৃদ্ধির এই গণশুনানি রূপ নিয়েছিল এক প্রাণহীন, একপেশে আনুষ্ঠানিকতায়। শুনানির শুরুতেই বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ যখন ক্যাবের বয়কট-সংক্রান্ত লিখিত বিবৃতিটি পাঠ করছিলেন, মিলনায়তনে উপস্থিত সবার চোখ খুঁজে বেড়াচ্ছিল এক চশমা পরা দৃঢ়চেতা প্রবীণ অধ্যাপককে–যিনি প্রতিবার তথ্যের পাহাড় আর অকাট্য যুক্তির বাণে জর্জরিত করতেন বিতরণ ও সঞ্চালন কোম্পানির কর্মকর্তাদের। কিন্তু এবার সেখানে ছিল কেবলই শূন্যতা। দুদিনের শুনানিতে বারবার ঘুরেফিরে এসেছে তার নাম, তার আগের শুনানির রেফারেন্স। অধ্যাপক শামসুল আলমের অনুপস্থিতি স্পষ্ট করে দিয়েছে–ভোক্তা অধিকারের লড়াইয়ে তার কণ্ঠ কতটা অপরিহার্য।
কেন এই বয়কট?
বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির এই বহুমাত্রিক প্রস্তাবের মুখে ক্যাবের গণশুনানি বয়কটের সিদ্ধান্তটি ছিল এক দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও নীতিগত আপসহীনতার বহিঃপ্রকাশ। ক্যাবের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, বিদ্যুৎ খাতের অভ্যন্তরীণ অদক্ষতা, সিস্টেম লস এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণের ক্ষেত্রে বিগত দেড় দশকের ‘লুণ্ঠনমূলক’ ব্যয়ের বোঝা সাধারণ মানুষের ওপর চাপানোর এই প্রক্রিয়া একটি প্রহসন ছাড়া আর কিছু নয়।

অধ্যাপক শামসুল আলমের দেখানো পথ ধরেই ক্যাব প্রশ্ন তুলেছে–বিগত বছরগুলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বা অযৌক্তিক ব্যয়ের নামে লোপাট হয়েছে এবং সঞ্চালন লাইনের ধীরগতির কারণে যে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, বিইআরসি কেন তার হিসাব খতিয়ে দেখছে না? বিতরণ ও সঞ্চালন কোম্পানিগুলোর দুর্নীতি, অপচয় ও সিস্টেম লস বন্ধ না করে বারবার খুচরা ও পাইকারি পর্যায়ে জনগণের পকেট কাটার এই গণবিরোধী শুনানিতে অংশ নেওয়াকে নীতিগতভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে ক্যাব। তাদের মতে, এই শুনানি জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের স্পিরিট ও জনআকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী। গণশুনানি বয়কট করলেও লিখিত বক্তব্যে ভোক্তার স্বার্থের কথা মনে করিয়ে দিতে ভোলেনি সংস্থাটি। বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের ওপর অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে লিখিত সুপারিশ ও তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছে ক্যাব। গণশুনানির দুই দিনই শুরুতে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ তা পাঠ করেন।
লিখিত বক্তব্যে ক্যাব দাবি করে, গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর এই প্রস্তাবকে ক্যাব সম্পূর্ণভাবে বয়কট করছে। তারা এটিকে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের পকেট কাটার একটি অন্যায্য উদ্যোগ হিসেবে মনে করে। আইন সংশোধনের মাধ্যমে অবিলম্বে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির এই প্রক্রিয়া থেকে বিইআরসি-কে সরে আসার আহ্বান জানানো হয়। ক্যাব মনে করে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমলেও দেশের সাধারণ ভোক্তারা তার কোনো পূর্ণ সুবিধা পাচ্ছেন না। তাই বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় যৌক্তিকভাবে পুনর্মূল্যায়ন না করে এই ধরনের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সবচেয়ে বড় কথা, বিদ্যুৎ খাতের অভ্যন্তরীণ অদক্ষতা, সিস্টেম লস, বিলম্বিত প্রকল্প, অতিরিক্ত ব্যয় এবং বিশেষ করে ক্যাপাসিটি চার্জের বিশাল আর্থিক বোঝা সাধারণ মানুষের ওপর চাপানো অন্যায় বলে মনে করে ভোক্তার স্বার্থ নিয়ে কাজ করা সংস্থাটি। তারা মনে করে, বিদ্যুতের দাম বাড়লে শিল্প, কৃষি, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় ব্যয় বাড়বে, যা চূড়ান্তভাবে সব ধরনের দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে দেবে। সাধারণ মানুষের আয় বৃদ্ধির তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় এমনিতেই অনেক বেশি। এর ওপর নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে তা জনজীবনে তীব্র চাপ সৃষ্টি করবে। দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা: বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় হ্রাসে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নবায়ণযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, সঞ্চালন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং অপচয় কমানো জরুরি।
ক্যাব স্পষ্ট ভাষায় জানায়, বাজার পরিস্থিতি, উৎপাদন ব্যয়, ক্যাপাসিটি চার্জ, সিস্টেম লস ও বিদ্যুৎ খাতের সার্বিক আর্থিক ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে পর্যালোচনা করে একটি বাস্তবসম্মত ও ভোক্তা-বান্ধব মূল্যনীতি প্রণয়ন করতে হবে।
বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে, বিইআরসির গণশুনানিগুলোকে আমলাতান্ত্রিক আইনি ফ্রেমওয়ার্ক থেকে বের করে সাধারণ মানুষের দরবারে নিয়ে আসার একক কৃতিত্ব অধ্যাপক শামসুল আলমের। তিনি কেবল একজন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বা শিক্ষক নন, তিনি ভোক্তাদের অধিকারের এক জীবন্ত প্রতীক।
বিগত সরকারের আমলে যখন বিশেষ আইনের দোহাই দিয়ে গণশুনানি ছাড়াই নির্বাহী আদেশে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তখন অধ্যাপক শামসুল আলমই রাজপথে এবং আদালতে এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। তিনি তথ্য-উপাত্ত দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন কীভাবে সরকারি কোম্পানির মুনাফার হার আইনি সীমা ছাড়িয়ে জনগণের ওপর বোঝা চাপানো হয়েছে। তিনি বারবার দাবি তুলেছেন, বিইআরসি আইনের অধীনে সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের নিয়ে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে ‘জ্বালানি অপরাধীদের’ বিচার করতে হবে।
খামারবাড়ির শুনানির টেবিলে আমলারা যখন টেকনিক্যাল শব্দের বেড়াজালে পাইকারি ও খুচরা মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতা প্রমাণের চেষ্টা করছিলেন, অধ্যাপক শামসুল আলম তখন একেকটি অডিট রিপোর্ট ও ব্যয়ের অসঙ্গতি তুলে ধরে তাদের সেই যুক্তি গুঁড়িয়ে দিতেন। বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন চার্জ কিংবা বিতরণের প্রতিটি স্তরের শুভঙ্করের ফাঁকি ধরে ফেলার ক্ষেত্রে তার জেরা ছিল কোম্পানির কর্মকর্তাদের জন্য এক আতঙ্কের নাম। তার কাছ থেকেই বারবার আলোকিত হন এই খাত নিয়ে কাজ করা সংবাদকর্মীরাও।
নিষ্প্রাণ শুনানির শূন্যতা
এবারের দুই দিনের শুনানিতে সেই ধারালো জেরা ছিল না, ছিল না তথ্যের গভীরে গিয়ে সঞ্চালন ও বিতরণ চার্জের শুভঙ্করের ফাঁকি ধরে ফেলার মতো কোনো বিকল্প কণ্ঠ। ফলে কোম্পানিগুলো তাদের প্রস্তাব পেশ করেছে প্রায় বিনা বাধায়। উপস্থিত অন্যান্য অংশীজনরা ক্ষোভ প্রকাশ করলেও অধ্যাপক শামসুল আলমের মতো তাত্ত্বিক গভীরতা আর আইনি ভিত্তির অভাব ছিল স্পষ্ট।
শুনানি শেষে করিডোরে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ফারহান নূর আক্ষেপ করে বলছিলেন, “শামসুল আলম স্যার থাকলে কোম্পানির কর্মকর্তারা বিদ্যুতের পাইকারি আর সঞ্চালন চার্জের নামে এভাবে পার পেয়ে যেতে পারতেন না। তিনি টেবিল চাপড়ে হিসাব আদায় করতেন।” কেবল তাই নয়; দুই দিনের শুনানিতে কমিশন এবং ভোক্তার পক্ষের অন্তত ৬ জন বক্তা ঘুরেফিরেই উত্থাপন করেছেন অধ্যাপক শামসুল আলমের কথা।
বিদ্যুতের পাইকারি, খুচরা ও সঞ্চালন চার্জ নির্ধারণের এই গণশুনানি মানে শুধু দুই পক্ষের উপস্থিতির আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি ভোক্তার বাঁচা-মরার লড়াইয়ের মঞ্চ। আর সেই মঞ্চে অধ্যাপক শামসুল আলমের অনুপস্থিতি শুধু ক্যাবের একটি শূন্য পদ নয়, বরং দেশের কোটি কোটি সাধারণ ভোক্তার অভিভাবকহীনতার প্রতিচ্ছবি। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে সুশাসন ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে হলে অধ্যাপক শামসুল আলমের মতো লড়াকু কণ্ঠের উপস্থিতি কতটা জরুরি, খামারবাড়ির এই দুই দিনের নিস্তেজ গণশুনানি তা আরও একবার প্রমাণ করে গেল।