Advertisement Banner

চীন-রাশিয়া সম্পর্কে বিশ্বস্ততার নতুন সমীকরণ

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
চীন-রাশিয়া সম্পর্কে বিশ্বস্ততার নতুন সমীকরণ
ভ্লাদিমির পুতিন ও সি চিনপিং। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

বর্তমানের পরিবর্তনশীল এবং চরম ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতায় বিপর্যস্ত বিশ্বব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা ও ইতিবাচক গতিশীলতা আনার ক্ষেত্রে চীন ও রাশিয়ার মধ্যকার সর্বাত্মক কৌশলগত অংশীদারিত্ব এক অনন্য নোঙর হিসেবে কাজ করছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের চীন সফরকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে যে, এই সফর দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও উচ্চ স্তরে নিয়ে যাবে।

চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৬ সালটি দুই দেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এই বছর চীন-রাশিয়া কৌশলগত সমন্বয় অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠার ৩০তম বার্ষিকী এবং একই সাথে চীন-রাশিয়া সুপ্রতিবেশীসুলভ বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা চুক্তির ২৫তম বার্ষিকী উদযাপিত হচ্ছে। এই ঐতিহাসিক মাইলফলকগুলো দুই পরাশক্তির মধ্যকার সম্পর্কের পরিপক্কতা এবং স্থিতিস্থাপকতাকেই পুনর্ব্যক্ত করে।

এই সম্পর্কটি মূলত একে অপরের মূল স্বার্থ এবং প্রধান উদ্বেগের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধা, পারস্পরিক কল্যাণমুখী সহযোগিতা এবং নিজ নিজ জাতীয় পরিস্থিতি ও বৈশিষ্ট্যের সাথে মানানসই নিজস্ব উন্নয়ন পথ অনুসরণের স্বাধীনতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের দূরদর্শী কৌশলগত নির্দেশনায় চীন-রাশিয়া সম্পর্ক ক্রমাগত আরও উচ্চতর স্তরে অগ্রসর হচ্ছে এবং এর পরিধি ও মাত্রা আরও বিস্তৃত হচ্ছে, যা নতুন যুগে বড় দেশগুলোর মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক অনন্য মডেল বা আদর্শ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। মূলত ২০১৩ সাল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত দুই দেশের শীর্ষ নেতা দ্বিপাক্ষিক এবং বহুপাক্ষিক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে ৪০ বারেরও বেশি সময় মুখোমুখি বৈঠকে মিলিত হয়েছেন, যা তাদের গভীর রাজনৈতিক বিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ।

চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ‘সিনহুয়া’-তে প্রকাশিত এক বিশেষ সম্পাদকীয় ভাষ্যের তথ্যানুযায়ী, নতুন যুগের জন্য চীন-রাশিয়া ব্যাপক কৌশলগত সমন্বয় অংশীদারিত্ব ক্রমাগত শক্তিশালী এবং আরও বেশি বাস্তবসম্মত হয়ে উঠেছে, যা গভীরতর রাজনৈতিক পারস্পরিক বিশ্বাস, দীর্ঘস্থায়ী সুপ্রতিবেশীসুলভ বন্ধুত্ব এবং একাধিক ক্ষেত্রে ব্যবহারিক সহযোগিতার দ্বারা দৃঢ়ভাবে সমর্থিত। দুই দেশের সরকারের সমস্ত স্তরের মন্ত্রণালয় এবং সংস্থাগুলোর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সংলাপ প্রক্রিয়া ক্রমাগত ফলপ্রসূ ফলাফল প্রদান করে চলেছে এবং একে অপরের উন্নয়নমূলক স্বার্থে পারস্পরিক সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।

বিশেষ করে জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদী এবং টেকসই সহযোগিতা আজ চীন-রাশিয়া সম্পর্কের অন্যতম প্রধান ভিত্তি বা চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে, যা মজবুত অর্থনৈতিক কাঠামো এবং বড় বড় অবকাঠামোগত প্রকল্পের ধারাবাহিক অগ্রগতির মাধ্যমে ক্রমাগত এগিয়ে চলেছে। চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০২৫ সালে দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ২২৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা টানা তৃতীয় বছরের মতো ২০০ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করার এক অনন্য রেকর্ড। এই ধারাবাহিক অর্থনৈতিক লেনদেনের ফলে চীন টানা ১৬ বছর ধরে রাশিয়ার একক বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে, যা দুই দেশের অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরশীলতাকে প্রমাণ করে।

দ্বিপাক্ষিক কৌশলগত সমন্বয়ের পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যকার প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক বিনিময় জনগণের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও বন্ধুত্বকে আরও জোরদার করেছে। এই বছর থেকে শুরু হওয়া ‘চীন-রাশিয়া শিক্ষা বর্ষ’-এর অধীনে শত শত বৈচিত্র্যময় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে, যা সংস্কৃতি, ক্রীড়া এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের জন্য উৎসর্গীকৃত পূর্ববর্তী থিম বছরগুলোর ধারাবাহিক সফলতার ওপর ভিত্তি করে পরিকল্পনা করা হয়েছে।

এর বাইরে দুই দেশের মধ্যকার পারস্পরিক ভিসা-মুক্ত নীতি সাধারণ মানুষের যাতায়াত এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানকে উল্লেখযোগ্যভাবে সহজতর করেছে। অ্যাসোসিয়েশন অফ ট্যুর অপারেটরস অফ রাশিয়া-এর তথ্য অনুসারে, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে বা প্রথম তিন মাসেই ১ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি চীনা পর্যটক রাশিয়া সফর করেছেন, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৪.৪ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে ২০২৫ সালে রাশিয়ান নাগরিকদের চীন সফরের হারও ৩৩.৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দুই দেশের সামাজিক ও পর্যটন খাতের এক অভূতপূর্ব জাগরণকে নির্দেশ করে। সম্প্রতি উত্তর-পূর্ব চীনের হেইলুংচিয়াং প্রদেশের হারবিনে ১০ম চীন-রাশিয়া এক্সপো জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে এবং চীনের হাইনান প্রদেশে ৬ষ্ঠ চীন আন্তর্জাতিক ভোক্তা পণ্য প্রদর্শনীতে রাশিয়ার ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প প্রদর্শন করা হয়েছে, যা এই গভীর বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনেরই জীবন্ত উদাহরণ।

তবে এই দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার পরিধি কেবল নিজেদের সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং গ্লোবাল সাউথ বা উদীয়মান অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর কণ্ঠস্বরকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে জোরালো করতে এবং একটি বহুমুখী বা মাল্টিপোলার আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা প্রচারের ক্ষেত্রে চীন ও রাশিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বর্তমান বিশ্ব আজ গভীর রূপান্তর এবং ক্রমবর্ধমান অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা চরম চাপের সম্মুখীন হয়েছে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠিত নিয়ম ও নীতিগুলো ক্রমাগত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে, ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত তীব্রতর হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক ধরণের ‘জঙ্গলের আইন’ বা জোর যার মুল্লুক তার– এমন নীতিতে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।

এই সংকটময় বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে চীন ও রাশিয়ার মধ্যকার কৌশলগত সমন্বয় বৈশ্বিক কৌশলগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে, বহুপাক্ষিকতাকে সমুন্নত রাখতে এবং আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার রক্ষা করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখছে। চীন এবং রাশিয়া বিশ্বব্যাপী যৌথ প্রচেষ্টাকে একত্রিত করে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ন্যায্যতা ও ন্যায়বিচার বজায় রাখতে কাজ করছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ী ফলাফলগুলোকে রক্ষা করছে এবং জাতিসংঘ-কেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক রীতিনীতিগুলোকে সুরক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তা এবং অস্থিতিশীল ল্যান্ডস্কেপের প্রতিক্রিয়া হিসেবে বেইজিং এবং মস্কোর উচিত তাদের বহুপাক্ষিক সমন্বয়কে আরও বেশি শক্তিশালী করা, বহুপাক্ষিকতার প্রকৃত চর্চা করা এবং জাতিসংঘের কর্তৃত্ব ও জীবনীশক্তিকে পুনরুজ্জীবিত করতে একসঙ্গে কাজ করা। একই সাথে তাদের সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (এসসিও) এবং ব্রিকস-এর মতো শক্তিশালী আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম ও কাঠামোগুলোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় ও সহযোগিতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি, যাতে আন্তর্জাতিক শাসন ব্যবস্থাকে আরও বেশি ন্যায়সংগত ও সমতার দিকে পরিচালিত করা সম্ভব হয়।

যেহেতু বর্তমান পৃথিবী এক গভীর ও মৌলিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তাই চীন-রাশিয়া সম্পর্কের এই অবিচ্ছিন্ন স্থিতিস্থাপকতা ও স্থায়িত্ব কেবল দ্বিপাক্ষিক স্তরের উর্ধ্বে গিয়ে সমগ্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। তাদের এই সর্বাত্মক সহযোগিতা বিশ্ববাসীকে দেখায় যে, বড় দেশগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক কোনো সামরিক ব্লকের সংঘাত বা ‘জিরো-সাম গেম’ বা একজনের জয়ে অন্য জনের পরাজয়ের বৈরিতার উর্ধ্বে উঠেও পরিচালনা করা সম্ভব। বরং এর পরিবর্তে তা বহুমুখিতা, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গণতান্ত্রিকীকরণ এবং এই দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে আরও বেশি স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণে অবদান রাখতে পারে, যা একটি শান্তিময় বিশ্ব গড়ার অন্যতম পূর্বশর্ত।

সম্পর্কিত