আল হেলাল শুভ

প্রতি বছর বাজেট ঘোষণার পর সাধারণ মানুষের মনে যে প্রশ্নটি আগে আসে তা হলো, কোন জিনিসের দাম বাড়ল আর কমল? আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের কতটা সামঞ্জস্য থাকবে? এবারও তার ব্যতিক্রম নয়।
গতকাল বৃহস্পতিবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে চাল, গম, ডাল, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, চিনি, ভোজ্যতেল, মাছ, মাংস ও কৃষিপণ্যসহ প্রায় ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর উৎসে কর কমানোর প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। বর্তমানে বিভিন্ন পণ্যে ১, ২ ও ৫ শতাংশ হারে বিদ্যমান উৎসে কর কমিয়ে ০ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
বাজেটে মসলা আমদানির ওপর আরোপিত ৫ শতাংশ রেগুলেটরি ডিউটি প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। একই ধরনের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে খেজুর আমদানিতেও। এ ছাড়া শিশুখাদ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামাল আমদানির শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
সরকারের আশা, এসব পদক্ষেপ বাজারে সরবরাহ ব্যয় কমাতে এবং নিত্যপণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হবে।
বাজেট পেশের পর নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষদের সঙ্গে কথা বলেছে চরচা, তাদের জন্য বাজেট খুব একটা স্বস্তি নিয়ে আসেনি। সাধারণ মানুষ এও মনে করে, বাজেট সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর না হওয়ায় যে সকল পণ্যের দাম কমেছে তার সুবিধা তারা পাবে না। যদিও দাম বাড়ার প্রস্তাবগুলো উত্থাপনের সঙ্গে সঙ্গেই বাজারে তার প্রভাব পড়ে।
প্রস্তাবিত বাজেটে ভ্যাট ও কর কাঠামোতে কিছু উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। ব্যক্তি থেকে শুরু করে পণ্য ও সেবা খাতের নানা পর্যায়ে কর, শুল্ক ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ইত্যাদির নতুন সমন্বয় করা হয়েছে। কিন্তু খুচরা সরবরাহ পর্যায়ে হাজারে দুই টাকা কর আরোপের বড় প্রভাব পড়তে পারে। এই ধাপে করারোপের কারণে বাজারে নতুন করে মূল্যচাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে।
নতুন জাতীয় বাজেট ঘোষণার পর সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—সংসার চালানোর খরচ কতটা বাড়বে? সরকারের পক্ষ থেকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু পণ্যে কর কমানোর কথা বলা হলেও বাজারে বিদ্যমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ের চাপ এবং বিভিন্ন পরোক্ষ করের প্রভাব সাধারণ মানুষের ব্যয় কমাবে না বলে মনে করছেন তারা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সবশেষ তথ্য বলছে, মে মাসে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ হয়েছে। সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে।
অর্থাৎ, গত বছর মে মাসে যে পণ্য বা সেবা কিনতে ১০ হাজার টাকা লাগত, এখন একই পণ্য কিনতে তাদের ১০ হাজার ৯৪২ টাকার মতো খরচ করতে হচ্ছে।
এ অবস্থায় সরকার উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে নতুন অর্থবছরে ৭.৫ শতাংশের মধ্যে আটকে রাখার পরিকল্পনা করেছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এই লক্ষ্য অর্জনে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপের তাগিদ দিয়েছে।
ঢাকার রামপুরার একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন সালমা সুলতানা। চরচাকে তিনি বলেন, “বাজেট তো এ দেশে আসেই নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়তে। সাধারণ মানুষের এমন ধারণা তো আর এমনি এমনি হয়নি। এমন এমন জিনিসের দাম কমায়, যা আমরা সাধারণ মানুষ কিনি কম।”
১০ হাজারে কত খরচ বাড়ল জানতে চাইলে সালমা সুলতানা বলেন, “বর্তমান ১০ হাজার টাকায় সব কিছু হয় না। তারপরও এই টাকা যাদের বেতন, তারা হিমশিম খায়, খাদ্য দ্রব্য ও সন্তানের শিক্ষার খরচ দিতে। এমন অবস্থায় আমাদের মতো সাধারণ মানুষ বাজেট এলে খুশির কিছুই থাকে না।” তিনি সরকারি ও বেসরকারি কর্মচারীদের বেতনে একটি সামঞ্জস্য আনার দাবি জানান।
কোন খাতে চাপ বেশি?
নিম্ন বিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষরা বলছেন, তাদের মোট আয়ের একটি বড় অংশ চলে যায় খাদ্যপণ্য কিনতে। এ ছাড়া শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয়ও বেড়েছে।
পরিবহন খরচের কথাও বলছেন অনেকে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি বাজারে পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়িয়ে দেয়, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই পড়ে। সাধারণ অনেকেই মনে করেন, সরকার যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কর কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে এবং কিছু খাদ্যপণ্যে করছাড়ের উদ্যোগ নিয়েছে তার সুবিধা বাজারে পুরোপুরি পৌঁছাতে সময় লাগতে পারে।
বাজারে করছাড়ের প্রভাব নিয়ে তদারকি প্রসঙ্গে ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আব্দুস সালাম বলেন, “এটা এনবিআর এর বিষয়। এ বিষয়ে তারা ভালো বলতে পারবেন।”
ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন সাব্বির হোসেন। তিনি জানান, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে তার খরচ বেড়েছে। কারণ তিনি মোটরসাইকেলের ওপর নির্ভর করেন। এ ছাড়া খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে আগের চেয়ে অনেক পণ্যের খরচ বাড়তি বলে তিনি জানান।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের গুরুত্ব বিবেচনায় এ খাতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এ মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে মোট ১৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই খাতে বরাদ্দ ছিল ১৬ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা। তবুও আশা রাখতে পারছেন না অনেকে।
ঢাকার আদাবরে এক বাড়িতে নাইট গার্ডের কাজ করেন মকলেসুর রহমান। তিনি চরচাকে জানান, তার মাসিক বেতন ১১ হাজার টাকা। যদিও তার থাকার ভাড়া লাগে না। তিনি বলেন, ‘‘জিনিস পত্রের মধ্যে খাবার খরচ সবচেয়ে বেড়েছে। এ ছাড়া মোবাইল ফোনের খরচও বাড়ছে। আগে তরি-তরকারি কেনা ৩ হাজার টাকার মধ্যে হয়ে যেত। কিন্তু এখন সেইটা ৬ মাস ধরে ৪ হাজার টাকায়ও হচ্ছে না।”
রিকশাচালক মুকুল মতিঝিল-গুলিস্তান এলাকায় রিকশা চালান। তিনি চরচাকে তার খরচের একটি ধারণা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘‘একজনের ঢাকায় থাকতে দিনে কম করে হলে ৪০০ টাকা লাগে।’ সে হিসেবে জনপ্রতি মাসে ১২ হাজার টাকা লাগার কথা। তিনি বলেন, ‘‘৬ মাস আগেও চাল, ডাল, তেল ৪ হাজার টাকা লাগলেও এখন সাড়ে ৪ হাজার টাকা পার হয়ে যায়। এ ছাড়া তরিতরকারি এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল মিলে খাবার খরচই লাগে একটি পরিবারের আট থেকে ৯ হাজার টাকা।” তিনি জানান, ১০ হাজার টাকায় তার হয় না। খাদ্য ও বাচ্চাদের পড়াশোনা বাবদই প্রায় সব টাকা চলে যায় তার।
আশরাফুল ইসলাম ঢাকার শেরে বাংলা নগর এলাকায় রিকশা চালান। আশরাফুল চরচাকে জানান, তার বাড়িতে সদস্য ৫ জন। এর মধ্যে আয় করেন ২ জন।
খরচ বাড়ছে না কমছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘খরচ বাড়ছে। কোনটার খরচ ছেড়ে কোনটা বলমু? সব কিছুই তো বাড়ছে। তবে আমার খাবার ও ওষুধের খরচ বেশি মনে হয়। ওষুধের খরচ কিছু টাকা কমানো যাইতে পারে। সরকারের এখানে নজর দিলে ভাল হইতো।”
বাজারের কী অবস্থা
রাজধানীর বাজারগুলোতে বাজেট ঘোষণার আগেই বেশির ভাগ নিত্যপণ্যের দাম বাড়তি। তাদের অভিযোগ, কর কমানো হলেও তার সুফল দ্রুত বাজারে আসে না; কিন্তু ব্যয় বাড়ানোর প্রভাব দ্রুত দেখা যায়। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, আয় বাড়ছে না কিন্তু ব্যয় নিয়মিত বাড়ছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো খাদ্য, বাসাভাড়া, শিক্ষা এবং চিকিৎসা ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে।
একজন বেসরকারি চাকরিজীবী খুরশিদা হক বলেন, ‘‘বেতন বাড়ে বছরে একবার, কিন্তু বাজার (সংশ্লিষ্ট ব্যয়) বাড়ে প্রায় প্রতি মাসে। বাজেটের পরে যদি আরও ৭০০-৮০০ টাকা খরচ বাড়ে, তাহলে সংসার চালানো আরও কঠিন হবে।”
রাজধানীর মনসুরাবাদে চা বিক্রেতা সাইদুর রহমান বলেন, “আমার মেয়ের পড়ার খরচ ২ হাজার, ছেলের ১ হাজার। খাবার খরচের মধ্যে ১ বছর আগে একজনের ৪ হাজার টাকায় চলে গেলেও এখন একজনের ৫ হাজার টাকা লাগে। সে হিসেবে পরিবারে ৪ সদস্যদের মাসে ১৫ হাজার টাকা খাবার খরচ লাগে। চা দোকানে এখন আর লাভ নেই। গ্যাসের খরচ বাড়ছে। তাই দোকানদারি ছাড়াও গ্রাম থেকে আরও টাকা আনা লাগে।”

প্রতি বছর বাজেট ঘোষণার পর সাধারণ মানুষের মনে যে প্রশ্নটি আগে আসে তা হলো, কোন জিনিসের দাম বাড়ল আর কমল? আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের কতটা সামঞ্জস্য থাকবে? এবারও তার ব্যতিক্রম নয়।
গতকাল বৃহস্পতিবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে চাল, গম, ডাল, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, চিনি, ভোজ্যতেল, মাছ, মাংস ও কৃষিপণ্যসহ প্রায় ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর উৎসে কর কমানোর প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। বর্তমানে বিভিন্ন পণ্যে ১, ২ ও ৫ শতাংশ হারে বিদ্যমান উৎসে কর কমিয়ে ০ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
বাজেটে মসলা আমদানির ওপর আরোপিত ৫ শতাংশ রেগুলেটরি ডিউটি প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। একই ধরনের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে খেজুর আমদানিতেও। এ ছাড়া শিশুখাদ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামাল আমদানির শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
সরকারের আশা, এসব পদক্ষেপ বাজারে সরবরাহ ব্যয় কমাতে এবং নিত্যপণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হবে।
বাজেট পেশের পর নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষদের সঙ্গে কথা বলেছে চরচা, তাদের জন্য বাজেট খুব একটা স্বস্তি নিয়ে আসেনি। সাধারণ মানুষ এও মনে করে, বাজেট সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর না হওয়ায় যে সকল পণ্যের দাম কমেছে তার সুবিধা তারা পাবে না। যদিও দাম বাড়ার প্রস্তাবগুলো উত্থাপনের সঙ্গে সঙ্গেই বাজারে তার প্রভাব পড়ে।
প্রস্তাবিত বাজেটে ভ্যাট ও কর কাঠামোতে কিছু উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। ব্যক্তি থেকে শুরু করে পণ্য ও সেবা খাতের নানা পর্যায়ে কর, শুল্ক ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ইত্যাদির নতুন সমন্বয় করা হয়েছে। কিন্তু খুচরা সরবরাহ পর্যায়ে হাজারে দুই টাকা কর আরোপের বড় প্রভাব পড়তে পারে। এই ধাপে করারোপের কারণে বাজারে নতুন করে মূল্যচাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে।
নতুন জাতীয় বাজেট ঘোষণার পর সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—সংসার চালানোর খরচ কতটা বাড়বে? সরকারের পক্ষ থেকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু পণ্যে কর কমানোর কথা বলা হলেও বাজারে বিদ্যমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ের চাপ এবং বিভিন্ন পরোক্ষ করের প্রভাব সাধারণ মানুষের ব্যয় কমাবে না বলে মনে করছেন তারা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সবশেষ তথ্য বলছে, মে মাসে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ হয়েছে। সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে।
অর্থাৎ, গত বছর মে মাসে যে পণ্য বা সেবা কিনতে ১০ হাজার টাকা লাগত, এখন একই পণ্য কিনতে তাদের ১০ হাজার ৯৪২ টাকার মতো খরচ করতে হচ্ছে।
এ অবস্থায় সরকার উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে নতুন অর্থবছরে ৭.৫ শতাংশের মধ্যে আটকে রাখার পরিকল্পনা করেছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এই লক্ষ্য অর্জনে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপের তাগিদ দিয়েছে।
ঢাকার রামপুরার একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন সালমা সুলতানা। চরচাকে তিনি বলেন, “বাজেট তো এ দেশে আসেই নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়তে। সাধারণ মানুষের এমন ধারণা তো আর এমনি এমনি হয়নি। এমন এমন জিনিসের দাম কমায়, যা আমরা সাধারণ মানুষ কিনি কম।”
১০ হাজারে কত খরচ বাড়ল জানতে চাইলে সালমা সুলতানা বলেন, “বর্তমান ১০ হাজার টাকায় সব কিছু হয় না। তারপরও এই টাকা যাদের বেতন, তারা হিমশিম খায়, খাদ্য দ্রব্য ও সন্তানের শিক্ষার খরচ দিতে। এমন অবস্থায় আমাদের মতো সাধারণ মানুষ বাজেট এলে খুশির কিছুই থাকে না।” তিনি সরকারি ও বেসরকারি কর্মচারীদের বেতনে একটি সামঞ্জস্য আনার দাবি জানান।
কোন খাতে চাপ বেশি?
নিম্ন বিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষরা বলছেন, তাদের মোট আয়ের একটি বড় অংশ চলে যায় খাদ্যপণ্য কিনতে। এ ছাড়া শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয়ও বেড়েছে।
পরিবহন খরচের কথাও বলছেন অনেকে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি বাজারে পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়িয়ে দেয়, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই পড়ে। সাধারণ অনেকেই মনে করেন, সরকার যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কর কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে এবং কিছু খাদ্যপণ্যে করছাড়ের উদ্যোগ নিয়েছে তার সুবিধা বাজারে পুরোপুরি পৌঁছাতে সময় লাগতে পারে।
বাজারে করছাড়ের প্রভাব নিয়ে তদারকি প্রসঙ্গে ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আব্দুস সালাম বলেন, “এটা এনবিআর এর বিষয়। এ বিষয়ে তারা ভালো বলতে পারবেন।”
ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন সাব্বির হোসেন। তিনি জানান, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে তার খরচ বেড়েছে। কারণ তিনি মোটরসাইকেলের ওপর নির্ভর করেন। এ ছাড়া খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে আগের চেয়ে অনেক পণ্যের খরচ বাড়তি বলে তিনি জানান।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের গুরুত্ব বিবেচনায় এ খাতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এ মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে মোট ১৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই খাতে বরাদ্দ ছিল ১৬ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা। তবুও আশা রাখতে পারছেন না অনেকে।
ঢাকার আদাবরে এক বাড়িতে নাইট গার্ডের কাজ করেন মকলেসুর রহমান। তিনি চরচাকে জানান, তার মাসিক বেতন ১১ হাজার টাকা। যদিও তার থাকার ভাড়া লাগে না। তিনি বলেন, ‘‘জিনিস পত্রের মধ্যে খাবার খরচ সবচেয়ে বেড়েছে। এ ছাড়া মোবাইল ফোনের খরচও বাড়ছে। আগে তরি-তরকারি কেনা ৩ হাজার টাকার মধ্যে হয়ে যেত। কিন্তু এখন সেইটা ৬ মাস ধরে ৪ হাজার টাকায়ও হচ্ছে না।”
রিকশাচালক মুকুল মতিঝিল-গুলিস্তান এলাকায় রিকশা চালান। তিনি চরচাকে তার খরচের একটি ধারণা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘‘একজনের ঢাকায় থাকতে দিনে কম করে হলে ৪০০ টাকা লাগে।’ সে হিসেবে জনপ্রতি মাসে ১২ হাজার টাকা লাগার কথা। তিনি বলেন, ‘‘৬ মাস আগেও চাল, ডাল, তেল ৪ হাজার টাকা লাগলেও এখন সাড়ে ৪ হাজার টাকা পার হয়ে যায়। এ ছাড়া তরিতরকারি এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল মিলে খাবার খরচই লাগে একটি পরিবারের আট থেকে ৯ হাজার টাকা।” তিনি জানান, ১০ হাজার টাকায় তার হয় না। খাদ্য ও বাচ্চাদের পড়াশোনা বাবদই প্রায় সব টাকা চলে যায় তার।
আশরাফুল ইসলাম ঢাকার শেরে বাংলা নগর এলাকায় রিকশা চালান। আশরাফুল চরচাকে জানান, তার বাড়িতে সদস্য ৫ জন। এর মধ্যে আয় করেন ২ জন।
খরচ বাড়ছে না কমছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘খরচ বাড়ছে। কোনটার খরচ ছেড়ে কোনটা বলমু? সব কিছুই তো বাড়ছে। তবে আমার খাবার ও ওষুধের খরচ বেশি মনে হয়। ওষুধের খরচ কিছু টাকা কমানো যাইতে পারে। সরকারের এখানে নজর দিলে ভাল হইতো।”
বাজারের কী অবস্থা
রাজধানীর বাজারগুলোতে বাজেট ঘোষণার আগেই বেশির ভাগ নিত্যপণ্যের দাম বাড়তি। তাদের অভিযোগ, কর কমানো হলেও তার সুফল দ্রুত বাজারে আসে না; কিন্তু ব্যয় বাড়ানোর প্রভাব দ্রুত দেখা যায়। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, আয় বাড়ছে না কিন্তু ব্যয় নিয়মিত বাড়ছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো খাদ্য, বাসাভাড়া, শিক্ষা এবং চিকিৎসা ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে।
একজন বেসরকারি চাকরিজীবী খুরশিদা হক বলেন, ‘‘বেতন বাড়ে বছরে একবার, কিন্তু বাজার (সংশ্লিষ্ট ব্যয়) বাড়ে প্রায় প্রতি মাসে। বাজেটের পরে যদি আরও ৭০০-৮০০ টাকা খরচ বাড়ে, তাহলে সংসার চালানো আরও কঠিন হবে।”
রাজধানীর মনসুরাবাদে চা বিক্রেতা সাইদুর রহমান বলেন, “আমার মেয়ের পড়ার খরচ ২ হাজার, ছেলের ১ হাজার। খাবার খরচের মধ্যে ১ বছর আগে একজনের ৪ হাজার টাকায় চলে গেলেও এখন একজনের ৫ হাজার টাকা লাগে। সে হিসেবে পরিবারে ৪ সদস্যদের মাসে ১৫ হাজার টাকা খাবার খরচ লাগে। চা দোকানে এখন আর লাভ নেই। গ্যাসের খরচ বাড়ছে। তাই দোকানদারি ছাড়াও গ্রাম থেকে আরও টাকা আনা লাগে।”