সামদানী হক নাজুম

শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন হত্যায় আরেক সন্ত্রাসী এনামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলালের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। টিটনের বড় ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপনের করা মামলায়ও সে কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু চরচার অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভিন্ন তথ্য। টিটন হত্যায় জড়িত সন্দেহে শুধু পিচ্চি হেলাল নয়, বরং টিটনের ভগ্নিপতি সাজেদুল ইসলাম ইমন ওরফে ক্যাপ্টেন ইমনসহ আরও বেশ কিছু নাম উঠে এসেছে।
গত ২৮ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টা ৫৪ মিনিটে রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহনেওয়াজ হলের সামনের বটতলায় চায়ের দোকানের পাশে হত্যা করা হয় টিটনকে। আততায়ী খুব কাছ থেকে টিটনকে লক্ষ্য করে সাতটি গুলি চালায়। এর মধ্যে একটি বুলেট টিটনের মাথার ডান পাশে, একটি বাম চোখের ভ্রুতে, দুটি পিঠে, বাকি তিনটির দুটি বাম হাতে এবং পাঁজরে বিদ্ধ হয়। মাত্র এক মিনিটের এই কিলিং মিশন শেষে সহযোগীসহ মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায় হত্যাকারী।
পরদিন নিউমার্কেট থানায় হত্যা মামলা করেন টিটনের বড় ভাই রিপন। মামলায় অজ্ঞাত ৮-৯ জনকে আসামি করা হয়। অভিযোগে বলা হয়, মোহম্মদপুরের বছিলা হাটের ইজারা নিয়ে টিটনের সঙ্গে বিরোধ চলছিল শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলালের। হেলালের সঙ্গে বাদল, শাজাহান ও রনি নামের আরও তিন ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়। বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ডেকে টিটনকে হত্যা করা হয় বলে মামলায় উল্লেখ করেন রিপন। কিন্তু চরচার অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভিন্ন তথ্য।
বছিলা পশুর হাটের ইজারা নিয়ে টিটনের সঙ্গে পিচ্চি হেলালের নয়, বরং ক্যাপ্টেন ইমনের সঙ্গে বিরোধ চলছিল। আর এই দুই গ্রুপের বিরোধের বলি হন টিটন। মূলত কোরবানির ঈদ সামনে রেখে বছিলা হাটের একক নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া ছিলেন ইমন। হাটের ইজারা নিশ্চিত করতে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছিলেন এই শীর্ষ সন্ত্রাসী। তার মাঝে পিচ্চি হেলাল এবং টিটন সমর্থিত এক ঠিকাদার হাটের শিডিউল কিনলে দুই গ্রুপের পুরনো বিরোধ নতুন মাত্রা পায়। এর কয়েক দিনের মধ্যেই খুন হন টিটন।
হাটের দরপত্র কার্যক্রমে কোন কোন প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়, তার খোঁজ নেয় চরচা। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) সবগুলো হাটের টেন্ডার শিডিউল কেনা প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকায় দেখা যায়, একমাত্র বছিলা পশুর হাটেই সবচেয়ে কমসংখ্যক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। টেন্ডারের শিডিউল কেনা চারটি প্রতিষ্ঠান হলো–‘রক্তাক্ত বিজয়’, ‘মেসার্স রনি এন্টারপ্রাইজ’, ‘আর ইসলাম মাচেন্ট্রী এন্ড কোং’ এবং ‘মেসার্স তালুকদার ট্রেডার্স’।
‘রক্তাক্ত বিজয়’ প্রতিষ্ঠানটির মালিক গোলাম মহিউদ্দিন ফারুক। তার ঠিকানা–বাড়ী ৬৭৩, রোড ১৩, বায়তুল আমান হাউজিং সোসাইটি, আদাবর। রনি এন্টারপ্রাইজের মালিকের নাম উল্লেখ না থাকলেও মালিকের বাবার নাম–মৃত আব্দুল হক; ঠিকানা–তালুকদার ভিলা, ১২৫/এ পশ্চিম ধানমন্ডি, শংকর, জাফরাবাদ, মোহম্মদপুর। ‘আর ইসলাম মাচেন্ট্রী এন্ড কোং’-এর মালিক মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন। তার ঠিকানা–১/২, রোড ৩, মোহাম্মদীয়া হাউজিং লিমিটেড, মোহাম্মদপুর। তালুকদার ট্রেডার্সের মালিক মো. রোকনুজ্জামান তালুকদার, ঠিকানা-৩০০/এ, পীরেরবাগ, মিরপুর।
রনি এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. রনি পশ্চিম ধানমন্ডি এলাকায় ‘ভাঙ্গারি রনি’ নামে পরিচিত, যাকে টিনন হত্যা মামলার অভিযোগে আসামি হিসেবে দেখানো হয়েছে। টিটন হত্যা মামলা দায়েরের পর থেকে রনির ফোন বন্ধ।
রক্তাক্ত বিজয়ের গোলাম মহিউদ্দিন ফারুকের খোঁজ পাওয়া যায়নি। তবে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি মোহাম্মদ জানান, ফারুক তার ‘স্থানীয় বড় ভাই’। নানা সময়ে ফারুকের ঠিকাদারি লাইসেন্স ব্যবহার করে বিভিন্ন টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশ নেন তারা। এরই ধারাবাহিকতায় বছিলা পশুর হাটের শিডিউল কেনা হয়। তবে ৪০ হাজার টাকা খরচ করে শিডিউল কিনলেও ‘আর্থিক সংকটের’ কারণে তা জমা দেওয়া হয়নি।
মোহাম্মদ বলেন, “উত্তর সিটি করপোরেশন থেকে এবার হাটের মূল্য নির্ধারণ করা হয় ১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। নিয়ম অনুযায়ী, এই দরের চেয়ে বেশি আমাদের রেট দেওয়া লাগত। শিডিউল ড্রপ করার সময় আমরা যে দর দিতাম, তার ৩০ পার্সেন্ট এবং ভ্যাট ট্যাক্সসহ অগ্রিম জমা দিতে হতো। আমরা হিসাব করে দেখলাম, এটা অনেক বড় অ্যামাউন্ট। এটা আমরা ম্যানেজ করতে পারিনি। শুনেছি, গত বছর এই হাটের ঠিকাদার বড় ধরনের লস করেছেন। সব দিক ভেবে ৪০ হাজার টাকা ক্ষতি হলেও আমরা বছিলা হাটের শিডিউল ড্রপ করিনি।”
শিডিউল জমা না দিতে কেউ চাপ দিয়েছিল কি না, জানতে চাইলে মোহাম্মদ বলেন, “তাদের ওপর কারও চাপ ছিল না।”
‘ইসলাম মাচেন্ট্রী এন্ড কোং’-এর মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেনও বছিলা হাটের শিডিউল কিনে তা জমা দেননি। চরচাকে তিনি বলেন, “শিডিউল কিনেছিলেম। তবে ইচ্ছে হয়নি, তাই শিডিউল জমা দিইনি।”
তালুকদার ট্রেডার্সের মালিক রোকনুজ্জামানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সংস্থার সদস্য এই ভয়েস মেসেজের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। ওই মেসেজ বিদেশে অবস্থানরত ক্যাপ্টেন ইমনেরই–বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে টিটন হত্যা মামলার তদন্তে এই অডিও-কে গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে আমলে নিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
রনি এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. রনি পশ্চিম ধানমন্ডি এলাকায় ‘ভাঙ্গারি রনি’ নামে পরিচিত, যাকে টিনন হত্যা মামলার অভিযোগে আসামি হিসেবে দেখানো হয়েছে। টিটন হত্যা মামলা দায়েরের পর থেকে রনির ফোন বন্ধ।
এদিকে, টিটন হত্যার কিছু দিন আগে বছিলা হাটের নিয়ন্ত্রণ পেতে নিজের সহযোগীদের ভয়েস মেসেজের মাধ্যমে নির্দেশনা দেন ক্যাপ্টেন ইমন। টিটন হত্যার পর এই ভয়েস মেসেজটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয় প্রতিপক্ষের সদস্যরা। মেসেজে ইমন তার সহযোগীদের উদ্দেশে বলেন, “রনির সঙ্গে তুমি আদর করে বুঝিয়ে কথা বলে রনিকে আমাদের পক্ষে নিয়ে আসো। পাপ্পু রনির সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছে, তাহলে মোহম্মদপুর (বছিলা) হাটটা একচেটিয়া নেওয়া যাবে। আর রাজেশ নবীরে দিয়ে ফোন করাইলে মিল্টনরা এমনি চলে আসবে।”

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সংস্থার সদস্য এই ভয়েস মেসেজের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। ওই মেসেজ বিদেশে অবস্থানরত ক্যাপ্টেন ইমনেরই–বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে টিটন হত্যা মামলার তদন্তে এই অডিও-কে গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে আমলে নিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
বছিলা হাটের ইজারা নিয়ে দ্বন্দ্ব সম্পর্কে জানতে চাইলে ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে চরচাকে বলেন, “গত বছরও বছিলা হাটের নিয়ন্ত্রণ ছিল ইমনের কাছেই। এবারও হাটের নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া তিনি। ইজারা নিশ্চিত করতে কৌশল এবং জালিয়াতির আশ্রয় নেন ইমন। এজন্য নিজের লোকেদের মাধ্যমে তিনটি শিডিউল কিনিয়েও সেগুলো জমা দেয়নি। তার উদ্দেশ্য ছিল, উন্মুক্ত দরপত্রের নিয়ম অনুযায়ী, প্রথম দরপত্রের আহ্বানে কোনো ঠিকাদার সাড়া না দিলে পরে আবারও দরপত্র আহ্বান করবে সিটি করপোরেশন। প্রথমবারে যেহেতু কেউ সাড়া দেয়নি, তাই দ্বিতীয়বারের শিডিউলেও তেমন সাড়া মিলবে না। মিললেও নিজের প্রভাব খাটিয়ে তা প্রতিরোধ করবে ইমন। এর পর বাধ্য হয়ে ডিএনসিসি যেকোনো একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বছিলা হাটের বরাদ্দ দেবে।”
ওই কর্মকর্তা জানান, সেই সুযোগ নিয়ে প্রশাসককে তদবির করে হাটের ইজারা নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল ইমনের। তার লোকজন পরিকল্পনামাফিক তিনটি আলাদা প্রতিষ্ঠানের নামে শিডিউল কেনে। অন্য সাধারণ ঠিকাদাররা যেহেতু জানে যে, ইমন এই হাটের ইজারা নিচ্ছেন, তাই ঝুঁকি নিয়ে কেউ টেন্ডারে অংশ নেয়নি। তাছাড়া গতবারের হাটের ইজারা নেওয়ার পর ইমনের লোকেরা বাজারে ছড়িয়ে দেয় এই হাটের টাকা ওঠানো সম্ভব নয়, দর অনেক বেশি; ইজারা নিলে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে–সব মিলিয়ে সাধারণ ঠিকাদাররা এই হাটের প্রতি কোনো আগ্রহ দেখাননি।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, শুধু ইমনের ঠিক করে দেওয়া তিনটি প্রতিষ্ঠান হাটের শিডিউল কিনে জমা না দেওয়ার কথা ছিল। তবে মাঝে বাধা হিসেবে উদয় হয় রনি এন্টারপ্রাইজ। পিচ্চি হেলাল ও টিটনের কথায় প্রতিষ্ঠানটির মালিক রনি ওরফে ভাঙ্গারি রনি বছিলা হাটের শিডিউল কেনে। বিপত্তি বাধে এখানেই।
এই ঘটনা পুরোটাই তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকে জেনেছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। এর সত্যতা নিশ্চিত করতে পারবে একমাত্র ভাঙ্গারি রনি।
ইমনের ভয়েস মেসেজের উদাহরণ টেনে ওই গোয়ন্দা কর্মকর্তা বলেন, “কথাগুলো যদি খেয়াল করেন, তাহলে তার পরিকল্পনা পরিষ্কার ধরতে পারবেন। ইমনের লোক পাপ্পু প্রথমে রনিকে শিডিউল ড্রপ করতে মানা করে। কিন্তু এ কথা জেনে হেলাল ও টিটন রনিকে তার অবস্থানে অনড় থাকতে বলে। তারপর পাপ্পু রনির সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করলে তা জেনে ইমন রনিকে ম্যানেজ করার জন্য তার ঘনিষ্ঠ এক সহযোগীকে দায়িত্ব দেন। কারণ, রনি একসময় ইমনের হয়েই কাজ করত। পরে তিনি হেলাল ও টিটনের গ্রুপে ভেড়েন। ইমনের পরিকল্পনা ছিল, দুটি দরের আহ্বানে কেউ সাড়া না দিলে তখন ৩৪ নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মো. মাসুম খান রাজেশের মাধ্যমে বিদেশ পলাতক ইন্টারপোলের রেড নোটিশভুক্ত আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী মোহাম্মদপুর এলাকার নবী হোসেনের সহযোগিতা নেবে। যেন নবী ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনকে অনুরোধ করে ইমনের মনোনীত প্রতিষ্ঠানটিকে কম দরে বছিলা হাটের ইজারা পাইয়ে দেয়। এতে করে দুটি লাভ। প্রথমত, অন্য কেউ হাটের ইজারা পেল না। আবার অনেক কম মূল্যে হাটের ইজারা ইমন পেয়ে যেত।”
ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, এই ঘটনা পুরোটাই তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকে জেনেছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। এর সত্যতা নিশ্চিত করতে পারবে একমাত্র ভাঙ্গারি রনি।
রনিকে এখনো হেফাজতে নেওয়া সম্ভব হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, “ও (রনি) হয়তো ভয়ে আত্মগোপনে আছে। আমরা তাকে খুঁজছি। এই হাটের ইস্যুতে যদি টিটনের সঙ্গে ইমন কিংবা হেলালের কোনো বাদানুবাদ হয়ে থাকে, তবে তা রনির কাছ থেকেই জানা যাবে।”
বাদীর ‘অসহযোগিতা’, অভিযোগে নাটকীয় তথ্য
শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটনের হত্যায় বছিলা পশুর হাটের দ্বন্দ্বের ঘটনাকে একমাত্র কারণ হিসেবে দেখছেন না তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, টিটনকে যারাই হত্যা করুক, তার নেপথ্যে আছে আরও বড় কারণ। অপরাধ জগতের বিভিন্ন গ্রুপের সঙ্গে নানামুখী পুরনো বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার, প্রতিশোধসহ প্রতিপক্ষকের ফাঁসানোর পাঁয়তারাও হত্যার নেপথ্য কারণ হিসেবে কাজ করতে পারে।
একাধিক বাহিনীর সদস্যদের মতে, পশুর হাটকে কেন্দ্র করে এই হত্যা হয়ে থাকলে, তা শুধুই ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহের কৌশল। সেক্ষেত্রে টিটনকে বলি দিয়ে প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর বিষয়টি তদন্তে বেশি গুরুত্ব পাবে। আবার মামলায় যেভাবে ঘটনা উপস্থাপন করা হয়েছে, তার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই বলে মনে করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ আলামত টিটনের ফোন হাতে পায়নি পুলিশ। টিটনের ভাইয়ের দাবি, টিটন ফোন ব্যবহার করতেন কি না, তা জানেন না তিনি। তার কাছে মামলার তদন্ত কর্মকর্তাসহ একাধিক সংস্থার গোয়েন্দারা ফোনটির তথ্য চাইলে তিনি জানান, টিটন নানা সময়ে অ্যাপের মাধ্যমে কথা বলতেন তার সঙ্গে। তার কোনো নির্দিষ্ট নম্বর ছিল না।
নিউমার্কেট থানার একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা চরচাকে বলেন, “মামলায় ঘটনার বর্ণনা যেভাবে সাজানো হয়েছে, তা খুব ড্রামাটিক। আমরা সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের সম্পর্কে যে তথ্য ও জ্ঞান রাখি, তাতে অন্য সব বাদ দিলেও এই ঘটনায় টিটন এবং ইমনের সম্পর্ক যে দা-কুমড়া, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাদী নিজে এই বিষয়ে অবগত থেকেও দুজনের সম্পর্ককে কল্পনাতীতভাবে ভালো উপস্থাপনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এটাও স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহের সৃষ্টি করে। এজন্য অভিযোগে অনেকের নাম উল্লেখ করলেও আমরা খুব সচেতনভাবেই মামলাটি গাইড করেছি, যেন ৩৬০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে-এর তদন্ত করে সঠিক অপরাধীকে চিহ্নিত করা যায়।”
বাদী তার অভিযোগে বলেন, বছিলা পশুর হাটের ইজারা নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে পিচ্চি হেলাল, বাদল, শাজাহান এবং রনি নামের ব্যক্তির সঙ্গে দ্বন্দ্ব চলছিল তার ভাইয়ের।
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের দাবি, এটিও মনগড়া তথ্য। কারণ, জেল থেকে বের হওয়ার পর থেকে পিচ্চি হেলাল ও টিটন একজোট হয়ে ইমনের বিরুদ্ধে কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। সম্প্রতি এই দুইজনের মধ্যে কোনো ধরনের দূরত্বের কথা শোনেনি কেউ।
তাছাড়া বাদী মামলা করতে নিউমার্কেট থানায় এলে তার সঙ্গে থাকা যুবকের উপস্থিতি এবং ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আছে পুলিশের। পুলিশের তথ্যমতে ওই যুবকের নাম সাইফুল। তিনি শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের বিশ্বস্ত লোক। ইমনের ‘ডান হাত’ এজাজের মৃত্যুর পর সাইফুলকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিয়োজিত রেখেছেন ইমন। মামলার দিন বাদীর সঙ্গে থেকে মামলা-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন তিনি। মামলা হওয়ার পর বাদীর সঙ্গে সংবাদমাধ্যমেও কথা বলেন সাইফুল। ইমনের কাছের লোক দিয়ে মামলার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করায় এটিকে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ এবং এর সঙ্গে ইমনের কোনো স্বার্থ থাকতে পারে বলে মনে করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে, তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ আলামত টিটনের ফোন হাতে পায়নি পুলিশ। টিটনের ভাইয়ের দাবি, টিটন ফোন ব্যবহার করতেন কি না, তা জানেন না তিনি। তার কাছে মামলার তদন্ত কর্মকর্তাসহ একাধিক সংস্থার গোয়েন্দারা ফোনটির তথ্য চাইলে তিনি জানান, টিটন নানা সময়ে অ্যাপের মাধ্যমে কথা বলতেন তার সঙ্গে। তার কোনো নির্দিষ্ট নম্বর ছিল না। বাদীর এই আচরণকে ‘অসহযোগিতামূলক’ উল্লেখ করে গোয়েন্দা বিভাগের এক কর্মকর্তা চরচাকে বলেন, “এই হত্যা মামলার রহস্য উন্মোচন করতে আমাদের বেগ পেতে হবে। তার জন্য মূল কারণ হলো বাদীর অসহযোগিতা। তিনি কারও প্ররোচনায় পড়েছেন।”
এদিকে মামলার বাদী খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপনের সঙ্গে কথা হয় চরচার। মামলায় তোলা অভিযোগের মতো একইভাবে ভাই হত্যায় পিচ্চি হেলালকে সন্দেহ করছেন তিনি। টিটনের মোবাইল ফোনটি কোথায় এবং সবশেষ কোন নম্বর ব্যবহার করতেন জানতে চাইলে রিপন বলেন, “আমার জানা নেই। ওর সঙ্গে আমার মাঝে মাঝে কথা হতো। কোনো কাজ লাগলে টিটনই আমাকে অ্যাপসের মাধ্যমে বিভিন্ন নম্বর থেকে ফোন দিত।”
ঘটনার পর থেকে ভগ্নিপতি ইমন কোনো যোগাযোগ করেছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, “নিয়মিতই যোগাযোগ রাখছেন, সব ধরনের সহযোগিতা করছে সে।”
ইমনের সঙ্গে টিটনের দূরত্ব ছিল কি না, জানতে চাইলে ‘তা সঠিক নয়’ বলে জানান রিপন। তিনি বলেন, “এগুলো বাজে কথা। লিমা হলো আমার ও টিটনের ছোট বোন। ইমন আমাদের বোন জামাই। আমি কখনো দেখিনি লিমা বা ইমনের সঙ্গে টিটনের কোনো বিরোধ ছিল। তারা সবসময় নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখত।”
দুই শুটারকে খুঁজছে পুলিশ
টিটন হত্যার দিনটি ছিল মঙ্গলবার। স্বাভাবিকভাবে সেদিন নিউমার্কেটের সাপ্তাহিক বন্ধ। যে জায়গায় টিটনের ওপর হামলা হয়, সেখানকার কাছাকাছি সিসি ক্যামেরা বলতে শুধু নিউমার্কেটের গেইটের ভেতরের ক্যামেরাগুলোই ছিল। কিন্তু গেইট বন্ধ থাকায় সেসব ক্যামেরায় কিছুই ধরা পড়েনি। তদন্ত সংশ্লষ্টদের হাতে আছে বিপরীত পাশে দূরের একটি ভবনের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ। তাতে শুধু ঘটনার আকস্মিকতা এবং দুই হামলাকারীর পালিয়ে যাওয়ার দৃশ্য ধারণ হয়েছে। সেই ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দুই শুটার সম্পর্কে ধারণা পেয়েছেন গোয়েন্দারা। এখন প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে একাধিক বাহিনী।
প্রযুক্তিগত অনুসন্ধান ও অপরাধী ডেটাবেজের তথ্য মিলিয়ে দুইজন শুটারকে চিহ্নিত করেছে গোয়ন্দারা। এদের একজন টিটনের ভগ্নিপতি শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের হয়ে কাজ করেন বলে নিশ্চিত হয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক গোয়ন্দা কর্মকর্তা বলেন, “শুটার খুবই প্রশিক্ষিত এবং দুই হাতে অস্ত্র চালাতে দক্ষ। নিজের পরিচয় আড়াল করতে প্রথমে হেলমেট পরে এলেও অপারেশন চালানোর সময় সে হেলমেট খুলে মাথায় ক্যাপ পরে; যেন টার্গেট মিস না হয়। টিটনের মৃত্যু নিশ্চিত করতেই একেবারে কাছে গিয়ে মাথায় গুলি করে সে। এরপর আবার পালিয়ে যাওয়ার সময় হেলমেট পরে। পালানোর সময় তারা মোহম্মদপুর বেড়িবাঁধের রাস্তা ব্যবহার করে। কারণ, সেদিকে সিসি ক্যামেরা কম।”
প্রযুক্তিগত অনুসন্ধান ও অপরাধী ডেটাবেজের তথ্য মিলিয়ে দুইজন শুটারকে চিহ্নিত করেছে গোয়ন্দারা। এদের একজন টিটনের ভগ্নিপতি শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের হয়ে কাজ করেন বলে নিশ্চিত হয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
ইমন-টিটন দ্বন্দ্বের নেপথ্যে
রাজধানীর মোহাম্মদপুর-ধানমন্ডি-পুরান ঢাকা এলাকার অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণ যাদের হাতে, তাদের মধ্যে অন্যতম সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের ভাই তোফায়েল আহমেদ জোসেফ, ইমন, টিটন, পিচ্চি হেলাল। এদের নিজেদের মধ্যে আধিপত্য নিয়ে দ্বন্দ্ব বেশ পুরনো।
অপরাধ জগতের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যকার বিরোধের বিষয়ে সুষ্পষ্ট ধারণা পেতে চরচা যোগাযোগ করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সদস্য এবং বিদেশ পলাতক কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর সাথে।
তাদের তথ্যমতে, যশোরের উদীয়মান ফুটবলার টিটন কিশোর বয়সেই অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। যশোরে থাকাকালীন টিটনের সঙ্গে তার ছোট ভাই টুটুলও অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকায় ১৯৯৬ সালে যশোর ছেড়ে টিটন ও টুটুল ঢাকার মোহম্মদপুরে চলে আসেন। সেখানেও অপরাধ জগতে যুক্ত থাকায় তাদের সঙ্গে পরিচয় হয় স্থানীয় সন্ত্রাসী ইমনের। তারা একজোট হয়ে অপরাধ চালাতে থাকে। মোহাম্মদপুরে থাকা অবস্থায় টিটনের ছোট বোন ইডেন কলেজের শিক্ষার্থী লিমার সঙ্গে প্রেম হয় ইমনের। নিজেদের সিদ্ধান্তে বিয়ে করেন তারা। বোনের সঙ্গে ইমনের সম্পর্ক শুরুতে মেনে নিতে পারেননি টিটন। যদিও পরে ইমনের সঙ্গে টিটনের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। ১৯৯৯ সালের ১৩ মার্চ মোহাম্মদপুরের নিয়ন্ত্রণ নিতে সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের আরেক ভাই সাইদ আহমেদ টিপুকে খিলক্ষেত এলাকায় চলন্ত গাড়িতে গুলি করে হত্যা করেন ইমন-টিটনসহ তাদের সহযোগীরা। এই ঘটনায় মামলা হলে টিটন ও টুটুল যশোরে পালিয়ে যান। কয়েক মাস পর যশোরের কারবালা এলাকায় বিএনপির দুই কর্মীকে গুলি করে হত্যা করেন টিটন-টুটুল। ২০০০ সালে র্যাবের ক্রসফায়ারে প্রাণ হারান টিটনের ছোট ভাই টুটুল। তখন টিটন জানতে পারেন ছোট ভাই টুটুলের ক্রসফায়ারের পেছনে ভগ্নিপতি ইমনের সরাসরি ইন্ধন রয়েছে। সেই থেকে ইমন ও টিটনের সম্পর্কে চূড়ান্ত ফাটল ধরে। পরে ছোট বোন লিমার সঙ্গেও টিটনের বিরোধ তৈরি হয়।
টিটন-ইমনের পরস্পরের প্রতি ক্রোধের বর্ণনা দেন একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা। তিনি জানান, জেলে তাদের জন্য বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে হতো সবসময়। তারা দুজন দুজনকে সহ্য করতে পারত না।
উত্তর আমেরিকার একটি দেশে অবস্থান করা আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী চরচাকে বলেন, “টিটনকে আমি চিনি ’৯৬ সাল থেকে। ও আমার কাছে নিজের সুখ-দুঃখের সব কথা শেয়ার করত। আমরা লম্বা সময় একসঙ্গে জেলে ছিলাম। ওর সব কিছু আমার চোখের সামনেই। ওর ছোট ভাইটাকে ইমন ক্রসফায়ারে দেওয়ার পর টিটন অনেক ভেঙে পড়ে। আমাকে প্রায়ই বলত, ‘এটা কীভাবে করল ইমন? টুটুল তো ওর শালা। আমার ছোট ভাইটা খুব আদরের ছিল।’ টুটুল হত্যার পর টিটন লিমাকে বলেছিল, ইমনকে ছেড়ে চলে আসতে। কিন্তু লিমা কখনোই বিশ্বাস করেনি ইমন তার ভাই হত্যায় জড়িত। পরে নিজেদের পারিবারিক সম্পদ ভাগাভাগি নিয়েও টিটনের সঙ্গে বিরোধ হয় লিমার। সম্পদ নিয়ে তাদের দুই ভাই-বোনের মধ্যে মামলাও চলেছে। সেই থেকে টিটনের সঙ্গে তার বোন এবং বোন-জামাই ইমনের খুব খারাপ সম্পর্ক।”
ওই শীর্ষ সন্ত্রাসী আরও বলেন, “টিটন সবসময় বলত, তার বোন ও বোন-জামাই সুযোগ পেলে তাকে হত্যা করবে। আবার টিটনও শপথ নিয়ে রেখেছিল, ইমনের মৃত্যু তার হাতেই হবে। আমি নিজেও অনেকবার টিটনকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি এসব জেদ বাদ দিতে। কিন্তু ও খুব জেদি ছেলে ছিল। অন্যদিকে ইমন হলো খুবই স্বার্থপর ও নির্দয়। সে তার স্বার্থের সামনে আত্মীয়কেও ছাড় দিতে নারাজ। ইমন টিটনের প্রতি ক্ষুব্ধ হয় কারণ, তার মনে হয়েছে টিটন তার সংসার ভাঙার চেষ্টা করেছে।”
টিটন-ইমনের পরস্পরের প্রতি ক্রোধের বর্ণনা দেন একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা। তিনি জানান, জেলে তাদের জন্য বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে হতো সবসময়। তারা দুজন দুজনকে সহ্য করতে পারত না। জেলের নিরাপত্তারক্ষীদের সতর্ক থাকতে হতো, দুজন যেন মুখোমুখি না হয়। এমনকি তাদের আদালতে নিতে আলাদা প্রিজন ভ্যানের ব্যবহার করত কারা কর্তৃপক্ষ।
এর বাইরেও সাবেক সেনাপ্রধানের ভাই জোসেফও ছিলেন ইমনের প্রতিদ্বন্দ্বী। মোহাম্মদপুর এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই ভাই টিপু-জোসেফের সঙ্গে ইমনের দ্বন্দ্ব অনেক পুরনো। এরই ধারাবাহিকতায় টিপুকে হত্যা করে ইমন ও টিটন। সেই থেকে জোসেফও সুযোগ খুঁজছিলেন কীভাবে ভাই হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া যায়। টিটনের ভাই টুটুলের ক্রসফায়ারে নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত টিটন ও পিচ্চি হেলাল ইমনের গ্রুপেই কাজ করত। কিন্তু টুটুল মারা যাওয়ার পর টিটন ইমনের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়লে মোহাম্মদপুরের আধিপত্যের হিসেবে তৈরি হয় নতুন সমীকরণ।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মোড় আসে জোসেফ-ইমন-টিটন-পিচ্চি হেলালসহ সকল শীর্ষ সন্ত্রাসীরা গ্রেপ্তার হয়ে জেলে থাকাকালীন। ওই সময় তাদের সঙ্গে জেলে থাকা বর্তমানে ইউরোপের একটি দেশে থাকা এক শীর্ষ সন্ত্রাসী জানান, জেলে থাকাকালীন ইমন তার অর্থ ও লোকবল দিয়ে মোহাম্মদপুর এলাকায় নতুন বাহিনী গড়ে তোলে। নাম দেওয়া হয় ক্যাপ্টেন ইমন গ্রুপ। তারা একচেটিয়া মোম্মদপুর-এলিফ্যান্ট রোড-ধানমন্ডি-পুরান ঢাকার সব এলাকার ময়লা, ইন্টারনেট, ক্যাবল ব্যবসা ও মাদক কারবারসহ জমি দখলের সব কাজে একক নিয়ন্ত্রণ নেয়। সেসময় অন্যান্য গ্রুপের সদস্যরাও ইমনের গ্রুপে যোগ দেয়।
আইন-শৃঙ্খলা রাক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের তথ্যমতে, ২০১৮ রাষ্ট্রপতির সাধারণ ক্ষমা পেয়ে দেশের বাইরে চলে যান জোসেফ। তারপর আর দেশে ফেরেননি তিনি।
ওই শীর্ষ অপরাধী চরচাকে জানান, আন্ডারওয়ার্ল্ডের গডফাদারদের পুরনো নিয়ম ছিল–কোনো কাজের ৬০-৭০ ভাগ টাকা নিজেরা নিতেন; বাকি ৩০-৪০ শতাংশ টাকা কর্মীদের দিতেন। কিন্তু ইমন জেলে বসেই নতুন নিয়ম করেন। তিনি তার কর্মীদের ৬০-৭০ শতাংশ অর্থ দিতে শুরু করেন। বেশি আয়ের আশায় অন্য গ্রুপের সদস্যরাও তার সঙ্গে কাজ শুরু করে। তাছাড়া ইমনের গ্রুপের কেউ গ্রেপ্তার হলে তিনি নিজে সব খরচ দিয়ে তাদের পরিবারকে সহযোগিতা করতেন। এজন্য অল্প সময়েই অপরাধীদের মাঝে ইমন জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। এ কারণে পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গডফাদাররা কোণঠাসা হয় পড়লেও ইমনের বাহিনী বহাল তবিয়তে ছিল। এমন সময় টিটনের সঙ্গে জেলের ভেতরে জোসেফের সমঝোতা হয়। টিটন অপরাধ স্বীকার করে ক্ষমা চান। টিটন দাবি করেন, টিপু হত্যার সময় তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও গুলি চালিয়েছিলেন ইমন। সেসময় জোসেফ টিটনকে ক্ষমা করে দেন এবং জেলের ভেতরে টিটনকে ‘ছোট ভাইয়ের’ মতো আগলে রাখতেন। একই সময়ে ইমন তার আধিপত্য বিস্তার কার্যক্রম চালিয়ে গেলে পিচ্চি হেলাল-টিটন-জোসেফ নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করে নেন। তারা একত্রে ইমনকে প্রতিরোধ করার সিদ্ধান্ত নেন।
আইন-শৃঙ্খলা রাক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের তথ্যমতে, ২০১৮ রাষ্ট্রপতির সাধারণ ক্ষমা পেয়ে দেশের বাইরে চলে যান জোসেফ। তারপর আর দেশে ফেরেননি তিনি। দেশের বাইরে থেকে এখন পর্যন্ত পিচ্চি হেলাল ও টিটনের মাধ্যমে ইমনের সঙ্গে বিরোধিতা চালিয়ে যাচ্ছিলেন জোসেফ।
কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ইমন-হেলাল-টিটন-মামুনসহ সকল শীর্ষ অপরাধী জামিনে মুক্ত হয়। জেলে থাকা অবস্থায় পিচ্চি হেলাল এলিফ্যান্ট রোডের সব মার্কেটের নিয়ন্ত্রণ নেন, যা আগে ইমনের দখলে ছিল। সবশেষ ২০২৫ সালে এলিফ্যান্ট রোড মার্কেট ব্যবসায়ীদের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইমন-হেলাল দ্বন্দ্ব মাথা চাড়া দেয়। সে সময় ইমনের গ্রুপের কাউকেই নির্বাচনে অংশ নিতে দেননি পিচ্চি হেলাল। হেলালের ভাই ওয়াহিদুল হাসান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এলিফ্যান্ট রোড কম্পিউটার কল্যাণ সমিতির সভাপতি পদে জয়ী হন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ২০২৫ সালের ১০ জানুয়ারি রাতে মাল্টিপ্ল্যান সেন্টারের সামনে ব্যবসায়ী এহতেশামুল হককে কুপিয়ে জখম করে ইমনের সহযোগীরা। এই হামলায় পিচ্চি হেলালের বড় ভাই ওয়াহিদুল হাসানও আহত হন। পরে ওয়াহিদ নিউমার্কেট থানায় একটি মামলা করেন। মামলার পর ইমনের মা ডা. সুলতানা জাহান ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলনে ছেলে ইমনকে নির্দোষ দাবি করে মামলাটি ‘উদ্দেশ্য প্রণোদিত’ বলে দাবি করেন।

ওই ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে পিচ্চি হেলালের ভাই এলিফ্যান্ট রোড কম্পিউটার কল্যাণ সমিতির সভাপতি ওয়াহিদুল হাসান চরচাকে বলেন, “ইমন মার্কেটের ময়লার কাজ, ইন্টারনেটের কাজ, মার্কেটের লবির দোকানের কাজ চেয়েছিল। আমরা তাকে ময়লার কাজটা দিয়েছিলাম। কিন্তু তার কথামতো সব না দেওয়ায় আমাদের ওপর হামলা করেছিল। মামলার পর ইমনের দুইজন লোক আটক হয়েছিল। তারা এখন জামিনে বের হয়ে উল্টো আমাদের হুমকি দিচ্ছে।”
পিচ্চি হেলাল তার আপন ছোট ভাই হলেও মার্কেট সমিতির নির্বাচনে তার কোনো ধরনের প্রভাব ছিল না বলে দাবি ওয়াহিদুলের। তিনি বলেন, নির্বাচনের সবকিছু নিয়ম মেনেই হয়েছে। ইমন কথামতো সবকিছু দখল না পাওয়ায় এই হামলা চালিয়েছিল।
পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, এরপর আবার নিউমার্কেট কাঁচাবাজারের নিয়ন্ত্রণ হারান ইমন। এখানে ইমনের লোকদের সরিয়ে দিয়ে টিটন সরাসরি বাজারে নিয়ন্ত্রণ নেন। এই কাঁচাবাজারের বটতলাতেই প্রাণ হারান টিটন। অন্যদিকে, গত বছরের নভেম্বরে রায়সাহেব বাজারের নিম্ন আদালত এলাকায় খুন হওয়া তারিক সাঈদ মামুনও টিটন-হেলালের সঙ্গে একজোট হয়ে বাংলামোটর-এলিফ্যান্টরোডের একাংশ-মগবাজার এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছিলেন। এর জেরেই পরে খুন হন তিনি। নিহত মামুনও ইমনের বাল্যবন্ধু।
পুলিশ জানায়, মামুন হত্যার পর থেকেই টিটন খুন হওয়ার আতঙ্কে থাকতেন। একপর্যায়ে তিনি ইমনকে হুঁমকি দেন যে, তার কোনো ক্ষতি করার চেষ্টা হলে ইমনের নানা অপরাধের সব তথ্য-প্রমাণ প্রশাসনের কাছে তুলে দেবেন টিটন। এই হুমকি ইমনকে আরও ক্ষুব্ধ করে তোলে। মামুন হত্যার পর থেকেই স্থানীয় পুলিশসহ একাধিক সংস্থার গোয়েন্দাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে টিটনের এক সহযোগী। তিনি টিটনের হয়ে প্রশাসনকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, টিটনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করলে ইমনের সব তথ্য জানাতে তারা প্রস্তুত। কিন্তু সে আলোচনা খুব একটা এগোয়নি। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে চরচার কাছে একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ‘স্বল্প সময়ের মধ্যে’ টিটন হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে।
টিটন হত্যায় লাভ অনেকের
টিটন হত্যার পেছনে একাধিক মোটিভ ধরে কাজ করছে পুলিশ ও গোয়েন্দারা। মূল শুটার ধরা না পড়লে সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। তবে এই হত্যাকাণ্ডে একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপের স্বার্থ হাসিল হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা চরচাকে জানান, টিটন হত্যা যেই করুক না কেন, প্রথমত খুশি হয়েছে জোসেফ। কারণ, এটি তার আপন ভাইয়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ। অন্যদিকে ইমনের শত্রুর বিনাশ ঘটল। ইমন খুব বেপোরোয়া হলেও আত্মীয় হওয়ায় টিটনকে সহজেই কিছু করতে পারছিলেন না। এই সুযোগটা নেন পিচ্চি হেলাল। টিটনকে তিনি হাতে রাখেন ইমনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার জন্য। তাই তার হত্যায় সকলেরই হাত থাকার সম্ভাবনা সমান। এ কারণে টিটন হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন কঠিন হবে–এমনটাই মনে করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
মামলার তদন্তকাজের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগ উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. মাসুদ আলম চরচাকে বলেন, “টিটন হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের এখনো সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। আমরা হত্যাকারীদের শনাক্ত করতে কাজ করছি। ঘটনাটি জটিল, সব তথ্য এখনো হাতে নেই। অনেক কিছু ভেতর থেকে খুঁজে বের করতে হচ্ছে।”
মাসুদ আলম জানান, মামলার বাদীর বক্তব্য গুরুত্বসহকারে নেওয়া হলেও সেটিই তদন্তের একমাত্র ভিত্তি নয়। তিনি বলেন, “আমরা একাধিক দিক বিবেচনায় তদন্ত করছি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য, ভুক্তভোগীর শত্রুতা, সম্ভাব্য উদ্দেশ্য–সবকিছুই যাচাই করা হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে মূল পরিকল্পনাকারী ও জড়িতদের শেকড় পর্যন্ত পৌঁছানো।”
ডিসি মাসুদ আলম বলেন, “পর্যাপ্ত ও স্পষ্ট আলামত এখনো পাওয়া যায়নি, বিশেষ করে হামলায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল বা সরাসরি অংশগ্রহণকারীদের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে আমরা ধাপে ধাপে এগোচ্ছি। মূল অপরাধীদের শনাক্ত করা গেলে পুরো চক্রই সামনে চলে আসবে। সেই লক্ষ্যেই তদন্ত চালানো হচ্ছে।”

শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন হত্যায় আরেক সন্ত্রাসী এনামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলালের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। টিটনের বড় ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপনের করা মামলায়ও সে কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু চরচার অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভিন্ন তথ্য। টিটন হত্যায় জড়িত সন্দেহে শুধু পিচ্চি হেলাল নয়, বরং টিটনের ভগ্নিপতি সাজেদুল ইসলাম ইমন ওরফে ক্যাপ্টেন ইমনসহ আরও বেশ কিছু নাম উঠে এসেছে।
গত ২৮ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টা ৫৪ মিনিটে রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহনেওয়াজ হলের সামনের বটতলায় চায়ের দোকানের পাশে হত্যা করা হয় টিটনকে। আততায়ী খুব কাছ থেকে টিটনকে লক্ষ্য করে সাতটি গুলি চালায়। এর মধ্যে একটি বুলেট টিটনের মাথার ডান পাশে, একটি বাম চোখের ভ্রুতে, দুটি পিঠে, বাকি তিনটির দুটি বাম হাতে এবং পাঁজরে বিদ্ধ হয়। মাত্র এক মিনিটের এই কিলিং মিশন শেষে সহযোগীসহ মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায় হত্যাকারী।
পরদিন নিউমার্কেট থানায় হত্যা মামলা করেন টিটনের বড় ভাই রিপন। মামলায় অজ্ঞাত ৮-৯ জনকে আসামি করা হয়। অভিযোগে বলা হয়, মোহম্মদপুরের বছিলা হাটের ইজারা নিয়ে টিটনের সঙ্গে বিরোধ চলছিল শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলালের। হেলালের সঙ্গে বাদল, শাজাহান ও রনি নামের আরও তিন ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়। বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ডেকে টিটনকে হত্যা করা হয় বলে মামলায় উল্লেখ করেন রিপন। কিন্তু চরচার অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভিন্ন তথ্য।
বছিলা পশুর হাটের ইজারা নিয়ে টিটনের সঙ্গে পিচ্চি হেলালের নয়, বরং ক্যাপ্টেন ইমনের সঙ্গে বিরোধ চলছিল। আর এই দুই গ্রুপের বিরোধের বলি হন টিটন। মূলত কোরবানির ঈদ সামনে রেখে বছিলা হাটের একক নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া ছিলেন ইমন। হাটের ইজারা নিশ্চিত করতে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছিলেন এই শীর্ষ সন্ত্রাসী। তার মাঝে পিচ্চি হেলাল এবং টিটন সমর্থিত এক ঠিকাদার হাটের শিডিউল কিনলে দুই গ্রুপের পুরনো বিরোধ নতুন মাত্রা পায়। এর কয়েক দিনের মধ্যেই খুন হন টিটন।
হাটের দরপত্র কার্যক্রমে কোন কোন প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়, তার খোঁজ নেয় চরচা। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) সবগুলো হাটের টেন্ডার শিডিউল কেনা প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকায় দেখা যায়, একমাত্র বছিলা পশুর হাটেই সবচেয়ে কমসংখ্যক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। টেন্ডারের শিডিউল কেনা চারটি প্রতিষ্ঠান হলো–‘রক্তাক্ত বিজয়’, ‘মেসার্স রনি এন্টারপ্রাইজ’, ‘আর ইসলাম মাচেন্ট্রী এন্ড কোং’ এবং ‘মেসার্স তালুকদার ট্রেডার্স’।
‘রক্তাক্ত বিজয়’ প্রতিষ্ঠানটির মালিক গোলাম মহিউদ্দিন ফারুক। তার ঠিকানা–বাড়ী ৬৭৩, রোড ১৩, বায়তুল আমান হাউজিং সোসাইটি, আদাবর। রনি এন্টারপ্রাইজের মালিকের নাম উল্লেখ না থাকলেও মালিকের বাবার নাম–মৃত আব্দুল হক; ঠিকানা–তালুকদার ভিলা, ১২৫/এ পশ্চিম ধানমন্ডি, শংকর, জাফরাবাদ, মোহম্মদপুর। ‘আর ইসলাম মাচেন্ট্রী এন্ড কোং’-এর মালিক মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন। তার ঠিকানা–১/২, রোড ৩, মোহাম্মদীয়া হাউজিং লিমিটেড, মোহাম্মদপুর। তালুকদার ট্রেডার্সের মালিক মো. রোকনুজ্জামান তালুকদার, ঠিকানা-৩০০/এ, পীরেরবাগ, মিরপুর।
রনি এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. রনি পশ্চিম ধানমন্ডি এলাকায় ‘ভাঙ্গারি রনি’ নামে পরিচিত, যাকে টিনন হত্যা মামলার অভিযোগে আসামি হিসেবে দেখানো হয়েছে। টিটন হত্যা মামলা দায়েরের পর থেকে রনির ফোন বন্ধ।
রক্তাক্ত বিজয়ের গোলাম মহিউদ্দিন ফারুকের খোঁজ পাওয়া যায়নি। তবে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি মোহাম্মদ জানান, ফারুক তার ‘স্থানীয় বড় ভাই’। নানা সময়ে ফারুকের ঠিকাদারি লাইসেন্স ব্যবহার করে বিভিন্ন টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশ নেন তারা। এরই ধারাবাহিকতায় বছিলা পশুর হাটের শিডিউল কেনা হয়। তবে ৪০ হাজার টাকা খরচ করে শিডিউল কিনলেও ‘আর্থিক সংকটের’ কারণে তা জমা দেওয়া হয়নি।
মোহাম্মদ বলেন, “উত্তর সিটি করপোরেশন থেকে এবার হাটের মূল্য নির্ধারণ করা হয় ১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। নিয়ম অনুযায়ী, এই দরের চেয়ে বেশি আমাদের রেট দেওয়া লাগত। শিডিউল ড্রপ করার সময় আমরা যে দর দিতাম, তার ৩০ পার্সেন্ট এবং ভ্যাট ট্যাক্সসহ অগ্রিম জমা দিতে হতো। আমরা হিসাব করে দেখলাম, এটা অনেক বড় অ্যামাউন্ট। এটা আমরা ম্যানেজ করতে পারিনি। শুনেছি, গত বছর এই হাটের ঠিকাদার বড় ধরনের লস করেছেন। সব দিক ভেবে ৪০ হাজার টাকা ক্ষতি হলেও আমরা বছিলা হাটের শিডিউল ড্রপ করিনি।”
শিডিউল জমা না দিতে কেউ চাপ দিয়েছিল কি না, জানতে চাইলে মোহাম্মদ বলেন, “তাদের ওপর কারও চাপ ছিল না।”
‘ইসলাম মাচেন্ট্রী এন্ড কোং’-এর মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেনও বছিলা হাটের শিডিউল কিনে তা জমা দেননি। চরচাকে তিনি বলেন, “শিডিউল কিনেছিলেম। তবে ইচ্ছে হয়নি, তাই শিডিউল জমা দিইনি।”
তালুকদার ট্রেডার্সের মালিক রোকনুজ্জামানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সংস্থার সদস্য এই ভয়েস মেসেজের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। ওই মেসেজ বিদেশে অবস্থানরত ক্যাপ্টেন ইমনেরই–বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে টিটন হত্যা মামলার তদন্তে এই অডিও-কে গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে আমলে নিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
রনি এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. রনি পশ্চিম ধানমন্ডি এলাকায় ‘ভাঙ্গারি রনি’ নামে পরিচিত, যাকে টিনন হত্যা মামলার অভিযোগে আসামি হিসেবে দেখানো হয়েছে। টিটন হত্যা মামলা দায়েরের পর থেকে রনির ফোন বন্ধ।
এদিকে, টিটন হত্যার কিছু দিন আগে বছিলা হাটের নিয়ন্ত্রণ পেতে নিজের সহযোগীদের ভয়েস মেসেজের মাধ্যমে নির্দেশনা দেন ক্যাপ্টেন ইমন। টিটন হত্যার পর এই ভয়েস মেসেজটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয় প্রতিপক্ষের সদস্যরা। মেসেজে ইমন তার সহযোগীদের উদ্দেশে বলেন, “রনির সঙ্গে তুমি আদর করে বুঝিয়ে কথা বলে রনিকে আমাদের পক্ষে নিয়ে আসো। পাপ্পু রনির সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছে, তাহলে মোহম্মদপুর (বছিলা) হাটটা একচেটিয়া নেওয়া যাবে। আর রাজেশ নবীরে দিয়ে ফোন করাইলে মিল্টনরা এমনি চলে আসবে।”

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সংস্থার সদস্য এই ভয়েস মেসেজের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। ওই মেসেজ বিদেশে অবস্থানরত ক্যাপ্টেন ইমনেরই–বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে টিটন হত্যা মামলার তদন্তে এই অডিও-কে গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে আমলে নিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
বছিলা হাটের ইজারা নিয়ে দ্বন্দ্ব সম্পর্কে জানতে চাইলে ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে চরচাকে বলেন, “গত বছরও বছিলা হাটের নিয়ন্ত্রণ ছিল ইমনের কাছেই। এবারও হাটের নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া তিনি। ইজারা নিশ্চিত করতে কৌশল এবং জালিয়াতির আশ্রয় নেন ইমন। এজন্য নিজের লোকেদের মাধ্যমে তিনটি শিডিউল কিনিয়েও সেগুলো জমা দেয়নি। তার উদ্দেশ্য ছিল, উন্মুক্ত দরপত্রের নিয়ম অনুযায়ী, প্রথম দরপত্রের আহ্বানে কোনো ঠিকাদার সাড়া না দিলে পরে আবারও দরপত্র আহ্বান করবে সিটি করপোরেশন। প্রথমবারে যেহেতু কেউ সাড়া দেয়নি, তাই দ্বিতীয়বারের শিডিউলেও তেমন সাড়া মিলবে না। মিললেও নিজের প্রভাব খাটিয়ে তা প্রতিরোধ করবে ইমন। এর পর বাধ্য হয়ে ডিএনসিসি যেকোনো একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বছিলা হাটের বরাদ্দ দেবে।”
ওই কর্মকর্তা জানান, সেই সুযোগ নিয়ে প্রশাসককে তদবির করে হাটের ইজারা নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল ইমনের। তার লোকজন পরিকল্পনামাফিক তিনটি আলাদা প্রতিষ্ঠানের নামে শিডিউল কেনে। অন্য সাধারণ ঠিকাদাররা যেহেতু জানে যে, ইমন এই হাটের ইজারা নিচ্ছেন, তাই ঝুঁকি নিয়ে কেউ টেন্ডারে অংশ নেয়নি। তাছাড়া গতবারের হাটের ইজারা নেওয়ার পর ইমনের লোকেরা বাজারে ছড়িয়ে দেয় এই হাটের টাকা ওঠানো সম্ভব নয়, দর অনেক বেশি; ইজারা নিলে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে–সব মিলিয়ে সাধারণ ঠিকাদাররা এই হাটের প্রতি কোনো আগ্রহ দেখাননি।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, শুধু ইমনের ঠিক করে দেওয়া তিনটি প্রতিষ্ঠান হাটের শিডিউল কিনে জমা না দেওয়ার কথা ছিল। তবে মাঝে বাধা হিসেবে উদয় হয় রনি এন্টারপ্রাইজ। পিচ্চি হেলাল ও টিটনের কথায় প্রতিষ্ঠানটির মালিক রনি ওরফে ভাঙ্গারি রনি বছিলা হাটের শিডিউল কেনে। বিপত্তি বাধে এখানেই।
এই ঘটনা পুরোটাই তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকে জেনেছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। এর সত্যতা নিশ্চিত করতে পারবে একমাত্র ভাঙ্গারি রনি।
ইমনের ভয়েস মেসেজের উদাহরণ টেনে ওই গোয়ন্দা কর্মকর্তা বলেন, “কথাগুলো যদি খেয়াল করেন, তাহলে তার পরিকল্পনা পরিষ্কার ধরতে পারবেন। ইমনের লোক পাপ্পু প্রথমে রনিকে শিডিউল ড্রপ করতে মানা করে। কিন্তু এ কথা জেনে হেলাল ও টিটন রনিকে তার অবস্থানে অনড় থাকতে বলে। তারপর পাপ্পু রনির সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করলে তা জেনে ইমন রনিকে ম্যানেজ করার জন্য তার ঘনিষ্ঠ এক সহযোগীকে দায়িত্ব দেন। কারণ, রনি একসময় ইমনের হয়েই কাজ করত। পরে তিনি হেলাল ও টিটনের গ্রুপে ভেড়েন। ইমনের পরিকল্পনা ছিল, দুটি দরের আহ্বানে কেউ সাড়া না দিলে তখন ৩৪ নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মো. মাসুম খান রাজেশের মাধ্যমে বিদেশ পলাতক ইন্টারপোলের রেড নোটিশভুক্ত আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী মোহাম্মদপুর এলাকার নবী হোসেনের সহযোগিতা নেবে। যেন নবী ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনকে অনুরোধ করে ইমনের মনোনীত প্রতিষ্ঠানটিকে কম দরে বছিলা হাটের ইজারা পাইয়ে দেয়। এতে করে দুটি লাভ। প্রথমত, অন্য কেউ হাটের ইজারা পেল না। আবার অনেক কম মূল্যে হাটের ইজারা ইমন পেয়ে যেত।”
ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, এই ঘটনা পুরোটাই তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকে জেনেছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। এর সত্যতা নিশ্চিত করতে পারবে একমাত্র ভাঙ্গারি রনি।
রনিকে এখনো হেফাজতে নেওয়া সম্ভব হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, “ও (রনি) হয়তো ভয়ে আত্মগোপনে আছে। আমরা তাকে খুঁজছি। এই হাটের ইস্যুতে যদি টিটনের সঙ্গে ইমন কিংবা হেলালের কোনো বাদানুবাদ হয়ে থাকে, তবে তা রনির কাছ থেকেই জানা যাবে।”
বাদীর ‘অসহযোগিতা’, অভিযোগে নাটকীয় তথ্য
শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটনের হত্যায় বছিলা পশুর হাটের দ্বন্দ্বের ঘটনাকে একমাত্র কারণ হিসেবে দেখছেন না তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, টিটনকে যারাই হত্যা করুক, তার নেপথ্যে আছে আরও বড় কারণ। অপরাধ জগতের বিভিন্ন গ্রুপের সঙ্গে নানামুখী পুরনো বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার, প্রতিশোধসহ প্রতিপক্ষকের ফাঁসানোর পাঁয়তারাও হত্যার নেপথ্য কারণ হিসেবে কাজ করতে পারে।
একাধিক বাহিনীর সদস্যদের মতে, পশুর হাটকে কেন্দ্র করে এই হত্যা হয়ে থাকলে, তা শুধুই ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহের কৌশল। সেক্ষেত্রে টিটনকে বলি দিয়ে প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর বিষয়টি তদন্তে বেশি গুরুত্ব পাবে। আবার মামলায় যেভাবে ঘটনা উপস্থাপন করা হয়েছে, তার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই বলে মনে করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ আলামত টিটনের ফোন হাতে পায়নি পুলিশ। টিটনের ভাইয়ের দাবি, টিটন ফোন ব্যবহার করতেন কি না, তা জানেন না তিনি। তার কাছে মামলার তদন্ত কর্মকর্তাসহ একাধিক সংস্থার গোয়েন্দারা ফোনটির তথ্য চাইলে তিনি জানান, টিটন নানা সময়ে অ্যাপের মাধ্যমে কথা বলতেন তার সঙ্গে। তার কোনো নির্দিষ্ট নম্বর ছিল না।
নিউমার্কেট থানার একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা চরচাকে বলেন, “মামলায় ঘটনার বর্ণনা যেভাবে সাজানো হয়েছে, তা খুব ড্রামাটিক। আমরা সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের সম্পর্কে যে তথ্য ও জ্ঞান রাখি, তাতে অন্য সব বাদ দিলেও এই ঘটনায় টিটন এবং ইমনের সম্পর্ক যে দা-কুমড়া, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাদী নিজে এই বিষয়ে অবগত থেকেও দুজনের সম্পর্ককে কল্পনাতীতভাবে ভালো উপস্থাপনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এটাও স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহের সৃষ্টি করে। এজন্য অভিযোগে অনেকের নাম উল্লেখ করলেও আমরা খুব সচেতনভাবেই মামলাটি গাইড করেছি, যেন ৩৬০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে-এর তদন্ত করে সঠিক অপরাধীকে চিহ্নিত করা যায়।”
বাদী তার অভিযোগে বলেন, বছিলা পশুর হাটের ইজারা নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে পিচ্চি হেলাল, বাদল, শাজাহান এবং রনি নামের ব্যক্তির সঙ্গে দ্বন্দ্ব চলছিল তার ভাইয়ের।
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের দাবি, এটিও মনগড়া তথ্য। কারণ, জেল থেকে বের হওয়ার পর থেকে পিচ্চি হেলাল ও টিটন একজোট হয়ে ইমনের বিরুদ্ধে কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। সম্প্রতি এই দুইজনের মধ্যে কোনো ধরনের দূরত্বের কথা শোনেনি কেউ।
তাছাড়া বাদী মামলা করতে নিউমার্কেট থানায় এলে তার সঙ্গে থাকা যুবকের উপস্থিতি এবং ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আছে পুলিশের। পুলিশের তথ্যমতে ওই যুবকের নাম সাইফুল। তিনি শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের বিশ্বস্ত লোক। ইমনের ‘ডান হাত’ এজাজের মৃত্যুর পর সাইফুলকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিয়োজিত রেখেছেন ইমন। মামলার দিন বাদীর সঙ্গে থেকে মামলা-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন তিনি। মামলা হওয়ার পর বাদীর সঙ্গে সংবাদমাধ্যমেও কথা বলেন সাইফুল। ইমনের কাছের লোক দিয়ে মামলার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করায় এটিকে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ এবং এর সঙ্গে ইমনের কোনো স্বার্থ থাকতে পারে বলে মনে করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে, তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ আলামত টিটনের ফোন হাতে পায়নি পুলিশ। টিটনের ভাইয়ের দাবি, টিটন ফোন ব্যবহার করতেন কি না, তা জানেন না তিনি। তার কাছে মামলার তদন্ত কর্মকর্তাসহ একাধিক সংস্থার গোয়েন্দারা ফোনটির তথ্য চাইলে তিনি জানান, টিটন নানা সময়ে অ্যাপের মাধ্যমে কথা বলতেন তার সঙ্গে। তার কোনো নির্দিষ্ট নম্বর ছিল না। বাদীর এই আচরণকে ‘অসহযোগিতামূলক’ উল্লেখ করে গোয়েন্দা বিভাগের এক কর্মকর্তা চরচাকে বলেন, “এই হত্যা মামলার রহস্য উন্মোচন করতে আমাদের বেগ পেতে হবে। তার জন্য মূল কারণ হলো বাদীর অসহযোগিতা। তিনি কারও প্ররোচনায় পড়েছেন।”
এদিকে মামলার বাদী খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপনের সঙ্গে কথা হয় চরচার। মামলায় তোলা অভিযোগের মতো একইভাবে ভাই হত্যায় পিচ্চি হেলালকে সন্দেহ করছেন তিনি। টিটনের মোবাইল ফোনটি কোথায় এবং সবশেষ কোন নম্বর ব্যবহার করতেন জানতে চাইলে রিপন বলেন, “আমার জানা নেই। ওর সঙ্গে আমার মাঝে মাঝে কথা হতো। কোনো কাজ লাগলে টিটনই আমাকে অ্যাপসের মাধ্যমে বিভিন্ন নম্বর থেকে ফোন দিত।”
ঘটনার পর থেকে ভগ্নিপতি ইমন কোনো যোগাযোগ করেছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, “নিয়মিতই যোগাযোগ রাখছেন, সব ধরনের সহযোগিতা করছে সে।”
ইমনের সঙ্গে টিটনের দূরত্ব ছিল কি না, জানতে চাইলে ‘তা সঠিক নয়’ বলে জানান রিপন। তিনি বলেন, “এগুলো বাজে কথা। লিমা হলো আমার ও টিটনের ছোট বোন। ইমন আমাদের বোন জামাই। আমি কখনো দেখিনি লিমা বা ইমনের সঙ্গে টিটনের কোনো বিরোধ ছিল। তারা সবসময় নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখত।”
দুই শুটারকে খুঁজছে পুলিশ
টিটন হত্যার দিনটি ছিল মঙ্গলবার। স্বাভাবিকভাবে সেদিন নিউমার্কেটের সাপ্তাহিক বন্ধ। যে জায়গায় টিটনের ওপর হামলা হয়, সেখানকার কাছাকাছি সিসি ক্যামেরা বলতে শুধু নিউমার্কেটের গেইটের ভেতরের ক্যামেরাগুলোই ছিল। কিন্তু গেইট বন্ধ থাকায় সেসব ক্যামেরায় কিছুই ধরা পড়েনি। তদন্ত সংশ্লষ্টদের হাতে আছে বিপরীত পাশে দূরের একটি ভবনের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ। তাতে শুধু ঘটনার আকস্মিকতা এবং দুই হামলাকারীর পালিয়ে যাওয়ার দৃশ্য ধারণ হয়েছে। সেই ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দুই শুটার সম্পর্কে ধারণা পেয়েছেন গোয়েন্দারা। এখন প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে একাধিক বাহিনী।
প্রযুক্তিগত অনুসন্ধান ও অপরাধী ডেটাবেজের তথ্য মিলিয়ে দুইজন শুটারকে চিহ্নিত করেছে গোয়ন্দারা। এদের একজন টিটনের ভগ্নিপতি শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের হয়ে কাজ করেন বলে নিশ্চিত হয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক গোয়ন্দা কর্মকর্তা বলেন, “শুটার খুবই প্রশিক্ষিত এবং দুই হাতে অস্ত্র চালাতে দক্ষ। নিজের পরিচয় আড়াল করতে প্রথমে হেলমেট পরে এলেও অপারেশন চালানোর সময় সে হেলমেট খুলে মাথায় ক্যাপ পরে; যেন টার্গেট মিস না হয়। টিটনের মৃত্যু নিশ্চিত করতেই একেবারে কাছে গিয়ে মাথায় গুলি করে সে। এরপর আবার পালিয়ে যাওয়ার সময় হেলমেট পরে। পালানোর সময় তারা মোহম্মদপুর বেড়িবাঁধের রাস্তা ব্যবহার করে। কারণ, সেদিকে সিসি ক্যামেরা কম।”
প্রযুক্তিগত অনুসন্ধান ও অপরাধী ডেটাবেজের তথ্য মিলিয়ে দুইজন শুটারকে চিহ্নিত করেছে গোয়ন্দারা। এদের একজন টিটনের ভগ্নিপতি শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের হয়ে কাজ করেন বলে নিশ্চিত হয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
ইমন-টিটন দ্বন্দ্বের নেপথ্যে
রাজধানীর মোহাম্মদপুর-ধানমন্ডি-পুরান ঢাকা এলাকার অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণ যাদের হাতে, তাদের মধ্যে অন্যতম সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের ভাই তোফায়েল আহমেদ জোসেফ, ইমন, টিটন, পিচ্চি হেলাল। এদের নিজেদের মধ্যে আধিপত্য নিয়ে দ্বন্দ্ব বেশ পুরনো।
অপরাধ জগতের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যকার বিরোধের বিষয়ে সুষ্পষ্ট ধারণা পেতে চরচা যোগাযোগ করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সদস্য এবং বিদেশ পলাতক কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর সাথে।
তাদের তথ্যমতে, যশোরের উদীয়মান ফুটবলার টিটন কিশোর বয়সেই অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। যশোরে থাকাকালীন টিটনের সঙ্গে তার ছোট ভাই টুটুলও অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকায় ১৯৯৬ সালে যশোর ছেড়ে টিটন ও টুটুল ঢাকার মোহম্মদপুরে চলে আসেন। সেখানেও অপরাধ জগতে যুক্ত থাকায় তাদের সঙ্গে পরিচয় হয় স্থানীয় সন্ত্রাসী ইমনের। তারা একজোট হয়ে অপরাধ চালাতে থাকে। মোহাম্মদপুরে থাকা অবস্থায় টিটনের ছোট বোন ইডেন কলেজের শিক্ষার্থী লিমার সঙ্গে প্রেম হয় ইমনের। নিজেদের সিদ্ধান্তে বিয়ে করেন তারা। বোনের সঙ্গে ইমনের সম্পর্ক শুরুতে মেনে নিতে পারেননি টিটন। যদিও পরে ইমনের সঙ্গে টিটনের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। ১৯৯৯ সালের ১৩ মার্চ মোহাম্মদপুরের নিয়ন্ত্রণ নিতে সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের আরেক ভাই সাইদ আহমেদ টিপুকে খিলক্ষেত এলাকায় চলন্ত গাড়িতে গুলি করে হত্যা করেন ইমন-টিটনসহ তাদের সহযোগীরা। এই ঘটনায় মামলা হলে টিটন ও টুটুল যশোরে পালিয়ে যান। কয়েক মাস পর যশোরের কারবালা এলাকায় বিএনপির দুই কর্মীকে গুলি করে হত্যা করেন টিটন-টুটুল। ২০০০ সালে র্যাবের ক্রসফায়ারে প্রাণ হারান টিটনের ছোট ভাই টুটুল। তখন টিটন জানতে পারেন ছোট ভাই টুটুলের ক্রসফায়ারের পেছনে ভগ্নিপতি ইমনের সরাসরি ইন্ধন রয়েছে। সেই থেকে ইমন ও টিটনের সম্পর্কে চূড়ান্ত ফাটল ধরে। পরে ছোট বোন লিমার সঙ্গেও টিটনের বিরোধ তৈরি হয়।
টিটন-ইমনের পরস্পরের প্রতি ক্রোধের বর্ণনা দেন একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা। তিনি জানান, জেলে তাদের জন্য বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে হতো সবসময়। তারা দুজন দুজনকে সহ্য করতে পারত না।
উত্তর আমেরিকার একটি দেশে অবস্থান করা আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী চরচাকে বলেন, “টিটনকে আমি চিনি ’৯৬ সাল থেকে। ও আমার কাছে নিজের সুখ-দুঃখের সব কথা শেয়ার করত। আমরা লম্বা সময় একসঙ্গে জেলে ছিলাম। ওর সব কিছু আমার চোখের সামনেই। ওর ছোট ভাইটাকে ইমন ক্রসফায়ারে দেওয়ার পর টিটন অনেক ভেঙে পড়ে। আমাকে প্রায়ই বলত, ‘এটা কীভাবে করল ইমন? টুটুল তো ওর শালা। আমার ছোট ভাইটা খুব আদরের ছিল।’ টুটুল হত্যার পর টিটন লিমাকে বলেছিল, ইমনকে ছেড়ে চলে আসতে। কিন্তু লিমা কখনোই বিশ্বাস করেনি ইমন তার ভাই হত্যায় জড়িত। পরে নিজেদের পারিবারিক সম্পদ ভাগাভাগি নিয়েও টিটনের সঙ্গে বিরোধ হয় লিমার। সম্পদ নিয়ে তাদের দুই ভাই-বোনের মধ্যে মামলাও চলেছে। সেই থেকে টিটনের সঙ্গে তার বোন এবং বোন-জামাই ইমনের খুব খারাপ সম্পর্ক।”
ওই শীর্ষ সন্ত্রাসী আরও বলেন, “টিটন সবসময় বলত, তার বোন ও বোন-জামাই সুযোগ পেলে তাকে হত্যা করবে। আবার টিটনও শপথ নিয়ে রেখেছিল, ইমনের মৃত্যু তার হাতেই হবে। আমি নিজেও অনেকবার টিটনকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি এসব জেদ বাদ দিতে। কিন্তু ও খুব জেদি ছেলে ছিল। অন্যদিকে ইমন হলো খুবই স্বার্থপর ও নির্দয়। সে তার স্বার্থের সামনে আত্মীয়কেও ছাড় দিতে নারাজ। ইমন টিটনের প্রতি ক্ষুব্ধ হয় কারণ, তার মনে হয়েছে টিটন তার সংসার ভাঙার চেষ্টা করেছে।”
টিটন-ইমনের পরস্পরের প্রতি ক্রোধের বর্ণনা দেন একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা। তিনি জানান, জেলে তাদের জন্য বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে হতো সবসময়। তারা দুজন দুজনকে সহ্য করতে পারত না। জেলের নিরাপত্তারক্ষীদের সতর্ক থাকতে হতো, দুজন যেন মুখোমুখি না হয়। এমনকি তাদের আদালতে নিতে আলাদা প্রিজন ভ্যানের ব্যবহার করত কারা কর্তৃপক্ষ।
এর বাইরেও সাবেক সেনাপ্রধানের ভাই জোসেফও ছিলেন ইমনের প্রতিদ্বন্দ্বী। মোহাম্মদপুর এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই ভাই টিপু-জোসেফের সঙ্গে ইমনের দ্বন্দ্ব অনেক পুরনো। এরই ধারাবাহিকতায় টিপুকে হত্যা করে ইমন ও টিটন। সেই থেকে জোসেফও সুযোগ খুঁজছিলেন কীভাবে ভাই হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া যায়। টিটনের ভাই টুটুলের ক্রসফায়ারে নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত টিটন ও পিচ্চি হেলাল ইমনের গ্রুপেই কাজ করত। কিন্তু টুটুল মারা যাওয়ার পর টিটন ইমনের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়লে মোহাম্মদপুরের আধিপত্যের হিসেবে তৈরি হয় নতুন সমীকরণ।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মোড় আসে জোসেফ-ইমন-টিটন-পিচ্চি হেলালসহ সকল শীর্ষ সন্ত্রাসীরা গ্রেপ্তার হয়ে জেলে থাকাকালীন। ওই সময় তাদের সঙ্গে জেলে থাকা বর্তমানে ইউরোপের একটি দেশে থাকা এক শীর্ষ সন্ত্রাসী জানান, জেলে থাকাকালীন ইমন তার অর্থ ও লোকবল দিয়ে মোহাম্মদপুর এলাকায় নতুন বাহিনী গড়ে তোলে। নাম দেওয়া হয় ক্যাপ্টেন ইমন গ্রুপ। তারা একচেটিয়া মোম্মদপুর-এলিফ্যান্ট রোড-ধানমন্ডি-পুরান ঢাকার সব এলাকার ময়লা, ইন্টারনেট, ক্যাবল ব্যবসা ও মাদক কারবারসহ জমি দখলের সব কাজে একক নিয়ন্ত্রণ নেয়। সেসময় অন্যান্য গ্রুপের সদস্যরাও ইমনের গ্রুপে যোগ দেয়।
আইন-শৃঙ্খলা রাক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের তথ্যমতে, ২০১৮ রাষ্ট্রপতির সাধারণ ক্ষমা পেয়ে দেশের বাইরে চলে যান জোসেফ। তারপর আর দেশে ফেরেননি তিনি।
ওই শীর্ষ অপরাধী চরচাকে জানান, আন্ডারওয়ার্ল্ডের গডফাদারদের পুরনো নিয়ম ছিল–কোনো কাজের ৬০-৭০ ভাগ টাকা নিজেরা নিতেন; বাকি ৩০-৪০ শতাংশ টাকা কর্মীদের দিতেন। কিন্তু ইমন জেলে বসেই নতুন নিয়ম করেন। তিনি তার কর্মীদের ৬০-৭০ শতাংশ অর্থ দিতে শুরু করেন। বেশি আয়ের আশায় অন্য গ্রুপের সদস্যরাও তার সঙ্গে কাজ শুরু করে। তাছাড়া ইমনের গ্রুপের কেউ গ্রেপ্তার হলে তিনি নিজে সব খরচ দিয়ে তাদের পরিবারকে সহযোগিতা করতেন। এজন্য অল্প সময়েই অপরাধীদের মাঝে ইমন জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। এ কারণে পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গডফাদাররা কোণঠাসা হয় পড়লেও ইমনের বাহিনী বহাল তবিয়তে ছিল। এমন সময় টিটনের সঙ্গে জেলের ভেতরে জোসেফের সমঝোতা হয়। টিটন অপরাধ স্বীকার করে ক্ষমা চান। টিটন দাবি করেন, টিপু হত্যার সময় তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও গুলি চালিয়েছিলেন ইমন। সেসময় জোসেফ টিটনকে ক্ষমা করে দেন এবং জেলের ভেতরে টিটনকে ‘ছোট ভাইয়ের’ মতো আগলে রাখতেন। একই সময়ে ইমন তার আধিপত্য বিস্তার কার্যক্রম চালিয়ে গেলে পিচ্চি হেলাল-টিটন-জোসেফ নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করে নেন। তারা একত্রে ইমনকে প্রতিরোধ করার সিদ্ধান্ত নেন।
আইন-শৃঙ্খলা রাক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের তথ্যমতে, ২০১৮ রাষ্ট্রপতির সাধারণ ক্ষমা পেয়ে দেশের বাইরে চলে যান জোসেফ। তারপর আর দেশে ফেরেননি তিনি। দেশের বাইরে থেকে এখন পর্যন্ত পিচ্চি হেলাল ও টিটনের মাধ্যমে ইমনের সঙ্গে বিরোধিতা চালিয়ে যাচ্ছিলেন জোসেফ।
কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ইমন-হেলাল-টিটন-মামুনসহ সকল শীর্ষ অপরাধী জামিনে মুক্ত হয়। জেলে থাকা অবস্থায় পিচ্চি হেলাল এলিফ্যান্ট রোডের সব মার্কেটের নিয়ন্ত্রণ নেন, যা আগে ইমনের দখলে ছিল। সবশেষ ২০২৫ সালে এলিফ্যান্ট রোড মার্কেট ব্যবসায়ীদের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইমন-হেলাল দ্বন্দ্ব মাথা চাড়া দেয়। সে সময় ইমনের গ্রুপের কাউকেই নির্বাচনে অংশ নিতে দেননি পিচ্চি হেলাল। হেলালের ভাই ওয়াহিদুল হাসান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এলিফ্যান্ট রোড কম্পিউটার কল্যাণ সমিতির সভাপতি পদে জয়ী হন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ২০২৫ সালের ১০ জানুয়ারি রাতে মাল্টিপ্ল্যান সেন্টারের সামনে ব্যবসায়ী এহতেশামুল হককে কুপিয়ে জখম করে ইমনের সহযোগীরা। এই হামলায় পিচ্চি হেলালের বড় ভাই ওয়াহিদুল হাসানও আহত হন। পরে ওয়াহিদ নিউমার্কেট থানায় একটি মামলা করেন। মামলার পর ইমনের মা ডা. সুলতানা জাহান ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলনে ছেলে ইমনকে নির্দোষ দাবি করে মামলাটি ‘উদ্দেশ্য প্রণোদিত’ বলে দাবি করেন।

ওই ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে পিচ্চি হেলালের ভাই এলিফ্যান্ট রোড কম্পিউটার কল্যাণ সমিতির সভাপতি ওয়াহিদুল হাসান চরচাকে বলেন, “ইমন মার্কেটের ময়লার কাজ, ইন্টারনেটের কাজ, মার্কেটের লবির দোকানের কাজ চেয়েছিল। আমরা তাকে ময়লার কাজটা দিয়েছিলাম। কিন্তু তার কথামতো সব না দেওয়ায় আমাদের ওপর হামলা করেছিল। মামলার পর ইমনের দুইজন লোক আটক হয়েছিল। তারা এখন জামিনে বের হয়ে উল্টো আমাদের হুমকি দিচ্ছে।”
পিচ্চি হেলাল তার আপন ছোট ভাই হলেও মার্কেট সমিতির নির্বাচনে তার কোনো ধরনের প্রভাব ছিল না বলে দাবি ওয়াহিদুলের। তিনি বলেন, নির্বাচনের সবকিছু নিয়ম মেনেই হয়েছে। ইমন কথামতো সবকিছু দখল না পাওয়ায় এই হামলা চালিয়েছিল।
পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, এরপর আবার নিউমার্কেট কাঁচাবাজারের নিয়ন্ত্রণ হারান ইমন। এখানে ইমনের লোকদের সরিয়ে দিয়ে টিটন সরাসরি বাজারে নিয়ন্ত্রণ নেন। এই কাঁচাবাজারের বটতলাতেই প্রাণ হারান টিটন। অন্যদিকে, গত বছরের নভেম্বরে রায়সাহেব বাজারের নিম্ন আদালত এলাকায় খুন হওয়া তারিক সাঈদ মামুনও টিটন-হেলালের সঙ্গে একজোট হয়ে বাংলামোটর-এলিফ্যান্টরোডের একাংশ-মগবাজার এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছিলেন। এর জেরেই পরে খুন হন তিনি। নিহত মামুনও ইমনের বাল্যবন্ধু।
পুলিশ জানায়, মামুন হত্যার পর থেকেই টিটন খুন হওয়ার আতঙ্কে থাকতেন। একপর্যায়ে তিনি ইমনকে হুঁমকি দেন যে, তার কোনো ক্ষতি করার চেষ্টা হলে ইমনের নানা অপরাধের সব তথ্য-প্রমাণ প্রশাসনের কাছে তুলে দেবেন টিটন। এই হুমকি ইমনকে আরও ক্ষুব্ধ করে তোলে। মামুন হত্যার পর থেকেই স্থানীয় পুলিশসহ একাধিক সংস্থার গোয়েন্দাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে টিটনের এক সহযোগী। তিনি টিটনের হয়ে প্রশাসনকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, টিটনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করলে ইমনের সব তথ্য জানাতে তারা প্রস্তুত। কিন্তু সে আলোচনা খুব একটা এগোয়নি। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে চরচার কাছে একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ‘স্বল্প সময়ের মধ্যে’ টিটন হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে।
টিটন হত্যায় লাভ অনেকের
টিটন হত্যার পেছনে একাধিক মোটিভ ধরে কাজ করছে পুলিশ ও গোয়েন্দারা। মূল শুটার ধরা না পড়লে সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। তবে এই হত্যাকাণ্ডে একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপের স্বার্থ হাসিল হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা চরচাকে জানান, টিটন হত্যা যেই করুক না কেন, প্রথমত খুশি হয়েছে জোসেফ। কারণ, এটি তার আপন ভাইয়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ। অন্যদিকে ইমনের শত্রুর বিনাশ ঘটল। ইমন খুব বেপোরোয়া হলেও আত্মীয় হওয়ায় টিটনকে সহজেই কিছু করতে পারছিলেন না। এই সুযোগটা নেন পিচ্চি হেলাল। টিটনকে তিনি হাতে রাখেন ইমনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার জন্য। তাই তার হত্যায় সকলেরই হাত থাকার সম্ভাবনা সমান। এ কারণে টিটন হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন কঠিন হবে–এমনটাই মনে করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
মামলার তদন্তকাজের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগ উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. মাসুদ আলম চরচাকে বলেন, “টিটন হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের এখনো সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। আমরা হত্যাকারীদের শনাক্ত করতে কাজ করছি। ঘটনাটি জটিল, সব তথ্য এখনো হাতে নেই। অনেক কিছু ভেতর থেকে খুঁজে বের করতে হচ্ছে।”
মাসুদ আলম জানান, মামলার বাদীর বক্তব্য গুরুত্বসহকারে নেওয়া হলেও সেটিই তদন্তের একমাত্র ভিত্তি নয়। তিনি বলেন, “আমরা একাধিক দিক বিবেচনায় তদন্ত করছি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য, ভুক্তভোগীর শত্রুতা, সম্ভাব্য উদ্দেশ্য–সবকিছুই যাচাই করা হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে মূল পরিকল্পনাকারী ও জড়িতদের শেকড় পর্যন্ত পৌঁছানো।”
ডিসি মাসুদ আলম বলেন, “পর্যাপ্ত ও স্পষ্ট আলামত এখনো পাওয়া যায়নি, বিশেষ করে হামলায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল বা সরাসরি অংশগ্রহণকারীদের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে আমরা ধাপে ধাপে এগোচ্ছি। মূল অপরাধীদের শনাক্ত করা গেলে পুরো চক্রই সামনে চলে আসবে। সেই লক্ষ্যেই তদন্ত চালানো হচ্ছে।”