Advertisement Banner

পটুয়াখালীতে হুমকির মুখে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, উপকূলীয় মানুষের জীবিকা

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
পটুয়াখালীতে হুমকির মুখে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, উপকূলীয় মানুষের জীবিকা
ছবি: বাসস

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার মহিপুর, আলীপুর, কুয়াকাটা ও আশাখালীর উপকূলসংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে অবৈধ এবং রূপান্তরিত (কনভার্টেড) কারিগরি মাছ ধরার ট্রলার দিন দিন বেড়ে চলেছে। এতে সামুদ্রিক সম্পদের দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

স্থানীয় জেলে ও মৎস্যসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নিষিদ্ধ অতি সূক্ষ্ম ফাঁসের জাল এবং আধুনিক মাছ শনাক্তকারী প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব ট্রলার নির্বিচারে মাছের পোনা, অপরিণত মাছ, ডিমওয়ালা মা মাছ, চিংড়ির রেণু, কাঁকড়া ও অন্য সামুদ্রিক প্রাণী আহরণ করছে।

বার্তা সংস্থা ইউএনবি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের কার্যক্রম সামুদ্রিক প্রাণীর স্বাভাবিক প্রজননচক্র মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে মাছ উৎপাদন এবং দেশের ব্লু ইকোনমি বা সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্থানীয় জেলেদের ভাষ্য, গত এক বছরে মহিপুর-আলীপুর এলাকায় রূপান্তরিত ট্রলারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

২০২৫ সালে যেখানে এ ধরনের ট্রলারের সংখ্যা ছিল প্রায় ৪০ থেকে ৪৫টি, বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৬০টিতে পৌঁছেছে।

বেশি লাভের আশায় মাছ ধরার নতুন কাঠের নৌকাকে ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে ট্রলারে রূপান্তর করা হচ্ছে বলেও জানা গেছে।

সামুদ্রিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ট্রলারে ব্যবহৃত বটম ট্রলিং পদ্ধতি অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক।

সমুদ্রের তলদেশ ঘেঁষে ভারী জাল টেনে নেওয়ার ফলে প্রবাল, সামুদ্রিক ঘাস, ঝিনুকজাতীয় প্রাণীর আবাসস্থল এবং তলদেশের অন্য বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খল ব্যাহত হচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে মাছের প্রজনন কমে যাচ্ছে।

আইন অনুযায়ী বড় ট্রলারগুলোর গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার কথা থাকলেও জেলেদের অভিযোগ, অনেক ট্রলার উপকূল থেকে মাত্র কয়েক নটিক্যাল মাইল দূরেই মাছ ধরছে। ফলে উপকূলীয় প্রজননক্ষেত্র ও মাছের অভয়াশ্রম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এসব ট্রলারে ফিশ ফাইন্ডার, জিপিএস, রাডার, ইকো সাউন্ডার এবং উইঞ্চ মেশিনসহ উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। এর মাধ্যমে সহজেই মাছের ঝাঁক শনাক্ত করে ব্যাপক হারে আহরণ করা সম্ভব হচ্ছে।

ফলে ছোট নৌকা ও প্রচলিত সরঞ্জাম ব্যবহারকারী ঐতিহ্যবাহী জেলেরা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না।

মহিপুর ও আলীপুর মৎস্যবন্দরের জেলেরা অভিযোগ করেন, বড় ট্রলারগুলো প্রায়ই তাদের জাল কেটে বা চাপা দিয়ে কয়েক লাখ টাকার ক্ষতি করে।

প্রতিবাদ করলে অনেক সময় ভয়ভীতি ও হুমকির মুখেও পড়তে হয় বলে অভিযোগ তাদের।

জেলে আনোয়ার হোসেন বলেন, “আমরা দিনের পর দিন সাগরে থেকে খালি হাতে ফিরি, অথচ প্রভাবশালী কয়েকজন ট্রলার মালিক অবৈধ ট্রলিংয়ের মাধ্যমে মাছের মজুত ধ্বংস করেই যাচ্ছে। কর্তৃপক্ষ চাইলে একদিনেই এটি বন্ধ করতে পারে।”

আরেক জেলে আবুল কাশেম বলেন, অপরিণত মাছ বড় হওয়ার আগেই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, “প্রতিদিন লাখ লাখ মাছের পোনা নিধন হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জেলেদের জন্য আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।”

মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, সামুদ্রিক দূষণ এবং অবৈধ ট্রলিং—এই তিনটি কারণে বাংলাদেশের সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ তীব্র চাপে রয়েছে।

মা মাছ ও অপরিণত মাছ ধ্বংস হওয়ায় ইলিশের পাশাপাশি লাখা, পোয়া, পমফ্রেট ও চিংড়ির মতো বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মাছের উৎপাদনও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।

তাদের মতে, এভাবে অতিরিক্ত আহরণ চলতে থাকলে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, রপ্তানি আয় এবং সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতি মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে।

কিছু জেলের অভিযোগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অসাধু কর্মকর্তাদের একটি অংশ এবং নদী পুলিশের কিছু সদস্যের কথিত প্রশ্রয় বা পরোক্ষ সহযোগিতায় বছরের পর বছর ধরে অবৈধ ট্রলারগুলো প্রকাশ্যে চলাচল করছে।

তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

মহিপুর মৎস্য আড়ত মালিক সমিতির সহসভাপতি রাজু আহমেদ রাজা বলেন, বারবার আলোচনা করেও অবৈধ ট্রলিং বন্ধ করা যায়নি।

তিনি বলেন, "বরং প্রতি বছর অবৈধ ট্রলারের সংখ্যা বাড়ছে। কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি ও আইন প্রয়োগ ছাড়া এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।"

মৎস্য কর্মকর্তা বখতিয়ার আহমেদ স্বীকার করেন, অবৈধ জালের কারণে মা মাছ ও অপরিণত মাছ ধ্বংস হচ্ছে, যার ফলে মাছের উৎপাদন কমে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, "জীববৈচিত্র্য, খাদ্যনিরাপত্তা এবং সামুদ্রিক মৎস্যের ওপর নির্ভরশীল লাখো মানুষের জীবিকা রক্ষায় মৎস্য আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ এবং অবৈধ জালের সম্পূর্ণ ব্যবহার বন্ধ করা অত্যন্ত জরুরি।"

কুয়াকাটা নদী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মনিরুজ্জামান জানান, অবৈধ ট্রলিং নৌযান-সংক্রান্ত মামলাগুলো বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

তিনি বলেন, "অবৈধ মাছ ধরা ও নিষিদ্ধ জালের বিরুদ্ধে আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। তবে গভীর সমুদ্রে অভিযান পরিচালনায় কখনো কখনো লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা কাজ করে।"

পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী বলেন, বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।

তিনি বলেন, "বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। কোস্ট গার্ড, নদী পুলিশ, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং জেলেদের সংগঠনের সমন্বয়ে নজরদারি ও অভিযান আরও জোরদার করা হবে।"

সম্পর্কিত