Advertisement Banner

পাকিস্তান দিবস যেভাবে হয়ে উঠল পাকিস্তান প্রতিরোধ দিবস

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
পাকিস্তান দিবস যেভাবে হয়ে উঠল পাকিস্তান প্রতিরোধ দিবস
ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

বাংলাদেশের ইতিহাসে যতগুলো গুরুত্বপূর্ণ তারিখ আছে, তার মধ্যে ২৩ মার্চ একটা। ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ লাহোরে অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের অধিবেশনে আনুষ্ঠানিকভাবে এক প্রস্তাব তুলে ধরা হয়, যেখানে বলা হয়–ভারত মূলত হিন্দু ও মুসলিম নামের দুটি আলাদা জাতি নিয়ে গঠিত। তারা দাবি করে, এই দুই ‘জাতি’ একই দেশের অংশ হতে পারে না। এমনকি তাদের মধ্যে এক সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া বা বৈবাহিক সম্পর্কও সম্ভব নয়।

পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত আইনজীবী মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঠিক এমনটাই বিশ্বাস করতেন। ১৯৪০ সালের মধ্যে তিনি নিজেকে উপমহাদেশের মুসলমানদের ত্রাতা হিসেবে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন। সেই অবস্থান থেকেই তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, এই দুটি আলাদা জাতির স্বার্থে ভারতের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বিভাজন প্রয়োজন। আর এভাবেই জন্ম নেয় তথাকথিত দ্বিজাতি তত্ত্ব। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৭ সালে জন্ম নেয় ভারত ও পাকিস্তান নামে দুই আলাদা দেশ।

ইতিহাসের এক অদ্ভুত পরিহাস লুকিয়ে আছে এই দিনটিতে। ব্যবধান ৩১ বছরের। ১৯৪০ সালের যে ২৩ মার্চে লাহোরে পাকিস্তান রাষ্ট্রের কাঠামো রচিত হয়েছিল, ৩১ বছর পর ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চেই সেই রাষ্ট্র কাঠামো প্রত্যাখান করেছিল বাঙালিরা। পরিহাসটা হলো বাঙালিদের রায়েই ১৯৪৭ সালে বাস্তব হয়েছিল জিন্নাহর পাকিস্তান রাষ্ট্রের স্বপ্ন।

১৯৪৭ সালে জন্মের পর থেকেই ২৩ মার্চ তারিখটাকে পাকিস্তান রাষ্ট্র বিশেষভাবে স্মরণ করে। দিনটা পাকিস্তানের জাতীয় দিবস—পাকিস্তান দিবস। অথচ, ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ স্বাধিকারের লক্ষ্যে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ বাঙালিরা সেই দিনটিকেই পরিণত করেছিল ‘প্রতিরোধ দিবস’। সাতচল্লিশ–পরবর্তী পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে ঢাকায় সেদিনের দৃশ্যপট ছিল একেবারেই ভিন্ন। পূর্ব পাকিস্তানের কোথাও সেদিন পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা ওড়েনি। ঢাকা টেলিভিশনে বাজেনি পাকিস্তানের জাতীয় সংগীত। ঢাকার বাড়ি বাড়িতে উড়েছিল স্বাধীন বাংলার লাল–সবুজের বুকে হলুদ মানচিত্র আঁকা পতাকা। আর এদিনই যুক্ত পাকিস্তানের কবর রচিত হয়ে গিয়েছিল।

তরুণ বয়সে পাকিস্তান আন্দোলনের কর্মী ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। সেই শেখ মুজিবই ১৯৭১ সালে এসে বাঙালির স্বাধিকারের নেতা হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বেই স্বাধীনতার দাবিতে এককাট্টা ছিল মুক্তিপাগল বাঙালিরা। শেখ মুজিব ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ এক চমকপ্রদ ঘটনার জন্ম দিয়েছিলেন। পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় অংশ নিতে তিনি যখন প্রেসিডেন্ট হাউজে যাচ্ছিলেন, তখন তাঁর গাড়িতে উড়ছিল স্বাধীন বাংলার পতাকা। এসব ইতিহাসের পরিহাস ছাড়া আর কী হতে পারে!

১৯৬৬ সালে লাহোরেই ছয় দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন শেখ মুজিব, যেখানে প্রথমবারের মতো তোলা হয় পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক স্বায়ত্ত্বশাসনের প্রস্তাব। মূলত এই প্রস্তাবেই স্বাধীন বাংলাদেশের চূড়ান্ত অভ্যুদয়ের ব্যাপারটি ছিল। আরও মজার বিষয় হলো ১৯৪০ সালে পাকিস্তানকে গড়ার প্রস্তাব, আর ১৯৬৬ সালে পাকিস্তানের রাষ্ট্রকাঠামোকে ভেঙে ফেলার দুটি প্রস্তাবই দেওয়া হয়েছিল লাহোরে।

১৯৭১ সালের মার্চ মাসে সেই বিশ্বাসকে চূড়ান্ত প্রত্যাখ্যান করা হয়—যেখানে বলা হয়েছিল–হিন্দু ও মুসলিম দুটি ভিন্ন জাতি এবং তারা একই ভূখণ্ডে শান্তিতে থাকতে পারে না। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১, মাত্র ২৪ বছরেই জিন্নাহর দ্বি-জাতি তত্ত্ব প্রত্যাখ্যান করেছিল যুক্ত পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতিগোষ্ঠী বাঙালিরা। এক সময় পাকিস্তানের স্বপ্নের বিভোর বাঙালিরা ততদিনে বুঝে গিয়েছিল ধর্মের ভিত্তিতে গঠিত হলেই রাষ্ট্র শোষণ ও নিপীড়ন থেকে মুক্তির নিশ্চয়তা দেয় না।

২৩ মার্চ ১৯৭১, বাঙালির প্রতিরোধ দিবসে বাড়ি বাড়ি পতাকা উড়েছিল স্বাধীন বাংলার। সেদিন ঢাকা টেলিভিশনে বাঙালি কর্মীরা আরেকটি চমকপ্রদ ঘটনার জন্ম দিয়েছিল। সেদিন পাকিস্তান টেলিভিশনের ঢাকা কেন্দ্রের দর্শকেরা অবাক বিস্ময়ে আর আনন্দ নিয়ে উপভোগ করেছিলেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনায় উদ্দীপ্ত অনুষ্ঠানমালা। সেদিনের অধিবেশনের সমাপ্তি ঘোষণার সময় হয়ে গেলেও অনুষ্ঠান শেষই হচ্ছিল না। রাত বারোটা পেরিয়ে ক্যালেন্ডারের পাতায় যখন তারিখটা ২৪ মার্চ, তখনই অধিবেশন শেষের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। আর নিয়মমতো বেজেছিল পাকিস্তানের জাতীয় সংগীত। টেলিভিশনের বাঙালি কর্মীরা ২৩ মার্চ প্রতিরোধ দিবসে পাকিস্তানের জাতীয় সংগীত বাজাতে চাননি। পাকিস্তানের রাষ্ট্রকাঠামোকে প্রত্যাখান করে বাংলাদেশের ঘোষণাটাই যেন হয়ে গিয়েছিল পাকিস্তান টেলিভিশনের ঢাকা কেন্দ্রে।

সম্পর্কিত