গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা মন্টু মিয়া পেশায় দিনমজুর। জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায় পরিবার নিয়ে থাকেন। জীবন চালাতে গিয়ে মন্টু মিয়া স্থানীয় মহাজন ও বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। ঋণের চাপে জর্জরিত মন্টু মিয়া যখন দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন, তখন তাকে ১০ লাখ টাকা পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখানো হয়। বিনিময়ে তার একটি কিডনি দিতে হবে।চরম আর্থিক সংকট ও ঋণ থেকে মুক্তির আশায় মন্টু মিয়া সেই প্রস্তাবে রাজি হন। কিন্তু মন্টুর ভাগ্য সহায় হয়নি। প্রতারণা বুঝতে পেরে শেষে তিনি আইনের আশ্রয় নেন।আজ শনিবার বার্তা সংস্থা ইউএনবি জানায়, আদালতে দায়ের করা মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ঢাকার এক নারীর জরুরি কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন রয়েছে এবং কিডনি দান করলে তাকে ১০ লাখ টাকা দেওয়া হবে- এমন প্রলোভন দেখিয়ে তাকে রাজি করানো হয়।কিন্তু মন্টুর দাবি, নেপালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে একটি কিডনি অপসারণের পর তিনি মাত্র ৫০ হাজার টাকা পেয়েছেন।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, দিনমজুরি করে পরিবার চালাতে গিয়ে মন্টু স্থানীয় মহাজন ও বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। ঋণের ভারে জর্জরিত এই সময়ে কয়েকজন দালাল তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তারা জানান- কিডনি বিক্রি করলে তিনি স্থায়ীভাবে ঋণমুক্ত হতে পারবেন। চরম আর্থিক সংকটের কারণে মন্টু তাদের প্রস্তাবে রাজি হন।
অভিযুক্তরা চলতি বছরের জানুয়ারির শুরুতে তার পাসপোর্ট তৈরি করে অগ্রিম হিসেবে ৫০ হাজার টাকা দেয়। এরপর তাকে ভারত হয়ে নেপালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার একটি কিডনি অপসারণ করা হয় বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
অস্ত্রোপচারের পর কয়েক দিন নেপালে চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণে রাখার পর তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়। তবে চুক্তি অনুযায়ী প্রতিশ্রুত বাকি নয় লাখ ৫০ হাজার টাকা তাকে দেওয়া হয়নি।
মন্টুর অভিযোগ, তিনি বাকি টাকা চাইলে অভিযুক্তরা তা দিতে অস্বীকৃতি জানায়।
স্থানীয়ভাবে সালিস-মীমাংসার মাধ্যমে বিচার না পেয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি আদালতে মামলা দায়ের করেন। আদালত কালাই থানাকে অভিযোগটি এফআইআর হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। পরে পুলিশ মামলাটি নথিভুক্ত করে।
মামলায় আটজনের নাম উল্লেখসহ চারজনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে বগুড়া, জয়পুরহাট ও নোয়াখালীর কয়েকজন বাসিন্দা রয়েছেন। অভিযোগে তাদের কিডনি কেনাবেচার দালাল চক্রের সদস্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
কালাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, “আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী মামলাটি রেকর্ড করা হয়েছে।”
তিনি বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বাংলাদেশে অঙ্গ প্রতিস্থাপন নিয়ন্ত্রণে আইন থাকলেও অবৈধ অঙ্গ পাচার চক্র এখনো সক্রিয় রয়েছে। তারা আর্থিকভাবে অসহায় মানুষকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি ও বিভিন্ন ধরনের প্রলোভন দেখিয়ে মানুষের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ প্রতিস্থাপনে রাজি করায়। এসব চক্র প্রায়ই সীমান্ত পেরিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করে। দুর্বল নজরদারি এবং জটিল আন্তঃদেশীয় রুটকে তারা নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগায়।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ঘটনা শুধু সংঘবদ্ধ অপরাধের চিত্রই তুলে ধরে না, বরং ঋণের চাপে জর্জরিত দরিদ্র পরিবারের কঠিন বাস্তবতাও সামনে আনে।
জেলা জজ আদালতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট উজ্জ্বল হোসেন বলেন, “অবৈধ অঙ্গ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা উচিত।”
তিনি বলেন, “যারা মানবদেহের অঙ্গের অবৈধ বাণিজ্যের মাধ্যমে দরিদ্র ও অসহায় মানুষকে শোষণ করছে, তারা জঘন্য অপরাধ করছে। এই চক্র ভেঙে দিতে আইনের কঠোর প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি।”