Advertisement Banner

ফ্লোর ক্রসিং কী, বিভ্রান্তি কেন

ফ্লোর ক্রসিং কী, বিভ্রান্তি কেন
জাতীয় সংসদের অধিবেশন। ছবি: বাসস

গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে ‘ফ্লোর ক্রসিং’ শব্দটা আবার আলোচনায় এসেছে। ওই ঘটনায় কোনো কোনো গণমাধ্যম তাদের ফেসবুক পেজে ফটোকার্ড প্রকাশ করে লিখেছে, ‘ফ্লোর ক্রসিং না করে পেছনে বসলেন প্রধানমন্ত্রী’।

আসলে কী ঘটেছিল সংসদে

গতকাল বুধবার সংসদে আইনমন্ত্রী মো.আসাদুজ্জামান বক্তব্য দিচ্ছিলেন। বক্তব্যের এক পর্যায়ে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদ কক্ষে ঢুকে আইনমন্ত্রীর পেছনের সারিতে ফাঁকা চেয়ারে বসে পড়েন। পরে বক্তব্য শেষ হলে তিনি নিজ আসনে যান। এই ঘটনাকে কেউ কেউ বলছেন, ‘ফ্লোর ক্রস’ এড়ানো। বুধবারও সংসদে এ কথা বলা হয়। প্রশ্ন হলো-কেন সংসদ নেতা আইনমন্ত্রীর সামনে দিয়ে গিয়ে নিজের আসনে বসলেন না?

জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ২৬৭ বিধিতে, সংসদে সদস্য কর্তৃক পালনীয় বিধি সম্পর্কে বলা আছে। সেখানে একটি উপধারায় বলা আছে, “সভাপতি এবং বক্তৃতারত কোনো সদস্যের মধ্যবর্তী স্থান দিয়া চলাচল করিবেন না।” অর্থাৎ কোনো সংসদ সদস্য যখন বক্তব্য দেন তখন অন্য কেউ বক্তৃতারত সদস্য এবং স্পিকারের মাঝখান দিয়ে চলাচল করবেন না। এই নিয়মটাই মেনেছেন সংসদ নেতা।

নবম জাতীয় সংসদেও তৎকালীন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক দিন এরকম করেছিলেন। তখনো কোনো কোনো গণমাধ্যমে একইভাবে সংবাদে শিরোনাম করেছিল, “ফ্লোর ক্রসিং এড়ালেন প্রধানমন্ত্রী।”

ফ্লোর ক্রসিং কী?

সংসদ কক্ষের মেঝেকেই আসলে ফ্লোর বলা হয়। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের রীতি অনুযায়ী সরকারি দল স্পিকারের ডানে আর বিরোধী দল বসে বামে। অর্থাৎ সংসদের মেঝের দুই দিকে দুই দলের এমপিরা বসেন। কেউ যদি নিজ দল ছেড়ে অন্য দলে যোগ দেন তাহলে ‘ফ্লোর ক্রস’ হয়। অর্থাৎ দল থেকে পদত্যাগ করলে বা দল পরিবর্তন করলে ফ্লোর ক্রস হয়।

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ওয়েবসাইটে বলা আছে, “রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্য পরিবর্তন করার অর্থ আক্ষরিক অর্থেই কক্ষের একপাশ থেকে অন্যপাশে যাওয়ার জন্য সংসদের মেঝে অতিক্রম করা বা ‘ফ্লোর ক্রসিং’ করা।”

বাংলাদেশে ফ্লোর ক্রস হলে কী হয়

বাংলাদেশে কেউ যদি ফ্লোর ক্রস করেন তাহলে তার সংসদ সদস্য পদ থাকে না। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে এ বিষয়ে বলা আছে। এই অনুচ্ছেদটি নিয়ে অনেক আলোচনা-বিতর্ক রয়েছে। অনেকেই এই অনুচ্ছেদের সংশোধন চান। তারা বলেন, এই অনুচ্ছেদের কারণে দলীয় প্রধানের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। এর বিপক্ষে যারা আছেন তাদের যুক্তি, দলীয় শৃঙ্খলার জন্য এই নিয়ম জরুরি।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা আছে, “কোন নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোন ব্যক্তি সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি- (ক) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা (খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন, তাহা হইলে সংসদে তাঁহার আসন শূন্য হইবে, তবে তিনি সেই কারণে পরবর্তী কোন নির্বাচনে সংসদ-সদস্য হইবার অযোগ্য হইবেন না।”

তবে বাংলাদেশে কোনো এমপিকে যদি দল থেকে বহিষ্কার করা হয় তবে কিন্তু তার সদস্য পদ যায় না। এরকম নজির অষ্টম ও নবম সংসদে একাধিক আছে।

যুক্তরাজ্যে ফ্লোর ক্রসিং-এর উদাহরণ আছে। বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব উইনস্টন চার্চিল ১৯০৪ সালের ৩১ মে হাউজ অফ কমন্সের ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ দলের বেঞ্চ ছেড়ে বিরোধী লিবারেল পার্টির বেঞ্চে গিয়ে বসেন। পরে ১৯২৪ সালে চার্চিল লিবারেল পার্টি ছেড়ে আবার কনজারভেটিভ পার্টিতে ফিরে আসেন এবং পরে দলের নেতৃত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী হন।

২০০৭ সালে কুয়েন্টিন ডেভিস কনজারভেটিভ দল ত্যাগ করে লেবার পার্টিতে যোগ দেন।

ফ্লোর ক্রসিং নিয়ে সম্প্রতি যে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে তা কিন্তু সহজেই মেটানো যায়। সংসদের যে ২৬৭ বিধির কথা আগেই বলা হয়েছে, সেটার ইংরেজি ভার্সনে বলা আছে, “Whilst the House in sitting a member... shall not pass between the Chair and any member who is speaking…।” ফ্লোর ক্রসিং শব্দটা নেই এখানে। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদেও নেই।

আর সংসদীয় ব্যবস্খা নিয়ে যারা একটু খোঁজ-খবর রাখেন তারা বিষয়টি জানেন। সুতরাং আক্ষরিক অনুবাদ করে ফ্লোর ক্রসিং শব্দ ব্যবহার করা সঠিক নয়।

সম্পর্কিত