ইতালীয় আলোকচিত্রী সিকুন্দো পিয়ার জন্ম ১৮৫৫ সনে। তিনি আইনজীবী, রাজনীতিবিদ ও আলোকচিত্রী। তবে আলোকচিত্রী হিসেবেই সবাই তাকে চেনে। অসংখ্য ছবি তুলে নয়, একটি মাত্র ছবির জন্য তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। যিশু খ্রিস্টের মরদেহ যে কথিত কাফন দিয়ে মোড়ানো হয়েছিল তার প্রথম ছবি তুলেছিলেন তিনি। ধর্ম নয়, তিনি বিজ্ঞান ও শিল্পকলায় আগ্রহী ছিলেন, তার তোলা ছবিই কিনা হয়ে উঠলো পবিত্র ধর্মীয় প্রতীক।
বাইবেলে বলা হয়েছে ‘‘…যীশু যে এতো শীঘ্র মরিয়া গিয়াছেন, ইহাতে পীলাত আশ্চর্য্য জ্ঞান করিলেন, এবং সেই শতপতিকে ডাকাইয়া, তিনি ইহার মধ্যই মরিয়াছেন কি না, জিজ্ঞাসা করিলেন; পরে শতপতির নিকট হইতে জানিয়া যোসেফকে দেহটি দান করিলেন। যোসেফ একখানি চাদর কিনিয়া তাঁহাকে নামাইয়া ঐ চাদরে জড়াইলেন এবং শৈলে ক্ষোদিত এক কবরে রাখিলেন; পরে কবরের দ্বারে একখান পাথর গড়াইয়া দিলেন।’’
এই যে ক্রুশবিদ্ধ যিশুর মরদেহ একটি চাদরে মুড়ে গুহার মতো কবরে রাখা হলো, খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, সেই চাদরটি এখনো টিকে আছে। আর তা আছে ইতালির উত্তরাঞ্চলের শহর তুরিনের সেন্ট জন ব্যাপটিস্ট ক্যাথেড্রালে। সারা বিশ্বে সেই লিনেনের চাদরটি ‘শ্রাউড অব তুরিন’ বা তুরিনের কাফন হিসেবে পরিচিত। এটি ৪ দশমিক ৩৬ মিটার লম্বা এবং ১ দশমিক ১০ মিটার চওড়া।
রোমান ক্যাথলিক চার্চের দেওয়া ছবির সত্যতার স্বীকৃতি। ছবি: সংগৃহীতমূল আলোচনায় যাওয়ার আগে এই কথিত কাফনটির ইতিহাস জেনে নেয়া যাক। যিশুর কথিত কাফনটি চতুর্দশ শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে ফ্রান্সের লিঁরে এলাকায় পাওয়া যায়। বলা হয়ে থাকে, জেফ্রোই দে শার্নি নামে একজন সৈনিক কাফনের কাপড়টি স্থানীয় একটি গির্জায় দান করে দাবি করেছিলেন যে, এটিই যিশুর কাফন। তবে তিনি এই কাফন কোথা থেকে পেয়েছিলেন, সে বিষয়ে কোনো তথ্য নেই। তারপর চার্চে কাফনটি প্রদর্শন করে প্রচুর অর্থ রোজগার করা শুরু হয়। ১৩৮৯ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সে ট্রয়েসের বিশপ পিয়ের দা’র্কিস ঘোষণা করেন, এটি যিশুর কাফন নয়। তিনি যিশুর কাফনের নামে জালিয়াতির তীব্র নিন্দাও জানান।
তারপর ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যকার যুদ্ধ তীব্র হতে শুরু করে। ১৪১৮ খ্রিস্টাব্দে জেফ্রোই দে শার্নির নাতনি মার্গারেট দে শার্নি তাদের প্রাসাদে কাফনটি রাখার প্রস্তাব দেন। বলেছিলেন, যুদ্ধের পর এটি ফেরত দেয়া হবে। কিন্তু আর ফেরত দেননি এবং ঘুরে ঘুরে প্রচার করতে থাকেন যে, এটিই যিশুর আসল কাফনের কাপড়। পরে ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে মার্গারেট কাফনটি দুটি প্রাসাদের বিনিময়ে ফ্রান্সের সাভয় রাজবংশের কাছে বিক্রি করে দেন। এই রাজবংশ তখন আধুনিক ফ্রান্স, ইতালি ও সুইজারল্যান্ডের কিছু অংশ শাসন করছিল। পরে তারা ইতালির শাসনভার গ্রহণ করে। কাফনটি বিক্রির অপরাধে মার্গারেটকে নির্বাসন দেয়া হয়েছিল।
সাভয় রাজবংশ ১৫০২ খ্রিস্টাব্দে কাফনটি ফ্রান্সে চেম্বেরির সেন্ট-চ্যাপেলে রাখে। ১৫৩২ খ্রিস্টাব্দে সেখানে আগুন লাগলে কাফনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অবশেষে ১৫৭৮ খ্রিস্টাব্দে এটিকে পাঠানো হয় বর্তমান ইতালির তুরিনে।
আলোকচিত্রী সেকুন্দো পিয়া। ছবি: সংগৃহীতআলোকচিত্রী সেকুন্দো পিয়া কীভাবে এর সঙ্গে যুক্ত হলেন, সে প্রসঙ্গে আসা যাক। ১৮৯৮ সনে তুরিন ক্যাথেড্রালের ৪০০তম বর্ষপূর্তির অনুষ্ঠানে আলোকচিত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান পিয়া। যদিও তিনি পেশাদার আলোকচিত্রী ছিলেন। কিন্তু অনেকদিন ধরে ইতালির স্থাপত্য, চিত্রকর্ম ও ভাস্কর্যের ছবি তুলে তার নামডাক ছড়িয়ে পড়েছিল। সেসময় সর্বসাধারণের জন্য সেই কাফনটি প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়। পিয়া সেটির ছবি তোলার সুযোগ হাতছাড়া করেননি। সেবারই প্রথমবারের মতো আলোচিত কাফনটির ছবি তোলা হয়।
সেই ছবি নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। পিয়ার ছবির কারণে এই প্রথম দেখা গেল, কাফনে এক ‘ব্যক্তির মুখচ্ছবি’ ফুটে উঠেছে! অনেকের বিশ্বাস এই মুখের ছবি যিশু ছাড়া আর কারো নয়। এই বিশ্বাস আরো জোরালো হয়, যখন ছবিটির সত্যতার স্বীকৃতি দিয়ে বসে রোমান ক্যাথলিক চার্চ!
ছবিতে তথাকথিত মুখচ্ছবিটি ধরা পড়ার সম্ভাব্য কারণ, ছাপটি আগে ছিল এক ধরনের নেগেটিভ চিত্র। ছবি তোলার কারণে তা পজিটিভ রূপ পায়। আরেকটি কারণ হতে পারে, ছবি তোলার সময় অর্থোক্রোমাটিক প্লেটের ব্যবহার। এই প্লেটগুলো শুধু ৩৫০ থেকে ৬০০ ন্যানোমিটারের তরঙ্গদৈর্ঘ্যের রঙের স্পেক্ট্রাম ধারণ করে। আর এ জন্য লাল ও হলুদ টোনগুলো কালচে দেখায়, অন্যদিকে নীল ও বেগুনি রঙ সাদা হয়ে যায়। তার অর্থ হলো, ছবিতে কাপড়ের বেশি লাল টোনগুলো কালচে হয়ে যায়, কিন্তু অনুমিত শরীরের ছাপগুলো হালকা রঙে সামনে চলে আসে।
যা হোক। ছবিতে যে যিশুর মুখ ভেসে উঠেছে, সাকুন্দো পিয়া নিজে তা বিশ্বাস করতেন কিনা তা স্পষ্ট নয়। বিশ্বাস থাকুক বা না থাকুক, এই ছবির কপি বিক্রি করে সেসময় তিনি প্রচুর রোজগার করেছিলেন। ১৯৪১ সনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু যিশুর নামের সঙ্গে তার নামটি অমর হয়ে গেল!
কাপড়টি নিয়ে এখনো বিতর্ক চলছে, চলছে গবেষণাও। ১৯৮০ সনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, কাপড়টি ১২৬০ এবং ১৩৯০ খ্রিস্টাব্দের। কোন কোন গবেষকের মতে, এটি মধ্যযুগের, কোনোভাবেই যিশুর মৃত্যুর সময়কার হতে পারে না। ২০২৪ সনে হেরিটেজ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে দাবি করা হয়, এটি যিশুর কাফন হতে পারে, কারণ এটি নাকি ২ হাজার বছরের প্রাচীন!
সূত্র: কোয়ারফেল্ডেন ম্যাগাজিন, হিস্ট্রি ডটকম, দ্য ইনডিপেন্ডেন্ট ও ডেইলি মেইল