একসময় মেটাভার্স নিয়ে যে তুমুল উত্তেজনা ছিল, তা এখন অনেকটাই স্তিমিত। কিন্তু জেনারেটিভ এআই যেমন চ্যাটজিপিটি বা জেমিনির মতো মডেল—ইতিমধ্যেই আমাদের অফিস ও কর্মসংস্কৃতির চেহারা পাল্টে দিতে শুরু করেছে। যদিও অনেকেই এআই থেকে কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ায় হতাশ, তবুও কর্মক্ষেত্রের ভাষা, আচরণ ও কাজের ধরনে এর প্রভাব স্পষ্ট।
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকনোমিস্টের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে কর্মক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের এই পরিবর্তন তুলে ধরা হয়েছে।
এতে বলা হয়, অফিসের কর্মীরা নিজেরাই, গোপনে বা প্রকাশ্যে এআই ব্যবহার করছেন। তারা খুঁজে নিচ্ছেন কীভাবে এই প্রযুক্তিকে নিজেদের কাজে লাগানো যায়। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর পর্যবেক্ষণও একই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ওপেনএআই-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, কাজের প্রয়োজনে চ্যাটজিপিটিতে প্রতিদিন পাঠানো বার্তার সংখ্যা গত এক বছরে প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। এ সংখ্যা গত বছরের জুনে ছিল ২১৩ মিলিয়ন। তা এ বছর জুনে ৭১৬ মিলিয়নে পৌঁছেছে।
অন্যদিকে অ্যানথ্রপিক ইকোনমিক ইনডেক্স জানিয়েছে, এখন এআই-কে সরাসরি কাজ করার নির্দেশ দেওয়ার হার সহায়ক হিসেবে ব্যবহারের তুলনায় বেশি। অর্থাৎ, কর্মীরা ধীরে ধীরে এআই-এর কাছে আরও বেশি কাজের দায়িত্ব অর্পণ করছেন।
এখন অফিসের আলোচনায় এআই একটি দৈনন্দিন বিষয়। কেউ যখন জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি কীভাবে এটা ব্যবহার করছ?’ সহজেই বোঝা যায়, আলোচনার বিষয়টি এআই।
মিটিং শেষে অনেকেই মজা করে বলেন, ‘তাহলে কি আমার চাকরিটা এখনো আছে?’ কিংবা ‘আমার পরের প্রজন্মের ভবিষ্যতটাই বা কী হবে!’
অফিসের কথাবার্তায় নতুন কিছু জটিল শব্দও যুক্ত হচ্ছে, যেমন: ‘অ্যালাইনমেন্ট’, ‘নন-ডিটারমিনিজম’ ও ‘এজেন্টিক’। যারা এআই ব্যবহার বাড়াচ্ছেন, তারা নিজেদের দক্ষতা বোঝাতে এখন এই নতুন প্রযুক্তিগত শব্দগুলো সহজেই ব্যবহার করছেন।
বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠানেই এআই ব্যবহারে কর্মীদের উৎসাহিত করা হচ্ছে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে এটি প্রায় বাধ্যতামূলক হয়ে উঠেছে। অনেক মিটিং এখন এআই দ্বারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রান্সক্রাইব ও সংক্ষিপ্ত করা হয়। ফলে সহকর্মীদের মধ্যে শুধু কথোপকথন নয়, ডিজিটাল রেকর্ডিংয়েও এআই সক্রিয় অংশগ্রহণ করছে।
এছাড়া, কর্মীদের কর্মক্ষমতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও এআই ব্যবহারের মাত্রা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। কিছু প্রতিষ্ঠান এমনকি কর্মীদের এআই ব্যবহারের ওপর নজরদারির জন্য বিশেষ ড্যাশবোর্ড তৈরি করেছে।
এআই এখন অনেক মৌলিক ধারণাকেও পাল্টে দিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, অনলাইনে চাকরির সাক্ষাৎকারে কোনো প্রার্থী যদি কম্পিউটারকে প্রশ্ন বারবার করতে বলেন, নিয়োগকারীরা তা সহজেই ধরতে পারেন। জালিয়াতি রোধে এখন ব্যবহার করা হচ্ছে এআই-ভিত্তিক পর্যবেক্ষণ সিস্টেম, যা নিরীক্ষণ করে কেউ ট্যাব বদলাচ্ছে কি না বা একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে কত সময় নিচ্ছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মক্ষেত্রে চ্যাটজিপিটির সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হচ্ছে লেখালেখি-সংক্রান্ত কাজে। এর ফলে নথিপত্রে ব্যাকরণগত ভুল কমছে, তবে তথ্যগত ভুল বা অপ্রয়োজনীয় বিষয়বস্তু বেড়ে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, পরিবর্তনগুলো এখনো পুরোপুরি কাঠামোগত রূপান্তর আনেনি, তবে এআই ইতোমধ্যেই কর্মক্ষেত্রের ভাষা, আচরণ ও চিন্তার ধরনে এক গভীর ছাপ ফেলেছে।
সব মিলিয়ে এতটুকু বলাই যায় যে, এআই অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো কর্মস্থলেও ব্যাপক পরিবর্তনের সারথি হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে। এই পরিবর্তন সামনে আরও কতটা আমূল হয়ে ওঠে, সেটিই আসলে দেখার।