ইইউ ও ভারতের ‘মাদার অব অল ডিলস’ কী?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ইইউ ও ভারতের ‘মাদার অব অল ডিলস’ কী?
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেনের সঙ্গে কথা বলছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি: রয়টার্স

ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসে অংশ নিতে আগামী সোমবার দেশটিতে আসছেন ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও লুইস সান্তোস দা কস্তা এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেন।

রাষ্ট্রীয় ভোজ ও আনুষ্ঠানিক কুচকাওয়াজের পাশাপাশি এই দুই নেতার সঙ্গে ভারতের আলোচ্যসূচিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে- এশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটির সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা এগিয়ে নেওয়া। এই চুক্তিকে ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি’ (মাদার অব অল ডিলস) বলে অভিহিত করেছেন উরসুলা ভন ডার লেন এবং ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়াল।

বর্তমান জটিল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারতের সঙ্গে এই আলোচনায় বসছে ইউরোপ। এর আগে গ্রিনল্যান্ড দখল নিয়ে বিরোধিতা করায় ইউরোপের আটটি দেশের ওপর শুল্কারোপের হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প, পরে অবশ্য সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন তিনি।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিস বলছে, এই অতিথি নির্বাচন ভারতের পক্ষ থেকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তা বহন করে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে ভারতের ওপর আরোপিত ৫০ শতাংশ শুল্ক নিয়ে অচলাবস্থা নতুন বছরেও গড়িয়েছে। তাই বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে কৌশলগত ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করছে দিল্লি।

লন্ডনভিত্তিক থিংকট্যাংক চ্যাথাম হাউসের বিশ্লেষক চিয়েতিজ বাজপাই বিবিসিকে বলেন, ভারত যে ট্রাম্প প্রশাসনের খেয়ালখুশির ওপর নির্ভরশীল নয় বরং বৈচিত্র্যময় পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখছে, এই অতিথি নির্বাচনের সিদ্ধান্তে সেই ইঙ্গিত মিলেছে।

ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক সুমেধা দাশগুপ্ত বলেন, “ভূরাজনীতিজনিত হুমকির কারণে বাণিজ্য পরিবেশ অস্থির হয়ে উঠেছে। তাই উভয় পক্ষই এখন নির্ভরযোগ্য বাণিজ্য অংশীদার খুঁজছে। ভারতের লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কসংক্রান্ত সমস্যার প্রভাব সামাল দেওয়া, আর ইউরোপীয় ইউনিয়নের লক্ষ্য চীনের ওপর বাণিজ্য নির্ভরতা কমানো।”

এই চুক্তি ভারতের দীর্ঘদিনের রক্ষণশীল বাণিজ্যনীতির খোলস ছাড়ার ক্ষেত্রে একটি ‘ধারাবাহিক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টার’ নিদর্শন হবে বলে মনে করেন সুমেধা।

এই চুক্তির বিষয়গুলো প্রায় দুই দশক ধরে কঠিন দরকষাকষির পর এখন আলোচনা শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে জানানো হয়েছে।

এই চুক্তি হলে এটি হবে গত চার বছরে ভারতের নবম মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ)। এর আগে ভারত যুক্তরাজ্য, ওমান, নিউজিল্যান্ডসহ একাধিক দেশের সঙ্গে চুক্তি করেছে।

চুক্তি থেকে কী পাবে ইইউ ও ভারত?

ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক ইইউর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দিল্লির অর্থনৈতিক গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। ভারত বর্তমানে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম এবং দ্রুততম বর্ধনশীল বড় অর্থনীতি। চলতি বছর দেশটির জিডিপি চার ট্রিলিয়ন ডলার (২.৯৭ ট্রিলিয়ন পাউন্ড) অতিক্রম করে জাপানকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে রয়েছে।

দাভোসে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে দেওয়া বক্তব্যে উরসুলা ফন ডার লিয়েন বলেন, ইইউ ও ভারত একসঙ্গে কাজ করলে দুই বিলিয়ন মানুষের একটি মুক্ত বাজার তৈরি হবে, যা বৈশ্বিক জিডিপির এক-চতুর্থাংশের প্রতিনিধিত্ব করবে।

দিল্লির জন্যও ইইউ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। বর্তমানে ইইউই ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক জোট। এই চুক্তির মাধ্যমে ‘জেনারালাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্সেস’ (জিএসপি) পুনর্বহাল হবে, যার আওতায় উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে ইইউ বাজারে প্রবেশ করা পণ্যের ওপর আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেন। ছবি: রয়টার্স
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেন। ছবি: রয়টার্স

দিল্লিভিত্তিক গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের (জিটিআরআই) অজয় শ্রীবাস্তবের মতে, ভারত ইইউতে প্রায় ৭৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে এবং ৬১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। ফলে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত অর্জিত হয়েছে। তবে ২০২৩ সালে ইইউর জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহারের ফলে বহু ভারতীয় পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।”

অজয় শ্রীবাস্তব আরও বলেন, “একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) হলে হারিয়ে ফেলা বাজার-প্রবেশাধিকার পুনরুদ্ধার করবে, তৈরি পোশাক, ওষুধ, ইস্পাত, পেট্রোলিয়াম পণ্য ও যন্ত্রপাতির মতো প্রধান রপ্তানি খাতে শুল্ক কমাবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্কের ধাক্কা সামাল দিতে ভারতীয় কোম্পানিগুলোকে সহায়তা করবে।”

তবে ধারণা করা হচ্ছে, ভারত কৃষি ও দুগ্ধজাত পণ্যের মতো রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল খাতগুলোকে এই চুক্তির বাইরে রাখবে বা সুরক্ষা দেবে। অন্যদিকে গাড়ি, ওয়াইন ও মদ্যপ পানীয়ের মতো খাতে ধাপে ধাপে শুল্ক কমানো হতে পারে, যা যুক্তরাজ্যের সঙ্গে করা আগের চুক্তিসহ ভারতের পূর্ববর্তী নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

চ্যাথাম হাউসের বিশ্লেষক চিয়েতিজ বাজপাই বলেন, “ভারতের প্রবণতা হলো বাণিজ্য আলোচনায় ধাপে ধাপে এগোনো এবং রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোকে পরবর্তী দফার আলোচনার জন্য সরিয়ে রাখা। এ ক্ষেত্রে চুক্তির ভূরাজনৈতিক প্রতীকী গুরুত্ব অর্থনৈতিক বাস্তবতার মতোই গুরুত্বপূর্ণ।”

অগ্রগতি সত্ত্বেও মতভেদ

বিশ্লেষকেরা বলছেন, অগ্রগতি সত্ত্বেও এখনো কিছু গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্য রয়ে গেছে। ইউরোপের দৃষ্টিকোণ থেকে বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ সুরক্ষা একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। ইইউ আরও শক্তিশালী তথ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং কঠোর পেটেন্ট নীতিমালা চায়।

অন্যদিকে ভারতের জন্য আলোচনার বড় ফাটল হিসেবে দেখা দিয়েছে ইউরোপের নতুন কার্বন কর-সিবিএএম (কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম), যা এ বছর থেকেই কার্যকর হচ্ছে।

জিটিআরআইয়ের অজয় শ্রীবাস্তব বলেন, “মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আওতায় আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করা হলেওসিবিএএম কার্যত ভারতীয় রপ্তানির ওপর একটি নতুন সীমান্ত করের মতো কাজ করছে।”

এই বিশ্লেষক আরও বলেন, “এটি ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পের (এমএসএমই) জন্য বিশেষভাবে ক্ষতিকর, কারণ তাদের উচ্চ মাত্রার কমপ্লায়েন্স ব্যয়, জটিল রিপোর্টিংয়ের বাধ্যবাধকতা এবং অতিরঞ্জিত ডিফল্ট নির্গমন মানের ভিত্তিতে জরিমানার ঝুঁকির মুখে পড়তে হচ্ছে।”

অজয় শ্রীবাস্তবের মতে, চুক্তিটি শেষ পর্যন্ত ‘প্রবৃদ্ধি-সহায়ক অংশীদারত্ব’ হবে নাকি ‘কৌশলগতভাবে অসম একটি চুক্তি’ তা নির্ভর করবে এই শেষ পর্যায়ের ইস্যুগুলো কীভাবে সমাধান হয় তার ওপর। তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি উভয় পক্ষের জন্যই লাভজনক হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক অ্যালেক্স ক্যাপ্রি বলেন, “শেষ পর্যন্ত এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য অনির্ভরযোগ্য অংশীদারদের সঙ্গে বাণিজ্যিক বিচ্ছিন্নতা ত্বরান্বিত করতে পারে। এর অর্থ হবে ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং দফায় দফায় আরোপিত শুল্ক, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ শৃঙ্খলকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের ঝুঁকি হ্রাস করা।”

অ্যালেক্স ক্যাপ্রির মতে, ভারতের উচ্চ কার্বন নিঃসরণ এবং মানবাধিকার রেকর্ড নিয়ে উদ্বেগের কারণে ইউরোপে এই চুক্তির বিরুদ্ধে কিছু প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, গত বছরের নভেম্বর থেকে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল কেনা কমানোর ভারতের সিদ্ধান্ত ইইউ পার্লামেন্টে চুক্তিটির অনুমোদন সহজ করতে পারে। কারণ চুক্তিটি কার্যকর করতে হলে ওই পার্লামেন্টের অনুমোদন প্রয়োজন।

ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের সুমেধা দাশগুপ্ত মনে করেন, চলতি বছরের শুরু থেকে আমেরিকার সঙ্গে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে, ইইউ নেতারা এখন এই বাণিজ্য চুক্তিকে আগের তুলনায় আরও ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করবেন।

সম্পর্কিত