সুপ্ত অনেক আগ্নেয়গিরি জেগে ওঠে প্রায়শই। এই তো কিছুদিন আগেই ইন্দোনেশিয়ার কথা বলা যায়, কিংবা আসতে পারে রাশিয়ার কথাও। জাগরুক বিভিন্ন আগ্নেয়গিরি বিশ্বের নানা প্রান্তে প্রায়ই জেগে ওঠে। খুব বেশি ক্ষয়ক্ষতি যে হয়, তা হয়তো নয়। কিন্তু হয় তো?
এই আগ্নেয়গিরি আসলে কী, কীভাবে এর উৎপত্তি, কত ধরন আছে এর, আর কোনগুলো নিয়ে আমরা হতে পারি সতর্ক, তা একটু খুঁজে দেখা যাক।
আগ্নেয়গিরি কী?
আগ্নেয়গিরি হলো এমন কিছু পাহাড়, যেগুলোর ভেতরে ভূ-গর্ভস্থ ম্যাগমা নামক উত্তপ্ত পদার্থ সঞ্চিত থাকে। কোনো কোনো ফাটল বা ছিদ্রপথ দিয়ে ভূগর্ভস্থ গরম বাতাস, জলীয় বাষ্প, গলিত শিলা, কাদা, ছাই, গ্যাস প্রবল বেগে বেরিয়ে আসে। আর ভূগর্ভস্থ পদার্থের এমন নির্গমনকে বলে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত।
আগ্নেয়গিরি
অগ্ন্যুৎপাতের ধরনের ওপর ভিত্তি করেই আগ্নেয়গিরির শ্রেণিবিভাগ করা হয়। যেসব আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত নিয়মিত হয়, সেগুলো সক্রিয় আগ্নেয়গিরি, যেমন হাওয়াই দ্বীপের মোনা লোয়া। আবার এমন কিছু আগ্নেয়গিরি আছে যেগুলোতে কোনো এক সময় অগ্ন্যুৎপাত হয়েছে, কিন্তু আপাতত বন্ধ আছে, এগুলো সুপ্ত আগ্নেয়গিরি। সুপ্ত আগ্নেয়গিরিগুলোতে যেকোনো সময় অগ্ন্যুৎপাত হতে পারে। জাপানের ফুজি পর্বত এ রকম সুপ্ত আগ্নেয়গিরি।
আবার কিছু আগ্নেয়গিরি আগে সক্রিয় থাকলেও ভবিষ্যতে এর অগ্ন্যুৎপাতের কোনো সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ, সেসকল আগ্নেয়গিরিকে লুপ্ত আগ্নেয়গিরি বলা হয়; যেমন তানজানিয়া কিলিমাঞ্জারো৷ কখনো কখনো লুপ্ত ও সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মুখে জল জমা হয়ে একটা হ্ৰদের সৃষ্টি হয়৷ এ ধরনের হ্ৰদকে আগ্নেয়গিরি হ্ৰদ বলে৷ কম্বোডিয়ার ইয়েক লাওম একটি আগ্নেয়গিরি হ্ৰদ।
আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত কেন ও কখন হয়?
আগেই বলেছি মাটির নিচে থাকা ম্যাগমা ওপরে উঠে এলেই অগ্ন্যুৎপাত হয়। এখন প্রশ্ন হলো কেন ম্যাগমা উঠে এসে অগ্ন্যুৎপাত ঘটায়?
এর প্রধান কারণ তিনটি-
টেকটোনিক প্লেট নামে পরিচিত পৃথিবীর ভূ-পৃষ্ঠের বিশাল খণ্ড একে অপরের থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে গেলে ম্যাগমা ওপরে উঠতে পারে। প্লেটগুলোর মাঝে যে ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়, ম্যাগমা তা ভরাট করতে উপরে উঠে আসে। এ প্রক্রিয়া পানির নিচে ঘটলে সাগরতলে আগ্নেয়গিরির সৃষ্টি হয়।
টেকটোনিক প্লেট একে অপরের দিকে সরে এলে একইভাবে ম্যাগমা উপরে ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে ভূ-পৃষ্ঠের কিছু অংশ গভীরের দিকে সরে যায়। উচ্চ তাপ ও চাপের কারণে সেই অংশ গলে ম্যাগমায় পরিণত হয় এবং উপরে উঠতে থাকে।
আরেকটি প্রক্রিয়া হলো ‘হটস্পট’। পৃথিবীর গভীরে থাকা অতিরিক্ত উষ্ণ অঞ্চলগুলোকে হটস্পট বলা হয়। এসব জায়গার তাপে ম্যাগমা উত্তপ্ত হয়ে এর ঘনত্ব কমে যায়। এই কম ঘনত্বের ম্যাগমা উপরে উঠে আসে।
ম্যাগমা নানা কারণেই উপরে উঠে আসতে পারে। তবে যে কারণেই আসুক, প্রতিটিই আগ্নেয়গিরির সৃষ্টি করতে পারে।
আগ্নেয়গিরির ফলে কী হয়?
আগ্নেয়গিরির জন্য বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিতে পারে, যেমন ভূমিকম্প, ভুমিধস। আবার আগ্নেয়গিরির লাভা (ম্যাগমা উপরে উঠে এলে তাকে লাভা বলে) প্রবাহিত হওয়ার সময় আশপাশের এলাকায় ব্যপক ক্ষতি হয়। কারণ, এই লাভায় ছাইসহ নানা ধরনের রাসায়নিক ও ভারী ধাতু।
আগ্নেয়গিরিপৃথিবী ছাড়া আর কি কোথাও আগ্নেয়গিরি আছে?
সৌরজগতের কিছু স্থানে এখনো সক্রিয় আগ্নেয়গিরি অগ্ন্যুৎপাত ঘটছে। শুক্র (ভেনাস) ও মঙ্গল গ্রহজুড়ে লুপ্ত আগ্নেয়গিরির অস্তিত্ব পাওয়া যায়। আবার বৃহস্পতি, শনি ও নেপচুনের কিছু উপগ্রহে এখনো অগ্ন্যুৎপাত হচ্ছে। নাসার বিভিন্ন মহাকাশযান এসব অগ্ন্যুৎপাতের ছবি তুলেও পৃথিবীতে পাঠিয়েছে।
এই আগ্নেয়গিরি যেমন ভূমিকম্প বা ভূমিধসের কারণ হতে পারে, তেমনি এর অগ্ন্যুৎপাতের মধ্য দিয়ে ভূমিতে আসা নানা রাসায়নিক আজকের পৃথিবীর খনিজসমৃদ্ধ গঠনের ভিত গড়ে দিয়েছে। যেমন গ্রিসের অন্যতম আকর্ষণ সান্তরিনি আসলে আগ্নেয়গিরির ফলাফল।
ছবি: রয়টার্সসৌরজগতের অন্যান্য গ্রহেও আগ্নেয়গিরির সক্রিয়তা প্রমাণ করে যে, এটি একটি মহাবৈশ্বিক ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া।
তথ্যসূত্র-ইউএসজিএস, টিচার্স.জিওভি.বিডি