সৌদি যুবরাজের নতুন নেশা কীসে!

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
সৌদি যুবরাজের নতুন নেশা কীসে!
সৌদি আরব তাদের অর্থনীতিকে তেল-নির্ভরতা থেকে দূরে সরিয়ে বৈচিত্র্য আনতে চাইছে। ২০৩০ সালের মধ্যেই গেমিং শিল্পে ৩৯ হাজার চাকরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

সৌদি আরব বর্তমানে গেমিং শিল্পে একটি বিশাল অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। তারা গেমিংয়ে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে, যা সিনেমা বা মিউজিকের চেয়েও বড় একটি শিল্প।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইকোনমিস্ট এক প্রতিবেদনে বলেছে, সৌদি আরবের বড় পদক্ষেপ ছিল আমেরিকার তৃতীয় বৃহত্তম গেমিং কোম্পানি ইলেকট্রনিক আর্টসকে (ইএ) সৌদি আরবের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের (পিআইএফ) নেতৃত্বে থাকা এক দল মানুষের ৫৫ বিলিয়ন ডলারে কিনে নেওয়া। এই দ্রুত এবং বিশাল বিনিয়োগের মাধ্যমে সৌদি আরব খুব দ্রুত ভিডিও গেমসের জগতে একটি শক্তিশালী পরাশক্তিতে পরিণত হচ্ছে।

ইএ কোম্পানিটি কিনতে সৌদি আরবের যারা ছিল তাদের দুটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার আছে। তারা হলেন একটি বেসরকারি বিনিয়োগ সংস্থা সিলভার লেক এবং আরেকটি সংস্থা অ্যাফিনিটি পার্টনার্স। অ্যাফিনিটি পার্টনার্সের প্রতিষ্ঠাতা আবার ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। ধারণা করা হচ্ছে, এই চুক্তিতে কুশনারের অংশ থাকা মানে অনুমোদনকারী সংস্থাগুলোর সুনজরে থাকা । ইলেকট্রনিক আর্টসের নতুন মালিকদের হাতে এখন ‘ম্যাডডেন’, ‘দ্য সিমস’ এবং জনপ্রিয় ফুটবল গেম ‘এফসি’ (ফিফা)-এর মতো বড় গেম ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর নিয়ন্ত্রণ থাকবে। এই ফুটবল সিরিজটি সৌদি আরবের যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানের খুবই প্রিয়।

ইলেকট্রনিক আর্টসের বিনিয়োগটা সৌদি আরবের সাম্প্রতিক সকল বিনিয়োগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। গেমিংয়ের কেন্দ্র হিসেবে সৌদি আরবকে গড়ে তুলতে দেশটির পিআইএফ তাদের অধীনস্থ স্যাভি গেমসকে ৩৮ বিলিয়ন ডলারের বিশাল তহবিল দিয়েছে। স্যাভি গেমস গত দুই বছরে অনেক বড় কোম্পানি কিনেছে। যেমন, দুইবছর আগে তারা স্কোপেলি নামে একটি আমেরিকান কোম্পানি কিনেছিল, যাদের ‘মনোপলি গো’ ২০২৩ সালে চালু হওয়ার পর পাঁচ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি আয় করে।

মে মাসে, তারা আমেরিকান কোম্পানি নিয়ান্টিক এর গেমিং শাখাও কিনে নেয়, যারা জনপ্রিয় ‘পোকেমন’ মোবাইল গেম তৈরি করে। এছাড়া সুইডিশ কোম্পানি এমব্রেসারেও স্যাভি গেমসের এ বড় অংশীদারত্ব আছে। এমব্রেসার মূলত সেই কোম্পানি যাদের কাছে ‘টুম্ব রেইডার’ গেমটির স্বত্ব আছে।

পিআইএফ নিজেরাও গেমিং জগতের কিছু বৃহত্তম ও বিখ্যাত কোম্পানির শেয়ার কিনেছে। জাপান-ভিত্তিক নিনটেন্ডো, ক্যাপকম এবং কোয়েই, দক্ষিণ কোরিয়ার নেক্সন ও এনসি সফট এবং আমেরিকার টেক-টু এই কোম্পানিগুলোতে পিআইফ হলো প্রধান তিনটি শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে একটি। এছাড়া, এটি জাপানের তোয়েই (ড্রাগন বল জেড) এবং স্কোয়ার এনিক্স (ফাইনাল ফ্যান্টাসি)-এর পাঁচটি বৃহত্তম শেয়ারহোল্ডারের মধ্যে রয়েছে। ইলেকট্রনিক আর্টসকে বাদ দিলেও, হিসাব অনুযায়ী পিআইএফ-এর গেমিং হোল্ডিংগুলির মোট মূল্য হলো ১১.৭ বিলিয়ন ডলার। অন্যান্য রাষ্ট্র-সমর্থিত ফান্ডিংয়েরও গেমিংয়ে বড়সড় বিনিয়োগ রয়েছে।

স্যাভি গেমস পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কানাডীয় শিল্প বিশেষজ্ঞ ব্রায়ান ওয়ার্ড বলেন, “আমরা কেবল শুরু করলাম।” তিনি ও তার টিম প্রতিবছর শত শত সম্ভাব্য কোম্পানির মধ্যে কোনগুলো কেনার সুযোগ আছে তা খতিয়ে দেখে। মূলত মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা থমকে যাওয়া এবং মহামারী চলাকালীন যারা গেম খেলা শুরু করেছিল, তাদের অনেকেই সরে যাওয়ায় গেমিং শিল্পে এক ধরনের দুর্বলতা এসেছে। ফলে ২০২১-২২ সালের পর থেকে এই শিল্পে ভেঞ্চার ক্যাপিটালের বিনিয়োগ প্রায় তিন-চতুর্থাংশ কমে গেছে।

নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির গেমিং বিশেষজ্ঞ জুস্ট ভ্যান ড্রুয়েন স বলেছেন, সৌদিদের কৌশল হলো বাজারের ওপর নিজেদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে বিপুল পরিমাণে টাকা ঢেলে দেওয়া।

ব্রায়ান ওয়ার্ড জানিয়েছেন, সৌদি যুবরাজ বিন সালমানের পক্ষ থেকে তার কাছে নির্দেশ হলো “ডিজনির মতো একটি কোম্পানি তৈরি করা, তবে তা হবে গেমস এবং ই-স্পোর্টসের জন্য।” এর একটি অংশ হলো সুপারফ্যানদের একটি কমিউনিটি তৈরি করা। ডিজনির যেমন থিম পার্ক আছে, তেমনি সৌদিরা লাইভ গেমিং টুর্নামেন্টগুলোর মধ্যে একটি সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছে। সেই লক্ষ্য পূরণে, ২০২২ সালে স্যাভি গেমস ইএসএল এবং এফএসিআইটি নামে দুটি ই-স্পোর্টস কোম্পানি দেড় বিলিয়ন ডলারে কিনে নেয়। এছাড়াও টেনসেন্ট-এর সমর্থনপুষ্ট চীনা কোম্পানি হিরো এস্পোর্টস-এর ৩০% অংশীদারত্বও তাদের রয়েছে। সব মিলিয়ে স্যাভি গেমসের দাবি, বিশ্বব্যাপী ই-স্পোর্টস বাজারের ৪০% তারানিয়ন্ত্রণ করে।

আরবিভাষী বিশ্ব ৩৩ কোটি গেমার আছেন, যা পশ্চিম ইউরোপ বা আমেরিকার চেয়েও বেশি। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
আরবিভাষী বিশ্ব ৩৩ কোটি গেমার আছেন, যা পশ্চিম ইউরোপ বা আমেরিকার চেয়েও বেশি। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

যুবরাজের শখ মেটানো ছাড়াও এই সব বিশাল বিনিয়োগের যৌক্তিকতা হলো দেশে একটি নতুন শিল্প তৈরি করা। সৌদি আরব তাদের অর্থনীতিকে তেল-নির্ভরতা থেকে দূরে সরিয়ে বৈচিত্র্য আনতে চাইছে। তাদের ‘ভিশন ২০৩০’ উদ্যোগে ২০৩০ সালের মধ্যেই গেমিং শিল্পে ৩৯ হাজার চাকরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এই লক্ষ্য পূরণে, স্যাভি গেমস নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান- প্রিন্সেস নুরাহ ইউনিভার্সিটিতে গেম শিল্পীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। সৌদি সরকার জানিয়েছে, দেশের মোট গেমারদের ৪৮% হলেন নারী। যদিও স্যাভির কর্মীদের মধ্যে নারীদের সংখ্যা মাত্র এক-চতুর্থাংশের কিছু বেশি।

স্যাভি গেমসের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি কর্মী বিদেশি। তবে ওয়ার্ড আশা করেন, ধীরে ধীরে বিদেশিদের সংখ্যা কমে আসবে। এস্পোর্টস বিশ্বকাপ আয়োজনকারী জার্মান নাগরিক রাল্ফ রাইচার্ট বলেন, পশ্চিমা দেশগুলোর মানুষকে সৌদি আরবে বিনিয়োগ বা কাজ করার জন্য রাজি করানো এখন আগের চেয়ে সহজ হচ্ছে।

ব্রায়ান ওয়ার্ড বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস পাঁচ থেকে দশ হাজার বছরের পুরোনো। কিন্তু গেমিংয়ে সেই গল্পগুলির উঠে আসেনি যেমনটা, চীন এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় হয়েছে। তারা তাদের জাতীয় লোককথা ও ঐতিহ্যকে জনপ্রিয় গেমসে রূপান্তর করেছে।” তিনি মনে করেন, আরবিভাষী বিশ্ব যেখানে ৩৩ কোটি গেমার আছেন, যা পশ্চিম ইউরোপ বা আমেরিকার চেয়েও বেশি, সেখানে গেমিংয়ের গুরুত্ব কম দেওয়া হয়েছে। গত বছর, চীনা লোককথার উপর ভিত্তি করে তৈরি গেম ‘ব্ল্যাক মিথ: উকং’ গ্লোবাল গেমিং প্ল্যাটফর্ম স্টিম-এর ব্যবহারকারীদের দ্বারা সেরা গেম হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল। ওয়ার্ড আশা করেন, ভবিষ্যতে সৌদি আরবে তৈরি হওয়া গেমগুলি পূর্ব এশীয় গেমগুলির মতোই সারা বিশ্বে জনপ্রিয়তা পাবে।

মার্চ মাসে ‘ফেটাল ফিউরি’-এর ভক্তরা অবাক হয়েছিলেন যখন জানতে পারেন যে এই ফাইটিং গেমের সর্বশেষ সংস্করণে একটি নতুন চরিত্র যুক্ত হবে। সেটি হলো ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। গেমটিতে পর্তুগিজ এই ফুটবলার একটি আগুনের গোলা দিয়ে প্রতিপক্ষকে আঘাত করেন। এর পিছনে সৌদি আরবের যোগসূত্র থাকতে পারে বলে ইকোনমিস্ট জানিয়েছে। রোনালদো রিয়াদ-ভিত্তিক ক্লাব আল নাসর এফসি-এর অধিনায়ক, যার অধিকাংশ মালিকানা পিআইফ-এর হাতে। অন্যদিকে, ‘ফেটাল ফিউরি’-এর জাপানি ডেভেলপার এসএনকেরও সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানা হলো এসআইএসকে ফাউন্ডেশন। এটি একটি অলাভজনক সংস্থা এবং এর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান হলেন সৌদি যুবরাজ।

পিআইএফ তাদের অধীনস্থ স্যাভি গেমসকে ৩৮ বিলিয়ন ডলারের বিশাল তহবিল দিয়েছে। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
পিআইএফ তাদের অধীনস্থ স্যাভি গেমসকে ৩৮ বিলিয়ন ডলারের বিশাল তহবিল দিয়েছে। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

গেমিং সাম্রাজ্যে সৌদি যুবরাজের নেশাই কী দেশটিকে এই শিল্পে বেশি যুক্ত করেছে, না কি খনিজ তেল থেকে নতুন যুগের ব্যবসায় তার আগ্রহ বেশি সেই প্রশ্নটা খুঁজতে হবে। হয়তো ব্রায়ান ওয়ার্ডের আশাই একসময় সত্যি হতে পারে, ভবিষ্যতে সৌদি আরবের তৈরি গেম চীন-জাপানের মতোই বিশ্বে জনপ্রিয়তা পাবে।

সম্পর্কিত