থাইল্যান্ড কি তার ‘মাফিয়া সন্ন্যাসীদের’ লাগাম টানতে পারবে?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
থাইল্যান্ড কি তার ‘মাফিয়া সন্ন্যাসীদের’ লাগাম টানতে পারবে?
থাইল্যান্ডের একটি বৌদ্ধ মন্দিরের সন্ন্যাসী। ছবি: রয়টার্স

থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের অদূরে অবস্থিত ‘ওয়াত রাই খিং’ মন্দিরের এক সুসজ্জিত মঞ্চে স্থাপিত রয়েছে একটি উজ্জ্বল সোনালি বুদ্ধমূর্তি। লোককথা অনুযায়ী, এই মূর্তিটি বাঁশের ভেলায় ভেসে অলৌকিকভাবে এখানে এসে পৌঁছেছিল। গ্রামবাসীরা যখন সেটিকে তীরে টেনে তোলে, তখনই নেমে আসে প্রবল বৃষ্টি, যা এক ভয়াবহ তাপপ্রবাহের অবসান ঘটায়। প্রতিদিন সকালে গেরুয়া বসনধারী সন্ন্যাসীরা এখানে প্রার্থনা করেন, আর সাধারণ মানুষও ভিড় করেন দর্শনের জন্য।

কিন্তু গত বছর এই ঐতিহ্যবাহী মন্দিরেই ফাঁস হয় এক বড় ধরনের কেলেঙ্কারি। মন্দিরের প্রধান পুরোহিতের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে, তিনি মন্দিরের ব্যাংক হিসাব থেকে ৩০ কোটি বাতেরও বেশি অর্থ (প্রায় ৯.৫ মিলিয়ন ডলার) সরিয়ে নিয়েছেন। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির প্রস্তুতির মধ্যেই তিনি পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন।

এই ঘটনা ছিল কেবল সূচনা। ২০২৫ সালজুড়ে একের পর এক কেলেঙ্কারিতে থাই বৌদ্ধধর্ম গভীর সংকটে পড়ে।

এর অল্প সময়ের মধ্যেই আরেকটি বিখ্যাত মন্দিরের প্রধান পুরোহিত প্রতিবেশী লাওসে পালিয়ে যান। অভিযোগ ওঠে, তিনি ‘মিস গলফ’ নামে পরিচিত এক নারীর ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়েছিলেন। পুলিশ ওই নারীকে গ্রেপ্তার করে জানায়, তিনি জ্যেষ্ঠ সন্ন্যাসীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের জন্য প্রায় ৮০ হাজার আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করেছিলেন। সেগুলো প্রকাশের হুমকি দিয়ে তিনি প্রায় ৩৮.৫ কোটি বাত হাতিয়ে নেন।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গত আগস্টে থাই পুলিশ একযোগে প্রায় ২০০টি মন্দির ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় অভিযান চালায়। মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো থেকে শুরু করে সংঘবদ্ধ অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে ১৮১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয় যাদের অধিকাংশই সন্ন্যাসী। পুলিশের ভাষ্য, কিছু অপরাধী পুলিশের নজর এড়াতে সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশ নিয়েছিল। এত বড় অভিযানের পরও কেলেঙ্কারির ধারা থামেনি। নভেম্বরে পুলিশ এমন এক সন্ন্যাসীকে গ্রেপ্তার করে, যিনি একটি চক্রকে ঋণ জালিয়াতিতে সহায়তা করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সন্ন্যাসীদের অনৈতিক আচরণ নতুন কোনো ঘটনা নয়। সিঙ্গাপুরের গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইএসইএএস–ইউসুফ ইসহাক ইনস্টিটিউটের সাবেক ভিজিটিং ফেলো কাতেওয়াদি কুলাবকাউ উল্লেখ করেন, বুদ্ধের যুগ থেকেই সন্ন্যাসীরা নানা বিতর্কে জড়িয়েছেন। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো থাইল্যান্ডের অতীতের সব নেতিবাচক নজিরকে ছাড়িয়ে গেছে।

থাইল্যান্ডে সন্ন্যাসীদের নিয়ে বিতর্ক বাড়ছে। ছবি: রয়টার্স
থাইল্যান্ডে সন্ন্যাসীদের নিয়ে বিতর্ক বাড়ছে। ছবি: রয়টার্স

থাইল্যান্ডভিত্তিক সংস্থা ইনস্টিটিউট অব বুদ্ধিস্ট ম্যানেজমেন্ট ফর হ্যাপিনেস অ্যান্ড পিস ফাউন্ডেশন-এর চেয়ারম্যান ও সহকারী প্রধান পুরোহিত প্রামাহা নাপান থাওর্নবাঞ্জব বলেন, আমার জন্মের পর থেকে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের জন্য এটিই ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ বছর।

এই কেলেঙ্কারিগুলো শুধু ধর্মীয় অস্বস্তিই নয়, রাজনৈতিকভাবেও অত্যন্ত সংবেদনশীল। থাইল্যান্ডের সংবিধান অনুযায়ী, রাজাকে বৌদ্ধধর্ম রক্ষার দায়িত্ব নিতে হয়। কারণ দেশের ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ এই ধর্মাবলম্বী।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজা মহা ভাজিরালংকর্ন বৌদ্ধধর্মীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছেন। যদিও দেশটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্র, বাস্তবে রাজার প্রভাব ও সম্পদ বিপুল।

২০১৮ সালের একটি আইন সংশোধনের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজার ক্ষমতা আরও বাড়ানো হয়, এবং তিনি তা ব্যাপকভাবে প্রয়োগও করেছেন। রাজা নিজে পালি ভাষা চর্চা করছেন এবং সন্ন্যাসীদের সঙ্গে প্রার্থনা ও ধ্যানে অংশ নেওয়ার ছবিও প্রায়ই প্রকাশিত হয়।

সমালোচকদের মতে, এগুলো জনসমক্ষে রাজার ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার কৌশল। তার বাবা রাজা ভূমিবল আদুলাদেজের ৭০ বছর রাজত্ব করে ২০১৬ সালে মারা যান। অনেক থাই নাগরিকের কাছে তিনি প্রায় দেবতুল্য ছিলেন; বর্তমান রাজা সেই গ্রহণযোগ্যতা পাননি। অনেকের ধারণা, সাম্প্রতিক সন্ন্যাসীবিরোধী অভিযানের পেছনে রাজপ্রাসাদের সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে । তবে একের পর এক কেলেঙ্কারি মানুষের মনে এই প্রশ্নও জাগাচ্ছে যে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধর্মীয় ব্যবস্থাপনা আদৌ সুষ্ঠু ছিল কি না।

জনআস্থা ফেরাতে গত অক্টোবরে বৌদ্ধধর্মের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘সংঘ সুপ্রিম কাউন্সিল’ নতুন কিছু নিয়ম জারি করে। এর মধ্যে রয়েছে আর্থিক স্বচ্ছতার কঠোর বিধান এবং মন্দিরে নগদ অর্থ সংরক্ষণের সীমা নির্ধারণ। পাশাপাশি রাজনীতিবিদেরা বিপথগামী সন্ন্যাসীদের জন্য কঠোর শাস্তির প্রস্তাব দিয়েছেন। এমনকি সাধারণ মানুষের সঙ্গে সন্ন্যাসীদের যৌন সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার কথাও উঠেছে।

তবে এসব উদ্যোগ থাইল্যান্ডের প্রায় ৪০ হাজার মন্দিরে বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে।

থাইল্যান্ডের চুলালংকর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক খেমথং তোনসাকুলরুংরুয়াং বলেন, বিদ্যমান আর্থিক হিসাব প্রদানের নিয়ম সব ক্ষেত্রে কার্যকরভাবে প্রয়োগ হয় না। তাছাড়া তরুণ সন্ন্যাসীদের জন্য জ্যেষ্ঠ বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ৩৫ বছর বয়সী সন্ন্যাসী ফ্রা আপিচেত বলেন, “কাউকে অভিযুক্ত করার আগে আমাকে শতভাগ নিশ্চিত হতে হয়।”

থাইল্যান্ডের রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন সন্ন্যাসীরা। ছবি: রয়টার্স
থাইল্যান্ডের রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন সন্ন্যাসীরা। ছবি: রয়টার্স

অনেক জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় নেতার প্রবণতা হলো, সব অনৈতিকতার দায় কয়েকজন ‘কুলাঙ্গার’ সন্ন্যাসীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া। তারা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা স্বীকার করতে চান না। এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়েই তথাকথিত ‘মাফিয়া সন্ন্যাসীরা’ শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, পূর্ণাঙ্গ শুদ্ধি অভিযান চালানো হলে তা থাইল্যান্ডের বহু প্রভাবশালী নীতি-নির্ধারকের জন্যও অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে।

সিঙ্গাপুরের নানয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির ডানকান ম্যাককার্গো বলেন, কুসংস্কারাচ্ছন্ন অনেক ক্ষমতাবান ব্যক্তি ভালো কর্মফলের আশায় বিখ্যাত সন্ন্যাসীদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। আবার উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তারাও পদোন্নতি বা প্রভাবশালী যোগাযোগের আশায় এসব সন্ন্যাসীর সান্নিধ্য চান।

হার্ভার্ড–ইয়েনচিং ইনস্টিটিউটের ভিজিটিং ফেলো প্রাকৃতি সাতাসুতের ভাষায়, একজন জ্যেষ্ঠ সন্ন্যাসীর সমর্থন কারও জীবন বদলে দিতে পারে। ফলে সন্ন্যাসী সমাজকে পুরোপুরি কলঙ্কমুক্ত করতে গেলে ব্যাংককের অভিজাত শ্রেণির অনৈতিক সম্পর্কও উন্মোচিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। আর থাইল্যান্ড সে কাজে কখনোই খুব দক্ষ ছিল না।

দ্য ইকোনোমিস্টের নিবন্ধ থেকে অনুবাদ ও সম্পাদিত

সম্পর্কিত