ইয়াসির আরাফাত

আনুষ্ঠানিকভাবে একটা দেশের গোয়েন্দা সংস্থায় কর্মরত একজন এজেন্ট, যিনি অন্য দেশের কাছে গোপন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাচার করেন, তাকে ডাবল এজেন্ট বলা হয়। থ্রিলার গল্প বা চলচ্চিত্রে এই ধরণের চরিত্র অহরহ দেখা যায়। তবে বাস্তবেও এই ধরণের ডাবল এজেন্ট বিশ্বের বড় বড় গোয়েন্দা সংস্থায় উপস্থিত ছিল। আর সেসবই তো সিনেমায় তুলে ধরা হয়।
৮৪ বছর বয়সে সম্প্রতি মারা গেছেন অলড্রিচ অ্যামস, যিনি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর কর্মকর্তা হয়েও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে ‘হুমকিস্বরূপ’ ডাবল এজেন্টদের একজন হয়ে উঠেছিলেন। সাবেক এই গোয়েন্দা কর্মকর্তা, কোনো প্যারোলের সুযোগ ছাড়াই মেরিল্যান্ডের কাম্বারল্যান্ডে অবস্থিত ফেডারেল সংশোধানাগারে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছিলেন, গত সোমবার তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন বলে জানায় যুক্তরাষ্ট্রে বিবিসির অংশীদার সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ।
অ্যামসকে কারাগারে পাঠানো হয় ১৯৯৪ সালের ২৮ এপ্রিল, তিনি যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পরে রাশিয়ার কাছে গোপন তথ্য বিক্রি করার কথা স্বীকার করেন। তার তথ্য পাচারের ফলে ১০০টির বেশি গোপন অভিযান বিপন্ন হয় এবং পশ্চিমা বিশ্বের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করা ৩০ জনের বেশি এজেন্টের পরিচয় ফাঁস হয়ে যায়। এদের মধ্যে অন্তত ১০ জন সিআইএ-গোয়েন্দাকে মরতে হয়।
১৯৮৫ সালের এপ্রিলে ঋণ শোধ করার অর্থ জোগাড়ের জন্য অ্যামস ডাবল এজেন্টের কাজে জড়িয়ে পড়েন। এই সময় থেকে তিনি রুশ গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবিকে সিআইএর গুপ্তচরদের নাম সরবরাহ করতে শুরু করেন এবং এর বিনিময়ে প্রাথমিকভাবে ৫০ হাজার ডলার গ্রহণ করতেন।
কেজিবির কাছে তার কোড নাম ছিল ‘কোলোকোল’ (এর অর্থ ‘ঘণ্টা’)। আদালতে পাঠ করা আট পৃষ্ঠার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “আমার দেওয়া তথ্যের ফলে কেজিবি এতটা উপকৃত হয়েছিল যে, কৃতজ্ঞতা হিসেবে তারা আমার জন্য ২০ লাখ ডলার আলাদা করে রেখেছে। আমার জন্য এটা যথেষ্ট বিস্ময়ের বিষয় ছিল।”
নয় বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার বিনিময়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে তিনি প্রায় ২৫ লাখ ডলার পেয়েছেন বলে অ্যামস স্বীকার করেন। এই অর্থে তিনি একটি নতুন জাগুয়ার গাড়ি কেনেন, বিদেশ ভ্রমণে যান এবং ৫ লাখ ৪০ হাজার ডলারের একটি বাড়ি কেনেন, যদিও তার বার্ষিক বেতন কখনোই ৭০ হাজার ডলারের বেশি ছিল না।
সিআইএতে অ্যামসের কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৬২ সালে। তার বাবা ছিলেন সিআইএর একজন বিশ্লেষক। কলেজে পড়াশোনা শেষ করার পর তার বাবা তাকে সেখানে চাকরি পেতে সাহায্য করেন।
১৯৬৯ সালে তিনি তার প্রথম স্ত্রী ও সহকর্মী সিআইএ এজেন্ট ন্যান্সি সেগেবার্থকে বিয়ে করেন। এরপর বিদেশি এজেন্ট নিয়োগের দায়িত্বে গোয়েন্দা কর্মকর্তা হিসেবে তাকে তুরস্কে পাঠানো হয়। তিন বছর পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসেন। এরপর থেকে তিনি মদ্যপানে আসক্ত হয়ে পড়েন এবং তার দাম্পত্য জীবনে ভাঙন ধরে।
বছরের পর বছর ধরে তিনি একাধিকবার নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটান। একবার তিনি পাতালরেলে গোপন নথিতে ভর্তি একটি ব্রিফকেস ফেলে আসেন। ১৯৮১ সালে অ্যামসকে মেক্সিকো সিটিতে প্রেরণ করা হয়। সেখানে তার দ্বিতীয় স্ত্রী মারিয়া দেল রোজারিও কাসাসের সঙ্গে পরিচিত হয়, যিনি পরবর্তীতে তার অপরাধের সহযোগী হিসেবে অভিযুক্ত হন।
১৯৮৩ সালে অ্যামস যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসেন। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি সিআইএর সোভিয়েত কাউন্টারইন্টেলিজেন্স বিভাগের প্রধান হন।
কর্মজীবনে তিনি যখন দ্রুত উন্নতি করছিলেন, তখন তার ব্যক্তিগত জীবন ভেঙে পড়ছিল। প্রথম স্ত্রীকে প্রতি মাসে মাসে ভরণপোষণ দিতে হতো, আবার দ্বিতীয় স্ত্রী রোজারিও বিলাসী জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন, যার মধ্যে ছিল কেনাকাটার প্রতি আসক্তি। তিনি ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েন এবং এই ক্রমবর্ধমান ঋণই শেষ পর্যন্ত তাকে তার হাতে থাকা বিপুল গোপন তথ্য বিক্রি করতে প্ররোচিত করে।
১৯৮৫ সালে তিনি ৫০ হাজার ডলারের বিনিময়ে এফবিআইয়ের জন্য গোপনে কাজ করা কয়েকজন কেজিবি কর্মকর্তার নাম সোভিয়েতদের কাছে তুলে দেন। পরবর্তী নয় বছর ধরে তার গুপ্তচরবৃত্তি চলতে থাকে এবং অবশেষে ১৯৯৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তিনি গ্রেপ্তার হন, যদিও এক বছর আগে থেকেই তাকে ধরার জন্য একটি গোপন মিশন শুরু হয়েছিল।
অ্যামস তার অপরাধ স্বীকার করেন এবং স্ত্রী রোজারিওর যেন তুলনামূলক হালকা শাস্তি হয় তা নিশ্চিত করেন। রোজারিও স্বীকার করেন, তিনি সোভিয়েতদের সঙ্গে অ্যামসের বৈঠক সম্পর্কে জানতেন। পাঁচ বছর পর তিনি মুক্তি পান।
তৎকালীন সিআইএ পরিচালক আর জেমস উলসে অ্যামসকে দেশের এক ‘মারাত্মক বিশ্বাসঘাতক’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, অ্যামস এমন একজন, যে বিলাসবহুল জীবনযাপন করার জন্য দেশপ্রেমিক এজেন্টদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল।
এতক্ষণ যার কথা বলা হচ্ছিল, তিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নে তথ্য পাচার করতেন। এবার যার কথা বলা হবে, তিনি কেজিবির এজেন্ট ছিলেন, কিন্তু তথ্য পাচার করতেন যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে। নাম ওলেগ অ্যাডলফভিচ লিয়ালিন।
বাল্টিক সাগরের তীরবর্তী ক্লেইপেডা নামক স্থানে দীর্ঘদিন একঘেয়ে দায়িত্ব পালন করছিলেন ওলেগ লিয়ালিন। ১৯৬৯ সালে তাকে লন্ডনে যেতে বলা হয়। ওলেগ লিয়ালিনের জন্য এটি স্বপ্নের মতো পোস্টিং। তিনি যোগ দিয়েছিলেন একটি সোভিয়েত বাণিজ্য মিশনে, বাস্তবে লিয়ালিন ছিলেন কেজিবির ‘ডিপার্টমেন্ট ভি’–এর সদস্য। নাশকতা ও হত্যাকাণ্ডের জন্য এই শাখার সদস্যরা বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত ছিল। রাজনৈতিক নেতাদের হত্যা, রেলপথ ধ্বংস, তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ছড়ানোর মাধ্যমে উপকূলীয় অঞ্চলের পানি দূষিত করা, খাবার সরবরাহে বিঘ্ন ঘটানোর মতো কাজের দায়িত্ব ছিল লিয়ালিনের ওপর।
দুই বছর পর তিনি স্নায়ুযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হয়ে ওঠেন। তিনি ব্রিটেনের নিরাপত্তা সংস্থা এমআই৫–কে বিপুল পরিমাণ গোয়েন্দা তথ্য দেন, যা সংস্থাটির সুনাম পুনরুদ্ধার করে। ১০৫ জন সোভিয়েত গুপ্তচরকে বহিষ্কার করা হয় তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে।
সম্প্রতি প্রকাশিত হওয়া গোয়েন্দা নথির ওপর ভিত্তি করে লিয়ালিনের ভূমিকার এক রোমাঞ্চকর কাহিনি তুলে ধরেছেন রিচার্ড কেরবাজ। গুপ্তচরবৃত্তির জগতে পশ্চিমা বিশ্ব এক সময় পিছিয়ে পড়েছিল, সেখানে পাল্টা আঘাত হানতে সাহায্য করেছিলেন লিয়ালিন। ওলেগ গর্ডিয়েভস্কি নামক আর একজন গোয়েন্দা কয়েক বছর ধরে ব্রিটেনের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৬–কে গোপন তথ্য দিতে শুরু করেন, আদর্শগত কারণে তিনি কেজিবি থেকে পলায়ন করেন। লিয়ালিন তার মতো কোনো আদর্শ থেকে নয়, বরং ব্যক্তিগত কারণে পলায়ন করেন।
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, লিয়ালিন একটি পুলিশ স্টেশনে গিয়ে নিজেকে কেজিবি কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি চেয়েছিলেন তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বহিষ্কার করা হোক, যাতে দেশের মানুষের কাছে তিনি নায়ক হিসেবে গণ্য হতে পারেন এবং স্ত্রীকে তালাক দিতে পারেন (যদিও স্ত্রী ছাড়াও আরও পাঁচজন নারীর সঙ্গে সম্পর্কে ছিল তার)। এর বিনিময়ে তিনি এমআই৫–কে কেজিবির কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার এবং মস্কো থেকে তাদের হয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেন।
১৯৭১ সালের ৩০ আগস্ট পুলিশ লিয়ালিনকে গ্রেপ্তার করে। কারণ তিনি টটেনহ্যাম কোর্ট রোড দিয়ে বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালাচ্ছিলেন উচ্চস্বরে গালাগালি করতে করতে। এদিকে লিয়ালিনের বিক্ষুব্ধ স্ত্রী মস্কোয় তার কর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তার আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ফলস্বরূপ লিয়ালিনকে ব্যাগ গুছিয়ে প্রশাসনিক শাস্তি মোকাবিলা করার জন্য দেশে ফিরতে বলা হয়।
এই অবস্থা থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় ছিল পলায়ন। ৩ সেপ্টেম্বর তিনি তার বান্ধবী ইরিনা তেপলিয়াকোভাকে সঙ্গে নিয়ে আত্মগোপনে চলে যান। এদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নে লিয়ালিনের অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
তিন সপ্তাহ পর ব্রিটিশ সরকার ‘অপারেশন ফুট’ নামে একটি অভিযান পরিচালনা করে এবং সোভিয়েত গুপ্তচরদের গণহারে বহিষ্কারের নির্দেশ দেয়। লেখকের দাবি, লিয়ালিনের পদক্ষেপের ফলে এমআই৫ রক্ষা পেয়েছিল। এটা কিছুটা অতিরঞ্জন মনে হতে পারে, তবে ১৯৬৩ সালে ব্রিটিশ গুপ্তচর কিম ফিলবি যে মস্কোর হয়ে কাজ করছিলেন, এই তথ্য প্রকাশের পর সংস্থাটির আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধারে এই ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
লিয়ালিন পরবর্তীতে তার নাম–পরিচয় বদলে উত্তর ইংল্যান্ডের এক জায়গায় বসবাস করা শুরু করেন। দীর্ঘ রোগভোগের পর ১৯৯৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা জগৎ এখন অনেক বদলে গেছে, কিন্তু এই দুজনের ঘটনার তাৎপর্য এখনও রয়ে গেছে। এজন্য এই জগতে এই দুজন বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছেন।

আনুষ্ঠানিকভাবে একটা দেশের গোয়েন্দা সংস্থায় কর্মরত একজন এজেন্ট, যিনি অন্য দেশের কাছে গোপন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাচার করেন, তাকে ডাবল এজেন্ট বলা হয়। থ্রিলার গল্প বা চলচ্চিত্রে এই ধরণের চরিত্র অহরহ দেখা যায়। তবে বাস্তবেও এই ধরণের ডাবল এজেন্ট বিশ্বের বড় বড় গোয়েন্দা সংস্থায় উপস্থিত ছিল। আর সেসবই তো সিনেমায় তুলে ধরা হয়।
৮৪ বছর বয়সে সম্প্রতি মারা গেছেন অলড্রিচ অ্যামস, যিনি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর কর্মকর্তা হয়েও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে ‘হুমকিস্বরূপ’ ডাবল এজেন্টদের একজন হয়ে উঠেছিলেন। সাবেক এই গোয়েন্দা কর্মকর্তা, কোনো প্যারোলের সুযোগ ছাড়াই মেরিল্যান্ডের কাম্বারল্যান্ডে অবস্থিত ফেডারেল সংশোধানাগারে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছিলেন, গত সোমবার তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন বলে জানায় যুক্তরাষ্ট্রে বিবিসির অংশীদার সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ।
অ্যামসকে কারাগারে পাঠানো হয় ১৯৯৪ সালের ২৮ এপ্রিল, তিনি যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পরে রাশিয়ার কাছে গোপন তথ্য বিক্রি করার কথা স্বীকার করেন। তার তথ্য পাচারের ফলে ১০০টির বেশি গোপন অভিযান বিপন্ন হয় এবং পশ্চিমা বিশ্বের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করা ৩০ জনের বেশি এজেন্টের পরিচয় ফাঁস হয়ে যায়। এদের মধ্যে অন্তত ১০ জন সিআইএ-গোয়েন্দাকে মরতে হয়।
১৯৮৫ সালের এপ্রিলে ঋণ শোধ করার অর্থ জোগাড়ের জন্য অ্যামস ডাবল এজেন্টের কাজে জড়িয়ে পড়েন। এই সময় থেকে তিনি রুশ গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবিকে সিআইএর গুপ্তচরদের নাম সরবরাহ করতে শুরু করেন এবং এর বিনিময়ে প্রাথমিকভাবে ৫০ হাজার ডলার গ্রহণ করতেন।
কেজিবির কাছে তার কোড নাম ছিল ‘কোলোকোল’ (এর অর্থ ‘ঘণ্টা’)। আদালতে পাঠ করা আট পৃষ্ঠার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “আমার দেওয়া তথ্যের ফলে কেজিবি এতটা উপকৃত হয়েছিল যে, কৃতজ্ঞতা হিসেবে তারা আমার জন্য ২০ লাখ ডলার আলাদা করে রেখেছে। আমার জন্য এটা যথেষ্ট বিস্ময়ের বিষয় ছিল।”
নয় বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার বিনিময়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে তিনি প্রায় ২৫ লাখ ডলার পেয়েছেন বলে অ্যামস স্বীকার করেন। এই অর্থে তিনি একটি নতুন জাগুয়ার গাড়ি কেনেন, বিদেশ ভ্রমণে যান এবং ৫ লাখ ৪০ হাজার ডলারের একটি বাড়ি কেনেন, যদিও তার বার্ষিক বেতন কখনোই ৭০ হাজার ডলারের বেশি ছিল না।
সিআইএতে অ্যামসের কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৬২ সালে। তার বাবা ছিলেন সিআইএর একজন বিশ্লেষক। কলেজে পড়াশোনা শেষ করার পর তার বাবা তাকে সেখানে চাকরি পেতে সাহায্য করেন।
১৯৬৯ সালে তিনি তার প্রথম স্ত্রী ও সহকর্মী সিআইএ এজেন্ট ন্যান্সি সেগেবার্থকে বিয়ে করেন। এরপর বিদেশি এজেন্ট নিয়োগের দায়িত্বে গোয়েন্দা কর্মকর্তা হিসেবে তাকে তুরস্কে পাঠানো হয়। তিন বছর পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসেন। এরপর থেকে তিনি মদ্যপানে আসক্ত হয়ে পড়েন এবং তার দাম্পত্য জীবনে ভাঙন ধরে।
বছরের পর বছর ধরে তিনি একাধিকবার নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটান। একবার তিনি পাতালরেলে গোপন নথিতে ভর্তি একটি ব্রিফকেস ফেলে আসেন। ১৯৮১ সালে অ্যামসকে মেক্সিকো সিটিতে প্রেরণ করা হয়। সেখানে তার দ্বিতীয় স্ত্রী মারিয়া দেল রোজারিও কাসাসের সঙ্গে পরিচিত হয়, যিনি পরবর্তীতে তার অপরাধের সহযোগী হিসেবে অভিযুক্ত হন।
১৯৮৩ সালে অ্যামস যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসেন। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি সিআইএর সোভিয়েত কাউন্টারইন্টেলিজেন্স বিভাগের প্রধান হন।
কর্মজীবনে তিনি যখন দ্রুত উন্নতি করছিলেন, তখন তার ব্যক্তিগত জীবন ভেঙে পড়ছিল। প্রথম স্ত্রীকে প্রতি মাসে মাসে ভরণপোষণ দিতে হতো, আবার দ্বিতীয় স্ত্রী রোজারিও বিলাসী জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন, যার মধ্যে ছিল কেনাকাটার প্রতি আসক্তি। তিনি ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েন এবং এই ক্রমবর্ধমান ঋণই শেষ পর্যন্ত তাকে তার হাতে থাকা বিপুল গোপন তথ্য বিক্রি করতে প্ররোচিত করে।
১৯৮৫ সালে তিনি ৫০ হাজার ডলারের বিনিময়ে এফবিআইয়ের জন্য গোপনে কাজ করা কয়েকজন কেজিবি কর্মকর্তার নাম সোভিয়েতদের কাছে তুলে দেন। পরবর্তী নয় বছর ধরে তার গুপ্তচরবৃত্তি চলতে থাকে এবং অবশেষে ১৯৯৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তিনি গ্রেপ্তার হন, যদিও এক বছর আগে থেকেই তাকে ধরার জন্য একটি গোপন মিশন শুরু হয়েছিল।
অ্যামস তার অপরাধ স্বীকার করেন এবং স্ত্রী রোজারিওর যেন তুলনামূলক হালকা শাস্তি হয় তা নিশ্চিত করেন। রোজারিও স্বীকার করেন, তিনি সোভিয়েতদের সঙ্গে অ্যামসের বৈঠক সম্পর্কে জানতেন। পাঁচ বছর পর তিনি মুক্তি পান।
তৎকালীন সিআইএ পরিচালক আর জেমস উলসে অ্যামসকে দেশের এক ‘মারাত্মক বিশ্বাসঘাতক’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, অ্যামস এমন একজন, যে বিলাসবহুল জীবনযাপন করার জন্য দেশপ্রেমিক এজেন্টদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল।
এতক্ষণ যার কথা বলা হচ্ছিল, তিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নে তথ্য পাচার করতেন। এবার যার কথা বলা হবে, তিনি কেজিবির এজেন্ট ছিলেন, কিন্তু তথ্য পাচার করতেন যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে। নাম ওলেগ অ্যাডলফভিচ লিয়ালিন।
বাল্টিক সাগরের তীরবর্তী ক্লেইপেডা নামক স্থানে দীর্ঘদিন একঘেয়ে দায়িত্ব পালন করছিলেন ওলেগ লিয়ালিন। ১৯৬৯ সালে তাকে লন্ডনে যেতে বলা হয়। ওলেগ লিয়ালিনের জন্য এটি স্বপ্নের মতো পোস্টিং। তিনি যোগ দিয়েছিলেন একটি সোভিয়েত বাণিজ্য মিশনে, বাস্তবে লিয়ালিন ছিলেন কেজিবির ‘ডিপার্টমেন্ট ভি’–এর সদস্য। নাশকতা ও হত্যাকাণ্ডের জন্য এই শাখার সদস্যরা বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত ছিল। রাজনৈতিক নেতাদের হত্যা, রেলপথ ধ্বংস, তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ছড়ানোর মাধ্যমে উপকূলীয় অঞ্চলের পানি দূষিত করা, খাবার সরবরাহে বিঘ্ন ঘটানোর মতো কাজের দায়িত্ব ছিল লিয়ালিনের ওপর।
দুই বছর পর তিনি স্নায়ুযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হয়ে ওঠেন। তিনি ব্রিটেনের নিরাপত্তা সংস্থা এমআই৫–কে বিপুল পরিমাণ গোয়েন্দা তথ্য দেন, যা সংস্থাটির সুনাম পুনরুদ্ধার করে। ১০৫ জন সোভিয়েত গুপ্তচরকে বহিষ্কার করা হয় তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে।
সম্প্রতি প্রকাশিত হওয়া গোয়েন্দা নথির ওপর ভিত্তি করে লিয়ালিনের ভূমিকার এক রোমাঞ্চকর কাহিনি তুলে ধরেছেন রিচার্ড কেরবাজ। গুপ্তচরবৃত্তির জগতে পশ্চিমা বিশ্ব এক সময় পিছিয়ে পড়েছিল, সেখানে পাল্টা আঘাত হানতে সাহায্য করেছিলেন লিয়ালিন। ওলেগ গর্ডিয়েভস্কি নামক আর একজন গোয়েন্দা কয়েক বছর ধরে ব্রিটেনের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৬–কে গোপন তথ্য দিতে শুরু করেন, আদর্শগত কারণে তিনি কেজিবি থেকে পলায়ন করেন। লিয়ালিন তার মতো কোনো আদর্শ থেকে নয়, বরং ব্যক্তিগত কারণে পলায়ন করেন।
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, লিয়ালিন একটি পুলিশ স্টেশনে গিয়ে নিজেকে কেজিবি কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি চেয়েছিলেন তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বহিষ্কার করা হোক, যাতে দেশের মানুষের কাছে তিনি নায়ক হিসেবে গণ্য হতে পারেন এবং স্ত্রীকে তালাক দিতে পারেন (যদিও স্ত্রী ছাড়াও আরও পাঁচজন নারীর সঙ্গে সম্পর্কে ছিল তার)। এর বিনিময়ে তিনি এমআই৫–কে কেজিবির কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার এবং মস্কো থেকে তাদের হয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেন।
১৯৭১ সালের ৩০ আগস্ট পুলিশ লিয়ালিনকে গ্রেপ্তার করে। কারণ তিনি টটেনহ্যাম কোর্ট রোড দিয়ে বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালাচ্ছিলেন উচ্চস্বরে গালাগালি করতে করতে। এদিকে লিয়ালিনের বিক্ষুব্ধ স্ত্রী মস্কোয় তার কর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তার আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ফলস্বরূপ লিয়ালিনকে ব্যাগ গুছিয়ে প্রশাসনিক শাস্তি মোকাবিলা করার জন্য দেশে ফিরতে বলা হয়।
এই অবস্থা থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় ছিল পলায়ন। ৩ সেপ্টেম্বর তিনি তার বান্ধবী ইরিনা তেপলিয়াকোভাকে সঙ্গে নিয়ে আত্মগোপনে চলে যান। এদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নে লিয়ালিনের অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
তিন সপ্তাহ পর ব্রিটিশ সরকার ‘অপারেশন ফুট’ নামে একটি অভিযান পরিচালনা করে এবং সোভিয়েত গুপ্তচরদের গণহারে বহিষ্কারের নির্দেশ দেয়। লেখকের দাবি, লিয়ালিনের পদক্ষেপের ফলে এমআই৫ রক্ষা পেয়েছিল। এটা কিছুটা অতিরঞ্জন মনে হতে পারে, তবে ১৯৬৩ সালে ব্রিটিশ গুপ্তচর কিম ফিলবি যে মস্কোর হয়ে কাজ করছিলেন, এই তথ্য প্রকাশের পর সংস্থাটির আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধারে এই ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
লিয়ালিন পরবর্তীতে তার নাম–পরিচয় বদলে উত্তর ইংল্যান্ডের এক জায়গায় বসবাস করা শুরু করেন। দীর্ঘ রোগভোগের পর ১৯৯৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা জগৎ এখন অনেক বদলে গেছে, কিন্তু এই দুজনের ঘটনার তাৎপর্য এখনও রয়ে গেছে। এজন্য এই জগতে এই দুজন বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছেন।