চরচা ডেস্ক

বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং অস্থিতিশীল জ্বালানি বাজারের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন, ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপ ও জ্বালানি আমদানিতে আকাশচুম্বী ব্যয়–এই ত্রিমুখী সংকট দেশের ‘এনার্জি ট্রানজিশন’ বা জ্বালানি রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করার প্রয়োজনীয়তাকে আগের চেয়ে অনেক বেশি স্পষ্ট করে তুলেছে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত এক ধরনের দ্বিমুখী সংকটে ভুগছে। একদিকে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট, আমদানিনির্ভর জ্বালানির উচ্চ ব্যয়ের মতো বিষয় আছে। অন্যদিকে সাশ্রয়ী পথে হাঁটলে বিদ্যুৎ সরবরাহে শুরু হয় নাকাল দশা। লোডশেডিং এড়াতে গেলে উচ্চব্যয় মেনে নিতে হচ্ছে, আবার উচ্চব্যয় এড়াতে গেলে লোডশেডিংয়ের বাস্তবতা। এ যেন এক চক্র। এ থেকে বের হওয়ার ক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানি একটা উপায় হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর কেবল পরিবেশগত বিলাসিতা নয়, বরং এটি দেশের অর্থনীতিকে জীবাশ্ম জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ সংকট থেকে রক্ষার একটি প্রাকৃতিক সুরক্ষা কবচ।
গত চার বছরে বাংলাদেশের প্রাথমিক জ্বালানি আমদানি ৪৭.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬২.৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক জীবাশ্ম জ্বালানির অস্থির বাজারের প্রতি দেশের নাজুক অবস্থাকে প্রকাশ করার পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ৮৩ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছে। ব্যয়বহুল জীবাশ্ম জ্বালানি ও মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন ছাড়াও চাহিদার মন্থর গতির বিপরীতে বিপুল পরিমাণ ‘ক্যাপাসিটি পেমেন্ট’ বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির পেছনে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়্যাল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) ‘ফস্টারিং বাংলাদেশ’স এনার্জি ট্রানজিশন’ শীর্ষক নতুন গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে আইইইএফএ’র গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০-২১ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছরের মধ্যে কয়লার গড় দাম ২৯০ শতাংশ বৃদ্ধি, স্বল্প সময়ের জন্য তেলের উচ্চমূল্য এবং মুদ্রার ব্যাপক অবমূল্যায়ন বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়কে নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে ২০২২-২৩ অর্থবছরের তুলনায় কয়লার দাম ৫৯.৭ শতাংশ হ্রাস পাওয়া এবং তেলের দাম কম থাকা সত্ত্বেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন খরচ কমেনি।
প্রতিবেদনটির লেখক এবং আইইইএফএ-র প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, “২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেসরকারি তেল ও কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে যথাক্রমে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় প্রায় ৯.৫ টাকা (০.০৭৭ মার্কিন ডলার) এবং ৫.৯ টাকা (০.০৪৮ মার্কিন ডলার) হারে দেওয়া গড় ‘ক্যাপাসিটি পেমেন্ট’ সামগ্রিক উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। গ্যাস সংকটের কারণেও ব্যয় বেড়েছে–২৫ শতাংশের কম লোড ফ্যাক্টরে চলা কেন্দ্রগুলোর বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ছিল ইউনিটপ্রতি ১৬.৮৫ টাকা (০.১৩৭ মার্কিন ডলার), যেখানে ৭৫ শতাংশ লোড ফ্যাক্টরে চলা কেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রে এই খরচ ছিল মাত্র ৬ টাকা (০.০৪৯ মার্কিন ডলার)।”
ক্যাপসিটি পেমেন্ট হলো বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতের একটি বিশেষ ধরনের চার্জ বা মাশুল। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো উৎপাদন করুক বা না করুক, তারা বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে প্রস্তুত থাকলে কেন্দ্রগুলোকে যে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সরকারকে পরিশোধ করতে হয়, তাকেই ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বলে।
আমদানিকৃত জ্বালানি ও ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে আমদানির ওপর নির্ভরতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। তথ্যানুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রাথমিক জ্বালানি আমদানি যেখানে ছিল ৪৭.৭ শতাংশ, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬২.৫ শতাংশে। অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন কমে আসা এবং সীমিত বিনিয়োগের ফলে দেশ আজ আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটের অস্থিরতার মুখে অরক্ষিত।
বর্তমানে বিশ্বব্যাপী নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের গড় হার প্রায় ৩৩.৮ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশে এই হার মাত্র ২.৩ শতাংশ। এই বিশাল ব্যবধানই বলে দেয় যে, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ কতটা পিছিয়ে।
বিশ্ববাজারে জীবাশ্ম জ্বালানির যেকোনো অস্থিরতা বাংলাদেশের মতো প্রান্তিক আয়ের দেশের অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বৈদেশিক মুদ্রার সীমাবদ্ধতা এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।
উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির নেপথ্যে কি শুধু বিশ্ববাজার?
বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির জন্য সাধারণত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ডলারের দাম বৃদ্ধিকে দায়ী করা হয়। তবে গভীর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পদ্ধতিগত কিছু ত্রুটিও এই ব্যয়বৃদ্ধির জন্য সমানভাবে দায়ী। ২০২০-২১ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছরের মধ্যে গড় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় প্রতি ইউনিটে ৬.৬১ টাকা থেকে বেড়ে ১১.৩৩ টাকায় পৌঁছেছে। এর প্রধান কারণগুলো হলো–

২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৬১.৩ শতাংশ বিশাল রিজার্ভ মার্জিন লক্ষ্য করা গেছে। চাহিদার তুলনায় সক্ষমতা অনেক বেশি হওয়ায় অলস বসে থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বিপুল পরিমাণ ‘ক্যাপাসিটি পেমেন্ট’ দিতে হচ্ছে।
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ১০.৭ শতাংশ আসে ব্যয়বহুল ‘পিকিং প্ল্যান্ট’, যা সাধারণত ফার্নেস অয়েল বা ডিজেলে চলে এমন বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে হয়। প্রতিবেশী দেশ ভারত (০.০২ শতাংশ), পাকিস্তান (০.৬ শতাংশ) কিংবা ভিয়েতনামের (০.০৬ শতাংশ) তুলনায় এই হার অত্যধিক।
যেসব কেন্দ্র ২৫ শতাংশের কম লোড ফ্যাক্টরে চলেছে, সেগুলোর উৎপাদন ব্যয় প্রতি ইউনিটে প্রায় ১৬.৮৫ টাকা পর্যন্ত ঠেকেছে, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য এক বিশাল বোঝা।
এলএনজি নির্ভরতা ও ভর্তুকির চাপ
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সরবরাহ সংকট বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানির জন্য বাংলাদেশকে প্রায় ১.০৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিশাল ভর্তুকি দিতে হতে পারে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর এই চাপ শেষ পর্যন্ত লোডশেডিংকে অনিবার্য করে তুলতে পারে, যা শিল্পোৎপাদন ও জনজীবনকে বিপর্যস্ত করবে। ইতোমধ্যে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বহুজাতিক সংস্থাগুলোর কাছে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার সহায়তা চাওয়া হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি ঋণের বোঝা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
শফিকুল আলম বলেন, “২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ৫৫৬.৬ বিলিয়ন টাকার (৪.৫৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) রাজস্ব ঘাটতি রেকর্ড করেছে। পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাত জ্বালানি খাতের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর ওপর আর্থিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।”
পরিশেষে, জ্বালানি রূপান্তরের পথটি নির্ভর করছে বাস্তবসম্মত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ এবং একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে বিচক্ষণ নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর, যা আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর দেশটির ক্রমাগত নির্ভরতা এবং উচ্চ ভর্তুকির চাপ কমিয়ে আনবে।”
সমাধানের পথ: নবায়নযোগ্য ও আঞ্চলিক সহযোগিতা
এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট থেকে উত্তরণের উপায় হলো কয়েক দশকের পুরনো আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি সংস্কার করা। এ বিষয়ে কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছেন শফিকুল আলম। সেগুলো হলো–
সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের প্রসার আমদানিকৃত জ্বালানির বিকল্প হিসেবে কাজ করবে এবং উৎপাদন ব্যয় স্থিতিশীল রাখবে।
২০৩০ সাল পরবর্তী সময়ের জন্য নেপাল ও ভুটান থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানির সম্ভাবনা যাচাই করা প্রয়োজন। উচ্চ চাহিদার মৌসুমে (মার্চ-সেপ্টেম্বর) যদি ৬ হাজার মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ সংস্থান করা যায়, তবে বার্ষিক গ্যাসের চাহিদা ২৫৭ বিলিয়ন ঘনফুট পর্যন্ত কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশ-ভুটান-ভারত-নেপাল (বিবিআইএন) কাঠামোর আওতায় বিদ্যুৎ বিনিময়ের পাশাপাশি ভারতের সাশ্রয়ী ‘ডে-এহেড মার্কেট’ থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ের সুযোগটি কাজে লাগানো যেতে পারে।
এ ছাড়া শফিকুল আলম আরও বলেন, “বাংলাদেশের এই দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সমাধান ঘরের কাছেই রয়েছে; যেমন–অতিরিক্ত সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে রাখতে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সীমিত করা এবং পাশাপাশি বড় পরিসরে অভ্যন্তরীণ নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ঘটানো। এ ছাড়া, ‘স্পিনিং রিজার্ভ’ এবং গ্রিডের ভারসাম্য রক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনা করে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি পেমেন্ট এড়াতে সরকার এগুলোর কিছু অংশ নিজস্ব মালিকানায় রেখে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।”

বিদ্যুৎ খাতের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে কেবল উৎপাদন বাড়ানোই যথেষ্ট নয়, বরং এর ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। ‘সিস্টেম লস’ নিয়ন্ত্রণ এবং জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি করা গেলে এলএনজির চাহিদা অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব। শিল্পকারখানাগুলোকে তাদের নিজস্ব ‘ক্যাপটিভ পাওয়ার’ ছেড়ে সাশ্রয়ী গ্রিড বিদ্যুতে নিয়ে আসার জন্য বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন গ্রিড ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তিতে ধারাবাহিক বিনিয়োগ।
বিনিয়োগ আকর্ষণ ও নীতি সহায়তা
পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করা জরুরি। সরকার সম্প্রতি পিপিপি মডেলের অধীনে সরকারি জমি ব্যবহারের নির্দেশিকা অনুমোদন করেছে, যা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে প্রকল্প বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে জমি বরাদ্দ থেকে শুরু করে শুল্ক নির্ধারণ পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া প্রয়োজন।
এ ছাড়া, ‘করপোরেট পাওয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্ট’ (সিপিপিএ) এবং ‘ওপেন অ্যাক্সেস ট্যারিফ’ সুবিধা প্রদান করা হলে তৈরি পোশাক শিল্পের মতো বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের কার্যক্রমকে ‘গ্রিন’ বা পরিবেশবান্ধব করার সুযোগ পাবে। বিকেন্দ্রীভূত নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থার প্রসারের জন্য উচ্চ আমদানি শুল্ক মওকুফ করাও সময়ের দাবি।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো আসলে একটি বড় পরিবর্তনের সুযোগ। আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতি-নির্ভরশীলতা আমাদের অর্থনীতিকে ভঙ্গুর করে তুলছে। এখন সময় এসেছে একটি শক্তিশালী ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার, যা অভ্যন্তরীণ সম্পদ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেবে। পরিকল্পিত জ্বালানি রূপান্তরই পারে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা থেকে দেশকে সুরক্ষা দিতে এবং একটি টেকসই ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে। সরকারের দৃঢ় নীতি নির্ধারণ এবং বেসরকারি খাতের সক্রিয় অংশগ্রহণই হতে পারে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান।

বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং অস্থিতিশীল জ্বালানি বাজারের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন, ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপ ও জ্বালানি আমদানিতে আকাশচুম্বী ব্যয়–এই ত্রিমুখী সংকট দেশের ‘এনার্জি ট্রানজিশন’ বা জ্বালানি রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করার প্রয়োজনীয়তাকে আগের চেয়ে অনেক বেশি স্পষ্ট করে তুলেছে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত এক ধরনের দ্বিমুখী সংকটে ভুগছে। একদিকে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট, আমদানিনির্ভর জ্বালানির উচ্চ ব্যয়ের মতো বিষয় আছে। অন্যদিকে সাশ্রয়ী পথে হাঁটলে বিদ্যুৎ সরবরাহে শুরু হয় নাকাল দশা। লোডশেডিং এড়াতে গেলে উচ্চব্যয় মেনে নিতে হচ্ছে, আবার উচ্চব্যয় এড়াতে গেলে লোডশেডিংয়ের বাস্তবতা। এ যেন এক চক্র। এ থেকে বের হওয়ার ক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানি একটা উপায় হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর কেবল পরিবেশগত বিলাসিতা নয়, বরং এটি দেশের অর্থনীতিকে জীবাশ্ম জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ সংকট থেকে রক্ষার একটি প্রাকৃতিক সুরক্ষা কবচ।
গত চার বছরে বাংলাদেশের প্রাথমিক জ্বালানি আমদানি ৪৭.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬২.৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক জীবাশ্ম জ্বালানির অস্থির বাজারের প্রতি দেশের নাজুক অবস্থাকে প্রকাশ করার পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ৮৩ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছে। ব্যয়বহুল জীবাশ্ম জ্বালানি ও মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন ছাড়াও চাহিদার মন্থর গতির বিপরীতে বিপুল পরিমাণ ‘ক্যাপাসিটি পেমেন্ট’ বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির পেছনে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়্যাল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) ‘ফস্টারিং বাংলাদেশ’স এনার্জি ট্রানজিশন’ শীর্ষক নতুন গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে আইইইএফএ’র গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০-২১ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছরের মধ্যে কয়লার গড় দাম ২৯০ শতাংশ বৃদ্ধি, স্বল্প সময়ের জন্য তেলের উচ্চমূল্য এবং মুদ্রার ব্যাপক অবমূল্যায়ন বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়কে নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে ২০২২-২৩ অর্থবছরের তুলনায় কয়লার দাম ৫৯.৭ শতাংশ হ্রাস পাওয়া এবং তেলের দাম কম থাকা সত্ত্বেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন খরচ কমেনি।
প্রতিবেদনটির লেখক এবং আইইইএফএ-র প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, “২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেসরকারি তেল ও কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে যথাক্রমে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় প্রায় ৯.৫ টাকা (০.০৭৭ মার্কিন ডলার) এবং ৫.৯ টাকা (০.০৪৮ মার্কিন ডলার) হারে দেওয়া গড় ‘ক্যাপাসিটি পেমেন্ট’ সামগ্রিক উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। গ্যাস সংকটের কারণেও ব্যয় বেড়েছে–২৫ শতাংশের কম লোড ফ্যাক্টরে চলা কেন্দ্রগুলোর বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ছিল ইউনিটপ্রতি ১৬.৮৫ টাকা (০.১৩৭ মার্কিন ডলার), যেখানে ৭৫ শতাংশ লোড ফ্যাক্টরে চলা কেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রে এই খরচ ছিল মাত্র ৬ টাকা (০.০৪৯ মার্কিন ডলার)।”
ক্যাপসিটি পেমেন্ট হলো বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতের একটি বিশেষ ধরনের চার্জ বা মাশুল। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো উৎপাদন করুক বা না করুক, তারা বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে প্রস্তুত থাকলে কেন্দ্রগুলোকে যে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সরকারকে পরিশোধ করতে হয়, তাকেই ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বলে।
আমদানিকৃত জ্বালানি ও ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে আমদানির ওপর নির্ভরতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। তথ্যানুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রাথমিক জ্বালানি আমদানি যেখানে ছিল ৪৭.৭ শতাংশ, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬২.৫ শতাংশে। অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন কমে আসা এবং সীমিত বিনিয়োগের ফলে দেশ আজ আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটের অস্থিরতার মুখে অরক্ষিত।
বর্তমানে বিশ্বব্যাপী নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের গড় হার প্রায় ৩৩.৮ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশে এই হার মাত্র ২.৩ শতাংশ। এই বিশাল ব্যবধানই বলে দেয় যে, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ কতটা পিছিয়ে।
বিশ্ববাজারে জীবাশ্ম জ্বালানির যেকোনো অস্থিরতা বাংলাদেশের মতো প্রান্তিক আয়ের দেশের অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বৈদেশিক মুদ্রার সীমাবদ্ধতা এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।
উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির নেপথ্যে কি শুধু বিশ্ববাজার?
বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির জন্য সাধারণত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ডলারের দাম বৃদ্ধিকে দায়ী করা হয়। তবে গভীর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পদ্ধতিগত কিছু ত্রুটিও এই ব্যয়বৃদ্ধির জন্য সমানভাবে দায়ী। ২০২০-২১ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছরের মধ্যে গড় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় প্রতি ইউনিটে ৬.৬১ টাকা থেকে বেড়ে ১১.৩৩ টাকায় পৌঁছেছে। এর প্রধান কারণগুলো হলো–

২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৬১.৩ শতাংশ বিশাল রিজার্ভ মার্জিন লক্ষ্য করা গেছে। চাহিদার তুলনায় সক্ষমতা অনেক বেশি হওয়ায় অলস বসে থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বিপুল পরিমাণ ‘ক্যাপাসিটি পেমেন্ট’ দিতে হচ্ছে।
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ১০.৭ শতাংশ আসে ব্যয়বহুল ‘পিকিং প্ল্যান্ট’, যা সাধারণত ফার্নেস অয়েল বা ডিজেলে চলে এমন বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে হয়। প্রতিবেশী দেশ ভারত (০.০২ শতাংশ), পাকিস্তান (০.৬ শতাংশ) কিংবা ভিয়েতনামের (০.০৬ শতাংশ) তুলনায় এই হার অত্যধিক।
যেসব কেন্দ্র ২৫ শতাংশের কম লোড ফ্যাক্টরে চলেছে, সেগুলোর উৎপাদন ব্যয় প্রতি ইউনিটে প্রায় ১৬.৮৫ টাকা পর্যন্ত ঠেকেছে, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য এক বিশাল বোঝা।
এলএনজি নির্ভরতা ও ভর্তুকির চাপ
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সরবরাহ সংকট বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানির জন্য বাংলাদেশকে প্রায় ১.০৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিশাল ভর্তুকি দিতে হতে পারে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর এই চাপ শেষ পর্যন্ত লোডশেডিংকে অনিবার্য করে তুলতে পারে, যা শিল্পোৎপাদন ও জনজীবনকে বিপর্যস্ত করবে। ইতোমধ্যে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বহুজাতিক সংস্থাগুলোর কাছে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার সহায়তা চাওয়া হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি ঋণের বোঝা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
শফিকুল আলম বলেন, “২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ৫৫৬.৬ বিলিয়ন টাকার (৪.৫৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) রাজস্ব ঘাটতি রেকর্ড করেছে। পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাত জ্বালানি খাতের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর ওপর আর্থিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।”
পরিশেষে, জ্বালানি রূপান্তরের পথটি নির্ভর করছে বাস্তবসম্মত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ এবং একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে বিচক্ষণ নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর, যা আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর দেশটির ক্রমাগত নির্ভরতা এবং উচ্চ ভর্তুকির চাপ কমিয়ে আনবে।”
সমাধানের পথ: নবায়নযোগ্য ও আঞ্চলিক সহযোগিতা
এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট থেকে উত্তরণের উপায় হলো কয়েক দশকের পুরনো আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি সংস্কার করা। এ বিষয়ে কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছেন শফিকুল আলম। সেগুলো হলো–
সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের প্রসার আমদানিকৃত জ্বালানির বিকল্প হিসেবে কাজ করবে এবং উৎপাদন ব্যয় স্থিতিশীল রাখবে।
২০৩০ সাল পরবর্তী সময়ের জন্য নেপাল ও ভুটান থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানির সম্ভাবনা যাচাই করা প্রয়োজন। উচ্চ চাহিদার মৌসুমে (মার্চ-সেপ্টেম্বর) যদি ৬ হাজার মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ সংস্থান করা যায়, তবে বার্ষিক গ্যাসের চাহিদা ২৫৭ বিলিয়ন ঘনফুট পর্যন্ত কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশ-ভুটান-ভারত-নেপাল (বিবিআইএন) কাঠামোর আওতায় বিদ্যুৎ বিনিময়ের পাশাপাশি ভারতের সাশ্রয়ী ‘ডে-এহেড মার্কেট’ থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ের সুযোগটি কাজে লাগানো যেতে পারে।
এ ছাড়া শফিকুল আলম আরও বলেন, “বাংলাদেশের এই দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সমাধান ঘরের কাছেই রয়েছে; যেমন–অতিরিক্ত সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে রাখতে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সীমিত করা এবং পাশাপাশি বড় পরিসরে অভ্যন্তরীণ নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ঘটানো। এ ছাড়া, ‘স্পিনিং রিজার্ভ’ এবং গ্রিডের ভারসাম্য রক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনা করে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি পেমেন্ট এড়াতে সরকার এগুলোর কিছু অংশ নিজস্ব মালিকানায় রেখে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।”

বিদ্যুৎ খাতের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে কেবল উৎপাদন বাড়ানোই যথেষ্ট নয়, বরং এর ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। ‘সিস্টেম লস’ নিয়ন্ত্রণ এবং জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি করা গেলে এলএনজির চাহিদা অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব। শিল্পকারখানাগুলোকে তাদের নিজস্ব ‘ক্যাপটিভ পাওয়ার’ ছেড়ে সাশ্রয়ী গ্রিড বিদ্যুতে নিয়ে আসার জন্য বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন গ্রিড ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তিতে ধারাবাহিক বিনিয়োগ।
বিনিয়োগ আকর্ষণ ও নীতি সহায়তা
পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করা জরুরি। সরকার সম্প্রতি পিপিপি মডেলের অধীনে সরকারি জমি ব্যবহারের নির্দেশিকা অনুমোদন করেছে, যা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে প্রকল্প বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে জমি বরাদ্দ থেকে শুরু করে শুল্ক নির্ধারণ পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া প্রয়োজন।
এ ছাড়া, ‘করপোরেট পাওয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্ট’ (সিপিপিএ) এবং ‘ওপেন অ্যাক্সেস ট্যারিফ’ সুবিধা প্রদান করা হলে তৈরি পোশাক শিল্পের মতো বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের কার্যক্রমকে ‘গ্রিন’ বা পরিবেশবান্ধব করার সুযোগ পাবে। বিকেন্দ্রীভূত নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থার প্রসারের জন্য উচ্চ আমদানি শুল্ক মওকুফ করাও সময়ের দাবি।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো আসলে একটি বড় পরিবর্তনের সুযোগ। আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতি-নির্ভরশীলতা আমাদের অর্থনীতিকে ভঙ্গুর করে তুলছে। এখন সময় এসেছে একটি শক্তিশালী ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার, যা অভ্যন্তরীণ সম্পদ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেবে। পরিকল্পিত জ্বালানি রূপান্তরই পারে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা থেকে দেশকে সুরক্ষা দিতে এবং একটি টেকসই ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে। সরকারের দৃঢ় নীতি নির্ধারণ এবং বেসরকারি খাতের সক্রিয় অংশগ্রহণই হতে পারে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান।

বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং অস্থিতিশীল জ্বালানি বাজারের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন, ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপ ও জ্বালানি আমদানিতে আকাশচুম্বী ব্যয়–এই ত্রিমুখী সংকট দেশের ‘এনার্জি ট্রানজিশন’ বা জ্বালানি রূপান্তরকে ত্বরান্বিত