সামদানী হক নাজুম, ঢাকা

গত ২৮ মে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী এলাকা থেকে ছিনতাইয়ের অভিযোগে মো. পারভেজ ও রিয়াজুর রহমান নামের দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ সময় তাদের কাছ থেকে ধারালো দেশীয় অস্ত্রসহ একটি রিভলভার ও গুলি উদ্ধার করে পুলিশ। পরে জানা যায়, গত বছরের ৫ আগস্ট পাহাড়তলী থানা থেকে লুট হয়েছিল সেই রিভলবার ও গুলি।
এভাবে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারের খবর মিলছে প্রতিনিয়ত। কখনো চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি বা খুনের মতো অপরাধের তদন্তে গিয়ে, আবার কখনো অস্ত্র কেনা–বেচার মতো সংঘবদ্ধ অপরাধের তদন্তে নেমে হদিস মিলছে লুট হওয়া অস্ত্রের। শুধু অপরাধী নয়, কখনো ভ্যানচালক, কখনো আপাত–সাধারণ ব্যক্তির কাছ থেকে উদ্ধার হচ্ছে অস্ত্র। সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের বদলে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশ অনেকটা কপালের ওপরই নির্ভর করছে।

কিছু ঘটনার দিকে নজর দেওয়া যাক। প্রথম যে পারভেজ ও রিয়াজুরের কথা বলা হলো, তারা পাহাড়তলী থানা থেকে লুট করা অস্ত্র দিয়ে পাহাড়তলী টোল সড়কে বিমানবন্দর ও পতেঙ্গাগামী যাত্রীদের ছিনতাই করত। চট্টগ্রামেই মো. রুবেল নামের এক কাভার্ডভ্যান চালকের কাছ থেকেও উদ্ধার হয়েছে পুলিশের অস্ত্র। চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানা থেকে লুট হওয়া একটি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, দুটি গুলি উদ্ধার হয় ওই চালকের কাছ থেকে।
এখানে বলা যেতে পারে ময়মনসিংহের কোতোয়ালির মো. মোতালেবের মেয়ে শাহিদা ইসলামের কথা। পুরান ঢাকার ওয়ারীতে মা ও ভাইয়ের সঙ্গে ভাড়া বাসায় থাকতেন তিনি। গত বছরের নভেম্বরে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের পাশ থেকে উদ্ধার করা হয় তার গুলিবিদ্ধ লাশ। সুরতহালে শাহিদার শরীরে আটটি গুলির ক্ষত দৃশ্যমান হয়।
এ ঘটনায় তার প্রেমিক তৌহিদ শেখ তন্ময়কে গ্রেপ্তারের পর জানা যায়, আড়াই মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন শাহিদা এবং বিয়ের জন্য প্রেমিককে চাপ দিচ্ছিলেন তিনি। এতে শাহিদার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে নিজের কাছে থাকা রিভলবার দিয়ে গুলি করে প্রেমিকাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন তন্ময়। এরপর ঘুরতে যাওয়ার কথা বলে এক্সপ্রেসওয়ের পাশে নির্জন জায়গায় নিয়ে ৮ রাউন্ড গুলি করে হত্যা করেন শাহিদাকে।
প্রশ্ন হলো তন্ময়ের মতো সাধারণ যুবক রিভলবার কোথায় পেলেন? পুলিশের তদন্তে উঠে আসে, ২০২৪ সালে রাজধানীর ওয়ারী থানায় হামলা ও লুটপাটকারীদের মধ্যে তন্ময় একজন। তিনি থানা থেকে রিভলবার ও গুলি লুট করে নিজের কাছে লুকিয়ে রাখেন। প্রেমিকাকে হত্যার পরিকল্পনার পর ইউটিউব দেখে তা চালনা শেখেন। হত্যার পর অস্ত্রটি ঘটনাস্থলের পাশের পুকুরে ফেলে দেন তিনি। পরে সেখান থেকেই উদ্ধার হয় ওয়ারী থানা পুলিশের লুট হওয়া এই অস্ত্র।
এমন আরও কিছু ঘটনার দিকে নজর দেওয়া যাক—গত ৪ এপ্রিল একটি বিশেষ অভিযানে ফারুক হোসেন ও খাইরুল সরদার নামের দুই যুবককে গ্রেপ্তার করে খুলনা সদর থানা পুলিশ। তারা দুজন অবৈধ অস্ত্র কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত। তাদের কাছ থেকে দুটি বিদেশি পিস্তল, একটি শটগান ও শটগানের সাতটি গুলি উদ্ধার করা হয়, যা ছিল পুলিশের লুণ্ঠিত অস্ত্র।
পুলিশের অস্ত্র মিলেছে রাজনৈতিক কর্মীদের কাছেও। গত ৩ মার্চ রাতে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায় ডাকাত সন্দেহে গণপিটুনির শিকার হয়ে মোহাম্মদ নেজাম উদ্দিন ও মোহাম্মদ সালেক নামের দুজন স্থানীয় জামায়াত কর্মী মারা যান। গণপিটুনির সময় নিহত নেজাম তার সঙ্গে থাকা পিস্তল থেকে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়েন। এতে ৪ জন গুলিবিদ্ধ হয়। পরে জানা যায়, পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র অবৈধভাবে ব্যবহার করছিলেন নেজাম।
এ ছাড়া গত ১৭ এপ্রিল চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র-গুলিসহ আরিফ হোসেন নামের এক ছিনতাকারী গ্রেপ্তার হয়। ১৯ জুন চট্টগ্রামের জেলেপাড়া রানী রাশমণিঘাট এলাকা থেকে স্থানীয় সন্ত্রাসী গ্রুপের প্রধান সাইদুর রহমান মাসুম ওরফে রেড মাসুমকে গ্রেপ্তার হয়। তার কাছ থেকে উদ্ধার হয় পুলিশের একটি পিস্তল ও চারটি গুলি।
দেখা যাচ্ছে, ছিনতাইয়ের মতো ছোটখাটো অপরাধ যেমন, তেমনি অস্ত্র কেনা–বেচার মতো সংঘবদ্ধ অপরাধে জড়িতদের কাছ থেকে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে। আবার তন্ময়ের মতো অস্ত্র চালনায় অদক্ষ একজন বা মো. রুবেলের মতো কাভার্ডভ্যান চালকের কাছ থেকেও অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে। বাদ যাচ্ছে না, মোহাম্মদ নেজাম উদ্দিনের মতো রাজনৈতিক কর্মীও।
লুট অস্ত্রের কতগুলো পাওয়া গেছে
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের ৪৬০টি থানা ও ১১৪টি ফাঁড়িতে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট হয়। এসব ঘটনায় ৫ হাজার ৭৫৩টি অস্ত্র লুট হয়।
এই লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে অন্তত ১৩০০ অস্ত্রের খোঁজ এখনো মেলেনি। যদিও এ সংখ্যা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে পালানো ৭২১ বন্দির কোনো হদিস নেই। উদ্ধার হয়নি কারা কর্তৃপক্ষের ২০টি শটগান ও চায়নিজ রাইফেল।
গণ-অভূত্থান পরবর্তী সময়ে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে বরাবরই বলা হয় পুলিশের লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন সময় যৌথবাহিনীর অভিযানসহ আর্থিক পুরষ্কারও ঘোষণা করেছে সরকার। তবু প্রায় দেড় বছর হতে চললেও লুণ্ঠিত অস্ত্রের এক–চতুর্থাংশ এখনো বেহাত। এসব অস্ত্র উদ্ধারে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অস্ত্র উদ্ধারে লুট হওয়া অস্ত্রের কয়েক হাত বদল হওয়া এ ক্ষেত্রে অন্যতম চ্যালেঞ্জ। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সদস্যের মতে, ৫ আগস্ট লুট হওয়া অস্ত্রগুলো কয়েক হাত বদল হয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসী, অপরাধী চক্রের কাছে চলে গেছে। আবার কিছু অস্ত্র দেশের বাইরেও পাচার হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
এ–সংক্রান্ত এক ব্রিফিংয়ে র্যাব-২ এর উপ-অধিনায়ক মেজর মোহাম্মদ নাজমুল্লাহেল ওয়াদুদ সংবাদমাধ্যমকে জানান, পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র কয়েক হাত বদল হওয়ায় তা উদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তার মতে, থানা লুটের সঙ্গে শুধু চিহ্নিত অপরাধীরা জড়িত থাকলে অস্ত্র উদ্ধারে তেমন বেগ পেতে হতো না। লুটের সঙ্গে অন্যান্য অপরাধীর সঙ্গে সাধারণরাও জড়িত ছিল। তাই লুটের পর এই অস্ত্রগুলোর প্রথম গন্তব্য সম্পর্কে ধারণা করা সম্ভব হয়নি। ফলে এগুলো পরে হাত বদলের সময় পেয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই গোয়েন্দা কর্মকর্তা চরচাকে বলেন, ৫ আগস্ট ঘোষণা দিয়ে থানাগুলোতে হামলা লুটপাট হয়েছে। সেখানে হামলাকারীদের মধ্যে রাস্তার টোকাই-অপরাধী যেমন ছিল, তেমনি ছিল সাধারণ ছাত্র–জনতা। সমাজে যে ব্যক্তি ভদ্রলোক হিসেবে পরিচিত, তিনিও দেখা গেছে সেই হামলায় অংশ নিয়েছেন। আর থানায় হামলার ঘটনায় নেতৃত্ব দিয়েছে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা। সে সময় অপরাধীরা যেমন অস্ত্র নিয়েছে, তেমনি রাজনৈতিক ব্যক্তিরাও নিয়েছে, ছাত্র কিংবা ভদ্রলোকও নিয়েছে। মূল সমস্যা হলো এখানে।
এই গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, “এই লুটপাট যদি শুধু অপরাধীরা করত, তাহলে অপরাধীদের ডেটাবেইজ ধরে আমরা সব অস্ত্র উদ্ধার করে ফেলতাম। কিন্তু যে সাধারণ ছাত্রটি একটি অস্ত্র নিয়ে তার বাড়ির উঠানে মাটি খুঁড়ে লুকিয়ে রেখেছে, সেটা আমরা পাব কীভাবে? তাছাড়া অভিযান শুরু হতেও টাইম লেগেছে। এই সুযোগে অস্ত্র কয়েক হাত বদল হয়েছে। কোনো কোনোটা হয়তো চোরাকারবারির হাত ধরে সীমান্তও পাড়ি দিয়েছে। তাই সব অস্ত্র যে উদ্ধার হবে, তা কনফিডেন্সের সঙ্গে বলাও কঠিন।”
এ ছাড়া ৫ আগস্টের পর থেকে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন অভিযানে যত অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে, সেগুলোর মধ্যে পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র থাকছে কি না, তা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয় বাহিনীগুলোকে।
এ বিষয়ে সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের রমনা বিভাগের উপ-কমিশনার আমির খসরু বলেন, “জুলাই–আগস্টের অভ্যুত্থানে বিভিন্ন থানা থেকে পুলিশের অস্ত্র লুটের পর থেকে আমরা যেকোনো অস্ত্র উদ্ধার করে মিলিয়ে দেখি, সেখানে লুট হওয়া কোনো অস্ত্র আছে কিনা।”
অর্থাৎ, যৌথবাহিনীর অভিযানের পর থেকে পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারের ক্ষেত্রে আইন–শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মুখ্যত কপালের ওপর নির্ভর করছে। এ ক্ষেত্রে গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পরিকল্পিত অভিযানের বদলে বিভিন্ন নিয়মিত অভিযানে উদ্ধার হওয়া অস্ত্র মিলিয়ে দেখাটাই অন্যতম উপায় হিসেবে সামনে হাজির হয়েছে। কোনো অভিযানে বা ছিনতাই, ডাকাতি বা এমন কোনো ঘটনার তদন্তে নেমে সেই তদন্তের সূত্রে অস্ত্র উদ্ধার হলেই তবে তা লুট হওয়া অস্ত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার সুযোগটি আসছে। সঙ্গে আছে অস্ত্র উদ্ধারে সাধারণ জনগণের সহায়তা চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া পুরস্কার ঘোষণা, যা এ বিষয়ে সরকার ও প্রশাসনের নিরুপায় দশারই পরিচায়ক। বিষয়টা অনেকটা এমন যে, কপাল ভালো থাকলে লুটের অস্ত্র মিলবে, না হলে না।

গত ২৮ মে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী এলাকা থেকে ছিনতাইয়ের অভিযোগে মো. পারভেজ ও রিয়াজুর রহমান নামের দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ সময় তাদের কাছ থেকে ধারালো দেশীয় অস্ত্রসহ একটি রিভলভার ও গুলি উদ্ধার করে পুলিশ। পরে জানা যায়, গত বছরের ৫ আগস্ট পাহাড়তলী থানা থেকে লুট হয়েছিল সেই রিভলবার ও গুলি।
এভাবে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারের খবর মিলছে প্রতিনিয়ত। কখনো চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি বা খুনের মতো অপরাধের তদন্তে গিয়ে, আবার কখনো অস্ত্র কেনা–বেচার মতো সংঘবদ্ধ অপরাধের তদন্তে নেমে হদিস মিলছে লুট হওয়া অস্ত্রের। শুধু অপরাধী নয়, কখনো ভ্যানচালক, কখনো আপাত–সাধারণ ব্যক্তির কাছ থেকে উদ্ধার হচ্ছে অস্ত্র। সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের বদলে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশ অনেকটা কপালের ওপরই নির্ভর করছে।

কিছু ঘটনার দিকে নজর দেওয়া যাক। প্রথম যে পারভেজ ও রিয়াজুরের কথা বলা হলো, তারা পাহাড়তলী থানা থেকে লুট করা অস্ত্র দিয়ে পাহাড়তলী টোল সড়কে বিমানবন্দর ও পতেঙ্গাগামী যাত্রীদের ছিনতাই করত। চট্টগ্রামেই মো. রুবেল নামের এক কাভার্ডভ্যান চালকের কাছ থেকেও উদ্ধার হয়েছে পুলিশের অস্ত্র। চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানা থেকে লুট হওয়া একটি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, দুটি গুলি উদ্ধার হয় ওই চালকের কাছ থেকে।
এখানে বলা যেতে পারে ময়মনসিংহের কোতোয়ালির মো. মোতালেবের মেয়ে শাহিদা ইসলামের কথা। পুরান ঢাকার ওয়ারীতে মা ও ভাইয়ের সঙ্গে ভাড়া বাসায় থাকতেন তিনি। গত বছরের নভেম্বরে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের পাশ থেকে উদ্ধার করা হয় তার গুলিবিদ্ধ লাশ। সুরতহালে শাহিদার শরীরে আটটি গুলির ক্ষত দৃশ্যমান হয়।
এ ঘটনায় তার প্রেমিক তৌহিদ শেখ তন্ময়কে গ্রেপ্তারের পর জানা যায়, আড়াই মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন শাহিদা এবং বিয়ের জন্য প্রেমিককে চাপ দিচ্ছিলেন তিনি। এতে শাহিদার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে নিজের কাছে থাকা রিভলবার দিয়ে গুলি করে প্রেমিকাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন তন্ময়। এরপর ঘুরতে যাওয়ার কথা বলে এক্সপ্রেসওয়ের পাশে নির্জন জায়গায় নিয়ে ৮ রাউন্ড গুলি করে হত্যা করেন শাহিদাকে।
প্রশ্ন হলো তন্ময়ের মতো সাধারণ যুবক রিভলবার কোথায় পেলেন? পুলিশের তদন্তে উঠে আসে, ২০২৪ সালে রাজধানীর ওয়ারী থানায় হামলা ও লুটপাটকারীদের মধ্যে তন্ময় একজন। তিনি থানা থেকে রিভলবার ও গুলি লুট করে নিজের কাছে লুকিয়ে রাখেন। প্রেমিকাকে হত্যার পরিকল্পনার পর ইউটিউব দেখে তা চালনা শেখেন। হত্যার পর অস্ত্রটি ঘটনাস্থলের পাশের পুকুরে ফেলে দেন তিনি। পরে সেখান থেকেই উদ্ধার হয় ওয়ারী থানা পুলিশের লুট হওয়া এই অস্ত্র।
এমন আরও কিছু ঘটনার দিকে নজর দেওয়া যাক—গত ৪ এপ্রিল একটি বিশেষ অভিযানে ফারুক হোসেন ও খাইরুল সরদার নামের দুই যুবককে গ্রেপ্তার করে খুলনা সদর থানা পুলিশ। তারা দুজন অবৈধ অস্ত্র কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত। তাদের কাছ থেকে দুটি বিদেশি পিস্তল, একটি শটগান ও শটগানের সাতটি গুলি উদ্ধার করা হয়, যা ছিল পুলিশের লুণ্ঠিত অস্ত্র।
পুলিশের অস্ত্র মিলেছে রাজনৈতিক কর্মীদের কাছেও। গত ৩ মার্চ রাতে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায় ডাকাত সন্দেহে গণপিটুনির শিকার হয়ে মোহাম্মদ নেজাম উদ্দিন ও মোহাম্মদ সালেক নামের দুজন স্থানীয় জামায়াত কর্মী মারা যান। গণপিটুনির সময় নিহত নেজাম তার সঙ্গে থাকা পিস্তল থেকে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়েন। এতে ৪ জন গুলিবিদ্ধ হয়। পরে জানা যায়, পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র অবৈধভাবে ব্যবহার করছিলেন নেজাম।
এ ছাড়া গত ১৭ এপ্রিল চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র-গুলিসহ আরিফ হোসেন নামের এক ছিনতাকারী গ্রেপ্তার হয়। ১৯ জুন চট্টগ্রামের জেলেপাড়া রানী রাশমণিঘাট এলাকা থেকে স্থানীয় সন্ত্রাসী গ্রুপের প্রধান সাইদুর রহমান মাসুম ওরফে রেড মাসুমকে গ্রেপ্তার হয়। তার কাছ থেকে উদ্ধার হয় পুলিশের একটি পিস্তল ও চারটি গুলি।
দেখা যাচ্ছে, ছিনতাইয়ের মতো ছোটখাটো অপরাধ যেমন, তেমনি অস্ত্র কেনা–বেচার মতো সংঘবদ্ধ অপরাধে জড়িতদের কাছ থেকে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে। আবার তন্ময়ের মতো অস্ত্র চালনায় অদক্ষ একজন বা মো. রুবেলের মতো কাভার্ডভ্যান চালকের কাছ থেকেও অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে। বাদ যাচ্ছে না, মোহাম্মদ নেজাম উদ্দিনের মতো রাজনৈতিক কর্মীও।
লুট অস্ত্রের কতগুলো পাওয়া গেছে
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের ৪৬০টি থানা ও ১১৪টি ফাঁড়িতে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট হয়। এসব ঘটনায় ৫ হাজার ৭৫৩টি অস্ত্র লুট হয়।
এই লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে অন্তত ১৩০০ অস্ত্রের খোঁজ এখনো মেলেনি। যদিও এ সংখ্যা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে পালানো ৭২১ বন্দির কোনো হদিস নেই। উদ্ধার হয়নি কারা কর্তৃপক্ষের ২০টি শটগান ও চায়নিজ রাইফেল।
গণ-অভূত্থান পরবর্তী সময়ে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে বরাবরই বলা হয় পুলিশের লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন সময় যৌথবাহিনীর অভিযানসহ আর্থিক পুরষ্কারও ঘোষণা করেছে সরকার। তবু প্রায় দেড় বছর হতে চললেও লুণ্ঠিত অস্ত্রের এক–চতুর্থাংশ এখনো বেহাত। এসব অস্ত্র উদ্ধারে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অস্ত্র উদ্ধারে লুট হওয়া অস্ত্রের কয়েক হাত বদল হওয়া এ ক্ষেত্রে অন্যতম চ্যালেঞ্জ। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সদস্যের মতে, ৫ আগস্ট লুট হওয়া অস্ত্রগুলো কয়েক হাত বদল হয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসী, অপরাধী চক্রের কাছে চলে গেছে। আবার কিছু অস্ত্র দেশের বাইরেও পাচার হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
এ–সংক্রান্ত এক ব্রিফিংয়ে র্যাব-২ এর উপ-অধিনায়ক মেজর মোহাম্মদ নাজমুল্লাহেল ওয়াদুদ সংবাদমাধ্যমকে জানান, পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র কয়েক হাত বদল হওয়ায় তা উদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তার মতে, থানা লুটের সঙ্গে শুধু চিহ্নিত অপরাধীরা জড়িত থাকলে অস্ত্র উদ্ধারে তেমন বেগ পেতে হতো না। লুটের সঙ্গে অন্যান্য অপরাধীর সঙ্গে সাধারণরাও জড়িত ছিল। তাই লুটের পর এই অস্ত্রগুলোর প্রথম গন্তব্য সম্পর্কে ধারণা করা সম্ভব হয়নি। ফলে এগুলো পরে হাত বদলের সময় পেয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই গোয়েন্দা কর্মকর্তা চরচাকে বলেন, ৫ আগস্ট ঘোষণা দিয়ে থানাগুলোতে হামলা লুটপাট হয়েছে। সেখানে হামলাকারীদের মধ্যে রাস্তার টোকাই-অপরাধী যেমন ছিল, তেমনি ছিল সাধারণ ছাত্র–জনতা। সমাজে যে ব্যক্তি ভদ্রলোক হিসেবে পরিচিত, তিনিও দেখা গেছে সেই হামলায় অংশ নিয়েছেন। আর থানায় হামলার ঘটনায় নেতৃত্ব দিয়েছে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা। সে সময় অপরাধীরা যেমন অস্ত্র নিয়েছে, তেমনি রাজনৈতিক ব্যক্তিরাও নিয়েছে, ছাত্র কিংবা ভদ্রলোকও নিয়েছে। মূল সমস্যা হলো এখানে।
এই গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, “এই লুটপাট যদি শুধু অপরাধীরা করত, তাহলে অপরাধীদের ডেটাবেইজ ধরে আমরা সব অস্ত্র উদ্ধার করে ফেলতাম। কিন্তু যে সাধারণ ছাত্রটি একটি অস্ত্র নিয়ে তার বাড়ির উঠানে মাটি খুঁড়ে লুকিয়ে রেখেছে, সেটা আমরা পাব কীভাবে? তাছাড়া অভিযান শুরু হতেও টাইম লেগেছে। এই সুযোগে অস্ত্র কয়েক হাত বদল হয়েছে। কোনো কোনোটা হয়তো চোরাকারবারির হাত ধরে সীমান্তও পাড়ি দিয়েছে। তাই সব অস্ত্র যে উদ্ধার হবে, তা কনফিডেন্সের সঙ্গে বলাও কঠিন।”
এ ছাড়া ৫ আগস্টের পর থেকে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন অভিযানে যত অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে, সেগুলোর মধ্যে পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র থাকছে কি না, তা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয় বাহিনীগুলোকে।
এ বিষয়ে সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের রমনা বিভাগের উপ-কমিশনার আমির খসরু বলেন, “জুলাই–আগস্টের অভ্যুত্থানে বিভিন্ন থানা থেকে পুলিশের অস্ত্র লুটের পর থেকে আমরা যেকোনো অস্ত্র উদ্ধার করে মিলিয়ে দেখি, সেখানে লুট হওয়া কোনো অস্ত্র আছে কিনা।”
অর্থাৎ, যৌথবাহিনীর অভিযানের পর থেকে পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারের ক্ষেত্রে আইন–শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মুখ্যত কপালের ওপর নির্ভর করছে। এ ক্ষেত্রে গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পরিকল্পিত অভিযানের বদলে বিভিন্ন নিয়মিত অভিযানে উদ্ধার হওয়া অস্ত্র মিলিয়ে দেখাটাই অন্যতম উপায় হিসেবে সামনে হাজির হয়েছে। কোনো অভিযানে বা ছিনতাই, ডাকাতি বা এমন কোনো ঘটনার তদন্তে নেমে সেই তদন্তের সূত্রে অস্ত্র উদ্ধার হলেই তবে তা লুট হওয়া অস্ত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার সুযোগটি আসছে। সঙ্গে আছে অস্ত্র উদ্ধারে সাধারণ জনগণের সহায়তা চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া পুরস্কার ঘোষণা, যা এ বিষয়ে সরকার ও প্রশাসনের নিরুপায় দশারই পরিচায়ক। বিষয়টা অনেকটা এমন যে, কপাল ভালো থাকলে লুটের অস্ত্র মিলবে, না হলে না।

বস্তিগুলোতে আগুন লাগার মূল কারণ হচ্ছে সম্পূর্ণ অপরিকল্পিত বৈদ্যুতিক সংযোগ, নিয়ম না মেনে সিলিন্ডার বা লাইন গ্যাসের অনিরাপদ ব্যবহার, বিড়ি-সিগারেট, মশার কয়েল ও খোলা বাতির ব্যবহার, উন্মুক্ত চুলা ও হিটারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহার। উদাসীনতা ও অসাবধানতা এই ঝুঁকি আরও বাড়ায়

সম্প্রতি কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে সাবেক খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের সঙ্গে কথা বলেছেন তার আইনজীবী মোরশেদ হোসেন। তিনি বলেন, “কারাগারে সাধন চন্দ্র মজুমদারের সঙ্গে যখন কথা হয়, তখন তিনি কেবল সাবেক শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদের মৃত্যুর প্রসঙ্গে কথা বলতে থাকেন। নুরুল মজিদের মৃত্যু অন্য নেতাদের ভীষণ চিন্ত