Advertisement Banner

বর্ণবাদ কি সত্যিই শেষ?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
বর্ণবাদ কি সত্যিই শেষ?
ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

জর্জ ফ্লয়েডের কথা মনে আছে?

সেই যে কৃষ্ণাঙ্গ লোকটা, যার গলায় হাঁটু চেপে ধরেছিল পুলিশ। আর ‘আই কান্ট ব্রিদ’ বলে শেষ চেষ্টা করেও বাঁচতে পারেনি যে। সেই জর্জ ফ্লয়েড, যার মৃত্যুতে শুরু হয়েছিল–আস্ত এক আন্দোলন– ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’

নিউইয়র্কের রাস্তা বর্ণবাদের বিরুদ্ধে কেঁপে উঠেছিল তারপর। এই তো বেশি আগে নয়। ২০২০ সাল তখন।

অথচ বর্ণবাদ মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল না? দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাস সামনে টেনে তো বলা হয়েছিল–এই দেখ বর্ণবাদ বিদায় নিয়েছে। মানুষ আর জাতি, লিঙ্গ, গাত্রবর্ণ দিয়ে মানুষের বিচার করবে না–এই তো ছিল আমাদের গৌরবের অন্যতম পালক। কিন্তু জর্জ ফ্লয়েড আমাদের জানিয়ে দিয়ে যান যে, ওটা ভাঁওতা কেবল।

অথচ সেই ১৯৯২ সালের পর আর এ নিয়ে আলাপ পাড়বার কথা ছিল না। কেন? কারণ, ১৯৯২ সালের ১৭ মার্চ, অর্থাৎ, আজকের দিনে দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গরা সংখ্যালঘু শাসনের অবসানের পক্ষে এক গণভোটে বিপুল ব্যবধানে ভোট দেয়, যেখানে ৬৮.৭ শতাংশ মানুষ এর পক্ষে এবং ৩১.২ শতাংশ মানুষ বিপক্ষে মত দেয়। এর মধ্য দিয়ে বর্ণবাদ বা 'অ্যাপারথাইড' নামক সেই অশান্ত অধ্যায়ের অবসান ঘটে।

এটি ছিল এমন এক জাতিগত পৃথকীকরণ নীতি, যার আওতায় কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু এলাকা ও কাজ নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে সংখ্যালঘু শ্বেতাঙ্গদের আলাদা করে রাখা হতো।

ভোটের পরদিন প্রেসিডেন্ট এফ ডব্লিউ ডি ক্লার্ক বলেছিলেন, “আজ আমরা বর্ণবাদের অধ্যায়ের সমাপ্তি টানলাম।”

মজার বিষয় এরও বেশ আগে, ১৯৬০ সালের ২১ মার্চ দক্ষিণ আফ্রিকার শার্পভিল শহরে জাতিগত বৈষম্যের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ এক শান্তিপূর্ণ মিছিলে পথে নেমেছিল। কিন্তু সেই মিছিলে পুলিশের নির্বিচার গুলিতে প্রাণ হারায় ৬৯ জন নিরীহ মানুষ, আহত হয় অন্তত ১৮০ জন।

ইতিহাসের এই রক্তক্ষয়ী ও মর্মান্তিক অধ্যায়কে স্মরণ করেই ১৯৭৯ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২১ মার্চ দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক জাতিগত বর্ণ বৈষম্য বিলোপ দিবস’ হিসেবে পালনের স্বীকৃতি দেয়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত পৃথিবীর নানা প্রান্তে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধিতে দিনটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে।

কিন্তু এত বছর পরও বর্ণবাদ কি এখনো সদর্পে পৃথিবীতে নেই? শুধু গায়ের রংয়েই বর্ণবাদ কিন্তু শেষ হয়ে যাচ্ছে না। লিঙ্গ, ধর্ম, সামাজিক, জাতিগত নানা রূপে বর্ণবাদ দেখা যায়।

শুধু যদি বাংলাদেশের দিকে তাকাই, তবে দেখব এই সকল রূপেই বর্ণবাদ এখানে বিদ্যমান। এই দেশের অর্থনীতি যে দুই খাতের ওপর ভর দিয়ে টিকে আছে–পোশাক শিল্প ও রেমিট্যান্স–এই দুই খাতেই নারীর উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি। কিন্তু সামাজিক ও রাজনৈতিক উভয় প্রেক্ষাপটেই এই দেশে নারী যেন ব্রাত্য। ক্ষমতায় যেই থাকুক নারীর প্রতি সহিংসতা যেন জ্যামিতিক হারে বেড়েই চলেছে। বিভিন্ন তথ্যে চোখ বোলালেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়।

আবার, যদি বলি ধর্মীয় বা জাতিগত বর্ণবাদের কথা, সেক্ষেত্রেও এই কথা খাটে। এর প্রমাণ পাওয়া যায়, যেকোনো ধর্মীয় উৎসবের খবর যখন অনলাইন নিউজপোর্টাল গুলো প্রকাশ করে তার কমেন্ট বক্সে। অবশ্য ধর্মীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব বা বক্তারাও কম যান না।

জাতিগত বর্ণবাদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

এমনকি সকল বৈষম্য দূর করার কথা বলে হাজারের বেশি মানুষ যে জুলাই অভ্যুত্থানে প্রাণ দিল, যে অভ্যুত্থানের পর আমরা ‘পাতা ছেঁড়া নিষেধ’-এর মতো প্রতীকী গ্রাফিতি দেখলাম দেয়ালজুড়ে, সেই অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে এসেও আমরা দেখলাম এই ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষেরা মার খাচ্ছে। তাদের অপরাধ–তারা নিজেদের আদিবাসী দাবি করেছে।

বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটের বাইরেও একই দশা কি নেই? বিভিন্ন বিবেচনায় ‘সংখ্যালঘু’ হিসেবে বিবেচিত অংশ একটি দেশে কেমন আছে, তা এখনো বিভিন্ন দেশের গণতন্ত্রের অন্যতম সূচক হয়ে আছে। এটাই বলে দেয় যে, জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও লিঙ্গভেদে মানুষ এখনো বিভাজিত এবং সে অনুযায়ী সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘুর রাজনীতি চলে। আর এই মানদণ্ডই বলে দেয় যে, বর্ণবাদ, ইংরেজিতে যাকে বলে রেসিজম–তা বেশ বহাল তবিয়তেই আছে।

না হলে কি আর দেশে দেশে এত যুদ্ধ, সংঘাত চলছে। প্রতিটি সংঘাত ও যুদ্ধের পেছনে কোনো না কোনো অংশে এই বর্ণবাদের অস্তিত্ব একটু চোখ মেললেই খুঁজে পাওয়া যাবে।

বর্ণবাদ বিলোপ–শুনতে ভালো; কিন্তু বাস্তবতা হলো–এ হলো কাজির সেই গরু, যা কাগজে আছে গোয়ালে নেই।

সম্পর্কিত