চরচা ডেস্ক

বাংলাদেশের গণমাধ্যম আজ এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সাম্প্রতিক আলোচনায় দ্য ডেইলি স্টারের পরামর্শক সম্পাদক কামাল আহমেদ যে মন্তব্য করেছেন ‘‘গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা তলানিতে’’, তা নিছক হতাশার বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং একটি গভীর কাঠামোগত সমস্যার প্রতিফলন। এই সংকট কেবল সাংবাদিকতার নয়, গণতন্ত্রেরও। কারণ, বিশ্বাসযোগ্য গণমাধ্যম ছাড়া জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা কার্যত অচল।
এই অবনতির পেছনে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো সংবাদমাধ্যমে মালিকদের প্রভাব। গণমাধ্যম যখন করপোরেট স্বার্থের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন সংবাদ আর নিরপেক্ষ থাকে না– তা হয়ে ওঠে নির্বাচিত সত্যের প্যাকেজ। সম্পাদকেরা যদি স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে না পারেন, তবে সংবাদমাধ্যম তার মৌলিক দায়িত্ব, সত্য তুলে ধরা পালনে ব্যর্থ হবেই। সংসদে অর্থ পাচারকারী বা ঋণখেলাপিদের তালিকা প্রকাশের সময় কিছু গণমাধ্যমের বেছে বেছে তথ্য প্রকাশের অভিযোগ এই বাস্তবতারই প্রমাণ।
তবে সমস্যাটি শুধু মালিকদের প্রভাবেই সীমাবদ্ধ নয়। অতীতের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, ভয়ভীতি এবং দমনমূলক আইন সাংবাদিকতার ভিত দুর্বল করে দিয়েছে। তার ওপর যুক্ত হয়েছে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। অধিকাংশ গণমাধ্যমই এখন বিজ্ঞাপননির্ভর এবং সেই বিজ্ঞাপন আসে প্রভাবশালী গোষ্ঠী বা সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উৎস থেকে। ফলে একটি অদৃশ্য চাপ সবসময় কাজ করে– যা সরাসরি সেন্সরশিপ না হলেও কার্যত একই ফল বয়ে আনে।
এই প্রেক্ষাপটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উত্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ভুয়া তথ্য, অপতথ্য এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। যখন মানুষ একই ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন সংস্করণ দেখে, তখন তারা মূলধারার গণমাধ্যমকেও সন্দেহের চোখে দেখে। ফলে একটি ভয়ংকর আস্থাহীনতার চক্র তৈরি হয়– যেখানে সত্যও আর বিশ্বাসযোগ্য থাকে না।
বাংলাদেশের এই সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। রিপোর্টার্স সানস ফ্রন্টিয়ার্স-এর সাম্প্রতিক সূচক দেখায়, বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিম্নমুখী। বাংলাদেশও সেই ধারা থেকে বাইরে নয়; বরং আরও কয়েক ধাপ পিছিয়েছে। এই বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ, তবে তার সমাধান খুঁজতে হবে স্থানীয় বাস্তবতার ভেতরেই।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের ভূমিকা এখানে বিশেষভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। বাংলাদেশ টেলিভিশন বা বাংলাদেশ বেতার যদি কেবল সরকারের প্রচারযন্ত্র হিসেবে কাজ করে, তবে তারা জনস্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না। একইভাবে বেসরকারি খাতেও যদি মালিকানা কেন্দ্রীভূত থাকে, তবে বহুমত ও বৈচিত্র্যের জায়গা সংকুচিত হয়।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ কী? প্রথমত, গণমাধ্যমের অর্থনৈতিক কাঠামো পুনর্বিবেচনা জরুরি। একটি টেকসই ও স্বাধীন অর্থনৈতিক মডেল ছাড়া সম্পাদকীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, আইনি কাঠামো এমন হতে হবে যাতে তা সাংবাদিকদের সুরক্ষা দেয়, দমন না করে। তৃতীয়ত, গণমাধ্যমের ভেতরেই নৈতিকতার পুনর্জাগরণ প্রয়োজন– সম্পাদক ও সাংবাদিকদের নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে।
সরকারের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তথ্য ও সম্প্রচার কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ভুল তথ্য গ্রহণযোগ্য নয়, তবে সমালোচনা করা যাবে। এই অবস্থান বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। কারণ, সমালোচনার স্বাধীনতা কেবল ঘোষণায় নয়, প্রয়োগেও নিশ্চিত করতে হয়।
সবশেষে, এই সংকট আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরে– গণমাধ্যম কার জন্য? যদি উত্তর হয় ‘জনগণের জন্য’, তবে সেই জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারই এখন প্রধান কাজ। আর তা সম্ভব কেবল স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং স্বাধীনতার মাধ্যমে।

বাংলাদেশের গণমাধ্যম আজ এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সাম্প্রতিক আলোচনায় দ্য ডেইলি স্টারের পরামর্শক সম্পাদক কামাল আহমেদ যে মন্তব্য করেছেন ‘‘গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা তলানিতে’’, তা নিছক হতাশার বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং একটি গভীর কাঠামোগত সমস্যার প্রতিফলন। এই সংকট কেবল সাংবাদিকতার নয়, গণতন্ত্রেরও। কারণ, বিশ্বাসযোগ্য গণমাধ্যম ছাড়া জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা কার্যত অচল।
এই অবনতির পেছনে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো সংবাদমাধ্যমে মালিকদের প্রভাব। গণমাধ্যম যখন করপোরেট স্বার্থের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন সংবাদ আর নিরপেক্ষ থাকে না– তা হয়ে ওঠে নির্বাচিত সত্যের প্যাকেজ। সম্পাদকেরা যদি স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে না পারেন, তবে সংবাদমাধ্যম তার মৌলিক দায়িত্ব, সত্য তুলে ধরা পালনে ব্যর্থ হবেই। সংসদে অর্থ পাচারকারী বা ঋণখেলাপিদের তালিকা প্রকাশের সময় কিছু গণমাধ্যমের বেছে বেছে তথ্য প্রকাশের অভিযোগ এই বাস্তবতারই প্রমাণ।
তবে সমস্যাটি শুধু মালিকদের প্রভাবেই সীমাবদ্ধ নয়। অতীতের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, ভয়ভীতি এবং দমনমূলক আইন সাংবাদিকতার ভিত দুর্বল করে দিয়েছে। তার ওপর যুক্ত হয়েছে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। অধিকাংশ গণমাধ্যমই এখন বিজ্ঞাপননির্ভর এবং সেই বিজ্ঞাপন আসে প্রভাবশালী গোষ্ঠী বা সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উৎস থেকে। ফলে একটি অদৃশ্য চাপ সবসময় কাজ করে– যা সরাসরি সেন্সরশিপ না হলেও কার্যত একই ফল বয়ে আনে।
এই প্রেক্ষাপটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উত্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ভুয়া তথ্য, অপতথ্য এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। যখন মানুষ একই ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন সংস্করণ দেখে, তখন তারা মূলধারার গণমাধ্যমকেও সন্দেহের চোখে দেখে। ফলে একটি ভয়ংকর আস্থাহীনতার চক্র তৈরি হয়– যেখানে সত্যও আর বিশ্বাসযোগ্য থাকে না।
বাংলাদেশের এই সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। রিপোর্টার্স সানস ফ্রন্টিয়ার্স-এর সাম্প্রতিক সূচক দেখায়, বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিম্নমুখী। বাংলাদেশও সেই ধারা থেকে বাইরে নয়; বরং আরও কয়েক ধাপ পিছিয়েছে। এই বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ, তবে তার সমাধান খুঁজতে হবে স্থানীয় বাস্তবতার ভেতরেই।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের ভূমিকা এখানে বিশেষভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। বাংলাদেশ টেলিভিশন বা বাংলাদেশ বেতার যদি কেবল সরকারের প্রচারযন্ত্র হিসেবে কাজ করে, তবে তারা জনস্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না। একইভাবে বেসরকারি খাতেও যদি মালিকানা কেন্দ্রীভূত থাকে, তবে বহুমত ও বৈচিত্র্যের জায়গা সংকুচিত হয়।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ কী? প্রথমত, গণমাধ্যমের অর্থনৈতিক কাঠামো পুনর্বিবেচনা জরুরি। একটি টেকসই ও স্বাধীন অর্থনৈতিক মডেল ছাড়া সম্পাদকীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, আইনি কাঠামো এমন হতে হবে যাতে তা সাংবাদিকদের সুরক্ষা দেয়, দমন না করে। তৃতীয়ত, গণমাধ্যমের ভেতরেই নৈতিকতার পুনর্জাগরণ প্রয়োজন– সম্পাদক ও সাংবাদিকদের নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে।
সরকারের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তথ্য ও সম্প্রচার কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ভুল তথ্য গ্রহণযোগ্য নয়, তবে সমালোচনা করা যাবে। এই অবস্থান বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। কারণ, সমালোচনার স্বাধীনতা কেবল ঘোষণায় নয়, প্রয়োগেও নিশ্চিত করতে হয়।
সবশেষে, এই সংকট আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরে– গণমাধ্যম কার জন্য? যদি উত্তর হয় ‘জনগণের জন্য’, তবে সেই জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারই এখন প্রধান কাজ। আর তা সম্ভব কেবল স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং স্বাধীনতার মাধ্যমে।