তবে গণভোটে ‘না’ ভোট কি রাষ্ট্রবিরোধী?

তবে গণভোটে ‘না’ ভোট কি রাষ্ট্রবিরোধী?
প্রতীকী ছবি। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

গণভোটের পক্ষে সরকারের প্রচার চালানো নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে অনেকেই কথা বলছেন। সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছে, যেহেতু কোনো আইনি বাধা নেই, সেজন্য সরকার পক্ষ নিতে পারে। কথাটা হয়ত ঠিক, আইনি বাধা নেই। কিন্তু নীতির জায়গায় কী হবে?

জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান চলাকালে নানা দাবি উঠেছিল। সেগুলো সব শেষ হয়ে এক দফা দাবিতে পরিণত হয়। ক্ষমতাচ্যুত হয় শেখ হাসিনার সরকার। আর শেখ হাসিনা পালিয়ে যান ভারতে। তারপরের ঘটনা এখানে লেখার দরকার নেই। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হওয়ার পর আমরা সংস্কারের কথা শুনলাম। নানা উদ্যোগ দেখলাম। দেশ-বিদেশের অনেকে এই কাজে যুক্ত হলো। অনেকগুলো কমিশন হলো। সব মিলে পরে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠায় একটি জাতীয় কমিশন হলো।

রাজনৈতিক দলগুলো অনেক আলোচনা, দাবি, সুপারিশ তুলল। তৈরি হলো জুলাই জাতীয় সনদ। সরকারের অন্যতম সমর্থক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি এই সনদ নিয়ে প্রশ্ন তুলল। তারা স্বাক্ষর করল না। নির্বাচন ও গণভোটের ঘোষণা হলো। সরকার বাহাদুর বললেন, তারা ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে প্রচার চালাবেন। ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি গণভোট নিয়ে প্রচারের জন্য প্রধান হিসেবে নিয়োগ পেলেন। প্রচার চলছে। আর এর মধ্যে এনসিপি বলছে, তারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে ২৭০ নির্বাচনী আসনে ‘অ্যাম্বাসেডর’ নিয়োগ দেবে। খুব ভালো উদ্যোগ। গণঅভ্যুত্থানকে যেমন এনসিপি সর্বাগ্রে রাখতে চায়। তেমনই সই না করা জুলাই সনদকেও তারা অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

সরকার যে প্রচার শুরু করেছে সেখানে নির্বাচনী আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংসদ নির্বাচনে যারা নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে, গণভোটেই তারা পক্ষাবলম্বন করবে! বিবিসির সঙ্গে এ নিয়ে কথাও বলেছেন, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন এবং জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশনের সদস্য আবদুল আলীম। তিনিও মনে করেন, ডিসি, ইউএনও যারা রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে নির্বাচনী দায়িত্বে থাকবেন তারা এই ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণায় সংশ্লিষ্ট থাকলে নির্বাচনে প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন তিনি।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলছেন, “আইনি বাধা না থাকায় গণভোটের প্রচারণা চালাবে সরকার।” আইনের চেয়ে বড় প্রশ্ন এখানে নৈতিকতা। নিরপেক্ষতা। একটা ভোট যখন হয় তখন আগে থেকে ফল নির্ধারণ হলে সেটা আর ভোট থাকে না। আর ভোটের আয়োজক রেফারি যদি কোনো একটা পক্ষে থাকেন তাহলে তো কথাই নেই। এখানে কথা উঠতেই পারে এই সরকার বাকি সব তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো নয়। গণঅভ্যুত্থানের ফসল এই সরকার। সুতরাং সংস্কারের পক্ষে সরকার থাকবেই। সরকার পক্ষের মূল যুক্তি এখানটাতেই। যদিও পুলিশের পোশাকের রঙ পাল্টানো, স্থাপনার নাম বদলানো ছাড়া আর কোন কোন খাতে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার হয়েছে সে প্রশ্নটা না হয় এখানে না তুললাম।

বাংলাদেশে এর আগে গণভোট হয়েছে তিনটি। আর গণভোট নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের অভিজ্ঞতা খুব সুখকর নয়। দেখা গেছে, গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে সরকারের মতামতের বৈধতা নেওয়া জন্য। অর্থাৎ, বন্দুক জনগণের কাঁধে।

১৯৭৭ সালের ৩০ মে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের প্রথম গণভোটটি ছিল সামরিক শাসক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের শাসনের প্রতি জনগণের সমর্থন আদায় করার উদ্দেশ্যে। ভোটারদের কাছে ব্যালটে প্রশ্ন ছিল, “আপনি কি রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের (বীরউত্তম) প্রতি এবং তাঁর গৃহীত নীতি ও কার্যক্রমের ওপর আস্থাশীল?” সেই গণভোটে মোট ৮৮.১ ভাগ ভোটার নিজেদের মতামত দিয়েছিলেন বলে নথিতে পাওয়া যায়। ৯৮.৯ শতাংশ ভোটারই রাষ্ট্রপতি জিয়ার শাসনের প্রতি নিজেদের সমর্থনের কথা জানান।

১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ জিয়ার পথ অনুসরণ করে জেনারেল এইচ এম এরশাদও নিজের রাজনৈতিক উত্তরণ ও জনসমর্থন আদায়ের জন্য গণভোটের আয়োজন করেন।

সেই গণভোটে, প্রথম গণভোটের মতোই প্রশ্ন রাখা হয়েছিল ভোটারদের সামনে। ১৯৮৫ গণভোটে ব্যালটে যে প্রশ্ন ছিল, তার অংশ ছিল দুটি। প্রথম অংশটি ছিল এমন, “আপনি কি রাষ্ট্রপতি লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রতি ও তাঁর গৃহীত নীতির প্রতি আস্থাশীল?”

দ্বিতীয় অংশে ছিল, “আপনি কি চান রাষ্ট্রপতি এরশাদ জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পূর্ব পর্যন্ত প্রশাসন পরিচালনা করবেন?”

সেই গণভোটে ৭২.২ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি ছিল বলে সরকারি হিসেবে জানা যায়। হাজির হওয়া ভোটারের ৯৪.৫ শতাংশই এরশাদের পক্ষে নিজেদের সমর্থন জানান। এই গণভোটের এক বছর পর, ১৯৮৬ সালে এরশাদ সংসদ নির্বাচন দেন।

১৯৯১ সালের জুলাই মাসে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয় জাতীয় সংসদে। সেই সংশোধনীর মধ্য দিয়ে সংসদীয় ব্যবস্থায় ফেরে দেশ। একাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সাহাবুদ্দীন আহমেদের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন শেষে প্রধান বিচারপতির পদে ফেরাকে বৈধতা দেওয়া হয়। দ্বাদশ সংশোধনীতে রাষ্ট্রপতি সম্মতি দেবেন কি না, সে প্রশ্নে অনুষ্ঠিত হয় দেশের ইতিহাসের তৃতীয় ও এখনো পর্যন্ত সর্বশেষ গণভোট।

১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত সেই গণভোটে ভোটারদের সামনে প্রশ্ন ছিল, “রাষ্ট্রপতি কি সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী বিলে সম্মতি দেবেন?”

তাহলে দেখা যাচ্ছে, তিনটির মধ্যে দুটো গণভোটই সরকারের বা বলা হলো সরকারপ্রধানের পক্ষে গেছে। ‘যারা ভোট দিয়েছেন’ তারা সরকারের সঙ্গে ‘সহমত ভাই’।

তবে ওই গণভোটগুলোর সঙ্গে এবারের ভোটের ফারাক বিস্তর। আগের ভোটগুলো হয়েছে সুনির্দিষ্ট একটি নির্দিষ্ট প্রশ্নে। এবার কিন্তু সেটা নয়। এবার অনেকগুলো বিষয় নিয়ে একটি ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’। সেখানে কোনো প্রশ্নে ‘সহমত’ কোনো প্রশ্নে ‘দ্বিমত’ হওয়ার সুযোগ নেই। আর ‘সহমত’ নিয়ে বিপত্তি কী হয় সেটা আমরা অতি নিকট অতীত থেকেই জানি?

তবে সরকারের প্রচারের পক্ষেই তার অবস্থান। এবার একটু অন্য দিক থেকে ঘুরে আসি চলুন। সরকার ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে। অর্থাৎ ‘না’ ভোটের বিপক্ষে। যারা সরকারের কথা না শুনে ‘না’ ভোট দেবেন, তারা সরকার বা রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত হবেন? তাদের শাস্তি হবে?

কিছুদিন আগে প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টারে ‘মব ভায়োলেন্স’ হলো। এর আগেও এই চেষ্টা হয়েছিল। এগুলো নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সরকারের প্রেস সচিব (প্রধান উপদেষ্টার হলেও মূলত সরকারের মুখপাত্রের কাজই করছেন) সাবেক সাংবাদিক শফিকুল আলম বলেছিলেন, মব নয়, ওগুলো প্রেশার গ্রুপ। কিন্তু দেশের শীর্ষ দুটি দৈনিকে হামলা-আগুন-লুটপাটের পর তিনি ‘লজ্জা’ পেলেন।

যদি ভবিষ্যতে অনুষ্ঠেয় গণভোটের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে অথবা এর প্রক্রিয়া নিয়ে কোনো আইনি বিবাদ দেখা যায়, তখন কে লজ্জা পাবে?

সম্পর্কিত