মফিদুল হক

বাঙালিকে ‘আত্মঘাতী’ বলেছিলেন নীরদ সি চৌধুরী। তার এই দৃষ্টিভঙ্গি আচ্ছন্ন ছিল ব্রিটিশ শাসনের মহিমা মুগ্ধতার মধ্যে। তদুপরি তার বিবেচনার বৃত্তে হিন্দু অভিজাত ও শিক্ষিত বাঙালি ছাড়া আর কারো অস্তিত্ব ছিল না। বাঙালি মুসলমান তো গণনার মধ্যেই অসেনি। ধর্মীয় বিভাজন পেরিয়ে বাঙালিকে সমগ্রতায় ধারণ করে ভৌগোলিকভাবে বৃহত্তর অংশের অন্তর্ভুক্ত বাঙালির যে মুক্তিযুদ্ধ বিশ্বের শুভবুদ্ধিসম্প মানুষের নজর কেড়েছিল, তা নীরদ চৌধুরীকে বিব্রত করেছিল। জুন মাসে তিনি বিলেতি অগ্রণী দৈনিক টাইমসে পত্র লিখে মুক্তিযুদ্ধের অসারতা প্রমাণে চেষ্টা নিয়েছিলেন। অভিমত প্রকাশ করেছিলেন যে, সমরাস্ত্রে বিপুল শক্তিমান সংগঠিত পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে দুর্বল অস্ত্রধারী দুর্বলতর মুক্তিযোদ্ধারা কখনো জয়ী হতে পারবে না। এই পত্রপ্রকাশের ছয় মাসের মধ্যে তাকে ভুল প্রমাণ করে পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাজিত করে মুক্তিবাহিনী ছিনিয়ে নেয় স্বাধীনতা, প্রতিষ্ঠা করে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের।
তারপর পাঁচ দশকের বেশি সময়ব্যাপী পথপরিক্রমণ ছিল নানা খানাখন্দ চড়াই-উৎরাইয়ে আকীর্ণ। সংস্কৃতি বিচারে অনেক ক্ষেত্রে আমরা নতুন মাত্রা যোগ করতে পেরেছি, সৃজনশীলতার প্রকাশে উন্মুখ এক বিশাল জনগোষ্ঠীকে সৃষ্টির পরিসরে সক্রিয় করেছি। তবে পাশাপাশি সামাজিক সংহতি ও সৌহার্দ্য নির্মাণে আমরা নানা সমস্যা তৈরি করে চলেছি, কখনো কখনো তা উপচে পড়েছে হিংস্র সংঘাতে। ধর্মকে আবার আমরা করে তুলেছি বিভাজনের হাতিয়ার। রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে সকল নাগরিকের সমমর্যাদা ক্ষুণ্ণ করছি সংখ্যাগরিষ্ঠতার হিসাব কষে। বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতির শক্তিময়তা আমরা বিসর্জন দিয়ে চলেছি পাকিস্তানি ধারায় ধর্মীয় আধিপত্যবাদী উগ্রতা দ্বারা। এর ফলে বাঙালিত্বের সমগ্রতার মধ্যে আমরা বিচ্ছেদ বয়ে আনছি, হয়ে উঠছি আত্মঘাতী বাঙালি, সম্পূর্ণ এক ভিন্ন প্রতিবেশে, তবে আরও ভয়ংকরভাবে। নিজেকে আমরা এভাবে খণ্ডিত করছি, নিজের সম্পদ নিজেই বিসর্জন দিচ্ছি, সম্ভাবনার লক্ষণগুলো পদপিষ্ট করছি এবং মহৎপ্রাণ বাঙালি হয়ে পড়ছি ক্ষুদ্রপ্রাণ জনগোষ্ঠী।
তার উদাহরণ পরিস্ফুট হয়ে উঠল বাংলা নববর্ষ উদযাপনের মঙ্গল শোভাযাত্রা ঘিরে। নব্বইয়ের গণ-আন্দোলন কেবল স্বৈরাচারীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জাতির শক্তিময়তা প্রকাশ করেনি, আমাদের সংস্কৃতিতেও নতুন ঢেউ বয়ে এনেছিল। জাতীয় মুক্তির সংগ্রামে ৬০-এর দশকের মধ্যভাগে ছায়ানট যখন রমনার বটমূলে বর্ষবরণের প্রভাতী সংগীতানুষ্ঠান নিবেদন করে, সেটা ছিল ছোট আকারের অয়োজন। তবে বছর ঘুরে তা ক্রমান্বয়ে অর্জন করে বিশালতা এবং নাগরিক জীবনের হারিয়ে যাওয়া বৈশাখকে আবার দেশবাসীর কাছে ফিরিয়ে দেয়। চারুকলার স্নাতক, শিক্ষার্থী ও নবীন শিল্পীরা মিলে নববর্ষের প্রভাতে তারুণ্যের আনন্দ মিছিলের আয়োজন করেছিল লোকশিল্পের ধারায়, বাঙালি জীবনের নানা প্রতীক সাজিয়ে, তা পথযাত্রায় বহনযোগ্য ও বাহনযোগ্যভাবে তৈরি করে, ঢোলক বাদ্যে মাতিয়ে দিয়ে চারদিক। সেই আয়োজন বাঙালি প্রাণে নবআনন্দ বয়ে আনল। অচিরেই মঙ্গল শোভাযাত্রা ছড়িয়ে পড়ল শহর থেকে শহরে, হয়ে উঠল ঐতিহ্যের নবায়নের অবলম্বন। সমষ্টির জীবনধারায় নববর্ষ যেমন নতুন আশা, নতুন উজ্জীবনের বার্তা বয়ে আনে, যার যেমন সাধ্য সেভাবে তাতে শরিক হয়, সেখানে মিলল নতুন, অভিনব ও আকর্ষণীয় মাত্রা–মঙ্গল শোভাযাত্রা। এই নবসৃজন ইউনেসকো স্বীকৃতি পেল মানবগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির ধারার আরেক প্রকাশ হিসেবে, যা বাঙালিকে এনে দেয় বিশ্বজনীন মহিমা।
কিন্তু বাঙালি সত্তায় আঘাত করবার জন্য যে শক্তি ছিল সমাজে, তারা আবারও ধর্মের দোহাই দিয়ে আঘাত করল মঙ্গল শোভাযাত্রাকে। বাঙালি জাতি আজ কতটা বিভ্রান্ত, বেপথু ও আত্মমর্যাদাহীন হয়ে পড়েছে, তার সাক্ষ্য মেলে মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীনদের খেলায়। মঙ্গল শোভাযাত্রা ধর্মসিদ্ধ নয়–এমন কথা বলবার মতো গোষ্ঠী সমাজে তৎপর রয়েছে। সার্বজনীন উৎসবকে ধর্মের দোহাই দিয়ে কালিমালিপ্ত করার প্রয়াসে সমর্থন যোগায় সুশিক্ষিত পাশ্চাত্য সমর্থিত ড. ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকার। তারা মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম পালটে করল ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’। কেননা ‘মঙ্গল’ শব্দ তাদের কাছে মনে হয়েছে হিন্দু প্রভাবিত এবং ইসলামের জন্যে ক্ষতিকর। যদিও তাদের মাতৃভাষা বাংলা, তার অর্থ অন্তরের ভাষাও বাংলা। মনে মনে ‘মঙ্গল’ শব্দ তাদের উচ্চারণ করতে হয় হরহামেশাই, পরিজন ও সন্তানের কল্যাণ কামনায় বা নিজেরই তরক্কির উদ্দেশ্যে। একই সঙ্গে লোকজীবন থেকে উঠে আসা প্রতীক পাল্টে দিতে তারা ধর্মসিদ্ধ প্রতীকের খোঁজ হাতড়াতে থাকে হতবিহ্বল হয়ে। শেষ পর্যন্ত গাধার পিঠে উল্টো হয়ে বসা নাসিরউদ্দিন হোজ্জাকে মনে হয় যথেষ্ট ইসলাম-সম্মত, এমনই তাদের ধর্মবোধ! সেটাই হয়ে ওঠে এক অর্থে প্রতীক যা পরোক্ষে তাদের নিজেদের মূর্খতার প্রকাশ ঘটায়।
বর্তমান সরকার শুভবুদ্ধির পরিচয় দিয়ে বলেছিলেন, মঙ্গল শোভাযাত্রা অভিধা পুনর্বহাল হবে। তবে শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে এসে এর নতুন নামকরণ করল ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। একটি আনন্দ উৎসবকে ঘিরে এমন বিচলিত মনোভাব নিজেদের মানসিক দৈন্যই প্রকাশ করে। আপন ঐতিহ্যের শৈল্পিক ও জননন্দিত রূপায়ন যেখানে আমাদের গর্বিত করবে, সেখানে আমরা দেখি বিপরীত চিত্র। এই ঘটনাক্রম দেখিয়ে দেয় জাতি হিসাবে আমাদের বিভ্রম। এটা হয়ে ওঠে আত্মগর্ব বিসর্জনের কৌতুকপ্রদ কাহিনি।
সকলের মঙ্গল হোক। নববর্ষে রইল এই শুভকামনা। মঙ্গলকামনায় জাতি ঐক্যবদ্ধভাবে চলবে সামনের পথে, তা আমরা প্রত্যাশা করি। এই প্রত্যয় আমরা পাই বাংলার জীবন ও সংস্কৃতি-সাধনা থেকে। নীরদ চৌধুরী বাঙালিকে আত্মঘাতী বলেছিলেন ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতি ভক্তিময়তা থেকে। সেটা ইতিহাসই বাতিল করে দিয়েছে। ধর্মকে ব্যবহার করে নিজের ঐতিহ্যকে নিজেই নষ্ট করার যে চেষ্টা, সেটাও ইতিহাসই বাতিল করে দেবে।
মফিদুল হক: লেখক ও গবেষক এবং মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি

বাঙালিকে ‘আত্মঘাতী’ বলেছিলেন নীরদ সি চৌধুরী। তার এই দৃষ্টিভঙ্গি আচ্ছন্ন ছিল ব্রিটিশ শাসনের মহিমা মুগ্ধতার মধ্যে। তদুপরি তার বিবেচনার বৃত্তে হিন্দু অভিজাত ও শিক্ষিত বাঙালি ছাড়া আর কারো অস্তিত্ব ছিল না। বাঙালি মুসলমান তো গণনার মধ্যেই অসেনি। ধর্মীয় বিভাজন পেরিয়ে বাঙালিকে সমগ্রতায় ধারণ করে ভৌগোলিকভাবে বৃহত্তর অংশের অন্তর্ভুক্ত বাঙালির যে মুক্তিযুদ্ধ বিশ্বের শুভবুদ্ধিসম্প মানুষের নজর কেড়েছিল, তা নীরদ চৌধুরীকে বিব্রত করেছিল। জুন মাসে তিনি বিলেতি অগ্রণী দৈনিক টাইমসে পত্র লিখে মুক্তিযুদ্ধের অসারতা প্রমাণে চেষ্টা নিয়েছিলেন। অভিমত প্রকাশ করেছিলেন যে, সমরাস্ত্রে বিপুল শক্তিমান সংগঠিত পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে দুর্বল অস্ত্রধারী দুর্বলতর মুক্তিযোদ্ধারা কখনো জয়ী হতে পারবে না। এই পত্রপ্রকাশের ছয় মাসের মধ্যে তাকে ভুল প্রমাণ করে পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাজিত করে মুক্তিবাহিনী ছিনিয়ে নেয় স্বাধীনতা, প্রতিষ্ঠা করে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের।
তারপর পাঁচ দশকের বেশি সময়ব্যাপী পথপরিক্রমণ ছিল নানা খানাখন্দ চড়াই-উৎরাইয়ে আকীর্ণ। সংস্কৃতি বিচারে অনেক ক্ষেত্রে আমরা নতুন মাত্রা যোগ করতে পেরেছি, সৃজনশীলতার প্রকাশে উন্মুখ এক বিশাল জনগোষ্ঠীকে সৃষ্টির পরিসরে সক্রিয় করেছি। তবে পাশাপাশি সামাজিক সংহতি ও সৌহার্দ্য নির্মাণে আমরা নানা সমস্যা তৈরি করে চলেছি, কখনো কখনো তা উপচে পড়েছে হিংস্র সংঘাতে। ধর্মকে আবার আমরা করে তুলেছি বিভাজনের হাতিয়ার। রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে সকল নাগরিকের সমমর্যাদা ক্ষুণ্ণ করছি সংখ্যাগরিষ্ঠতার হিসাব কষে। বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতির শক্তিময়তা আমরা বিসর্জন দিয়ে চলেছি পাকিস্তানি ধারায় ধর্মীয় আধিপত্যবাদী উগ্রতা দ্বারা। এর ফলে বাঙালিত্বের সমগ্রতার মধ্যে আমরা বিচ্ছেদ বয়ে আনছি, হয়ে উঠছি আত্মঘাতী বাঙালি, সম্পূর্ণ এক ভিন্ন প্রতিবেশে, তবে আরও ভয়ংকরভাবে। নিজেকে আমরা এভাবে খণ্ডিত করছি, নিজের সম্পদ নিজেই বিসর্জন দিচ্ছি, সম্ভাবনার লক্ষণগুলো পদপিষ্ট করছি এবং মহৎপ্রাণ বাঙালি হয়ে পড়ছি ক্ষুদ্রপ্রাণ জনগোষ্ঠী।
তার উদাহরণ পরিস্ফুট হয়ে উঠল বাংলা নববর্ষ উদযাপনের মঙ্গল শোভাযাত্রা ঘিরে। নব্বইয়ের গণ-আন্দোলন কেবল স্বৈরাচারীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জাতির শক্তিময়তা প্রকাশ করেনি, আমাদের সংস্কৃতিতেও নতুন ঢেউ বয়ে এনেছিল। জাতীয় মুক্তির সংগ্রামে ৬০-এর দশকের মধ্যভাগে ছায়ানট যখন রমনার বটমূলে বর্ষবরণের প্রভাতী সংগীতানুষ্ঠান নিবেদন করে, সেটা ছিল ছোট আকারের অয়োজন। তবে বছর ঘুরে তা ক্রমান্বয়ে অর্জন করে বিশালতা এবং নাগরিক জীবনের হারিয়ে যাওয়া বৈশাখকে আবার দেশবাসীর কাছে ফিরিয়ে দেয়। চারুকলার স্নাতক, শিক্ষার্থী ও নবীন শিল্পীরা মিলে নববর্ষের প্রভাতে তারুণ্যের আনন্দ মিছিলের আয়োজন করেছিল লোকশিল্পের ধারায়, বাঙালি জীবনের নানা প্রতীক সাজিয়ে, তা পথযাত্রায় বহনযোগ্য ও বাহনযোগ্যভাবে তৈরি করে, ঢোলক বাদ্যে মাতিয়ে দিয়ে চারদিক। সেই আয়োজন বাঙালি প্রাণে নবআনন্দ বয়ে আনল। অচিরেই মঙ্গল শোভাযাত্রা ছড়িয়ে পড়ল শহর থেকে শহরে, হয়ে উঠল ঐতিহ্যের নবায়নের অবলম্বন। সমষ্টির জীবনধারায় নববর্ষ যেমন নতুন আশা, নতুন উজ্জীবনের বার্তা বয়ে আনে, যার যেমন সাধ্য সেভাবে তাতে শরিক হয়, সেখানে মিলল নতুন, অভিনব ও আকর্ষণীয় মাত্রা–মঙ্গল শোভাযাত্রা। এই নবসৃজন ইউনেসকো স্বীকৃতি পেল মানবগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির ধারার আরেক প্রকাশ হিসেবে, যা বাঙালিকে এনে দেয় বিশ্বজনীন মহিমা।
কিন্তু বাঙালি সত্তায় আঘাত করবার জন্য যে শক্তি ছিল সমাজে, তারা আবারও ধর্মের দোহাই দিয়ে আঘাত করল মঙ্গল শোভাযাত্রাকে। বাঙালি জাতি আজ কতটা বিভ্রান্ত, বেপথু ও আত্মমর্যাদাহীন হয়ে পড়েছে, তার সাক্ষ্য মেলে মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীনদের খেলায়। মঙ্গল শোভাযাত্রা ধর্মসিদ্ধ নয়–এমন কথা বলবার মতো গোষ্ঠী সমাজে তৎপর রয়েছে। সার্বজনীন উৎসবকে ধর্মের দোহাই দিয়ে কালিমালিপ্ত করার প্রয়াসে সমর্থন যোগায় সুশিক্ষিত পাশ্চাত্য সমর্থিত ড. ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকার। তারা মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম পালটে করল ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’। কেননা ‘মঙ্গল’ শব্দ তাদের কাছে মনে হয়েছে হিন্দু প্রভাবিত এবং ইসলামের জন্যে ক্ষতিকর। যদিও তাদের মাতৃভাষা বাংলা, তার অর্থ অন্তরের ভাষাও বাংলা। মনে মনে ‘মঙ্গল’ শব্দ তাদের উচ্চারণ করতে হয় হরহামেশাই, পরিজন ও সন্তানের কল্যাণ কামনায় বা নিজেরই তরক্কির উদ্দেশ্যে। একই সঙ্গে লোকজীবন থেকে উঠে আসা প্রতীক পাল্টে দিতে তারা ধর্মসিদ্ধ প্রতীকের খোঁজ হাতড়াতে থাকে হতবিহ্বল হয়ে। শেষ পর্যন্ত গাধার পিঠে উল্টো হয়ে বসা নাসিরউদ্দিন হোজ্জাকে মনে হয় যথেষ্ট ইসলাম-সম্মত, এমনই তাদের ধর্মবোধ! সেটাই হয়ে ওঠে এক অর্থে প্রতীক যা পরোক্ষে তাদের নিজেদের মূর্খতার প্রকাশ ঘটায়।
বর্তমান সরকার শুভবুদ্ধির পরিচয় দিয়ে বলেছিলেন, মঙ্গল শোভাযাত্রা অভিধা পুনর্বহাল হবে। তবে শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে এসে এর নতুন নামকরণ করল ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। একটি আনন্দ উৎসবকে ঘিরে এমন বিচলিত মনোভাব নিজেদের মানসিক দৈন্যই প্রকাশ করে। আপন ঐতিহ্যের শৈল্পিক ও জননন্দিত রূপায়ন যেখানে আমাদের গর্বিত করবে, সেখানে আমরা দেখি বিপরীত চিত্র। এই ঘটনাক্রম দেখিয়ে দেয় জাতি হিসাবে আমাদের বিভ্রম। এটা হয়ে ওঠে আত্মগর্ব বিসর্জনের কৌতুকপ্রদ কাহিনি।
সকলের মঙ্গল হোক। নববর্ষে রইল এই শুভকামনা। মঙ্গলকামনায় জাতি ঐক্যবদ্ধভাবে চলবে সামনের পথে, তা আমরা প্রত্যাশা করি। এই প্রত্যয় আমরা পাই বাংলার জীবন ও সংস্কৃতি-সাধনা থেকে। নীরদ চৌধুরী বাঙালিকে আত্মঘাতী বলেছিলেন ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতি ভক্তিময়তা থেকে। সেটা ইতিহাসই বাতিল করে দিয়েছে। ধর্মকে ব্যবহার করে নিজের ঐতিহ্যকে নিজেই নষ্ট করার যে চেষ্টা, সেটাও ইতিহাসই বাতিল করে দেবে।
মফিদুল হক: লেখক ও গবেষক এবং মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি