ফজলে রাব্বি

এক দুর্দমনীয় অস্থির সময় দুর্নীতি দমন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার রক্ষার অঙ্গীকার দিয়ে শান্তিতে নোবেল জয়ী, বাংলাদেশের গর্ব, আন্তর্জাতিকভাবে সুপরিচিত অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে শুরু হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের পথচলা। নির্বাচন হয়ে গেছে। ফলাফল সবার জানা। সময় যত যাচ্ছে, ঘনিয়ে আসছে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময়। কলেজের অধ্যাপকের বিদায়ে মানপত্রের ভাষায় ১৮ মাস বাংলাদেশকে শাসন করা ড. ইউনূসের জন্য নিশ্চয়ই মানপত্র তৈরি রেখেছেন তার পর্ষদ। আমরা না হয়, অন্যভাবে বিশ্লেষণ করি সরকার প্রধানের বিদায় বেলা।
বিশ্বের প্রভাবশালী গণতান্ত্রিক দেশে সরকারের শেষ সময় একটি কাজ প্রায় নিয়মিতই করে। পাঠক কিংবা জনগণকে মনে করিয়ে দেয়, ক্ষমতা নেওয়ার দিন, আগে কিংবা পরে শাসক কী বলেছিলেন, কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সেগুলোর আলোকে দুভাবে মূল্যায়ন করা হয়–
এক. বিশেষজ্ঞের বিশ্লেষণে প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের চুলচেরা হিসাব
দুই. জনগণের অভিজ্ঞতার আলোকে শাসনকালের মূল্যায়ন
প্রথমটা নিশ্চয়ই হবে। হতেই থাকবে। আমরা বরং একদফা চোখ বুলিয়ে নিই, কী কথা দিয়েছিলেন নোবেলজয়ী মোহাম্মদ ইউনূস। এই স্মরণ পাঠকের জন্য। গণতন্ত্রের জন্য। ইতিহাসের জন্য।
৮ আগস্ট, ২০২৪। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শাসকশূন্য তিনদিন কেটে গেছে। দেশ তখন অস্থির। সহিংসতা, ভয় ও অনিশ্চয়তা চারদিকে।
এই প্রেক্ষাপটে ফ্রান্স থেকে এসে দেশের দায়িত্ব নেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন। ওই দিন শপথের পরপরই তিনি জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, এই দায়িত্ব তিনি চাননি। এই দায়িত্ব তিনি নিয়েছেন পরিস্থিতির কারণে।
মানবাধিকার রক্ষা আর মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার আগে অধ্যাপক ইউনূস বাংলাদেশের সংবিধানের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তার শপথ নেন। শপথ হয় বঙ্গভবনের দরবার হলে, রাত ৯টা ১৫ মিনিটে। রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন প্রধান উপদেষ্টার শপথবাক্য পাঠ করান।
দুর্নীতি দমন: প্রথম ও স্পষ্ট অঙ্গীকার
ড. ইউনূস বলেন, দুর্নীতি রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে ধ্বংস করে। অনেক হয়েছে। আর না। তিনি ঘোষণা করেন, তার সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। ২৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশে দেওয়া তার আনুষ্ঠানিক প্রথম ভাষণে অধ্যাপক ইউনূস ঘোষণা করেন–“উপদেষ্টারা নিজেদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করবেন।” তিনি বলেন, পর্যায়ক্রমে সরকারি কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও এটি বাধ্যতামূলক হবে। এমন প্রতিশ্রুতির ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ঘুষমুক্ত দেশ ছাড়া ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র সম্ভব নয়।
মতপ্রকাশ ও সমালোচনার স্বাধীনতা
ড. ইউনূস বলেন, “গণতন্ত্র মানেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা।” তিনি বলেন, মানুষ যেন নির্ভয়ে কথা বলতে পারে। সমালোচনা করতে পারে। তিনি তেমনটি চান। ২৫ আগস্টের ভাষণে তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি দেন অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, নিপীড়নমূলক আইন গণতন্ত্রের শত্রু। গণমাধ্যমের ওপর থাকা দমনমূলক আইন সংশোধন বা বাতিল করা হবে।
মানবাধিকার রক্ষার অঙ্গীকার
ড. ইউনূস বলেন, মানবাধিকার রাষ্ট্রের ভিত্তি। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, দেশে সুবিচার নিশ্চিত করা হবে। মানবাধিকার রক্ষা করা হবে। ২৫ আগস্টের ভাষণে তিনি বলেন, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, আদিবাসী, নারী ও শিশু–সবাই সমান নাগরিক। বাংলাদেশের সবাই একটা পরিবার উল্লেখ করে তিনি বলেন, আইনের সুরক্ষা সবার জন্য সমান হবে।
অরাজকতা ও ভয় নিয়ে কথা
শপথ নিয়ে ড. ইউনূস বলেন, দেশজুড়ে অরাজকতা তৈরি হয়েছে। তিনি কথা দিয়েছিলেন, এই ভয় ও বিশৃঙ্খলা দূর করা হবে। তিনি বলেন, মানুষ যেন ভয়মুক্ত হয়ে চলতে পারে–এটাই এই সরকারের প্রথম দায়িত্ব।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ে অবস্থান
সেনা, নৌ, বিমানবাহিনী ও পুলিশকে রাষ্ট্রের গর্ব উল্লেখ করে জাতির উদ্দেশে দেওয়া নিজের প্রথম ভাষণে তিনি বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক হুকুম থেকে মুক্ত রাখা হবে।
জুলাই–আগস্ট ও বিচার প্রসঙ্গ
২৫ আগস্টের ভাষণে ড. ইউনূস বলেন, জুলাই-আগস্টে গণহত্যা হয়েছে। বলেন, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। সে কারণে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলেও জানিয়েছিলেন তিনি। গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি ছিল তার সেই ভাষণে।
নির্বাচন ও ক্ষমতা হস্তান্তর
ড. ইউনূস বলেছিলেন, এই সরকারের মূল দায়িত্ব একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন। প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনের সংস্কার প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি কথা দিয়েছিলেন, সংস্কারের পর একটি অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হবে।
মূল প্রতিশ্রুতি
ড. মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতা নেওয়ার সময় যা বলেছিলেন–সেগুলো ছিল অঙ্গীকার। জনগণের কাছে কোনো ধরনের দায়বদ্ধতা থাকে না অন্তর্বর্তীকালীন কিংবা তত্ত্বাবধায়ক ধরনের সরকারের। রাজনৈতিক ব্যর্থতার কারণেই গঠিত হয় এ ধরনের সরকার। আজ থেকে ১৮ মাস আগে তেমনই এক সরকার যাত্রা করেছিল অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে। যার যার অভিজ্ঞতার আলোকে মূল্যায়ন করা যেতেই পারে সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতি আর এই দেড় বছরে তাদের কর্মকাণ্ডকে।

এক দুর্দমনীয় অস্থির সময় দুর্নীতি দমন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার রক্ষার অঙ্গীকার দিয়ে শান্তিতে নোবেল জয়ী, বাংলাদেশের গর্ব, আন্তর্জাতিকভাবে সুপরিচিত অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে শুরু হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের পথচলা। নির্বাচন হয়ে গেছে। ফলাফল সবার জানা। সময় যত যাচ্ছে, ঘনিয়ে আসছে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময়। কলেজের অধ্যাপকের বিদায়ে মানপত্রের ভাষায় ১৮ মাস বাংলাদেশকে শাসন করা ড. ইউনূসের জন্য নিশ্চয়ই মানপত্র তৈরি রেখেছেন তার পর্ষদ। আমরা না হয়, অন্যভাবে বিশ্লেষণ করি সরকার প্রধানের বিদায় বেলা।
বিশ্বের প্রভাবশালী গণতান্ত্রিক দেশে সরকারের শেষ সময় একটি কাজ প্রায় নিয়মিতই করে। পাঠক কিংবা জনগণকে মনে করিয়ে দেয়, ক্ষমতা নেওয়ার দিন, আগে কিংবা পরে শাসক কী বলেছিলেন, কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সেগুলোর আলোকে দুভাবে মূল্যায়ন করা হয়–
এক. বিশেষজ্ঞের বিশ্লেষণে প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের চুলচেরা হিসাব
দুই. জনগণের অভিজ্ঞতার আলোকে শাসনকালের মূল্যায়ন
প্রথমটা নিশ্চয়ই হবে। হতেই থাকবে। আমরা বরং একদফা চোখ বুলিয়ে নিই, কী কথা দিয়েছিলেন নোবেলজয়ী মোহাম্মদ ইউনূস। এই স্মরণ পাঠকের জন্য। গণতন্ত্রের জন্য। ইতিহাসের জন্য।
৮ আগস্ট, ২০২৪। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শাসকশূন্য তিনদিন কেটে গেছে। দেশ তখন অস্থির। সহিংসতা, ভয় ও অনিশ্চয়তা চারদিকে।
এই প্রেক্ষাপটে ফ্রান্স থেকে এসে দেশের দায়িত্ব নেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন। ওই দিন শপথের পরপরই তিনি জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, এই দায়িত্ব তিনি চাননি। এই দায়িত্ব তিনি নিয়েছেন পরিস্থিতির কারণে।
মানবাধিকার রক্ষা আর মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার আগে অধ্যাপক ইউনূস বাংলাদেশের সংবিধানের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তার শপথ নেন। শপথ হয় বঙ্গভবনের দরবার হলে, রাত ৯টা ১৫ মিনিটে। রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন প্রধান উপদেষ্টার শপথবাক্য পাঠ করান।
দুর্নীতি দমন: প্রথম ও স্পষ্ট অঙ্গীকার
ড. ইউনূস বলেন, দুর্নীতি রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে ধ্বংস করে। অনেক হয়েছে। আর না। তিনি ঘোষণা করেন, তার সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। ২৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশে দেওয়া তার আনুষ্ঠানিক প্রথম ভাষণে অধ্যাপক ইউনূস ঘোষণা করেন–“উপদেষ্টারা নিজেদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করবেন।” তিনি বলেন, পর্যায়ক্রমে সরকারি কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও এটি বাধ্যতামূলক হবে। এমন প্রতিশ্রুতির ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ঘুষমুক্ত দেশ ছাড়া ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র সম্ভব নয়।
মতপ্রকাশ ও সমালোচনার স্বাধীনতা
ড. ইউনূস বলেন, “গণতন্ত্র মানেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা।” তিনি বলেন, মানুষ যেন নির্ভয়ে কথা বলতে পারে। সমালোচনা করতে পারে। তিনি তেমনটি চান। ২৫ আগস্টের ভাষণে তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি দেন অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, নিপীড়নমূলক আইন গণতন্ত্রের শত্রু। গণমাধ্যমের ওপর থাকা দমনমূলক আইন সংশোধন বা বাতিল করা হবে।
মানবাধিকার রক্ষার অঙ্গীকার
ড. ইউনূস বলেন, মানবাধিকার রাষ্ট্রের ভিত্তি। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, দেশে সুবিচার নিশ্চিত করা হবে। মানবাধিকার রক্ষা করা হবে। ২৫ আগস্টের ভাষণে তিনি বলেন, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, আদিবাসী, নারী ও শিশু–সবাই সমান নাগরিক। বাংলাদেশের সবাই একটা পরিবার উল্লেখ করে তিনি বলেন, আইনের সুরক্ষা সবার জন্য সমান হবে।
অরাজকতা ও ভয় নিয়ে কথা
শপথ নিয়ে ড. ইউনূস বলেন, দেশজুড়ে অরাজকতা তৈরি হয়েছে। তিনি কথা দিয়েছিলেন, এই ভয় ও বিশৃঙ্খলা দূর করা হবে। তিনি বলেন, মানুষ যেন ভয়মুক্ত হয়ে চলতে পারে–এটাই এই সরকারের প্রথম দায়িত্ব।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ে অবস্থান
সেনা, নৌ, বিমানবাহিনী ও পুলিশকে রাষ্ট্রের গর্ব উল্লেখ করে জাতির উদ্দেশে দেওয়া নিজের প্রথম ভাষণে তিনি বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক হুকুম থেকে মুক্ত রাখা হবে।
জুলাই–আগস্ট ও বিচার প্রসঙ্গ
২৫ আগস্টের ভাষণে ড. ইউনূস বলেন, জুলাই-আগস্টে গণহত্যা হয়েছে। বলেন, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। সে কারণে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলেও জানিয়েছিলেন তিনি। গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি ছিল তার সেই ভাষণে।
নির্বাচন ও ক্ষমতা হস্তান্তর
ড. ইউনূস বলেছিলেন, এই সরকারের মূল দায়িত্ব একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন। প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনের সংস্কার প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি কথা দিয়েছিলেন, সংস্কারের পর একটি অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হবে।
মূল প্রতিশ্রুতি
ড. মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতা নেওয়ার সময় যা বলেছিলেন–সেগুলো ছিল অঙ্গীকার। জনগণের কাছে কোনো ধরনের দায়বদ্ধতা থাকে না অন্তর্বর্তীকালীন কিংবা তত্ত্বাবধায়ক ধরনের সরকারের। রাজনৈতিক ব্যর্থতার কারণেই গঠিত হয় এ ধরনের সরকার। আজ থেকে ১৮ মাস আগে তেমনই এক সরকার যাত্রা করেছিল অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে। যার যার অভিজ্ঞতার আলোকে মূল্যায়ন করা যেতেই পারে সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতি আর এই দেড় বছরে তাদের কর্মকাণ্ডকে।