চরচা ডেস্ক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার দুদিন আগে আমেরিকার সঙ্গে হওয়া বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে দেশে বেশ তোলপাড় হয়েছে। কিন্তু নির্বাচনের ডামাডোলে এই আলোচনা–সমালোচনা শুরু হয়েই অনেকটা মিলিয়ে গেছে। বলা হয়েছে–অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নেওয়ার আগমুহূর্তে দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিক্রি করে দিয়ে গেছে। এ নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের ভ্যারিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।
Chief Adviser GOB পেজে দেওয়া দীর্ঘ পোস্টে ‘বাংলাদেশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পাদিত Agreement on Reciprocal Trade (ART)’–এর পটভূমি তুলে ধরা হয়েছে শুরুতে।
এতে বলা হয়, “২০২৫ সালের ২ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র নির্বাহী আদেশ নং ১৪২৫৭ বলে বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সকল দেশের ওপর বিভিন্ন হারে যুক্তরাষ্ট্র Reciprocal Tariff (RT) আরোপ করে। এর পরপরই বাংলাদেশ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও বাণিজ্য উপদেষ্টা মার্কিন কর্তৃপক্ষকে পত্র প্রেরণ করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যোগাযোগ স্থাপন ও আলাপ আলোচনার মধ্যমে উক্ত শুল্ক প্রত্যাহার বা কমানোর অনুরোধ করে। যুক্তরাষ্ট্র RT (পাল্টাপাল্টি শুল্কারোপ) আরোপের পর একটি অভিন্ন RT চুক্তির খসড়া প্রায় সকল বাণিজ্য অংশীদার দেশকে প্রেরণ করে। যে সকল দেশ উক্ত চুক্তির ওপর আলোচনায় অংশ নেয়, তাদের ওপর আরোপিত শুল্ক হার কমিয়ে ৩০ আগস্ট একটি Revised RT হার নির্ধারণ করে, যা বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত হয় ২০%।”
এইি প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার শুল্কহার কমাতে মার্কিন সরাকরের সঙ্গে আলোচনা করে। এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার পেজে বলা হয়, “বাংলাদেশি পণ্যের ওপর পারষ্পরিক শুল্কারোপের পর Agreement on Reciprocal Trade (ART) চুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়। গত ৯ মাস ধরে ধারাবাহিক ও গঠনমূলক আলোচনা এবং নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সফলভাবে দর কষাকষি করে পারষ্পরিক শুল্ক হার ১৯ শতাংশ নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। এ দীর্ঘ আলোচনা প্রক্রিয়ায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নেতৃত্ব দেয়। এ কাজে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয় এবং ওয়াশিংটনে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিল। বিভিন্ন বহুমাত্রিক বিষয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় পরামর্শ গ্রহণ করে বাংলাদেশের অবস্থান নির্ধারণ করা হয়।”
পোস্টে লেখা হয়েছে, “RT চুক্তিতে পণ্য, সেবা, বাণিজ্য, কাস্টমস প্রক্রিয়া ও বাণিজ্য সহজীকরণ, রুলস অব অরিজিন, স্বাস্থ্য ও উদ্ভিদ সুরক্ষা ব্যবস্থা, কারিগরি বাধা, বিনিয়োগ, ই-কমার্স, সরকারি ক্রয়, লেবার, পরিবেশ, প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা, পারস্পরিক সহযোগিতাসহ বিস্তৃত বিষয়ে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ সকল বিষয়ের মধ্যে বাংলাদেশ আগে থেকেই WTO TRIPS চুক্তি অনুস্বাক্ষর করায় বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের RT চুক্তিতে নতুন কোনো শর্ত আরোপিত হয়নি। অন্যান্য বিষয়ে বাংলাদেশ পূর্বেই ILO, TRIPS ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। RT-তে উক্ত চুক্তির বিধানাবলী বাস্তাবায়নে সম্মতি দেওয়া হয়েছে।”
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া বাংলাদেশের বাণিজ্য চুক্তির মধ্যে কিছু বিশেষ পণ্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করার শর্ত নিয়ে সমালোচনার জবাবে ওই পোস্টে লেখা হয়েছে, “বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে যে সকল পণ্য ক্রয়ের অঙ্গীকার করেছে, সেসব পণ্য অন্য উৎস হতে ক্রয় করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান গন্তব্য বিধায় সে বাজার ধরে রাখার জন্য তাদের বাজার থেকে ক্রয়ের অঙ্গীকার করা হয়েছে; এতে বাংলাদেশের অতিরিক্ত ব্যয় হবে না। শুধুমাত্র উৎসের পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশের রপ্তানি বাজার সুরক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”
আরও বলা হয়েছে, “চুক্তিতে ট্রেক্সটাইল ও পোশাক খাতের জন্য বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা ও কৃত্রিম তন্তু আমদানি করে এবং তা ব্যবহার করে তৈরি করা পোশাক যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির ক্ষেত্রে শূন্য RT হারে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে। বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্র রপ্তানি হওয়া মোট পণ্যের প্রায় ৮০ শতাংশই তৈরী পোশাক। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ মার্কিন তুলা ও কৃত্রিম তন্তু আমদানি করে তৈরী পোশাক যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করলে পোশাক খাতে প্রত্যাশিত সুবিধা নিশ্চিত হবে। এক্ষেত্রে, ১৯ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক যোগ হবে না।”
চুক্তির উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হিসেবে পোস্টে উল্লেখ করা হয়েছে–
১. এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড ও বাংলাদেশসহ প্রায় ১৫টি দেশের সাথে Reciprocal Tariff চুক্তি সম্পাদন করেছে। ভারত ও জাপানের সাথে Joint Declaration সম্পন্ন হয়েছে, চুক্তি স্বাক্ষর অপেক্ষমাণ। যে সকল চুক্তি অনলাইনে উন্মুক্ত করা হয়েছে তার মধ্যে মালয়েশিয়া এবং কেম্বোডিয়ার সাথে সম্পাদিত চুক্তির সাথে বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের Agreement on BD-US Reciprocal Trade এর কতিপয় মিল রয়েছে।

কয়েকটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। যেমন: যুক্তরাষ্ট্র মালয়েশিয়া ও কেম্বোডিয়ার সাথে সম্পাদিত চুক্তিতে বলা হয়েছে ওই দুটি দেশ ডিজিটাল ট্রেড সংক্রান্ত কোনো চুক্তি স্বাক্ষর করতে চাইলে সেক্ষেত্রে তাদেরকে উক্ত চুক্তি স্বাক্ষরের পূর্বে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনা করতে হবে। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চূড়ান্তকৃত ART এর খসড়াতে এ ধরনের কোনো বিধান নেই।
৩. যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদিত তুলা এবং man made fiber textile inputs ব্যবহার করে উৎপাদিত পণ্য উক্ত দেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা (Market access) প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
উক্তরূপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে মালয়েশিয়া এবং কেম্বোডিয়ার সম্পাদিত Agreement on Reciprocal Trade (ART)-তে উল্লেখ নেই। এখানে বাংলাদেশ সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে।
৪. এ চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ প্রায় ২৫০০টি পণ্যের শূণ্য শুল্ক সুবিধা পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ, কৃষিপণ্য, প্লাষ্টিক, কাঠ ও কাঠজাত পণ্যসহ অন্যান্য পণ্য। অন্যদিকে, বাংলাদেশের বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা (Market access) প্রদানের ৭১৩২টি tariff line / HS Code কে offer list-এ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। offer list-এর সার-সংক্ষেপ নিম্নরূপ:
(ক) ৪৯২২টি tariff line-কে চুক্তি স্বাক্ষরের দিন হতে শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদান করা হবে (উল্লেখ্য, এর মধ্যে ৪৪১টি tariff line-এর শুল্কহার ইতোমধ্যে শূন্য রয়েছে);
(খ) ১৫৩৮টি tariff line-এর শুল্কহার ৫ বছরের মধ্যে শূন্য করা হবে (প্রথম বছর ৫০% হ্রাস এবং পরবর্তী ৪ বছরে অবশিষ্ট ৫০%কে সমানুপাতিক হারে হ্রাস করে শূন্য করা হবে);
(গ) ৬৭২টি tariff line-এর শুল্কহার ১০ বছরের মধ্যে শূন্য করা হবে (প্রথম বছর ৫০% হ্রাস এবং পরবর্তী ৯ বছরে অবশিষ্ট ৫০%-কে সমানুপাতিক হারে হ্রাস করে শূন্য করা হবে);
(ঘ) ৩২৬টি tariff line-কে শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদান করা হয়নি (এর মধ্যে জাপান ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পাদিত CEPA’র offer list-এর ৮১টি EMFN tariff line-কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে)।
উল্লেখ্য, অন্যান্য দেশের সাথে সম্পাদিত ART-তে ধাপে ধাপে শুল্ক হ্রাসের (staging) বিষয়টি পরিলক্ষিত হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশের ART-তে ধাপে ধাপে শুল্ক হ্রাসের বিধান সংযুক্ত করা হয়েছে।
৫. ART paperless trade 4, IPR enforcement, E-commerce permanent moratorium সমর্থন, Non-Tariff Barrier ও TBT হ্রাস, Trade Facilitation, Conformity Assessment Certificate, Good Governance ও nuclear reactors, fuel rods, or enriched uranium ক্রয় ইত্যাদি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। ৯টি IPR-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি accession প্রস্তাবে সম্মতি প্রদান করা হয়েছে।
৬. ART-তে ই-কমার্স এ permanent moratorium-কে সমর্থন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হতে মেডিক্যাল ডিভাইস ও ফার্মাসিউটিক্যালস আমদানিতে উক্ত দেশের FDA'র সনদ থাকা সাপেক্ষে মার্কেট অথরাইজেশন এর পূর্বানুমতি ব্যাতীত আমদানির সুযোগ; FMVSS-কে স্বীকৃতি; রিম্যানুফেকচার গুডস আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ না করা; খাদ্য ও কৃষি পণ্য আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের SPS মেজার্সকে স্বীকৃতি প্রদান; ডেইরি প্রোডাক্টস, মাংস ও পোল্ট্রি প্রোডাক্ট আমদানিতে মার্কিন সনদকে স্বীকৃতি প্রদানের বিষয়সমূহ উল্লেখ রয়েছে। এগ্রিকালচারাল বায়ো-টেকনোলজি রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট সময়ে সম্পন্ন, উক্ত প্রযুক্তির খাদ্য ও কৃষিজাত পণ্যকে (Non-Living Modified Organisms না থাকা শর্তে) স্বীকৃতি; জীবন্ত পোল্ট্রি ও এর সংশ্লিষ্ট পণ্য আমদানিতে আন্তর্জাতিক পদ্ধতি অনুসরণ এবং MRL-কে স্বীকৃতি; Plant and Plant products এর আমদানিতে market access প্রক্রিয়া ২৪ মাসের মধ্যে সম্পাদন; ইন্স্যুরেন্স, তেল, গ্যাস ও টেলিযোগাযোগ খাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগে ইকুইটি সীমা লিবারালাইজ করা, অ্যান্টিকরাপশন-সংক্রান্ত বিধি-বিধানের যথাযথ প্রয়োগ, ডব্লিউটিও-এর এগ্রিমেন্ট অন ফিশারিজ সাবসিডিকে accept করা ও Illegal Unreported and Underregulated (IUU)-এর ক্ষেত্রে সাবসিডি প্রদান না করা, পরিবেশ রক্ষায় এ-সংক্রান্ত বিধি-বিধানের যথাযথ প্রয়োগ, বনজ সম্পদ ও Wildlife-এর অবৈধ ট্রেড বন্ধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ; আন্তর্জাতিক Labor-সংক্রান্ত বিধি-বিধান অনুযায়ী বাংলাদেশের labor law-কে হালনাগাদ করার বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
৭. ডিজিটাল ট্রেড ও টেকনোলোজিতে CBPR, PRP, PDPO ইত্যাদি বিষয়কে স্বীকৃতি, যুক্তরাষ্ট্রের ইকোনোমিক ও ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইস্যু সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ এবং উক্ত দেশ হতে বোয়িং ক্রয়, LNG, LPG, সয়াবিন, গম, তুলা, সামরিক সরঞ্জাম আমদানি বৃদ্ধির প্রচেষ্টা করার বিষয়সমূহ খসড়া চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে।
৮. কোনো দেশের পক্ষেই চুক্তি terminate করার সুযোগ ছিল না। বাংলাদেশ চুক্তিতে exit clause অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
সামগ্রিকভাবে, বাংলাদেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার Agreement on BD-US Reciprocal Trade যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানিতে competitiveness ধরে রাখাসহ এবং বিশ্বের সাথে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সুফল বয়ে আনবে মর্মে আশা করা যাচ্ছে।
প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে দেওয়া এই ব্যাখ্যায় দেশের মানুষকে আশ্বস্ত করা হয়েছে। তীব্র সমালোচনার মুখে এ নিয়ে প্রথমবারের মতো ব্যাখ্যা এল অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার দুদিন আগে আমেরিকার সঙ্গে হওয়া বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে দেশে বেশ তোলপাড় হয়েছে। কিন্তু নির্বাচনের ডামাডোলে এই আলোচনা–সমালোচনা শুরু হয়েই অনেকটা মিলিয়ে গেছে। বলা হয়েছে–অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নেওয়ার আগমুহূর্তে দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিক্রি করে দিয়ে গেছে। এ নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের ভ্যারিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।
Chief Adviser GOB পেজে দেওয়া দীর্ঘ পোস্টে ‘বাংলাদেশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পাদিত Agreement on Reciprocal Trade (ART)’–এর পটভূমি তুলে ধরা হয়েছে শুরুতে।
এতে বলা হয়, “২০২৫ সালের ২ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র নির্বাহী আদেশ নং ১৪২৫৭ বলে বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সকল দেশের ওপর বিভিন্ন হারে যুক্তরাষ্ট্র Reciprocal Tariff (RT) আরোপ করে। এর পরপরই বাংলাদেশ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও বাণিজ্য উপদেষ্টা মার্কিন কর্তৃপক্ষকে পত্র প্রেরণ করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যোগাযোগ স্থাপন ও আলাপ আলোচনার মধ্যমে উক্ত শুল্ক প্রত্যাহার বা কমানোর অনুরোধ করে। যুক্তরাষ্ট্র RT (পাল্টাপাল্টি শুল্কারোপ) আরোপের পর একটি অভিন্ন RT চুক্তির খসড়া প্রায় সকল বাণিজ্য অংশীদার দেশকে প্রেরণ করে। যে সকল দেশ উক্ত চুক্তির ওপর আলোচনায় অংশ নেয়, তাদের ওপর আরোপিত শুল্ক হার কমিয়ে ৩০ আগস্ট একটি Revised RT হার নির্ধারণ করে, যা বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত হয় ২০%।”
এইি প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার শুল্কহার কমাতে মার্কিন সরাকরের সঙ্গে আলোচনা করে। এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার পেজে বলা হয়, “বাংলাদেশি পণ্যের ওপর পারষ্পরিক শুল্কারোপের পর Agreement on Reciprocal Trade (ART) চুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়। গত ৯ মাস ধরে ধারাবাহিক ও গঠনমূলক আলোচনা এবং নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সফলভাবে দর কষাকষি করে পারষ্পরিক শুল্ক হার ১৯ শতাংশ নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। এ দীর্ঘ আলোচনা প্রক্রিয়ায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নেতৃত্ব দেয়। এ কাজে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয় এবং ওয়াশিংটনে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিল। বিভিন্ন বহুমাত্রিক বিষয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় পরামর্শ গ্রহণ করে বাংলাদেশের অবস্থান নির্ধারণ করা হয়।”
পোস্টে লেখা হয়েছে, “RT চুক্তিতে পণ্য, সেবা, বাণিজ্য, কাস্টমস প্রক্রিয়া ও বাণিজ্য সহজীকরণ, রুলস অব অরিজিন, স্বাস্থ্য ও উদ্ভিদ সুরক্ষা ব্যবস্থা, কারিগরি বাধা, বিনিয়োগ, ই-কমার্স, সরকারি ক্রয়, লেবার, পরিবেশ, প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা, পারস্পরিক সহযোগিতাসহ বিস্তৃত বিষয়ে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ সকল বিষয়ের মধ্যে বাংলাদেশ আগে থেকেই WTO TRIPS চুক্তি অনুস্বাক্ষর করায় বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের RT চুক্তিতে নতুন কোনো শর্ত আরোপিত হয়নি। অন্যান্য বিষয়ে বাংলাদেশ পূর্বেই ILO, TRIPS ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। RT-তে উক্ত চুক্তির বিধানাবলী বাস্তাবায়নে সম্মতি দেওয়া হয়েছে।”
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া বাংলাদেশের বাণিজ্য চুক্তির মধ্যে কিছু বিশেষ পণ্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করার শর্ত নিয়ে সমালোচনার জবাবে ওই পোস্টে লেখা হয়েছে, “বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে যে সকল পণ্য ক্রয়ের অঙ্গীকার করেছে, সেসব পণ্য অন্য উৎস হতে ক্রয় করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান গন্তব্য বিধায় সে বাজার ধরে রাখার জন্য তাদের বাজার থেকে ক্রয়ের অঙ্গীকার করা হয়েছে; এতে বাংলাদেশের অতিরিক্ত ব্যয় হবে না। শুধুমাত্র উৎসের পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশের রপ্তানি বাজার সুরক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”
আরও বলা হয়েছে, “চুক্তিতে ট্রেক্সটাইল ও পোশাক খাতের জন্য বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা ও কৃত্রিম তন্তু আমদানি করে এবং তা ব্যবহার করে তৈরি করা পোশাক যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির ক্ষেত্রে শূন্য RT হারে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে। বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্র রপ্তানি হওয়া মোট পণ্যের প্রায় ৮০ শতাংশই তৈরী পোশাক। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ মার্কিন তুলা ও কৃত্রিম তন্তু আমদানি করে তৈরী পোশাক যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করলে পোশাক খাতে প্রত্যাশিত সুবিধা নিশ্চিত হবে। এক্ষেত্রে, ১৯ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক যোগ হবে না।”
চুক্তির উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হিসেবে পোস্টে উল্লেখ করা হয়েছে–
১. এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড ও বাংলাদেশসহ প্রায় ১৫টি দেশের সাথে Reciprocal Tariff চুক্তি সম্পাদন করেছে। ভারত ও জাপানের সাথে Joint Declaration সম্পন্ন হয়েছে, চুক্তি স্বাক্ষর অপেক্ষমাণ। যে সকল চুক্তি অনলাইনে উন্মুক্ত করা হয়েছে তার মধ্যে মালয়েশিয়া এবং কেম্বোডিয়ার সাথে সম্পাদিত চুক্তির সাথে বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের Agreement on BD-US Reciprocal Trade এর কতিপয় মিল রয়েছে।

কয়েকটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। যেমন: যুক্তরাষ্ট্র মালয়েশিয়া ও কেম্বোডিয়ার সাথে সম্পাদিত চুক্তিতে বলা হয়েছে ওই দুটি দেশ ডিজিটাল ট্রেড সংক্রান্ত কোনো চুক্তি স্বাক্ষর করতে চাইলে সেক্ষেত্রে তাদেরকে উক্ত চুক্তি স্বাক্ষরের পূর্বে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনা করতে হবে। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চূড়ান্তকৃত ART এর খসড়াতে এ ধরনের কোনো বিধান নেই।
৩. যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদিত তুলা এবং man made fiber textile inputs ব্যবহার করে উৎপাদিত পণ্য উক্ত দেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা (Market access) প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
উক্তরূপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে মালয়েশিয়া এবং কেম্বোডিয়ার সম্পাদিত Agreement on Reciprocal Trade (ART)-তে উল্লেখ নেই। এখানে বাংলাদেশ সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে।
৪. এ চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ প্রায় ২৫০০টি পণ্যের শূণ্য শুল্ক সুবিধা পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ, কৃষিপণ্য, প্লাষ্টিক, কাঠ ও কাঠজাত পণ্যসহ অন্যান্য পণ্য। অন্যদিকে, বাংলাদেশের বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা (Market access) প্রদানের ৭১৩২টি tariff line / HS Code কে offer list-এ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। offer list-এর সার-সংক্ষেপ নিম্নরূপ:
(ক) ৪৯২২টি tariff line-কে চুক্তি স্বাক্ষরের দিন হতে শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদান করা হবে (উল্লেখ্য, এর মধ্যে ৪৪১টি tariff line-এর শুল্কহার ইতোমধ্যে শূন্য রয়েছে);
(খ) ১৫৩৮টি tariff line-এর শুল্কহার ৫ বছরের মধ্যে শূন্য করা হবে (প্রথম বছর ৫০% হ্রাস এবং পরবর্তী ৪ বছরে অবশিষ্ট ৫০%কে সমানুপাতিক হারে হ্রাস করে শূন্য করা হবে);
(গ) ৬৭২টি tariff line-এর শুল্কহার ১০ বছরের মধ্যে শূন্য করা হবে (প্রথম বছর ৫০% হ্রাস এবং পরবর্তী ৯ বছরে অবশিষ্ট ৫০%-কে সমানুপাতিক হারে হ্রাস করে শূন্য করা হবে);
(ঘ) ৩২৬টি tariff line-কে শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদান করা হয়নি (এর মধ্যে জাপান ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পাদিত CEPA’র offer list-এর ৮১টি EMFN tariff line-কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে)।
উল্লেখ্য, অন্যান্য দেশের সাথে সম্পাদিত ART-তে ধাপে ধাপে শুল্ক হ্রাসের (staging) বিষয়টি পরিলক্ষিত হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশের ART-তে ধাপে ধাপে শুল্ক হ্রাসের বিধান সংযুক্ত করা হয়েছে।
৫. ART paperless trade 4, IPR enforcement, E-commerce permanent moratorium সমর্থন, Non-Tariff Barrier ও TBT হ্রাস, Trade Facilitation, Conformity Assessment Certificate, Good Governance ও nuclear reactors, fuel rods, or enriched uranium ক্রয় ইত্যাদি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। ৯টি IPR-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি accession প্রস্তাবে সম্মতি প্রদান করা হয়েছে।
৬. ART-তে ই-কমার্স এ permanent moratorium-কে সমর্থন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হতে মেডিক্যাল ডিভাইস ও ফার্মাসিউটিক্যালস আমদানিতে উক্ত দেশের FDA'র সনদ থাকা সাপেক্ষে মার্কেট অথরাইজেশন এর পূর্বানুমতি ব্যাতীত আমদানির সুযোগ; FMVSS-কে স্বীকৃতি; রিম্যানুফেকচার গুডস আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ না করা; খাদ্য ও কৃষি পণ্য আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের SPS মেজার্সকে স্বীকৃতি প্রদান; ডেইরি প্রোডাক্টস, মাংস ও পোল্ট্রি প্রোডাক্ট আমদানিতে মার্কিন সনদকে স্বীকৃতি প্রদানের বিষয়সমূহ উল্লেখ রয়েছে। এগ্রিকালচারাল বায়ো-টেকনোলজি রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট সময়ে সম্পন্ন, উক্ত প্রযুক্তির খাদ্য ও কৃষিজাত পণ্যকে (Non-Living Modified Organisms না থাকা শর্তে) স্বীকৃতি; জীবন্ত পোল্ট্রি ও এর সংশ্লিষ্ট পণ্য আমদানিতে আন্তর্জাতিক পদ্ধতি অনুসরণ এবং MRL-কে স্বীকৃতি; Plant and Plant products এর আমদানিতে market access প্রক্রিয়া ২৪ মাসের মধ্যে সম্পাদন; ইন্স্যুরেন্স, তেল, গ্যাস ও টেলিযোগাযোগ খাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগে ইকুইটি সীমা লিবারালাইজ করা, অ্যান্টিকরাপশন-সংক্রান্ত বিধি-বিধানের যথাযথ প্রয়োগ, ডব্লিউটিও-এর এগ্রিমেন্ট অন ফিশারিজ সাবসিডিকে accept করা ও Illegal Unreported and Underregulated (IUU)-এর ক্ষেত্রে সাবসিডি প্রদান না করা, পরিবেশ রক্ষায় এ-সংক্রান্ত বিধি-বিধানের যথাযথ প্রয়োগ, বনজ সম্পদ ও Wildlife-এর অবৈধ ট্রেড বন্ধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ; আন্তর্জাতিক Labor-সংক্রান্ত বিধি-বিধান অনুযায়ী বাংলাদেশের labor law-কে হালনাগাদ করার বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
৭. ডিজিটাল ট্রেড ও টেকনোলোজিতে CBPR, PRP, PDPO ইত্যাদি বিষয়কে স্বীকৃতি, যুক্তরাষ্ট্রের ইকোনোমিক ও ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইস্যু সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ এবং উক্ত দেশ হতে বোয়িং ক্রয়, LNG, LPG, সয়াবিন, গম, তুলা, সামরিক সরঞ্জাম আমদানি বৃদ্ধির প্রচেষ্টা করার বিষয়সমূহ খসড়া চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে।
৮. কোনো দেশের পক্ষেই চুক্তি terminate করার সুযোগ ছিল না। বাংলাদেশ চুক্তিতে exit clause অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
সামগ্রিকভাবে, বাংলাদেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার Agreement on BD-US Reciprocal Trade যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানিতে competitiveness ধরে রাখাসহ এবং বিশ্বের সাথে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সুফল বয়ে আনবে মর্মে আশা করা যাচ্ছে।
প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে দেওয়া এই ব্যাখ্যায় দেশের মানুষকে আশ্বস্ত করা হয়েছে। তীব্র সমালোচনার মুখে এ নিয়ে প্রথমবারের মতো ব্যাখ্যা এল অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে।