চরচা ডেস্ক

চার্লস ম্যাকের লেখা ‘এক্সট্রাঅর্ডিনারি পপুলার ডিলিউশন্স অ্যান্ড দ্য ম্যাডনেস অব ক্রাউডস’ (১৮৪১) বইটি ইতিহাসবিদদের চোখে যেমন সমালোচিত হলেও ব্যবসায়ীদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। ১৭ শতকের টিউলিপ ফুলের ব্যবসা নিয়ে পাগলামি (টিউলিপ ম্যানিয়া) এবং ১৮ শতকের শেয়ার বাজারের ধস (সাউথ সি বাবল) নিয়ে চমৎকার বর্ণনার জন্য বইটি পরিচিত। তবে যারা ২১ শতকের ব্যবসা-বাণিজ্য বুঝতে চান, তাদের বরং এই বইয়ের ‘পৃথিবীর শেষ নিয়ে মহামারি আতঙ্ক’ অধ্যায়টি পড়া দরকার।
আজকের মার্কিন পুঁজিবাদের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হলো, ‘পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে’-এমন একটি আতঙ্ক। এই যেমন ধনকুবের ইলন মাস্কের কথাই ধরুন। তাকে দেখলে মনে হয় তিনি ম্যাকের বইয়ের পাতা থেকেই যেন উঠে এসেছেন। মাস্ক খুব শিগগিরই তার রকেট কোম্পানি ‘স্পেসএক্স’ শেয়ার বাজারে ছাড়বেন। এই কোম্পানির মূল লক্ষ্য হলো মঙ্গলে মানুষের বসতি গড়া, যাতে ভবিষ্যতে পৃথিবী ধ্বংসের কোনো পরিস্থিতি তৈরি হলেও মানবজাতি টিকে থাকতে পারে। ইলন মাস্ক আমেরিকার সবচেয়ে ধনী ব্যবসায়ী হতে পেরেছেন, কারণ তিনি সবাইকে এই আসন্ন বিপদের কথা সবচেয়ে জোরেসোরে শোনাতে পেরেছেন।
একই রকম ‘পৃথিবীর শেষ’ নিয়ে ভয় দেখানো আরও দুজন ব্যক্তির আগেই মাস্ক তার কোম্পানি বাজারে ছাড়ার জন্য তাড়াহুড়ো করছেন। এদের একটি প্রতিষ্ঠান ‘অ্যানথ্রোপিক’ চলতি সপ্তাহেই শেয়ারবাজারে আসার আবেদন করেছে। এর প্রধান দারিও আমোদেই তাদের তৈরি ‘মিথোস’ এআই মডেলের ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা নিয়ে অনেক কথা বলেছেন, যা এখনো সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হয়নি। অন্যদিকে স্যাম অল্টম্যানের ‘ওপেনএআই’ কোম্পানিটিও হয়তো দ্রুতই শেয়ারবাজারে আসার আবেদন করবে। এই প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি এআই-এর যুগে মানুষের সমাজ ব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে একটি কাল্পনিক ও আদর্শ রূপরেখা প্রকাশ করেছে।

বর্তমানে আমেরিকান ব্যবসাকে কে কোন ধরনের পণ্য তৈরি করছে তা দিয়ে বিচার করা যায় না, বরং কে পৃথিবী ধ্বংসের কী রূপরেখা দেখাচ্ছে—তা দিয়ে ভাগ করা যায়। এআইয়ের মতোই যুদ্ধের হুমকিও এখন ব্যবসার জগতে বড় জায়গা করে নিয়েছে। যেমন, ‘প্যালান্টিয়ার’ কোম্পানির প্রধান অ্যালেক্স কার্প গত বছর একটি বইয়ে লিখেছেন যে, পাশ্চাত্যের ভবিষ্যৎ টিকে থাকা নির্ভর করছে তাদের মতো হাই-টেক প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর ওপর।
আবার ‘অ্যান্ডুরিল’ নামের আরেকটি প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা পামার লাকি প্রায়ই বলেন যে, চীন যেকোনো সময় তাইওয়ান আক্রমণ করতে পারে। এমনকি যারা জরুরি খনিজ সম্পদ বিক্রি করেন, এমন প্রতিটি কোম্পানির কাছেই একটি গল্প তৈরি আছে-যুদ্ধ লাগলে কীভাবে তাদের খনিজ উপাদানগুলোর চরম সংকট তৈরি হবে (এবং তাদের পণ্যের দাম বাড়বে)।
ওয়াল স্ট্রিটের বড় একটা অংশ এখন এক ধরনের চরম হতাশায় ভুগছে। সম্প্রতি সাধারণ মানুষের কাছে অপরিচিত কিছু বেসরকারি ঋণ তহবিল থেকে বিনিয়োগকারীরা হুট করে টাকা তুলে নিয়েছেন। এতে পুরো বেসরকারি বাজারের ওপর থেকেই মানুষের ভরসা নড়ে গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, নতুন নতুন আর্থিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা অর্থনীতির জন্য এতটাই ঝুঁকি তৈরি করছে যে-সেই তালিকার শেষ নেই। এই পুরো ব্যবস্থাটা নিজের চিন্তার বোঝা নিয়েই কেন এখনো ভেঙে পড়েনি, তা ভাবাই কঠিন।
এর একটি বড় উদাহরণ হলো ‘ক্রিপ্টোকারেন্সি’। এটি মূলত তৈরিই হয়েছে পৃথিবী ধ্বংসের এক আতঙ্ক থেকে। ক্রিপ্টোকারেন্সির দাবি হলো, এটি সরকারের নিয়ন্ত্রণ এবং মার্কিন সরকারের অতিরিক্ত খরচের (যা মূলত যুদ্ধ ও প্রতিরক্ষায় ব্যয় হয়) ফলে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতি বা টাকার অবমূল্যায়ন থেকে সাধারণ মানুষকে বাঁচাবে।

অতীতের অর্থনৈতিক মন্দা বা বিপর্যয়ের বছরগুলো এখন ব্যবসায়ীদের কাছে প্রায় কুসংস্কারের মতো গুরুত্ব পাচ্ছে। গত বছর ওয়াল স্ট্রিটে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া বইটির নাম ছিল ‘১৯২৯’ (শেয়ার বাজারে ধসের বছর)। আর এই বছরের জন্য জনপ্রিয় বই হতে পারে ‘১৮৭৩’। ব্যবসায়ীরা বর্তমান শেয়ার বাজারকে অতীতের বড় বড় বিপর্যয়ের সাথে তুলনা করছেন। ডয়চে ব্যাংকের একজন বিশ্লেষক এই সপ্তাহে লিখেছেন, “১৯৯৯ সালের পরিস্থিতি কি ২০০০ বা ১৯৮৭ সালের মতো ধসে রূপ নেবে? নাকি বাজার আবার ভালো সময়ে (১৯৯৬ সালে) ফিরে যাবে?” ১৯৭৩ সালের মতো তেলের সংকটের কথা মাথায় আনার আগেই এই প্রশ্নগুলো উঠছে। আর বাজার যদি ১৯৯৯ সালের মতো ফুলেফেঁপে ওঠে, তবে কি নিশ্চিতভাবেই আরেকটি ২০০৮ সালের মতো বড় মন্দা ধেয়ে আসবে না?
যে অর্থনীতি ‘পৃথিবী ধ্বংসের’ আতঙ্কে ভোগে, সেখানে সবার মনেই সন্দেহ আর ভয় কাজ করে। অতীতে যেমন আকাশে ধূমকেতু দেখলে মানুষ ভাবত পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে; আজকাল তেমনি একটি ওয়েবসাইট বড় বড় ধনকুবেরদের প্রাইভেট জেটের যাতায়াতের ওপর নজর রাখে। মানুষের ধারণা, বড় কোনো বিপর্যয় ঘটলে এই ধনীরা বিমানে চড়ে নিরাপদ জায়গায় পালিয়ে যাবে। এমনকি অর্থনীতিবিদরাও আমেরিকার বর্তমান ভালো অর্থনৈতিক রিপোর্টের আড়ালে উদ্বেগের সাথে ‘K’ অক্ষরের মতো একটি লক্ষণ খুঁজছেন। এই ধারণাটির মানে হলো—দেশের অর্থনীতি আসলে মজবুত নয়, এটি কেবল অতি-ধনীদের জোরে টিকে আছে, আর বাকি সাধারণ মানুষ দিন দিন আরও গরিব হচ্ছে।
আজকাল বিভিন্ন প্রকল্পের সরকারি অনুমতি পাওয়ার সাধারণ বিতর্কগুলোও দেশের টিকে থাকার লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। যেমন, আমেরিকার ইয়োটাহ অঙ্গরাজ্যের গভর্নর সতর্ক করে বলেছেন, “সব শেষ, আমাদের আর কোনো আশা নেই-যদি এআইয়ের দৌড়ে আমেরিকা চীনের কাছে হেরে যায়।”
সম্প্রতি ওই রাজ্যের সাধারণ মানুষ সেখানে একটি বিশাল ডেটা সেন্টার তৈরির বিরুদ্ধে খেপে উঠেছে, যেটির পেছনে টাকা ঢালছেন টিভি শো ‘শার্ক ট্যাঙ্ক’-এর পরিচিত মুখ কেভিন ও’লিয়ারি। এমনকি সাধারণ চুক্তির বিষয়গুলোকেও এখন দুনিয়া কাঁপানো ঘটনা বানিয়ে ফেলা হচ্ছে। যেমন, ওপেনএআই-এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ঝগড়ার সময় ইলন মাস্ক স্যাম অল্টম্যানকে মেসেজ পাঠিয়েছিলেন, “আমি দুঃখিত, কিন্তু এখানে পুরো মানব সভ্যতার ভাগ্য জড়িয়ে আছে।”
ব্যবসায়িক নিয়মকানুন নিয়ে বিতর্কগুলো এখন এক ধরনের ধর্মীয় রূপ নিয়েছে। প্রযুক্তিখাতের বড় বিনিয়োগকারী পিটার থিয়েল মনে করেন, এআইয়ের ওপর সরকারের কড়া নিয়ন্ত্রণ আসলে শয়তান বা ‘দাজ্জাল’ (অ্যান্টিক্রাইস্ট)-এর আগমন ডেকে আনবে। আবার গত মাসে এআই নিয়ে লেখা এক বিশাল প্রবন্ধে পোপ লিও চতুর্দশ লিখেছেন, “শুধু নিয়মকানুন দিয়ে একে বাঁধা যাবে না, একে পুরোপুরি নিরস্ত্র করতে হবে।”
এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে যে, অবস্থা যদি এতই খারাপ হয়, তবে আমেরিকার শেয়ারবাজারে শেয়ারের দাম এত আকাশছোঁয়া কেন? অনেকে বলেন, আজকের শেয়ার বাজার আসলে ভয়ের চেয়ে মানুষের লোভের কারণে এত চাঙ্গা। কিন্তু আসল ব্যাপারটি পুরো উল্টো। কোম্পানিগুলো তাদের ‘পৃথিবী ধ্বংসের আতঙ্ক’ যতটা বড় করে দেখাতে পারছে, বাজার থেকে তত বেশি টাকা তুলতে পারছে। এবং তারা এটা করছে খুব তাড়াহুড়ো করে, কারণ তাদের ধারণা—যেকোনো সময় বাজারে বড় ধস নামতে পারে।
সবকিছু হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার সাধারণ ভয় এখন এক ধরনের পাগলামিতে রূপ নিয়েছে। যারা শেয়ার বাজারে বড় বড় তহবিল খাটান (হেজ-ফান্ড ব্যবসায়ী), তাদের কেউ কেউ ভাবছেন-ভবিষ্যতে এআই-এর কারণে মানুষের মেধা ও শ্রমের আর কোনো মূল্য থাকবে না। তাই তারা এখনই শেষ সম্বলটুকু বাজি ধরে টাকা জমানোর নেশায় মেতেছেন। মজার ব্যাপার হলো, যারা এই ধ্বংসের তত্ত্ব বিশ্বাস করেন এবং যারা একে ফালতু মনে করেন-উভয়পক্ষের শেয়ার কেনার তালিকা কিন্তু একই রকম। কারণ প্রযুক্তি খাতের শেয়ার ছাড়া আসলে তাদের আর অন্য কোথাও বিনিয়োগ করার উপায় নেই।
যদি এআই সত্যিই নতুন এক অর্থনীতি তৈরি করে, তবে বাজার এত দ্রুত বদলাবে যে মূল্যস্ফীতি আর সুদের হারের কারণে সরকারি বন্ডের (বিনিয়োগ মাধ্যম) দাম কমে যাবে। আর এআই যদি সফল না হয়, তবে এটি বর্তমান অর্থনীতিকে পুরোপুরি ধসিয়ে দেবে, যার ফলে বন্ডের দাম আরও তলানিতে গিয়ে ঠেকবে। তাই বিনিয়োগকারীরা মনেপ্রাণে এই ধ্বংসের কথা বিশ্বাস করুন আর নাই করুন—দিনশেষে তারা সবাই এই আতঙ্কেরই অন্ধ অনুসারী।
অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করতে করতে একটা দেশের পক্ষে নিজেকে পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিক বা মূল্যহীন করে ফেলা অসম্ভব কিছু নয়। তবে আমেরিকা এমন এক আজব জায়গা, যেখানে নিজেকে আতঙ্কের মধ্যে রেখে ধনী হওয়ার এক অভিনব পরীক্ষা চলে। ‘সবকিছু পুরোপুরি এবং চিরতরে বদলে যাবে’-এমন ভবিষ্যদ্বাণী করার অবশ্য কিছু সুবিধাও আছে। বিনিয়োগকারীদের পকেট থেকে টাকা বের করার এর চেয়ে বড় টোপ আর হতে পারে না-যখন আপনি দাবি করবেন যে আপনার ব্যবসাই এই চেনা পৃথিবীকে বদলে বা ধ্বংস করে দেবে।
তবে যে অর্থনীতিতে একদিকে সাধারণ মানুষের মনে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতি গভীর অবিশ্বাস রয়েছে, আর অন্যদিকে বড় বড় ধনকুবেরদের মাথায় ‘পৃথিবী ধ্বংসের’ ভূত চেপে বসেছে—সেই অর্থনীতি যেকোনো সময় বিস্ফোরিত হতে পারে। তাই বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে হয়, আসল বিপদ হয়তো ২০০৮, ১৯৯৯, ১৯৭৩ বা ১৮৭৩ সালের অর্থনৈতিক মন্দাগুলোর মতো নয়; বরং বিপদটা হতে পারে ১৭৮৯ সালের (ফরাসি বিপ্লবের) মতো এক রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থান।
(দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণ)

চার্লস ম্যাকের লেখা ‘এক্সট্রাঅর্ডিনারি পপুলার ডিলিউশন্স অ্যান্ড দ্য ম্যাডনেস অব ক্রাউডস’ (১৮৪১) বইটি ইতিহাসবিদদের চোখে যেমন সমালোচিত হলেও ব্যবসায়ীদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। ১৭ শতকের টিউলিপ ফুলের ব্যবসা নিয়ে পাগলামি (টিউলিপ ম্যানিয়া) এবং ১৮ শতকের শেয়ার বাজারের ধস (সাউথ সি বাবল) নিয়ে চমৎকার বর্ণনার জন্য বইটি পরিচিত। তবে যারা ২১ শতকের ব্যবসা-বাণিজ্য বুঝতে চান, তাদের বরং এই বইয়ের ‘পৃথিবীর শেষ নিয়ে মহামারি আতঙ্ক’ অধ্যায়টি পড়া দরকার।
আজকের মার্কিন পুঁজিবাদের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হলো, ‘পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে’-এমন একটি আতঙ্ক। এই যেমন ধনকুবের ইলন মাস্কের কথাই ধরুন। তাকে দেখলে মনে হয় তিনি ম্যাকের বইয়ের পাতা থেকেই যেন উঠে এসেছেন। মাস্ক খুব শিগগিরই তার রকেট কোম্পানি ‘স্পেসএক্স’ শেয়ার বাজারে ছাড়বেন। এই কোম্পানির মূল লক্ষ্য হলো মঙ্গলে মানুষের বসতি গড়া, যাতে ভবিষ্যতে পৃথিবী ধ্বংসের কোনো পরিস্থিতি তৈরি হলেও মানবজাতি টিকে থাকতে পারে। ইলন মাস্ক আমেরিকার সবচেয়ে ধনী ব্যবসায়ী হতে পেরেছেন, কারণ তিনি সবাইকে এই আসন্ন বিপদের কথা সবচেয়ে জোরেসোরে শোনাতে পেরেছেন।
একই রকম ‘পৃথিবীর শেষ’ নিয়ে ভয় দেখানো আরও দুজন ব্যক্তির আগেই মাস্ক তার কোম্পানি বাজারে ছাড়ার জন্য তাড়াহুড়ো করছেন। এদের একটি প্রতিষ্ঠান ‘অ্যানথ্রোপিক’ চলতি সপ্তাহেই শেয়ারবাজারে আসার আবেদন করেছে। এর প্রধান দারিও আমোদেই তাদের তৈরি ‘মিথোস’ এআই মডেলের ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা নিয়ে অনেক কথা বলেছেন, যা এখনো সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হয়নি। অন্যদিকে স্যাম অল্টম্যানের ‘ওপেনএআই’ কোম্পানিটিও হয়তো দ্রুতই শেয়ারবাজারে আসার আবেদন করবে। এই প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি এআই-এর যুগে মানুষের সমাজ ব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে একটি কাল্পনিক ও আদর্শ রূপরেখা প্রকাশ করেছে।

বর্তমানে আমেরিকান ব্যবসাকে কে কোন ধরনের পণ্য তৈরি করছে তা দিয়ে বিচার করা যায় না, বরং কে পৃথিবী ধ্বংসের কী রূপরেখা দেখাচ্ছে—তা দিয়ে ভাগ করা যায়। এআইয়ের মতোই যুদ্ধের হুমকিও এখন ব্যবসার জগতে বড় জায়গা করে নিয়েছে। যেমন, ‘প্যালান্টিয়ার’ কোম্পানির প্রধান অ্যালেক্স কার্প গত বছর একটি বইয়ে লিখেছেন যে, পাশ্চাত্যের ভবিষ্যৎ টিকে থাকা নির্ভর করছে তাদের মতো হাই-টেক প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর ওপর।
আবার ‘অ্যান্ডুরিল’ নামের আরেকটি প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা পামার লাকি প্রায়ই বলেন যে, চীন যেকোনো সময় তাইওয়ান আক্রমণ করতে পারে। এমনকি যারা জরুরি খনিজ সম্পদ বিক্রি করেন, এমন প্রতিটি কোম্পানির কাছেই একটি গল্প তৈরি আছে-যুদ্ধ লাগলে কীভাবে তাদের খনিজ উপাদানগুলোর চরম সংকট তৈরি হবে (এবং তাদের পণ্যের দাম বাড়বে)।
ওয়াল স্ট্রিটের বড় একটা অংশ এখন এক ধরনের চরম হতাশায় ভুগছে। সম্প্রতি সাধারণ মানুষের কাছে অপরিচিত কিছু বেসরকারি ঋণ তহবিল থেকে বিনিয়োগকারীরা হুট করে টাকা তুলে নিয়েছেন। এতে পুরো বেসরকারি বাজারের ওপর থেকেই মানুষের ভরসা নড়ে গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, নতুন নতুন আর্থিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা অর্থনীতির জন্য এতটাই ঝুঁকি তৈরি করছে যে-সেই তালিকার শেষ নেই। এই পুরো ব্যবস্থাটা নিজের চিন্তার বোঝা নিয়েই কেন এখনো ভেঙে পড়েনি, তা ভাবাই কঠিন।
এর একটি বড় উদাহরণ হলো ‘ক্রিপ্টোকারেন্সি’। এটি মূলত তৈরিই হয়েছে পৃথিবী ধ্বংসের এক আতঙ্ক থেকে। ক্রিপ্টোকারেন্সির দাবি হলো, এটি সরকারের নিয়ন্ত্রণ এবং মার্কিন সরকারের অতিরিক্ত খরচের (যা মূলত যুদ্ধ ও প্রতিরক্ষায় ব্যয় হয়) ফলে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতি বা টাকার অবমূল্যায়ন থেকে সাধারণ মানুষকে বাঁচাবে।

অতীতের অর্থনৈতিক মন্দা বা বিপর্যয়ের বছরগুলো এখন ব্যবসায়ীদের কাছে প্রায় কুসংস্কারের মতো গুরুত্ব পাচ্ছে। গত বছর ওয়াল স্ট্রিটে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া বইটির নাম ছিল ‘১৯২৯’ (শেয়ার বাজারে ধসের বছর)। আর এই বছরের জন্য জনপ্রিয় বই হতে পারে ‘১৮৭৩’। ব্যবসায়ীরা বর্তমান শেয়ার বাজারকে অতীতের বড় বড় বিপর্যয়ের সাথে তুলনা করছেন। ডয়চে ব্যাংকের একজন বিশ্লেষক এই সপ্তাহে লিখেছেন, “১৯৯৯ সালের পরিস্থিতি কি ২০০০ বা ১৯৮৭ সালের মতো ধসে রূপ নেবে? নাকি বাজার আবার ভালো সময়ে (১৯৯৬ সালে) ফিরে যাবে?” ১৯৭৩ সালের মতো তেলের সংকটের কথা মাথায় আনার আগেই এই প্রশ্নগুলো উঠছে। আর বাজার যদি ১৯৯৯ সালের মতো ফুলেফেঁপে ওঠে, তবে কি নিশ্চিতভাবেই আরেকটি ২০০৮ সালের মতো বড় মন্দা ধেয়ে আসবে না?
যে অর্থনীতি ‘পৃথিবী ধ্বংসের’ আতঙ্কে ভোগে, সেখানে সবার মনেই সন্দেহ আর ভয় কাজ করে। অতীতে যেমন আকাশে ধূমকেতু দেখলে মানুষ ভাবত পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে; আজকাল তেমনি একটি ওয়েবসাইট বড় বড় ধনকুবেরদের প্রাইভেট জেটের যাতায়াতের ওপর নজর রাখে। মানুষের ধারণা, বড় কোনো বিপর্যয় ঘটলে এই ধনীরা বিমানে চড়ে নিরাপদ জায়গায় পালিয়ে যাবে। এমনকি অর্থনীতিবিদরাও আমেরিকার বর্তমান ভালো অর্থনৈতিক রিপোর্টের আড়ালে উদ্বেগের সাথে ‘K’ অক্ষরের মতো একটি লক্ষণ খুঁজছেন। এই ধারণাটির মানে হলো—দেশের অর্থনীতি আসলে মজবুত নয়, এটি কেবল অতি-ধনীদের জোরে টিকে আছে, আর বাকি সাধারণ মানুষ দিন দিন আরও গরিব হচ্ছে।
আজকাল বিভিন্ন প্রকল্পের সরকারি অনুমতি পাওয়ার সাধারণ বিতর্কগুলোও দেশের টিকে থাকার লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। যেমন, আমেরিকার ইয়োটাহ অঙ্গরাজ্যের গভর্নর সতর্ক করে বলেছেন, “সব শেষ, আমাদের আর কোনো আশা নেই-যদি এআইয়ের দৌড়ে আমেরিকা চীনের কাছে হেরে যায়।”
সম্প্রতি ওই রাজ্যের সাধারণ মানুষ সেখানে একটি বিশাল ডেটা সেন্টার তৈরির বিরুদ্ধে খেপে উঠেছে, যেটির পেছনে টাকা ঢালছেন টিভি শো ‘শার্ক ট্যাঙ্ক’-এর পরিচিত মুখ কেভিন ও’লিয়ারি। এমনকি সাধারণ চুক্তির বিষয়গুলোকেও এখন দুনিয়া কাঁপানো ঘটনা বানিয়ে ফেলা হচ্ছে। যেমন, ওপেনএআই-এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ঝগড়ার সময় ইলন মাস্ক স্যাম অল্টম্যানকে মেসেজ পাঠিয়েছিলেন, “আমি দুঃখিত, কিন্তু এখানে পুরো মানব সভ্যতার ভাগ্য জড়িয়ে আছে।”
ব্যবসায়িক নিয়মকানুন নিয়ে বিতর্কগুলো এখন এক ধরনের ধর্মীয় রূপ নিয়েছে। প্রযুক্তিখাতের বড় বিনিয়োগকারী পিটার থিয়েল মনে করেন, এআইয়ের ওপর সরকারের কড়া নিয়ন্ত্রণ আসলে শয়তান বা ‘দাজ্জাল’ (অ্যান্টিক্রাইস্ট)-এর আগমন ডেকে আনবে। আবার গত মাসে এআই নিয়ে লেখা এক বিশাল প্রবন্ধে পোপ লিও চতুর্দশ লিখেছেন, “শুধু নিয়মকানুন দিয়ে একে বাঁধা যাবে না, একে পুরোপুরি নিরস্ত্র করতে হবে।”
এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে যে, অবস্থা যদি এতই খারাপ হয়, তবে আমেরিকার শেয়ারবাজারে শেয়ারের দাম এত আকাশছোঁয়া কেন? অনেকে বলেন, আজকের শেয়ার বাজার আসলে ভয়ের চেয়ে মানুষের লোভের কারণে এত চাঙ্গা। কিন্তু আসল ব্যাপারটি পুরো উল্টো। কোম্পানিগুলো তাদের ‘পৃথিবী ধ্বংসের আতঙ্ক’ যতটা বড় করে দেখাতে পারছে, বাজার থেকে তত বেশি টাকা তুলতে পারছে। এবং তারা এটা করছে খুব তাড়াহুড়ো করে, কারণ তাদের ধারণা—যেকোনো সময় বাজারে বড় ধস নামতে পারে।
সবকিছু হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার সাধারণ ভয় এখন এক ধরনের পাগলামিতে রূপ নিয়েছে। যারা শেয়ার বাজারে বড় বড় তহবিল খাটান (হেজ-ফান্ড ব্যবসায়ী), তাদের কেউ কেউ ভাবছেন-ভবিষ্যতে এআই-এর কারণে মানুষের মেধা ও শ্রমের আর কোনো মূল্য থাকবে না। তাই তারা এখনই শেষ সম্বলটুকু বাজি ধরে টাকা জমানোর নেশায় মেতেছেন। মজার ব্যাপার হলো, যারা এই ধ্বংসের তত্ত্ব বিশ্বাস করেন এবং যারা একে ফালতু মনে করেন-উভয়পক্ষের শেয়ার কেনার তালিকা কিন্তু একই রকম। কারণ প্রযুক্তি খাতের শেয়ার ছাড়া আসলে তাদের আর অন্য কোথাও বিনিয়োগ করার উপায় নেই।
যদি এআই সত্যিই নতুন এক অর্থনীতি তৈরি করে, তবে বাজার এত দ্রুত বদলাবে যে মূল্যস্ফীতি আর সুদের হারের কারণে সরকারি বন্ডের (বিনিয়োগ মাধ্যম) দাম কমে যাবে। আর এআই যদি সফল না হয়, তবে এটি বর্তমান অর্থনীতিকে পুরোপুরি ধসিয়ে দেবে, যার ফলে বন্ডের দাম আরও তলানিতে গিয়ে ঠেকবে। তাই বিনিয়োগকারীরা মনেপ্রাণে এই ধ্বংসের কথা বিশ্বাস করুন আর নাই করুন—দিনশেষে তারা সবাই এই আতঙ্কেরই অন্ধ অনুসারী।
অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করতে করতে একটা দেশের পক্ষে নিজেকে পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিক বা মূল্যহীন করে ফেলা অসম্ভব কিছু নয়। তবে আমেরিকা এমন এক আজব জায়গা, যেখানে নিজেকে আতঙ্কের মধ্যে রেখে ধনী হওয়ার এক অভিনব পরীক্ষা চলে। ‘সবকিছু পুরোপুরি এবং চিরতরে বদলে যাবে’-এমন ভবিষ্যদ্বাণী করার অবশ্য কিছু সুবিধাও আছে। বিনিয়োগকারীদের পকেট থেকে টাকা বের করার এর চেয়ে বড় টোপ আর হতে পারে না-যখন আপনি দাবি করবেন যে আপনার ব্যবসাই এই চেনা পৃথিবীকে বদলে বা ধ্বংস করে দেবে।
তবে যে অর্থনীতিতে একদিকে সাধারণ মানুষের মনে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতি গভীর অবিশ্বাস রয়েছে, আর অন্যদিকে বড় বড় ধনকুবেরদের মাথায় ‘পৃথিবী ধ্বংসের’ ভূত চেপে বসেছে—সেই অর্থনীতি যেকোনো সময় বিস্ফোরিত হতে পারে। তাই বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে হয়, আসল বিপদ হয়তো ২০০৮, ১৯৯৯, ১৯৭৩ বা ১৮৭৩ সালের অর্থনৈতিক মন্দাগুলোর মতো নয়; বরং বিপদটা হতে পারে ১৭৮৯ সালের (ফরাসি বিপ্লবের) মতো এক রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থান।
(দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণ)