Advertisement Banner

২৫ মার্চ কালরাতের প্রামাণ্য দলিল ছিল কার কাছে?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
২৫ মার্চ কালরাতের প্রামাণ্য দলিল ছিল কার কাছে?
ছবি: সংগৃহীত

২৫ মার্চ ১৯৭১!

ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত প্রায় ১২টা। ঢাকার মানুষ বেশিরভাগই হয় ঘুমিয়ে পড়েছেন, নয়তো ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সময়টা তখন অনিশ্চয়তার। হরতাল, অবরোধ আর অসহযোগ আন্দোলনের মধ্যেই চলছে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে বাঙালির নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের আলোচনা। সেই আলোচনাও কখনো আশার আলো দেখায়, কখনো অনিশ্চয়তার কালো মেঘ ছড়িয়ে দেয় সবার মধ্যে। সবার মধ্যেই এক ধরনের আশঙ্কা! কী হবে! কিন্তু মানুষ ভাবতেও পারেনি, ইয়াহিয়া নিজ দেশের মানুষের পেছনে লেলিয়ে দেবেন সেনাবাহিনীকে। মানুষের করের টাকায় গড়ে ওঠা সেনাবাহিনী অস্ত্র হাতে ঝাঁপিয়ে পড়বে নিজ দেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর!

সেই ২৫ মার্চ রাতে ঢাকাবাসী, বিস্ময় আর আতঙ্ক নিয়ে সাক্ষী হয়েছিল ইতিহাসের ভয়াবহতম অধ্যায়ের। মর্টার, ট্যাঙ্কের গোলা আর স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের কান ফাটানো শব্দে কাঁচা ঘুম ভেঙে ঢাকাবাসী সাক্ষী হয়েছিল ধ্বংসযজ্ঞের। শুরুতে কেউই কিছু বুঝে উঠতে পারেনি, চারদিকে কী হচ্ছে! এসব কীসের আওয়াজ! বিভিন্ন দিক থেকে মানুষের আর্ত চিৎকার–ই বা ভেসে আসছে কেন! বাড়ির জানালা দিয়ে দূর দিগন্তের আকাশের দিকে তাকিয়ে ঢাকার মানুষ লক্ষ করল রক্তাভ আকাশ। হাউইটজারের শব্দ সেই সঙ্গে রাতের আকাশ লাল হয়ে যাওয়া! সংবিৎ ফিরে পেয়ে মানুষ বুঝল ভয়াবহ কিছু একটা ঘটছে। রাস্তা দিয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে ছুটে চলছে সামরিক যান, জান্তব শব্দ তুলে! সামরিক যানের ওপর মেশিনগান ফিট করা, খাকি পোশাকে যুদ্ধ সাজে সেনা সদস্যরা!

সেই ভয়াবহ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ শুরু করেছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিদের শায়েস্তা করতে। কত বড় সাহস! এরা স্বাধিকার চায়, এরা ক্ষমতায় যেতে চায়, এরা স্বাধীনতা চায়! বাঙালিরা যেন কোনো দিন পাকিস্তান রাষ্ট্রে মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করারই ‘পোড়ামাটি’ নীতি নিয়ে তৈরি হয়েছিল সেই কুখ্যাত ‘অপারেশন সার্চ লাইট’। এক রাতেই হত্যা করেছিল কয়েক হাজার ঘুমন্ত নিরীহ মানুষকে। ইতিহাসের জঘন্যতম এক হত্যাযজ্ঞ ঘটেছিল সে রাতে বাঙালি জাতির ওপর।

সেই ভয়াল রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কতটা নির্মম ছিল বাঙালিদের ওপর, কী ধরনের হত্যাযজ্ঞ সেদিন সংঘটিত হয়েছিল। রাত ঠিক বারোটার আশেপাশের সময়ে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে পাকিস্তানি সেনা কনভয় ছড়িয়ে পড়েছিল ঢাকার চারদিকে। একদল গিয়েছিল ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবের বাড়িতে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর স্পেশাল সার্ভিস গ্রুপের (এসএসজি) কমান্ডোদের ওপর দায়িত্ব ছিল শেখ মুজিবকে জীবিত অবস্থায় গ্রেপ্তারের। বাকি সেনা কলামগুলো রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানায় ইপিআর সদর দপ্তরসহ প্রবেশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। রাজাবাগে সেদিন পুলিশ ব্যারাক থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে প্রতিরোধের চেষ্টা করার হলেও অত্যাধুনিক অস্ত্রের সামনে দেশপ্রেমিক পুলিশ সদস্যরা বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারেনি। পিলখানাতেও ইপিআরের বাঙালি সৈনিকেরা প্রতিরোধের চেষ্টা করেছিল। দেশের অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে ঢুকে নির্বিচারে আবাসিক ছাত্রদের হত্যা করা হয়েছিল সেদিন। রেহাই পায়নি মেয়েদের রোকেয়া হল ও শামসুন্নাহার হলও। আগেই বলা হয়েছে ‘পোড়ামাটি নীতি’ অবলম্বনেই তৈরি হয়েছিল ‘অপারেশন সার্চ লাইট’। তাই পাকিস্তানি সেনাদের ওপর নির্দেশই ছিল নির্বিচার হত্যাযজ্ঞের। এমনকি নারী ধর্ষণেরও অনুমতি ছিল হিংস্র সেনাদলের পর। সবচেয়ে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ ঘটে জগন্নাথ হলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকায় শিক্ষকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হত্যা করা হয়েছিল প্রখ্যাত সব শিক্ষকদের।

ইতিহাসের নৃশংসতম সেই কালরাতের প্রামান্য দলিল আছে। আর সেটি সম্ভব হয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সে সময়ের সহযোগী অধ্যাপক নূরুল উলার কল্যাণে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের ঠিক উল্টোদিকে অবস্থিত বুয়েটের শিক্ষকদের আবাসিক ফ্ল্যাটের জানালা দিয়ে একটি টেলিভিশন ভিডিও টেপ ক্যামেরা দিয়ে তুলেছিলেন নৃশংস হত্যাযজ্ঞের ভিডিও। ক্যামেরার সামনে তিনি ফিট করে নিয়েছিলেন টেলিস্কোপ। ভোরের দিকে অধ্যাপক নূরুল উলার ক্যামেরাতেই ধরা পড়ে জগন্নাথ হল মাঠে কীভাবে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে ছাত্র ও হল কর্মচারিদের গুলি করে হত্যা করেছিল পাকিস্তানি সেনাদল।

তিনি তাঁর ফ্ল্যাটের জানালায় এমনভাবে ক্যামেরা বসিয়েছিলেন, যেন বাইরে থেকে সেটি দেখা না যায়। জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে শুধু টেলিস্কোপের মুখটা বের করা ছিল। পুরো ক্যামেরা মোড়ানো ছিল কালো কাপড় দিয়ে। গোলাগুলির শব্দে ঘুম ভেঙে শুরুতে তিনি বোঝার চেষ্টা করেছিলেন কী হচ্ছে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে তিনি ধ্বংসযজ্ঞের কিছুটা দেখেন। এরপরই তাঁর মাথায় আসে টেলিভিশন ভিডিও টেড ক্যামেরায় সেই ধ্বংসযজ্ঞ ধারণ করে রাখার বিষয়টি।

দৃশ্যগুলো ধারণ করতে করতেই তিনি জানালা দিয়ে লক্ষ করেন জগন্নাথ হলের সামনের রাস্তায় ঘোরাঘুরি করছে একটি সামরিক যান। সেটির ওপর একটা গোল অ্যান্টেনা। গাড়িটি দেখেই বুয়েটের অধ্যাপক নুরুল উলা বুঝে যান ওই অ্যান্টেনাটি ছিল মাইক্রোওয়েভ ডিটেক্টর। কেউ কোনো কিছু ব্রডকাস্ট করছে কিনা, বা ক্যামেরা দিয়ে কোনো ছবি তুলছে কিনা, সেসব ধরার জন্যই ওই রাতে পাকিস্তানি বাহিনী মাইক্রোওয়েভ ফিট করা গাড়ি নিয়ে রাস্তায়।

নূরুল উলা ক্যামেরা দিয়ে কোন দৃশ্য ধারণ করেছিলেন? তিনি ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রেখে যা যা দেখেছিলেন, সেসব দেখার পর কারওরই মানসিকভাবে স্থির থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু দৃঢ় মানসিক শক্তি নিয়ে নূরুল উলা ভিডিওগুলো ধারণ করেছিলেন। তিনি দেখছিলেন জগন্নাথ হলের মাঠে ছাত্রদের লাইন করে দাঁড় করানো হচ্ছে। একজন সৈনিক অস্ত্র তাক করে আছে তাদের দিকে। অফিসের নির্দেশে সে গুলি করলে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল সারিতে দাঁড়ানো সবাই। এক অফিসার শ্রেণির একজন এসে সেই সৈনিককে মৃতদের স্তুপেও ব্রাশফায়ার করার নির্দেশ দিলে সে আবারও গুলি চালায়। তিনি জগন্নাথ হলেও মাঠে কবর খোঁড়ার দৃশ্যও ধারণ করেছিলেন। তাঁর ক্যামেরায় ধরা পড়েছিল সেই গর্তে মৃতদেহ ফেলে সেগুলোকে মাটিচাপা দেওয়ার বর্বর দৃশ্য।

মুক্তিযুদ্ধের নয়মাস অধ্যাপক নুরুল উলা সেই ভিডিও সংরক্ষণ করেছিলেন নিজের কাছে। তীব্র আতঙ্ক নিয়ে কেটেছে তাঁর মুক্তিযুদ্ধের ওই নয় মাস। তাঁর শঙ্কা ছিল, যেকোনো সময় সেই গণহত্যার টেপের খবর পাকিস্তানি জান্তার কাছে চলে যাবে। জীবনের শঙ্কা নিয়েও তিনি সংরক্ষণ করেছিলেন পৃথিবীর নৃশংসতম গণহত্যার এক টুকরো প্রামাণ্য দলিল। মুক্তিযুদ্ধের পর সেই ভিডিও টেপের কপি তিনি হস্তান্তর করেছিলেন বাংলাদেশ সরকারের কাছে। যদিও মূল কপিটি তিনি কখনোই হাতছাড়া করেননি। বিদেশি সংবাদমাধ্যম বহুমূল্যে সেটি কিনতে চেয়েছিল, কিন্তু তিনি এদেশের জন্মমুহূর্তের ইতিহাস আজীবন রেখে দিয়েছিলেন নিজের কাছেই।

সম্পর্কিত