ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন আসলে কী জিনিস?

ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন আসলে কী জিনিস?
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে রাজপথে আন্দোলনকারীরা। ছবি: রয়টার্স

সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস Truth and Reconciliation Commission বা TRC নিয়ে মন্তব্য করার পর এই ধারণাটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এ দেশে অনেকের কাছেই TRC বিষয়টি নতুন। তারা জানতে চাইছেন—

টিআরসি আসলে কী?

অনেকের কাছেই মনে হতে পারে এটি বিচার এড়িয়ে যাওয়ার একটি রাজনৈতিক কৌশল। অনেকের জিজ্ঞাসা, এটি কি রাষ্ট্রীয় অপরাধের সত্য উদঘাটনের একটি স্বীকৃত আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া?

আইন, ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকে চলুন জানা যাক, কি এই ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন বা টিআরসি।

ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন সাধারণত রাষ্ট্রীয়ভাবে গঠন করা একটি অস্থায়ী, স্বাধীন তদন্ত কমিশন, যার মূল কাজ—

  • অতীতের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে তথ্য উপাত্ত ও বাস্তব ঘটনার বিশ্লেষণের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন
  • ভুক্তভোগীদের বয়ান রাষ্ট্রীয় নথিতে অন্তর্ভুক্ত করা
  • রাষ্ট্রের দায় ও কাঠামোগত ব্যর্থতা চিহ্নিত করা
  • ভবিষ্যতে যেন একই অপরাধ না ঘটে, সে বিষয়ে সুপারিশ দেওয়া

মনে রাখতে হবে, ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন কিন্তু আদালত নয়। এটি কাউকে কারাদণ্ড দেয় না, সাজা ঘোষণা করে না। টিআরসি যা করে, তা অনেক সময় আদালতের পক্ষেও সম্ভব হয় না।

টিআরসির ধারণা সামনে আসে কবে?

ল্যাটিন আমেরিকার কয়েকটি দেশে সামরিক শাসনের পতন ঘটেছিল গত শতাব্দীর শেষের দিকে। বিশেষ করে ১৯৮৩ সালে আর্জেন্টিনার সামরিক জান্তার গুম-খুনের ঘটনাগুলোর তদন্তের বিষয়টি সামনে আসে। একইভাবে ১৯৯০ সালে  চিলির পিনোচে শাসনের নির্যাতনের বিচারের সময় এ ধরনের কমিশন গঠনের বিষয়টি ওঠে। উগান্ডা ও শ্রীলংকার মতো আফ্রিকা ও এশিয়ায় গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী রাষ্ট্র গঠনের সময় এই দেশগুলো একটি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। তারা দেখতে পায়, সব অপরাধের বিচার করতে গেলে নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়তে পারে। আবার বিচার না করলে ইতিহাসের প্রতি অবিচার করা হয়।

এই দ্বন্দ্ব থেকেই একটি ট্রানজিশনাল জাস্টিস মেকানিজম, অর্থাৎ এক শাসনব্যবস্থা থেকে আরেকটিতে যাওয়ার সময় ব্যবহৃত ন্যায়বিচারের পদ্ধতি হিসাবে জন্ম নেয় ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন।

এই কমিশন সবচেয়ে সফলভাবে কাজ করেছে দক্ষিণ আফ্রিকায়। দেশটিতে ১৯৪৮ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় বর্ণবাদ ভয়াবহ আকারে ছিল। সেখানে কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠী রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছিল। চলেছিল রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে গুম, হত্যা, নির্যাতন। এছাড়া অভিযোগ ছিল যে দেশের বিচারব্যবস্থা বৈষম্যমূলক আচরণ করত।

১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম সর্বজনীন নির্বাচনে নেলসন ম্যান্ডেলা ক্ষমতায় আসেন। বর্ণবাদী শাসনের অবসানের পর নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হয় দক্ষিণ আফ্রিকা। আগের অপরাধের বিচারকে প্রতিশোধমূলক ভাবলে নতুন করে পুরনো দ্বন্দ্ব মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার শঙ্কা তৈরি হয়। তখনই তারা বেছে নেয় ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠনের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নেয়ার পথ। কারণ দেশটিতে রাজনৈতিক বাস্তবতা ছিল অত্যন্ত জটিল। সেখানে শ্বেতাঙ্গ সংখ্যালঘুদের হাতে ছিল সেনাবাহিনী, পুলিশ ও অর্থনীতি। দেশটিতে কৃষ্ণাঙ্গরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল এবং বৈষম্যমূলক আচরণেরও শিকার হতো। আবার আগের সব অপরাধের পূর্ণ বিচার হলে গৃহযুদ্ধের ঝুঁকিও ছিল স্পষ্ট।

নেলসন ম্যান্ডেলা। ছবি: রয়টার্স
নেলসন ম্যান্ডেলা। ছবি: রয়টার্স

এই প্রেক্ষাপটে ম্যান্ডেলা বলেন, “We cannot build the future by destroying the present.” ১৯৯৫ সালে নেলসন ম্যান্ডেলার সরকার ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠন করে। পরিপূর্ণ সত্য প্রকাশ না করলে ক্ষমার কোনো সুযোগ না রাখা এই কমিশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল।

অর্থাৎ, সেই ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশনে অপরাধীকে প্রকাশ্যে স্বীকারোক্তি দিতে হতো। পুরো ঘটনার বর্ণনা দেওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রমাণও করতে হতো। ওই কমিশনে আংশিক সত্য বললে বা তথ্য গোপন করলে কাউকে ক্ষমা করা হযনি।

বিশ্লেষকদের মতে, এতে করে দক্ষিণ আফ্রিকার সমাজে তিনটি বড় পরিবর্তন এসেছিল। সেগুলো হলো: ১. রাষ্ট্রীয় অপরাধের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি, ২. ভুক্তভোগীদের কথা প্রথমবার রাষ্ট্রীয় ইতিহাসে জায়গা পায়, এবং ৩. প্রতিশোধের বদলে সহাবস্থানের একটি রাজনৈতিক ভিত্তিও তৈরি হয়।

এটি ঠিক যে, ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন দক্ষিণ আফ্রিকায় একেবারে নিখুঁত সমাজ তৈরি করেনি। কিন্তু এটি একটি জাতিকে গৃহযুদ্ধ থেকে রক্ষা করেছে। এটাই এর সবচেয়ে বড় সাফল্য বলে মনে করে বিশেষজ্ঞরা।

টিআরসি কোথায় সফল? কোথায় ব্যর্থ?

তবে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন কিন্তু সব দেশে সফল হয়নি। যেমন: শ্রীলঙ্কায় গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী কমিশনে সেনাবাহিনীকে কার্যত প্রশ্নের বাইরে রাখা হয়। ফলে সত্য আংশিক থেকে যায়। অন্যদিকে কেনিয়ায় নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা তদন্তে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করে বলে অভিযোগ আছে। আর এল সালভাদরে জাতিসংঘ সমর্থিত কমিশন ভয়াবহ সত্য প্রকাশ করলেও সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ ক্ষমা আইন পাস হয়। কোনো বিচার হয়নি।

এসব দেশে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন ব্যর্থ হয়, কারণ এটি ক্ষমতাবানদের রক্ষাকবচে পরিণত হয়েছিল বলে অভিযোগ আছে।

ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন নিয়ে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বড় বিতর্ক হলো, গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি এড়াতে সত্য জানাই কি যথেষ্ট, নাকি শাস্তি অপরিহার্য? এই প্রশ্নের কোনো সহজ সুরাহা নেই।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, টিআরসি তখনই কার্যকর, যখন এটি বিচারের বিকল্প নয়, বরং সহাবস্থানের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। তা না হলে এটি হয়ে উঠতে পারে, দায়মুক্তিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার একটি কৌশল।

বাংলাদেশে কী হওয়া উচিত?

আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশে টিআরসি প্রসঙ্গে মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত: কে বা কোন কোন প্রতিষ্ঠান তদন্তের বাইরে থাকবে, পূর্ণ সত্য বলার বাধ্যবাধকতা থাকবে কি না এবং গুরুতর অপরাধ বিচারের আওতার বাইরে যাবে কি না।

কারণ বৈশ্বিক উদাহরণগুলো থেকে এতটুকু বোঝা যায় যে, ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশনের কর্মকাণ্ড সঠিক, বাস্তবানুগ ও ন্যায্য প্রক্রিয়ায় না হলে আরও বড় গ্যাঁড়াকল বাঁধতে পারে।

টিআরসি কোনো যাদুকরী সমাধান নয়। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, এটি রাষ্ট্রকে একবার হলেও আয়নার সামনে দাঁড় করায়। অন্তত এই প্রক্রিয়া যেসব দেশে সফলতা পেয়েছে কিংবা আংশিক সফল হয়েছে, সেখানে তেমনটিই দেখা যায়। 

সম্পর্কিত