Advertisement Banner

রক্তের ব্যাগের অন্ধকার বাণিজ্য, জীবনরক্ষার সম্পদ কীভাবে নীরব শোষণের অস্ত্র

প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আনিসুর রহমান ফরাজী
প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আনিসুর রহমান ফরাজী
রক্তের ব্যাগের অন্ধকার বাণিজ্য, জীবনরক্ষার সম্পদ কীভাবে নীরব শোষণের অস্ত্র
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

মানব সভ্যতার ইতিহাসে এমন কিছু উপাদান রয়েছে, যেগুলো কেবল শারীরিক উপকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়—বরং সেগুলো মানবতার প্রতীক, সহমর্মিতার নিদর্শন এবং জীবনের ধারক হিসেবে বিবেচিত। রক্ত তার মধ্যে অন্যতম। রক্ত মানেই জীবন, রক্ত মানেই আশার আলো, রক্ত মানেই এক মানুষের জীবন অন্য মানুষের মাধ্যমে রক্ষা পাওয়ার এক অনন্য ব্যবস্থা। কিন্তু যখন এই জীবনদায়ী উপাদানটি অনিয়ম, দুর্নীতি এবং অসাধু চক্রের কবলে পড়ে একটি বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হয়, তখন তা শুধু স্বাস্থ্যখাতের সংকট নয়—বরং এটি এক গভীর নৈতিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত বহন করে।

বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর একটি বহুল প্রচলিত বাস্তবতা হলো—অপারেশনের আগে রোগীর জন্য দুই ব্যাগ বা তারও বেশি রক্ত প্রস্তুত রাখার নির্দেশ। চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা হতে পারে, কারণ অপারেশনের সময় হঠাৎ রক্তক্ষরণ হলে তাৎক্ষণিক রক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু প্রশ্ন তখনই ওঠে, যখন অপারেশন শেষে জানা যায় যে রোগীর কোনো রক্তই দেওয়া হয়নি। তখন সেই সংগৃহীত রক্তের ব্যাগগুলোর কী হয়? সেগুলো কি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়? সেগুলো কি অন্য জরুরি রোগীর জন্য ব্যবহৃত হয়? নাকি সেগুলো এক অদৃশ্য বাণিজ্যিক চক্রের হাতে চলে যায়?

এই প্রশ্নগুলো কেবল সাধারণ মানুষের নয়—এগুলো আজ স্বাস্থ্যখাতের নীতিনির্ধারক, চিকিৎসক সমাজ এবং সচেতন নাগরিকদের জন্যও এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং নানা অভিযোগ থেকে জানা যায়, অনেক ক্ষেত্রে এই অতিরিক্ত সংগৃহীত রক্ত যথাযথভাবে ব্লাড ব্যাংকে জমা দেওয়া হয় না। বরং তা অসাধু কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মাধ্যমে উচ্চমূল্যে বিক্রি করা হয় অন্য রোগীদের কাছে। এই প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণভাবে অনৈতিক, বেআইনি এবং মানবতাবিরোধী।

একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বোঝা দরকার—রক্ত কোনো পণ্য নয়। এটি কোনো ব্যবসার উপকরণ হতে পারে না। একজন মানুষ যখন রক্ত দেন, তখন তিনি কোনো লাভের আশায় তা দেন না; তিনি দেন মানবতার তাগিদে, জীবন বাঁচানোর উদ্দেশ্যে। কিন্তু সেই রক্ত যদি পরে কারো মুনাফার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তাহলে তা শুধু দাতার প্রতি অবিচার নয়, বরং পুরো সমাজের প্রতি এক ধরনের প্রতারণা।

বাংলাদেশে রক্ত সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো—যেমন সন্ধ্যানী, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন, রেড ক্রিসেন্ট ইত্যাদি। এরা দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ রক্ত সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু সরকারি হাসপাতালগুলোতে যদি সংগৃহীত রক্ত এই ধরনের প্রতিষ্ঠানে জমা না দিয়ে অন্যত্র সরিয়ে ফেলা হয়, তাহলে তা একটি বড় ধরনের ব্যবস্থাগত ব্যর্থতার পরিচয় বহন করে।

এই সমস্যার পেছনে কয়েকটি মৌলিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, পর্যাপ্ত মনিটরিং ও জবাবদিহিতার অভাব। অনেক হাসপাতালেই রক্ত ব্যবস্থাপনার জন্য নির্দিষ্ট কোনো ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম নেই। ফলে কোন রোগীর জন্য কত রক্ত সংগৃহীত হলো, কতটুকু ব্যবহার হলো, আর বাকিটা কোথায় গেল—তার কোনো নির্ভরযোগ্য হিসাব থাকে না।

দ্বিতীয়ত, কিছু অসাধু কর্মচারী ও দালাল চক্রের সক্রিয়তা, যারা এই ব্যবস্থার ফাঁকফোকর ব্যবহার করে ব্যক্তিগত লাভবান হয়।

তৃতীয়ত, রোগীর স্বজনদের অজ্ঞতা ও অসহায়ত্ব—যারা চিকিৎসকের নির্দেশ অমান্য করতে পারেন না এবং পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পর্কে সচেতন থাকেন না।

এই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—সমাধান কী? কীভাবে এই অনিয়ম ও দুর্নীতির চক্র ভাঙা সম্ভব?

প্রথমত, প্রতিটি হাসপাতালে রক্ত ব্যবস্থাপনার জন্য একটি স্বচ্ছ ও ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করতে হবে। প্রতিটি রক্তের ব্যাগের একটি ইউনিক আইডি থাকতে হবে, যার মাধ্যমে তার সংগ্রহ, সংরক্ষণ, ব্যবহার এবং অবশিষ্ট অবস্থার পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংরক্ষণ করা যাবে। এতে করে কোনো রক্তের ব্যাগ ‘গায়েব’ হয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকবে না।

দ্বিতীয়ত, অপারেশনের আগে রক্ত প্রস্তুত রাখার প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণে একটি স্ট্যান্ডার্ড গাইডলাইন প্রণয়ন করতে হবে। সব অপারেশনের জন্য সমান পরিমাণ রক্ত চাওয়া যৌক্তিক নয়। রোগীর অবস্থা, অপারেশনের ধরন এবং ঝুঁকির মাত্রা বিবেচনা করে রক্তের প্রয়োজন নির্ধারণ করতে হবে।

তৃতীয়ত, অপারেশনের পর অব্যবহৃত রক্ত বাধ্যতামূলকভাবে অনুমোদিত ব্লাড ব্যাংকে জমা দিতে হবে। এই প্রক্রিয়াটি আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে হবে এবং এর ব্যত্যয় ঘটলে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে।

চতুর্থত, রোগীর স্বজনদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। তাদের জানাতে হবে যে, তারা রক্তের ব্যবহারের হিসাব জানতে পারেন এবং অব্যবহৃত রক্তের বিষয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার তাদের রয়েছে।

পঞ্চমত, স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতি দমনে একটি স্বাধীন মনিটরিং সংস্থা গঠন করা যেতে পারে, যারা নিয়মিতভাবে হাসপাতালগুলোতে পরিদর্শন চালাবে এবং রক্ত ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে।

এই সমস্যাটি কেবল একটি প্রশাসনিক বা কারিগরি সমস্যা নয়—এটি একটি নৈতিক সমস্যা। এখানে মানবতার প্রশ্ন জড়িত, এখানে জীবনের প্রশ্ন জড়িত। একজন মুমূর্ষু রোগী যখন রক্তের অভাবে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেন, তখন অন্য কোথাও যদি সেই রক্ত অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকে বা বিক্রি হয়ে যায়, তাহলে তা একটি জাতির জন্য লজ্জাজনক বাস্তবতা।

আমাদের মনে রাখতে হবে—রক্তের প্রতিটি ফোঁটা অমূল্য। এটি কোনো পণ্য নয়, এটি একটি জীবনরক্ষাকারী সম্পদ। তাই এর ব্যবস্থাপনায় কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতি সহ্য করা যায় না।

সচেতনতা, জবাবদিহিতা এবং কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে আমরা এই সমস্যার সমাধান করতে পারি। আমাদের সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে—চিকিৎসক, নার্স, প্রশাসন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সাধারণ মানুষ—সবাইকে।

শেষ কথা একটাই— রক্ত দিন, জীবন বাঁচান; রক্তকে পণ্য হতে দেবেন না।

লেখক: নার্সিং শিক্ষাবিদ ও গবেষণা পরামর্শক

সম্পর্কিত