মেরিনা মিতু

জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির মনোনয়নে নবীন ও প্রবীণের মিশ্রণ, রাজপথে সক্রিয় নেতা-কর্মীদের মূল্যায়ন এবং সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতের চেষ্টা ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে একই সঙ্গে পরিবারতন্ত্রের উপস্থিতি, আলোচিত কিছু নাম বাদ পড়া এবং ভিন্ন রাজনৈতিক পটভূমি থেকে আসা কয়েকজনকে মনোনয়ন দেওয়ায় বিতর্কও উঠেছে।
সংরক্ষিত নারী আসনে দলীয় মনোনয়ন পেতে ১২ শতাধিক আবেদন পড়েছিল। ক্ষমতাসীন দল হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই তার হয়ে সংসদে যাওয়ার আগ্রহী নারীর সংখ্যা বেশি ছিল। ফলে প্রশ্ন ছিল–শেষ পর্যন্ত কোন মানদণ্ডে মনোনয়ন দেয় দলটি। তবে দলটির নেতারা বলছেন, তারা যোগ্যতার ভিত্তিতে, রাজনৈতিক মূল্যায়ন করেই মনোনয়ন দিয়েছেন।
গতকাল সোমবার ৩৬ জনের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করে ক্ষমতাসীন দলটি। রাজনীতির বাইরে থেকে কয়েকজন পেশাজীবীর অন্তর্ভুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে নানা মাধ্যমে।
আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর থেকেই কে, কোন কারণে মনোনয়ন পেলেন, পারিবারিক বা রাজনৈতিক সম্পর্ক আছে কি না, কেন বাদ পড়লেন আলোচিত প্রার্থীরা, বঞ্চিতদের দল কীভাবে সামলাবে–এসব নানা প্রশ্ন ঘুরেফিরে উঠছে রাজনীতির অঙ্গনে।
নবীন-প্রবীণের মিশ্রণ
তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিএনপি এবার নতুন মুখের প্রাধান্য দিয়েছে। ৩৬ জনের মধ্যে ২৮ জনই নতুন, আর সাবেক সংসদ সদস্য রয়েছেন দশজন।
এর মধ্যে রয়েছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী সেলিমা রহমান, প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক রাশেদা বেগম হীরা, স্বনির্ভর বিষয়ক সম্পাদক শিরীন সুলতানা, স্বনির্ভর বিষয়ক সহ-সম্পাদক নিলোফার চৌধুরী মনি, সহশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক হেলেন জেরিন খান, নির্বাহী কমিটির সদস্য শাম্মি আক্তার, রেহানা আক্তার রানু, বিলকিস ইসলাম, নেওয়াজ হালিমা আরলী ও মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমাদ।
প্রবীণ নেত্রী সেলিমা রহমান চরচাকে বলেন, “আমি দলের প্রতি কৃতজ্ঞ যে, তারা আমার ওপর আস্থা রেখেছে। অনেক নবীনদের দেখছি। আমি মনে করি এটি একটি নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি করবে।”

মনোনয়ন পাওয়াদের মধ্যে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক মানসুরা আক্তার রয়েছেন। তার এই মনোনয়নকে দলের অনেকেই নতুন নেতৃত্ব তৈরির ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
মানসুরা আক্তার চরচাকে বলেন, “দলের মাননীয় চেয়ারম্যান আগেই বলেছিলেন, তিনি তরুণদের প্রতি আশাবাদী। তাদের সুযোগ দেবেন। তিনি সুযোগ দিয়েছেন। এখন আমাদের পালা।”
এ ছাড়া সাবেক ছাত্রদল নেত্রীদের মধ্যে রয়েছেন–কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক ও ইডেন মহিলা কলেজ ছাত্রদলের সদ্য সাবেক সদস্যসচিব মোছা. সানজিদা ইয়াসমিন তুলি, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য অ্যাডভোকেট আরিফা সুলতানা (রুমা), মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য নাদিয়া পাঠান (পাপন), ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শওকত আরা আক্তার (উর্মি), সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সেলিনা সুলতানা (নিশিতা)।
রয়েছে পরিবারতন্ত্রের ছায়া
তরুণদের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি প্রশংসিত হলেও ক্ষমতাসীন দল হিসেবে বিএনপি এবারও পরিবারতন্ত্রের বিতর্ক পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। তালিকায় নেতাদের স্ত্রী, কন্যা বা ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের অন্তর্ভুক্তি দলটির ভেতরে-বাইরে দীর্ঘদিনের আলোচনার বিষয়। দলের অনেকে বলছেন, তৃণমূলের ত্যাগী নেতা-কর্মীদের মূল্যায়নের বার্তার সঙ্গে রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যদের অগ্রাধিকার দেওয়ায় এক ধরনের দ্বৈত সংকেত তৈরি হয়েছে, যা অসন্তোষের কারণ হতে পারে।
তবে দলীয় নেতারা বলছেন, মনোনয়ন পাওয়া এসব ব্যক্তির অনেকেই নিজ নিজ জায়গা থেকে দীর্ঘদিন রাজনীতিতে সক্রিয় এবং সংগঠনে অবদান রেখেছেন। ফলে তাদের শুধু পারিবারিক পরিচয়ের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা ঠিক নয়।
মনোনয়নপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর মেয়ে ও স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের পুত্রবধূ নিপুণ রায় চৌধুরী, সাবেক এমপি সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের মেয়ে ব্যারিস্টার সাকিলা ফারজানা, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকনের স্ত্রী শিরীন সুলতানা, স্বেচ্ছাসেবক দলের প্রয়াত সভাপতি শফিউল বারী বাবুর স্ত্রী বীথিকা বিনতে হুসাইন, সাবেক এমপি নাসির উদ্দিন পিন্টুর বোন ফেরদৌসী আহমেদ, শেরপুর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ডা. হযরত আলীর মেয়ে ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী এবাদুর রহমান চৌধুরীর মেয়ে জহরত আদিব চৌধুরী।
ছাত্রদলের সাবেক একজন নেত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “যারা মনোনয়ন পেলেন, তারা কেউ রাজপথে ছিল না, আমি তা বলব না। কিন্তু, তাদের পারিবারিক পরিচয় তাদের আলাদা করে প্রিভিলেজ দিয়েছে। কারণ, রাজপথে আন্দোলনে সক্রিয় আমিও ছিলাম, জেল-জুলুমের শিকার আমিও হয়েছি। কিন্তু আমি পিছিয়ে গেলাম কারণ, আমার বাবা বা স্বামী কেউ প্রভাবশালী নেতা নন।”
এ বিষয়ে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন চরচাকে বলেন, “পারিবারিক পরিচয়ের বাইরে প্রত্যেকেই নিজস্ব রাজনৈতিক সক্রিয়তার জন্যও পরিচিত। দলের প্রতি তাদের অবদান, ত্যাগ–সকল কিছু মূল্যায়ন করেই বাছাই করা হয়েছে।”

সুবর্ণা ইস্যু: সামাজিক মাধ্যমে তুমুল আলোচনা
সংরক্ষিত আসনে বিএনপির মনোনয়নের তালিকা ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচিত নামগুলোর একটি সুবর্ণা শিকদার ঠাকুর।
সুবর্ণা গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলা আওয়ামী লীগের সর্বশেষ কমিটির বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে তালিকাভুক্ত ছিলেন এবং দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচিতে তার উপস্থিতির ছবিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
একটি ভিডিওতে দেখা যায়, আওয়ামী লীগের শাসনামলে সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে দলটির মনোনয়ন পেতে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছিলেন সুবর্ণা শিকদার ঠাকুর। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “আমি বিশ্বাস করি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মানবতার মা আমাকে মনোনয়ন দেবেন, আমি যাতে মানবকল্যাণে কাজ করতে পারি।”
আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, সুবর্ণা শিকদার ঠাকুর নিজেকে কাশিয়ানী উপজেলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
মনোনয়ন ঘোষণার পরই বিষয়টি সামনে এলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় তুমুল আলোচনা। আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে এটিকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে ‘বর্তমান সরকারে আমাদের প্রতিনিধি’ বলেও উল্লেখ করেন।
তবে সুবর্ণা শিকদার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছেন, তাকে না জানিয়ে কমিটিতে নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল এবং তিনি কখনো আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না; বরং ছাত্রজীবনে বিএনপির ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
সুবর্ণা শিকদার চরচাকে বলেন, “সমালোচনা-বিতর্ক থাকবেই। আমি আমার ব্যাখা দিয়েছি। যোগ্যতার ভিত্তিতেই মূল্যায়নের মাধ্যমে আমাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।”
সুবর্ণা ছাড়াও সামাজিক মাধ্যমে বিতর্কিত আলোচনায় রয়েছেন ফাহমিদা হক ও নাদিয়া পাঠান (পাপন)। ফাহমিদা হকের মনোনয়ন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে তার স্বামী, সাংবাদিক ও টকশো উপস্থাপক জিল্লুর রহমানের পেশাগত অবস্থান ঘিরে।
অনেকেই ফেসবুকে লিখেছেন, ‘নিরপেক্ষ সাংবাদিকের’ স্ত্রী বিএনপির মনোনয়ন পেলেন কীভাবে?
জিল্লুর রহমান এ বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। তিনি লিখেছেন, তার স্ত্রী দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করে ভূমিকা রেখেছেন। বিএনপির সঙ্গে তার সুসম্পর্কের কারণে হয়তো ফাহমিদা হক মনোনয়ন পেয়েছেন। তবে নিজের পেশাগত অবস্থান আগের মতোই থাকবে বলে জানান জিল্লুর রহমান।
অন্যদিকে নাদিয়া পাঠান পাপনকে নিয়েও আলোচনা রয়েছে তার পারিবারিক রাজনৈতিক পটভূমি নিয়ে। তিনি বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও তার মা আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে পরিবারটির দাবি, তাদের রাজনৈতিক অবস্থান একে অপরের ওপর প্রভাব ফেলে না।

রয়েছেন ভোটে পরাজিতরাও
গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হওয়া কয়েকজনকেও সংরক্ষিত আসনে স্থান দিয়েছে বিএনপি। এর মধ্যে রয়েছেন শেরপুর-১ (সদর) আসনে ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা, ঢাকা-১৪ আসনে বিগত দিনে গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের প্ল্যাটফর্ম ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম (তুলি) ও যশোর-২ আসনের সাবিরা সুলতানা (মুন্নী)।
সানজিদা ইসলাম (তুলি) চরচাকে বলেন, “জাতীয় নির্বাচনে নানা কারণে আমরা কয়েকজন জয়ী হতে পারিনি। তবে, দুঃসময়ে দলের প্রতি আমাদের অবদান বিবেচনায় নিয়েই দল হয়তো এই স্বীকৃতি দিয়েছে।”
সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী প্রতিনিধিত্ব
দলে সব ধর্মের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে তালিকায় স্থান দেওয়া হয়েছে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের। তাদেরও রয়েছে সামাজিক প্রতিনিধিত্ব। এর মধ্যে আছেন আন্না মিনজ, মাধবী মারমা, সুবর্ণা সিকদার (ঠাকুর)।
এর মধ্যে আন্না মিনজ উন্নয়নকর্মী এবং আদিবাসী ওঁরাও সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি। পেশাগতভাবে ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনালের সিনিয়র ডিরেক্টর (প্রোগ্রাম)। তিনি নাটোরের বাসিন্দা। তার স্বামী জন গোমেজ বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির ধর্ম বিষয়ক সহ-সম্পাদক।
সুবর্ণা সিকদার (ঠাকুর) গোপালগঞ্জ ও মাধবী মারমা বান্দরবানের বাসিন্দা। পেশায় শিক্ষকতার পাশাপাশি সুবর্ণা সিকদার মতুয়া বহুজন সমাজ ঐক্যজোটের প্রধান উপদেষ্টা। অপরদিকে মাধবী মারমা বান্দরবান জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য ও জেলা মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক।
বাদ পড়া হেভিওয়েটরা
এদিকে তালিকায় স্থান পাননি অনেক আলোচিত ও হেভিওয়েট প্রার্থী। তাদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সভানেত্রী আফরোজা আব্বাস, সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়া, জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী কনকচাঁপা, বেবী নাজনীন, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের স্ত্রী ও মহিলা দলের সহসভাপতি নাজমুন নাহার বেবী অন্যতম।
এ ছাড়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রয়াত সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের স্ত্রী হাসনা জসীমউদ্দীন মওদুদের নামও আসেনি এ তালিকায়। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর স্ত্রী সাবেক সংসদ সদস্য রুমানা মাহমুদের নামও নেই বিএনপির তালিকায়।
তবে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস জানিয়েছেন, তাকে প্রস্তাব দেওয়া হলেও তিনি নিজেই সংরক্ষিত আসনে নির্বাচন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার ভাষ্য, ‘বাদ পড়া’ নয়, বরং এটি ছিল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।

জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির মনোনয়নে নবীন ও প্রবীণের মিশ্রণ, রাজপথে সক্রিয় নেতা-কর্মীদের মূল্যায়ন এবং সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতের চেষ্টা ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে একই সঙ্গে পরিবারতন্ত্রের উপস্থিতি, আলোচিত কিছু নাম বাদ পড়া এবং ভিন্ন রাজনৈতিক পটভূমি থেকে আসা কয়েকজনকে মনোনয়ন দেওয়ায় বিতর্কও উঠেছে।
সংরক্ষিত নারী আসনে দলীয় মনোনয়ন পেতে ১২ শতাধিক আবেদন পড়েছিল। ক্ষমতাসীন দল হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই তার হয়ে সংসদে যাওয়ার আগ্রহী নারীর সংখ্যা বেশি ছিল। ফলে প্রশ্ন ছিল–শেষ পর্যন্ত কোন মানদণ্ডে মনোনয়ন দেয় দলটি। তবে দলটির নেতারা বলছেন, তারা যোগ্যতার ভিত্তিতে, রাজনৈতিক মূল্যায়ন করেই মনোনয়ন দিয়েছেন।
গতকাল সোমবার ৩৬ জনের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করে ক্ষমতাসীন দলটি। রাজনীতির বাইরে থেকে কয়েকজন পেশাজীবীর অন্তর্ভুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে নানা মাধ্যমে।
আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর থেকেই কে, কোন কারণে মনোনয়ন পেলেন, পারিবারিক বা রাজনৈতিক সম্পর্ক আছে কি না, কেন বাদ পড়লেন আলোচিত প্রার্থীরা, বঞ্চিতদের দল কীভাবে সামলাবে–এসব নানা প্রশ্ন ঘুরেফিরে উঠছে রাজনীতির অঙ্গনে।
নবীন-প্রবীণের মিশ্রণ
তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিএনপি এবার নতুন মুখের প্রাধান্য দিয়েছে। ৩৬ জনের মধ্যে ২৮ জনই নতুন, আর সাবেক সংসদ সদস্য রয়েছেন দশজন।
এর মধ্যে রয়েছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী সেলিমা রহমান, প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক রাশেদা বেগম হীরা, স্বনির্ভর বিষয়ক সম্পাদক শিরীন সুলতানা, স্বনির্ভর বিষয়ক সহ-সম্পাদক নিলোফার চৌধুরী মনি, সহশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক হেলেন জেরিন খান, নির্বাহী কমিটির সদস্য শাম্মি আক্তার, রেহানা আক্তার রানু, বিলকিস ইসলাম, নেওয়াজ হালিমা আরলী ও মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমাদ।
প্রবীণ নেত্রী সেলিমা রহমান চরচাকে বলেন, “আমি দলের প্রতি কৃতজ্ঞ যে, তারা আমার ওপর আস্থা রেখেছে। অনেক নবীনদের দেখছি। আমি মনে করি এটি একটি নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি করবে।”

মনোনয়ন পাওয়াদের মধ্যে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক মানসুরা আক্তার রয়েছেন। তার এই মনোনয়নকে দলের অনেকেই নতুন নেতৃত্ব তৈরির ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
মানসুরা আক্তার চরচাকে বলেন, “দলের মাননীয় চেয়ারম্যান আগেই বলেছিলেন, তিনি তরুণদের প্রতি আশাবাদী। তাদের সুযোগ দেবেন। তিনি সুযোগ দিয়েছেন। এখন আমাদের পালা।”
এ ছাড়া সাবেক ছাত্রদল নেত্রীদের মধ্যে রয়েছেন–কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক ও ইডেন মহিলা কলেজ ছাত্রদলের সদ্য সাবেক সদস্যসচিব মোছা. সানজিদা ইয়াসমিন তুলি, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য অ্যাডভোকেট আরিফা সুলতানা (রুমা), মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য নাদিয়া পাঠান (পাপন), ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শওকত আরা আক্তার (উর্মি), সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সেলিনা সুলতানা (নিশিতা)।
রয়েছে পরিবারতন্ত্রের ছায়া
তরুণদের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি প্রশংসিত হলেও ক্ষমতাসীন দল হিসেবে বিএনপি এবারও পরিবারতন্ত্রের বিতর্ক পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। তালিকায় নেতাদের স্ত্রী, কন্যা বা ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের অন্তর্ভুক্তি দলটির ভেতরে-বাইরে দীর্ঘদিনের আলোচনার বিষয়। দলের অনেকে বলছেন, তৃণমূলের ত্যাগী নেতা-কর্মীদের মূল্যায়নের বার্তার সঙ্গে রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যদের অগ্রাধিকার দেওয়ায় এক ধরনের দ্বৈত সংকেত তৈরি হয়েছে, যা অসন্তোষের কারণ হতে পারে।
তবে দলীয় নেতারা বলছেন, মনোনয়ন পাওয়া এসব ব্যক্তির অনেকেই নিজ নিজ জায়গা থেকে দীর্ঘদিন রাজনীতিতে সক্রিয় এবং সংগঠনে অবদান রেখেছেন। ফলে তাদের শুধু পারিবারিক পরিচয়ের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা ঠিক নয়।
মনোনয়নপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর মেয়ে ও স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের পুত্রবধূ নিপুণ রায় চৌধুরী, সাবেক এমপি সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের মেয়ে ব্যারিস্টার সাকিলা ফারজানা, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকনের স্ত্রী শিরীন সুলতানা, স্বেচ্ছাসেবক দলের প্রয়াত সভাপতি শফিউল বারী বাবুর স্ত্রী বীথিকা বিনতে হুসাইন, সাবেক এমপি নাসির উদ্দিন পিন্টুর বোন ফেরদৌসী আহমেদ, শেরপুর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ডা. হযরত আলীর মেয়ে ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী এবাদুর রহমান চৌধুরীর মেয়ে জহরত আদিব চৌধুরী।
ছাত্রদলের সাবেক একজন নেত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “যারা মনোনয়ন পেলেন, তারা কেউ রাজপথে ছিল না, আমি তা বলব না। কিন্তু, তাদের পারিবারিক পরিচয় তাদের আলাদা করে প্রিভিলেজ দিয়েছে। কারণ, রাজপথে আন্দোলনে সক্রিয় আমিও ছিলাম, জেল-জুলুমের শিকার আমিও হয়েছি। কিন্তু আমি পিছিয়ে গেলাম কারণ, আমার বাবা বা স্বামী কেউ প্রভাবশালী নেতা নন।”
এ বিষয়ে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন চরচাকে বলেন, “পারিবারিক পরিচয়ের বাইরে প্রত্যেকেই নিজস্ব রাজনৈতিক সক্রিয়তার জন্যও পরিচিত। দলের প্রতি তাদের অবদান, ত্যাগ–সকল কিছু মূল্যায়ন করেই বাছাই করা হয়েছে।”

সুবর্ণা ইস্যু: সামাজিক মাধ্যমে তুমুল আলোচনা
সংরক্ষিত আসনে বিএনপির মনোনয়নের তালিকা ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচিত নামগুলোর একটি সুবর্ণা শিকদার ঠাকুর।
সুবর্ণা গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলা আওয়ামী লীগের সর্বশেষ কমিটির বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে তালিকাভুক্ত ছিলেন এবং দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচিতে তার উপস্থিতির ছবিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
একটি ভিডিওতে দেখা যায়, আওয়ামী লীগের শাসনামলে সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে দলটির মনোনয়ন পেতে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছিলেন সুবর্ণা শিকদার ঠাকুর। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “আমি বিশ্বাস করি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মানবতার মা আমাকে মনোনয়ন দেবেন, আমি যাতে মানবকল্যাণে কাজ করতে পারি।”
আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, সুবর্ণা শিকদার ঠাকুর নিজেকে কাশিয়ানী উপজেলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
মনোনয়ন ঘোষণার পরই বিষয়টি সামনে এলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় তুমুল আলোচনা। আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে এটিকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে ‘বর্তমান সরকারে আমাদের প্রতিনিধি’ বলেও উল্লেখ করেন।
তবে সুবর্ণা শিকদার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছেন, তাকে না জানিয়ে কমিটিতে নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল এবং তিনি কখনো আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না; বরং ছাত্রজীবনে বিএনপির ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
সুবর্ণা শিকদার চরচাকে বলেন, “সমালোচনা-বিতর্ক থাকবেই। আমি আমার ব্যাখা দিয়েছি। যোগ্যতার ভিত্তিতেই মূল্যায়নের মাধ্যমে আমাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।”
সুবর্ণা ছাড়াও সামাজিক মাধ্যমে বিতর্কিত আলোচনায় রয়েছেন ফাহমিদা হক ও নাদিয়া পাঠান (পাপন)। ফাহমিদা হকের মনোনয়ন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে তার স্বামী, সাংবাদিক ও টকশো উপস্থাপক জিল্লুর রহমানের পেশাগত অবস্থান ঘিরে।
অনেকেই ফেসবুকে লিখেছেন, ‘নিরপেক্ষ সাংবাদিকের’ স্ত্রী বিএনপির মনোনয়ন পেলেন কীভাবে?
জিল্লুর রহমান এ বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। তিনি লিখেছেন, তার স্ত্রী দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করে ভূমিকা রেখেছেন। বিএনপির সঙ্গে তার সুসম্পর্কের কারণে হয়তো ফাহমিদা হক মনোনয়ন পেয়েছেন। তবে নিজের পেশাগত অবস্থান আগের মতোই থাকবে বলে জানান জিল্লুর রহমান।
অন্যদিকে নাদিয়া পাঠান পাপনকে নিয়েও আলোচনা রয়েছে তার পারিবারিক রাজনৈতিক পটভূমি নিয়ে। তিনি বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও তার মা আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে পরিবারটির দাবি, তাদের রাজনৈতিক অবস্থান একে অপরের ওপর প্রভাব ফেলে না।

রয়েছেন ভোটে পরাজিতরাও
গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হওয়া কয়েকজনকেও সংরক্ষিত আসনে স্থান দিয়েছে বিএনপি। এর মধ্যে রয়েছেন শেরপুর-১ (সদর) আসনে ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা, ঢাকা-১৪ আসনে বিগত দিনে গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের প্ল্যাটফর্ম ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম (তুলি) ও যশোর-২ আসনের সাবিরা সুলতানা (মুন্নী)।
সানজিদা ইসলাম (তুলি) চরচাকে বলেন, “জাতীয় নির্বাচনে নানা কারণে আমরা কয়েকজন জয়ী হতে পারিনি। তবে, দুঃসময়ে দলের প্রতি আমাদের অবদান বিবেচনায় নিয়েই দল হয়তো এই স্বীকৃতি দিয়েছে।”
সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী প্রতিনিধিত্ব
দলে সব ধর্মের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে তালিকায় স্থান দেওয়া হয়েছে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের। তাদেরও রয়েছে সামাজিক প্রতিনিধিত্ব। এর মধ্যে আছেন আন্না মিনজ, মাধবী মারমা, সুবর্ণা সিকদার (ঠাকুর)।
এর মধ্যে আন্না মিনজ উন্নয়নকর্মী এবং আদিবাসী ওঁরাও সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি। পেশাগতভাবে ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনালের সিনিয়র ডিরেক্টর (প্রোগ্রাম)। তিনি নাটোরের বাসিন্দা। তার স্বামী জন গোমেজ বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির ধর্ম বিষয়ক সহ-সম্পাদক।
সুবর্ণা সিকদার (ঠাকুর) গোপালগঞ্জ ও মাধবী মারমা বান্দরবানের বাসিন্দা। পেশায় শিক্ষকতার পাশাপাশি সুবর্ণা সিকদার মতুয়া বহুজন সমাজ ঐক্যজোটের প্রধান উপদেষ্টা। অপরদিকে মাধবী মারমা বান্দরবান জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য ও জেলা মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক।
বাদ পড়া হেভিওয়েটরা
এদিকে তালিকায় স্থান পাননি অনেক আলোচিত ও হেভিওয়েট প্রার্থী। তাদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সভানেত্রী আফরোজা আব্বাস, সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়া, জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী কনকচাঁপা, বেবী নাজনীন, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের স্ত্রী ও মহিলা দলের সহসভাপতি নাজমুন নাহার বেবী অন্যতম।
এ ছাড়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রয়াত সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের স্ত্রী হাসনা জসীমউদ্দীন মওদুদের নামও আসেনি এ তালিকায়। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর স্ত্রী সাবেক সংসদ সদস্য রুমানা মাহমুদের নামও নেই বিএনপির তালিকায়।
তবে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস জানিয়েছেন, তাকে প্রস্তাব দেওয়া হলেও তিনি নিজেই সংরক্ষিত আসনে নির্বাচন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার ভাষ্য, ‘বাদ পড়া’ নয়, বরং এটি ছিল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।