Advertisement Banner

রূপপুরে ফুয়েল লোডিং: কী, কেন এবং এখন কেন গুরুত্বপূর্ণ?

রূপপুরে ফুয়েল লোডিং: কী, কেন এবং এখন কেন গুরুত্বপূর্ণ?
একটি নতুন রিঅ্যাক্টরের কোরে প্রথমবারের মতো পারমাণবিক জ্বালানি স্থাপনের প্রক্রিয়াই হলো ফুয়েল লোডিং। ছবি: ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব এনার্জি

আগামীকাল ২৮ এপ্রিল ২০২৬, বাংলাদেশের জ্বালানি ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। এদিন পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে শুরু হবে ফার্স্ট ফুয়েল লোডিং। এটি কেবল একটি কারিগরি ধাপ নয়; বরং দেশের জন্য পারমাণবিক বিদ্যুতের বাস্তব যুগে প্রবেশের সূচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ফুয়েল লোডিং আসলে কী?

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) ভাষায়, একটি নতুন রিঅ্যাক্টরের কোরে প্রথমবারের মতো পারমাণবিক জ্বালানি (fuel assemblies) স্থাপনের প্রক্রিয়াই হলো ফুয়েল লোডিং। এই ধাপের মাধ্যমে একটি প্রকল্প নির্মাণ পর্যায় থেকে বের হয়ে ধীরে ধীরে অপারেশনাল পর্যায়ে প্রবেশ করে।

সহজভাবে বললে–

  • এতদিন যে রিঅ্যাক্টরটি ‘খালি’ ছিল, সেখানে এবার বসানো হচ্ছে জ্বালানি
  • এরপরই শুরু হবে নিয়ন্ত্রিত নিউক্লিয়ার চেইন রিঅ্যাকশন, যা বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল ভিত্তি

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ফুয়েল লোডিং মানেই বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু নয়। এটি তার আগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

কী ধরনের জ্বালানি ব্যবহার করা হবে?

রূপপুরে ব্যবহার করা হচ্ছে লো-এনরিচড ইউরেনিয়াম ডাই-অক্সাইড (UO₂) পলেট, যেখানে ইউরেনিয়াম-২৩৫ এর পরিমাণ প্রায় ২.৪% থেকে ৪.৯৫%। এই ছোট ছোট পলেটগুলো জিরকোনিয়াম অ্যালয়ের তৈরি লম্বা টিউবের ভেতরে রাখা হয়, যাকে বলা হয় ফুয়েল রড।

  • এই জ্বালানির শক্তি ঘনত্বই পারমাণবিক বিদ্যুতের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য
  • মাত্র কয়েক গ্রাম ওজনের একটি পলেট প্রায় এক টন কয়লার সমপরিমাণ শক্তি উৎপাদন করতে পারে–এমন তুলনা আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত।
ফুয়েল লোডিংয়ের একটি দৃশ্য। ছবি: এনইউসিনেটের সৌজন্যে
ফুয়েল লোডিংয়ের একটি দৃশ্য। ছবি: এনইউসিনেটের সৌজন্যে

এ কারণেই পারমাণবিক বিদ্যুৎকে বলা হয় “high energy density” উৎস, যাতে অল্প জ্বালানিতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।

রিঅ্যাক্টরের ভেতরে কী বসানো হবে?

রূপপুরের প্রতিটি ইউনিট একটি VVER-1200 ধরনের রিঅ্যাক্টর, যেখানে মোট ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি বসানো হবে। প্রতিটি অ্যাসেম্বলি কয়েক মিটার লম্বা এবং এর ভেতরে অসংখ্য ফুয়েল রড থাকে।

এই পুরো প্রক্রিয়া অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করতে হয়–

  • বিশেষ রোবোটিক বা রিফুয়েলিং মেশিন ব্যবহার করা হয়
  • প্রতিটি ধাপ পূর্বনির্ধারিত সিকোয়েন্স অনুযায়ী চলে

রাশিয়ার বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় বিশেষ মেশিনের মাধ্যমে অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিতভাবে একেকটি অ্যাসেম্বলি রিয়্যাক্টরে বসানো হবে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি ধাপে নিউট্রন মনিটরিং ব্যবস্থা সক্রিয় থাকবে। এর আগে ডামি (নকল) ফুয়েল দিয়ে একাধিকবার মহড়াও সম্পন্ন করা হয়েছে, যাতে বাস্তব লোডিংয়ের সময় কোনো ধরনের ত্রুটি-বিচ্যুতি না হয়।

আইনি ও নিরাপত্তা প্রস্তুতি কি শেষ?

পারমাণবিক খাতে কোনো ধাপই অনুমতি ছাড়া হয় না। বাংলাদেশে এই দায়িত্বে রয়েছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (BAERA)।

২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে এই সংস্থা রূপপুর ইউনিটের জন্য ফুয়েল লোডিংয়ের লাইসেন্স দেয়। এর অর্থ–

  • প্রযুক্তিগত
  • নিরাপত্তা
  • আইনি সব প্রস্তুতি সন্তোষজনক বলে বিবেচিত হয়েছে

আইএইএ-এর গাইডলাইন অনুযায়ী, ফুয়েল লোডিংয়ের আগে একাধিক ধাপে কমিশনিং টেস্ট, নিরাপত্তা যাচাই এবং আন্তর্জাতিক রিভিউ (যেমন Pre-OSART) সম্পন্ন করা হয়। রূপপুরেও এই প্রক্রিয়াগুলো অনুসরণ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

কেন এটি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ?

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে—

  • দেশীয় গ্যাস কমে যাচ্ছে
  • LNG, কয়লা ও তেল আমদানিনির্ভরতা
  • আন্তর্জাতিক বাজারে দামের অস্থিরতা

এই প্রেক্ষাপটে পারমাণবিক বিদ্যুৎ একটি টেকসই সমাধান হিসেবেই ধরা হচ্ছে–

  • এটি baseload power–অর্থাৎ, ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দিতে পারে
  • জ্বালানির দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল
  • এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ–এটি প্রায় কার্বন-মুক্ত

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) ও আইএইএ–দুই সংস্থাই পারমাণবিক শক্তিকে ‘low-carbon reliable energy source’ হিসেবে উল্লেখ করে।

ফুয়েল লোডিংয়ের একটি দৃশ্য। ছবি: সিএনএন
ফুয়েল লোডিংয়ের একটি দৃশ্য। ছবি: সিএনএন

সামনে কী ঘটবে?

ফুয়েল লোডিং শেষ হওয়ার পরপরই রিঅ্যাক্টর ধাপে ধাপে ‘criticality’ পর্যায়ে যাবে–যেখানে নিয়ন্ত্রিতভাবে নিউক্লিয়ার চেইন রিঅ্যাকশন শুরু হবে। এরপর–

  • পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন
  • সিস্টেম স্থিতিশীলতা যাচাই
  • শেষে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু

রূপপুরের প্রতিটি ইউনিটের ক্ষমতা প্রায় ১,২০০ মেগাওয়াট–যা জাতীয় গ্রিডে বড় সংযোজন হবে।

শেষ কথা

রূপপুরের ফুয়েল লোডিং তাই কেবল একটি প্রযুক্তিগত মাইলফলক নয়–এটি একটি পরিবর্তনের সূচনা। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ উচ্চপ্রযুক্তির এই জ্বালানি ব্যবস্থাকে দক্ষভাবে পরিচালনা করবে। একটি ছোট ইউরেনিয়াম পলেট থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করতে পারে, সেটি দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।

সম্পর্কিত