ফজলে রাব্বি

লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ গ্রাহকদের প্রস্তুত থাকতে হবে বিদ্যুতের বাড়তি দাম দেওয়ার জন্য। এরই মধ্যে পাইকারি ও খুচরা বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য পাঠিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এতে বাসাবাড়িতে বিদ্যুতের দাম ব্যবহারভেদে ৭ দশমিক ৮ থেকে ২০ দশমিক ১১ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
তবে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী লাইফ লাইনের গ্রাহকদের ব্যবহৃত বিদ্যুতের দাম অপরিবর্তিত রাখার কথা বলা হয়েছে প্রস্তাবে। অন্যদিকে, পাইকারি বিদ্যুতের দাম বর্তমানের প্রতি ইউনিট ৭ টাকা ৪ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ১ টাকা ২০ পয়সা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। প্রস্তাবটি এখন মন্ত্রিসভার অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
তারেক রহমান সরকার দ্বায়িত্ব নেওয়ার পর গত ২৬ ফেব্রুয়ারি জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু আগামী দুই বছর বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সিস্টেম লস কমিয়ে আর্থিক চাপ সামাল দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন মন্ত্রী।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর এলএনজি, ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলের সরবরাহে চাপ তৈরি হয়। এতে বাড়তে থাকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়। ভর্তুকির পরিমাণও দ্রুত বাড়তে থাকে। প্রস্তাবে বলা হয়, বর্তমানে বিদ্যুতের গড় পাইকারি মূল্য ৭ টাকা ৪ পয়সা, যা উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় কম। ফলে উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা ভর্তুকির মাধ্যমে সামাল দিতে হচ্ছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সম্ভাব্য ঘাটতি দাঁড়াতে পারে প্রায় ৫৬ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকা।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে পরাশক্তিদের মধ্যে মীমাংসা না হলে এই ঘাটতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা নিয়েও শঙ্কা রয়েছে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম চরচাকে বলেন, “বিদ্যুৎ খাতে লুটপাট ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের মাধ্যমে কৃত্রিম ঘাটতি তৈরি করা হয়েছে।” তিনি বলেন, “বর্তমান সংকটকে ভিত্তি করে মূল্য সমন্বয়ের কোনো সুযোগ নেই। আগে ঘাটতির প্রকৃত কারণ ও বৈধতা নিরূপণ করতে হবে। অপচয় ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বাদ দিতে হবে। এরপরও যদি দাম বাড়াতে হয়, তবে তা নিয়ে গণশুনানির মাধ্যমে যৌক্তিকতা প্রমাণের পরই করতে হবে। মূল্যবৃদ্ধির বর্তমান প্রক্রিয়া গ্রহনযোগ্য নয়।”
আইন অনুযায়ী দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য সমন্বয়ের (বৃদ্ধি অথবা হ্রাস) এখতিয়ার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি)। কাজটি করা হয় গণশুনানির মাধ্যমে, একটা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। তবে আওয়ামী লীগ সরকার বিইআরসিকে পাশ কাটিয়ে নির্বাহী আদেশে দফায় দফায় গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে।
দাম না বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি থাকলেও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ের জন্য গত ৯ এপ্রিল উচ্চপর্যায়ের একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করে সরকার। অর্থমন্ত্রীকে আহ্বায়ক করে গঠিত এ কমিটিতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী এবং বাণিজ্যমন্ত্রী সদস্য হিসেবে রয়েছেন। এ ছাড়া অর্থ বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগ এবং জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সচিবরা সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। কমিটি বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা দাম পুনর্নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা যাচাই করে মন্ত্রিসভার জন্য সুপারিশ দেবে। সেই সুপারিশই দিয়েছে কমিটি।
পাইকারির প্রস্তাব
বিদ্যুৎ বিভাগ পাইকারি বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর তিনটি বিকল্প প্রস্তাব তৈরি করেছে। বর্তমান ৭ টাকা ৪ পয়সা থেকে ৫০ পয়সা বাড়িয়ে প্রতি ইউনিট হবে সাত টাকা ৫৪ পয়সা। এতে ৫ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা ভর্তুকি কমবে। এক টাকা বাড়িয়ে পাইকারি দাম ৮ টাকা ৪ পয়সা হলে ভর্তুকি ১০ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা কমতে পারে। পাইকারি মূল্য প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ২০ পয়সা বাড়িয়ে ৮ টাকা ২৪ পয়সা করলে সাশ্রয় হবে ১২ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা।
খুচরায় প্রস্তাব
পাইকারি দরের পাশাপাশি খুচরা পর্যায়েও দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের সুরক্ষায় ০ থেকে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত লাইফলাইন পর্যায়ে দর বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়নি। অন্য আবাসিক গ্রাহকের ক্ষেত্রে ব্যবহারভেদে ধাপে ধাপে ৭০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের প্রস্তাবে দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা তুলে ধরতে বিভিন্ন দেশে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার কারণে এরই মধ্যে শ্রীলঙ্কা আবাসিক খাতে ৭ দশমিক ২ শতাংশ, শিল্প খাতে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ এবং সেবা খাতে ৯ দশমিক ৯ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধি করেছে। পাশাপাশি পেট্রোল, ডিজেল ও কেরোসিনের দাম প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। সিঙ্গাপুরেও বিদ্যুতের দাম বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ।
এদিকে, ঋণ সহায়তার জন্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) দারস্থ হওয়ার পর থেকেই অর্থনৈতিক সংস্কারের অংশ হিসেবে প্রান্তিক গ্রাহকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করে ভর্তুকির বোঝা কমানোর ওপর চাপ দেওয়া হচ্ছে। জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়ার কারণেই শুধু নয়; আইএমএফের চাপও দাম বৃদ্ধি করতে চাওয়ার পেছনে নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে।
সব শেষ খবর হচ্ছে, গত বুধবার ওয়াশিংটনে স্প্রিং মিটিংসের প্রেস ব্রিফিংয়ে সংস্থাটির এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন ঋণের কিস্তি ছাড়ের সুখবরের পরিবর্তে বাংলাদেশের রাজস্ব ভিত্তি দুর্বল হওয়ায় সীমিত সম্পদকেই যতটা সম্ভব লক্ষ্যভিত্তিক উপায়ে ব্যয় করার পরামর্শ দিয়েছেন।
লোডশেডিং পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নিচ্ছে
শুক্রবার সকালে চরচার সাথে কথা হয় নোয়াখালীর স্থানীয় সাংবাদিক ফুয়াদ হোসেনের সাথে। তিনি জানান, জেলার ৯টি উপজেলায় সাড়ে ৯ লাখ গ্রাহক বর্তমানে নামমাত্র বিদ্যুৎ পাচ্ছে। চাটখিলের মতো অনেক এলাকায় ২৪ ঘণ্টায় মাত্র ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে। ৩০-৪০ মিনিটের স্বল্প বিরতিতে লোডশেডিং হচ্ছে।
যখন বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর তোড়জোড় চলছে, তখন দেশজুড়ে লোডশেডিং পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকেলে বিদ্যুৎ ঘাটতি বেড়ে ১ হাজার ৯০০ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে, যা গত সপ্তাহের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। তীব্র গরমে দেশের বড় একটি অংশের জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।
তীব্র লোডশেডিংয়ের কবলে পড়েছে খুলনা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও কুমিল্লার মতো এলাকার মানুষ। অঘোষিত লোডশেডিংয়ে হাসপাতাল ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। জ্বালানি সংকটে উৎপাদন কমে যাওয়ায় অনেক এলাকায় সরবরাহ চাহিদার অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে।
লোডশেডিংয়ের ফলে একদিকে যেমন পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও ঘুম বিঘ্নিত হচ্ছে, অন্যদিকে জেনারেটর চালাতে গিয়ে হাসপাতালগুলোর অতিরিক্ত ব্যয় বাড়ছে। ঢাকার গ্রামীণ এলাকাগুলোতেও প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছে। এ অবস্থায় বাড়তি দামে গ্রাহক বিদ্যুৎ নাকি লোডশেডিং কিনবে–সে প্রশ্ন উঠছে?

লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ গ্রাহকদের প্রস্তুত থাকতে হবে বিদ্যুতের বাড়তি দাম দেওয়ার জন্য। এরই মধ্যে পাইকারি ও খুচরা বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য পাঠিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এতে বাসাবাড়িতে বিদ্যুতের দাম ব্যবহারভেদে ৭ দশমিক ৮ থেকে ২০ দশমিক ১১ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
তবে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী লাইফ লাইনের গ্রাহকদের ব্যবহৃত বিদ্যুতের দাম অপরিবর্তিত রাখার কথা বলা হয়েছে প্রস্তাবে। অন্যদিকে, পাইকারি বিদ্যুতের দাম বর্তমানের প্রতি ইউনিট ৭ টাকা ৪ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ১ টাকা ২০ পয়সা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। প্রস্তাবটি এখন মন্ত্রিসভার অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
তারেক রহমান সরকার দ্বায়িত্ব নেওয়ার পর গত ২৬ ফেব্রুয়ারি জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু আগামী দুই বছর বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সিস্টেম লস কমিয়ে আর্থিক চাপ সামাল দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন মন্ত্রী।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর এলএনজি, ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলের সরবরাহে চাপ তৈরি হয়। এতে বাড়তে থাকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়। ভর্তুকির পরিমাণও দ্রুত বাড়তে থাকে। প্রস্তাবে বলা হয়, বর্তমানে বিদ্যুতের গড় পাইকারি মূল্য ৭ টাকা ৪ পয়সা, যা উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় কম। ফলে উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা ভর্তুকির মাধ্যমে সামাল দিতে হচ্ছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সম্ভাব্য ঘাটতি দাঁড়াতে পারে প্রায় ৫৬ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকা।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে পরাশক্তিদের মধ্যে মীমাংসা না হলে এই ঘাটতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা নিয়েও শঙ্কা রয়েছে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম চরচাকে বলেন, “বিদ্যুৎ খাতে লুটপাট ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের মাধ্যমে কৃত্রিম ঘাটতি তৈরি করা হয়েছে।” তিনি বলেন, “বর্তমান সংকটকে ভিত্তি করে মূল্য সমন্বয়ের কোনো সুযোগ নেই। আগে ঘাটতির প্রকৃত কারণ ও বৈধতা নিরূপণ করতে হবে। অপচয় ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বাদ দিতে হবে। এরপরও যদি দাম বাড়াতে হয়, তবে তা নিয়ে গণশুনানির মাধ্যমে যৌক্তিকতা প্রমাণের পরই করতে হবে। মূল্যবৃদ্ধির বর্তমান প্রক্রিয়া গ্রহনযোগ্য নয়।”
আইন অনুযায়ী দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য সমন্বয়ের (বৃদ্ধি অথবা হ্রাস) এখতিয়ার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি)। কাজটি করা হয় গণশুনানির মাধ্যমে, একটা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। তবে আওয়ামী লীগ সরকার বিইআরসিকে পাশ কাটিয়ে নির্বাহী আদেশে দফায় দফায় গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে।
দাম না বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি থাকলেও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ের জন্য গত ৯ এপ্রিল উচ্চপর্যায়ের একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করে সরকার। অর্থমন্ত্রীকে আহ্বায়ক করে গঠিত এ কমিটিতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী এবং বাণিজ্যমন্ত্রী সদস্য হিসেবে রয়েছেন। এ ছাড়া অর্থ বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগ এবং জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সচিবরা সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। কমিটি বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা দাম পুনর্নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা যাচাই করে মন্ত্রিসভার জন্য সুপারিশ দেবে। সেই সুপারিশই দিয়েছে কমিটি।
পাইকারির প্রস্তাব
বিদ্যুৎ বিভাগ পাইকারি বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর তিনটি বিকল্প প্রস্তাব তৈরি করেছে। বর্তমান ৭ টাকা ৪ পয়সা থেকে ৫০ পয়সা বাড়িয়ে প্রতি ইউনিট হবে সাত টাকা ৫৪ পয়সা। এতে ৫ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা ভর্তুকি কমবে। এক টাকা বাড়িয়ে পাইকারি দাম ৮ টাকা ৪ পয়সা হলে ভর্তুকি ১০ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা কমতে পারে। পাইকারি মূল্য প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ২০ পয়সা বাড়িয়ে ৮ টাকা ২৪ পয়সা করলে সাশ্রয় হবে ১২ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা।
খুচরায় প্রস্তাব
পাইকারি দরের পাশাপাশি খুচরা পর্যায়েও দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের সুরক্ষায় ০ থেকে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত লাইফলাইন পর্যায়ে দর বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়নি। অন্য আবাসিক গ্রাহকের ক্ষেত্রে ব্যবহারভেদে ধাপে ধাপে ৭০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের প্রস্তাবে দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা তুলে ধরতে বিভিন্ন দেশে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার কারণে এরই মধ্যে শ্রীলঙ্কা আবাসিক খাতে ৭ দশমিক ২ শতাংশ, শিল্প খাতে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ এবং সেবা খাতে ৯ দশমিক ৯ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধি করেছে। পাশাপাশি পেট্রোল, ডিজেল ও কেরোসিনের দাম প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। সিঙ্গাপুরেও বিদ্যুতের দাম বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ।
এদিকে, ঋণ সহায়তার জন্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) দারস্থ হওয়ার পর থেকেই অর্থনৈতিক সংস্কারের অংশ হিসেবে প্রান্তিক গ্রাহকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করে ভর্তুকির বোঝা কমানোর ওপর চাপ দেওয়া হচ্ছে। জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়ার কারণেই শুধু নয়; আইএমএফের চাপও দাম বৃদ্ধি করতে চাওয়ার পেছনে নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে।
সব শেষ খবর হচ্ছে, গত বুধবার ওয়াশিংটনে স্প্রিং মিটিংসের প্রেস ব্রিফিংয়ে সংস্থাটির এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন ঋণের কিস্তি ছাড়ের সুখবরের পরিবর্তে বাংলাদেশের রাজস্ব ভিত্তি দুর্বল হওয়ায় সীমিত সম্পদকেই যতটা সম্ভব লক্ষ্যভিত্তিক উপায়ে ব্যয় করার পরামর্শ দিয়েছেন।
লোডশেডিং পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নিচ্ছে
শুক্রবার সকালে চরচার সাথে কথা হয় নোয়াখালীর স্থানীয় সাংবাদিক ফুয়াদ হোসেনের সাথে। তিনি জানান, জেলার ৯টি উপজেলায় সাড়ে ৯ লাখ গ্রাহক বর্তমানে নামমাত্র বিদ্যুৎ পাচ্ছে। চাটখিলের মতো অনেক এলাকায় ২৪ ঘণ্টায় মাত্র ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে। ৩০-৪০ মিনিটের স্বল্প বিরতিতে লোডশেডিং হচ্ছে।
যখন বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর তোড়জোড় চলছে, তখন দেশজুড়ে লোডশেডিং পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকেলে বিদ্যুৎ ঘাটতি বেড়ে ১ হাজার ৯০০ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে, যা গত সপ্তাহের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। তীব্র গরমে দেশের বড় একটি অংশের জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।
তীব্র লোডশেডিংয়ের কবলে পড়েছে খুলনা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও কুমিল্লার মতো এলাকার মানুষ। অঘোষিত লোডশেডিংয়ে হাসপাতাল ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। জ্বালানি সংকটে উৎপাদন কমে যাওয়ায় অনেক এলাকায় সরবরাহ চাহিদার অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে।
লোডশেডিংয়ের ফলে একদিকে যেমন পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও ঘুম বিঘ্নিত হচ্ছে, অন্যদিকে জেনারেটর চালাতে গিয়ে হাসপাতালগুলোর অতিরিক্ত ব্যয় বাড়ছে। ঢাকার গ্রামীণ এলাকাগুলোতেও প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছে। এ অবস্থায় বাড়তি দামে গ্রাহক বিদ্যুৎ নাকি লোডশেডিং কিনবে–সে প্রশ্ন উঠছে?