Advertisement Banner

বাংলাদেশের বাজেট: সাড়ে ৮ কোটি থেকে ৮ লাখ কোটি টাকা

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
বাংলাদেশের বাজেট: সাড়ে ৮ কোটি থেকে ৮ লাখ কোটি টাকা
জাতীয় সংসদের অধিবেশন। ছবি: বাসস

বাজেট বললেই হাজারটা সংখ্যা চোখের সামনে আসে। একেবারে ভিরমি খাওয়ার দশা। তবে ভয় নেই। অত সংখ্যার হুজ্জতে যাচ্ছি না।

স্বাধীনতার ঘোষণার পর মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের বাজেট কত ছিল জানেন? মাত্র ৮ কোটি ৬২ লাখ টাকা। সেটা ছিল আপৎকালীন বাজেট। সেই বাজেটেও ঘাটতি ছিল ৮৮ লাখ টাকা, যা মোট বাজেটের ১০ দশমিক ২০ শতাংশ।

অবশ্য দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২-৭৩ সালের জন্য ঘোষিত প্রথম বাজেটের আকার ছিল সে তুলনায় বেশ বড়। ৭১৯ কোটি ৪৩ লাখ টাকার সেই বাজেটের মধ্যে ৪২৭ কোটি ৮৫ লাখই ছিল ঘাটতি, যা মোট বাজেটের প্রায় ৬০ শতাংশ।

দেশের প্রথম অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ টানা তিনটি বাজেট দিয়েছিলেন। দেশের তৃতীয় ও তাজউদ্দীন আহমদের ঘোষিত তৃতীয় বাজেটের আকার ছিল ৯৯৫ কোটি ২৩ লাখ টাকা। এতে ঘাটতি ৫২ দশমিক ৭৫ শতাংশে নেমে ৫২৫ কোটিতে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশের বাজেট প্রথমবারের মতো হাজার কোটি টাকার অঙ্ক ছাড়ায় চতুর্থ বাজেটে। ১৯৭৫-৭৬ সালের জন্য ঘোষিত সেই বাজেটের আকার ছিল ১৫৪৯.৪৮। ঘাটতির পরিমাণও কিছুটা কমে আসে। তবে তা ৫০ শতাংশের ওপরই ছিল।

স্বাধীনতা পরবর্তী পরপর কয়েকটি বাজেটের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অর্থনীতির অবস্থাটি কী ছিল। মূলত বিদেশি ঋণ ও দানের ওপর নির্ভর করেই কোনোমতে দাঁড়িয়েছিল অর্থনীতি। রাজস্বের উৎস যেমন কম ছিল, তেমনি কম ছিল রাজস্ব আদায়। ফলে ঘাটতি বাজেটের আকার ছিল মোট বাজেটের অর্ধেক বা তারও বেশি।

ঘাটতি বাজেটের পরিমাণ প্রথম ৫০ শতাংশের নিচে নামে পঞ্চম বাজেটে। ১৯৭৬-৭৭ সালের জন্য ঘোষিত সেই বাজেটের আকার ছিল ১৮৬৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। আর ঘাটতি ছিল ৯০১ কোটি ৪৯ লাখ টাকা, যা মোট বাজেটের ৪৮ দশমিক ২৬ শতাংশ।

রাজনৈতিক উত্তাল সে সময়ে বাজেট ঘোষণা করেন জিয়াউর রহমান। তখনো কিন্তু তিনি প্রেসিডেন্ট হননি। প্রেসিডেন্ট হিসেবে জিয়াউর রহমান দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল। তার আগেই ১৯৭৬ সালের ২৬ জুন তিনি দেশের পঞ্চম বাজেট ঘোষণা করেন। পরপর তিনবার তিনি বাজেট ঘোষণা করেন। জিয়া শাসনামালে এর পর বাজেট ঘোষণা করেছেন মির্জা নুরুল হুদা ও এম সাইফুর রহমান। এম সাইফুর রহমান তার দ্বিতীয় বাজেট ঘোষণার আগেই অবশ্য জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। দিনটি ছিল ৩০ মে ১৯৮১। আর এম সাইফুর রহমান বাজেট ঘোষণা করেন একই বছরের ৬ জুন।

অস্থির সে সময়ে ঘোষিত বাজেটের আকার ছিল ৪৬৭৭ কোটি টাকা, যার মধ্যে ঘাটতি ছিল ১৯১০ কোটি। অর্থাৎ, ওই বছর ঘাটতি এসে দাঁড়ায় ৪০ দশমিক ৮৩ শতাংশ।

মজার বিষয় হচ্ছে–সবচেয়ে বেশি বাজেট ঘোষণার রেকর্ড যে দুজন গড়েছেন, এম সাইফুর রহমান ও আবুল মাল আবদুল মুহিত–উভয়েই সেনাশাসিত সেই সময়ে নিজেদের প্রথম বাজেট ঘোষণা করেন। সেনাশাসনকালেই বাজেট ঘোষণায় তাদের হাতেখড়ি হয়েছিল।

এম সাইফুর রহমান জিয়াউর রহমান সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে এবং আবুল মাল আবদুল মুহিত হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে প্রথম বাজেট ঘোষণা করেন।

এম এ মুহিতের প্রথম বাজেট ছিল ১৯৮২-৮৩ অর্থবছরের। এর আকার ছিল ৪৭৩৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকা, যেখানে ঘাটতি ছিল ১৯৬৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা।

দেশের বাজেট প্রথম ১০ হাজার কোটি টাকার মাইলফলক পেরোয় ১৯৮৮-৮৯ সালে। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম এ মুনিম ঘোষিত সেই বাজেটের আকার ছিল ১০৫৬৫ কোটি টাকা। এতে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৪৯৯৬ কোটি টাকা।

দীর্ঘ সেনাশাসনের পর ৯০–এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ফেরে। এবং রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় পদ্ধতির সরকারে প্রত্যাবর্তন করে বাংলাদেশ। গণতান্ত্রিক এই রূপান্তরের পর বিএনপি সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে বাজেট ঘোষণা করেন এম সাইফুর রহমান।

১৯৯১-৯২ অর্থবছরের জন্য ঘোষিত সেই বাজেটের আকার ছিল ১৫৫৮৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা, যেখানে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৭০৮০ কোটি ১৬ লাখ টাকা।

সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান। ফাইল ছবি
সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান। ফাইল ছবি

সাইফুর রহমান এই পর্যায়ে টানা পাঁচটি বাজেট ঘোষণা করেন। এর মধ্যে ১৯৯৪-৯৫ অর্থবছরের জন্য ঘোষিত বাজেট প্রথমবারের মতো ২ হাজার কোটি টাকার অঙ্ক পেরোয়। একইসঙ্গে এ বছর ঘাটতির পরিমাণ ৩০-এর ঘরে নেমে আসে। ২০৯৪৮ কোটি টাকার সেই বাজেটে ঘাটতি ছিল ৭৩১১ কোটি টাকা।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর অর্থমন্ত্রী হন শাহ এ এম এস কিবরিয়া। টানা ছয়টি বাজেট ঘোষণা করেছিলেন তিনি। তার সময়কালেই বাংলাদেশের বাজেটের আকার ৩০ ও ৪০ হাজার কোটি টাকার মাইলফলক পেরোয়। ২০০১-০২ অর্থবছরের জন্য ঘোষিত তার সর্বশেষ বাজেটের আকার ছিল ৪৪৭৬৫ কোটি টাকা। এতে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১৭৫২৬ কোটি টাকা।

২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় এলে আবার অর্থমন্ত্রী হন এম সাইফুর রহমান। তার মেয়াদকালেই বাংলাদেশের বাজেট ৫০ ও ৬০ হাজার কোটি টাকার মাইলফলক পেরোয়। এ পর্যায়ে তার সর্বশেষ ঘোষিত বাজেটের আকার ছিল ৬৯৭৪০ কোটি টাকা, যেখানে ঘাটতি ছিল ১৭১৯৮ কোটি। ওই অর্থবছরে ঘাটতকির পরিমাণ মোট বাজেটের ২৫ শতাংশের নিচে নামে।

দেশের বাজেট প্রথমবারের মতো ১ লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করে ২০০৯-১০ অর্থবছরে। আবুল মাল আবদুল মুহিত ঘোষিত সেই বাজেটের আকার ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার ৮১৯ কোটি টাকা, যেখানে ঘাটতি ছিল ২৯ হাজার ২২৮ কোটি টাকা। ওই সরকারের মেয়াদেই বাজেটের আকার ২ লাখ কোটি টাকা ছাড়ায়। সেটা ছিল ২০১৩-১৪ অর্থবছর। অর্থমন্ত্রী এ এম এ মুহিত। টানা ১০টি বাজেট ঘোষণা করেছিলেন তিনি। এরশাদের আমলে ঘোষিত দুটি বাজেটসহ তিনি বসেন সর্বোচ্চ বাজেট ঘোষণাকারী অর্থমন্ত্রী হিসেবে এম সাইফুর রহমানের পাশে। তার সর্বশেষ ঘোষিত বাজেটের আকার ছিল ৪৬৪৫৭৩ কোটি টাকা। সেটা ছিল ২০১৮-১৯ অর্থবছর।

এর পর টানা ৫টি বাজেট ঘোষণা করেন আ হ ম মুস্তফা কামাল। ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য মুস্তফা কামাল ঘোষিত প্রথম বাজেটের আকার ছিল ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার, যেখানে ঘাটতির পরিমাণই ছিল ১ লাখ ৪১ হাজার ২১২ কোটি টাকা। শতাংশের হিসাবে ২৬ শতাংশের বেশি। আর তার ঘোষিত সর্বশেষ বাজেটের আকার ছিল ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা, যেখানে ঘাটতি ছিল ২ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা। শতাংশের হারে ঘাটতি গিয়ে দাঁড়ায় ৩৪ শতাংশের বেশি।

গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে আগে নতুন অর্থমন্ত্রী হিসেবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য বাজেট ঘোষণা করেন আবুল হাসান মাহমুদ আলী। আকার ছিল ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা, যেখানে ঘাটতি ছিল ২ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা। শতাংশের হিসাবে ৩২ শতাংশের কিছু বেশি।

সাবেক অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। ফাইল ছবি
সাবেক অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। ফাইল ছবি

ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে আগের সরকারের বাজেট প্রায় অপরিবর্তিত রাখে। এই সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ ঘোষিত বাজেটের আকার ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা, যেখানে ঘাটতি ছিল ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকার, যা মোট বাজেটের ২৮ দশমিক ৬০ শতাংশ।

এবার নির্বাচনের পর আবার একটি রাজনৈতিক সরকার। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনের আগেই ঘোষণা করেছিলেন একটি পরিকল্পনার কথা। সে পরিকল্পনার একটা চিহ্ন হয়তো এই বাজেটে প্রকাশ্য হবে। দায়িত্বে আছেন আগের বিএনপি সরকারে বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে ঘোষিত বাজেটগুলোর একটি অভিন্ন বৈশিষ্ট্য হলো–ঘাটতি। প্রথম বাজেটে যে ঘাটতি ছিল ৬০ শতাংশ, তা বিভিন্ন সময়ে কমে বেড়ে ২৮ শতাংশের আশপাশে এসেছে। এ ঘাটতি মেটাতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রাজস্ব আয় বাড়ানো।

নানা সময়ে কর কাঠামো সংস্কার করে এ ঘাটতি পূরণের চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু বড় প্রকল্পের ক্ষুধার সঙ্গে তাল মিলিয়ে খুব একটা সুবিধা করা যায়নি। মূলত করহার নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ যতটা থাকে, ততটা থাকে না কর-পরিসর বাড়ানোর বিষয়ে। আর কর আদায় বা আহরণ, যাই বলা হোক না কেন, সেখানে সব সরকারের আমলেই দেখা গেছে এক ধরনের একচোখা নীতি। বিশেষত উৎসে করকর্তনের ক্ষেত্রে বড় বড় ব্যবসায়ীর বেলায় চোখ বুঁজে চলার ক্ষেত্রে সরকারগুলো একে অপরকে দারুণভাবে অনুসরণ করেছে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নীতি, আদর্শ, ইত্যাদি কোনো বাধা হয়নি কোনোকালেই। এবারও তেমন কিছু হবে কি না, কে জানে।

সংশয় বা আশা–একসঙ্গে জাগার কারণ ওই যে–বদলের ডাক দিয়ে অভ্যুত্থান, নির্বাচন ও ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’-এর মতো উচ্চারণগুলো।

সম্পর্কিত