Advertisement Banner

গ্যাস খুঁজতে এবার ১৮ হাজার ফুট গভীরে অনুসন্ধান শুরু

চরচা প্রতিবেদক
চরচা প্রতিবেদক
গ্যাস খুঁজতে এবার ১৮ হাজার ফুট গভীরে অনুসন্ধান শুরু
ছবি: বাসস

দেশে ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাপ সামাল দিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে সর্বোচ্চ গভীরতায় অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর লক্ষ্য, আগের খনন করা স্তরের অনেক নিচে থাকা সম্ভাব্য গ্যাসভাণ্ডার শনাক্ত করা।

এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে তিতাস-৩১ নামে নতুন একটি কূপ খনন করা হচ্ছে, যার নির্ধারিত গভীরতা পাঁচ হাজার ৬০০ মিটার (১৮ হাজার ৩৭২ ফুট)। এটি বাস্তবায়িত হলে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে গভীর কূপ হিসেবে রেকর্ড গড়বে। এর মাধ্যমে এত দিন অপ্রবেশযোগ্য থাকা গভীর হাইড্রোকার্বন স্তরে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন অগভীর স্তরে ‘সীমাবদ্ধ’ অনুসন্ধানের পর এখন কৌশলগতভাবে গভীর খননের দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে। কারণ সহজলভ্য গ্যাসের মজুত দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশে এখনো উল্লেখযোগ্য গ্যাস সম্ভাবনা রয়েছে, তবে তা কাজে লাগাতে হলে গভীর ও জটিল কূপ খননের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।

সরকারি হিসাবে, দেশে এখন পর্যন্ত ২৯টি গ্যাসক্ষেত্রে মোট ২৯.৭৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাস আবিষ্কৃত হয়েছে। এর মধ্যে ২১.৭৮ টিসিএফ উত্তোলিত হওয়ায় অবশিষ্ট মজুত দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭.৯৭ টিসিএফ।

দেশের বৃহত্তম গ্যাসক্ষেত্র তিতাসের প্রাথমিক মজুত ছিল ৭.৩৪ টিসিএফ। ইতোমধ্যে প্রায় ৫.৬ টিসিএফ গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে। বর্তমানে ২২টি কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ৩৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে, যা দেশের মোট দেশীয় সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ।

বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিএফসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবদুল জলিল প্রামাণিক বলেন, “গভীর স্তরে সাধারণত বড় মজুতের সম্ভাবনা থাকে। এই খনন আমাদের উৎস শিলার আরও কাছাকাছি নিয়ে যাবে।”

এর আগে দেশে সর্বোচ্চ গভীরতায় খননের রেকর্ড ছিল চার হাজার ৯৭৭ মিটার, যা ফেঞ্চুগঞ্জ-১ কূপে (১৯৮৫–৮৮) অর্জিত হয়। অধিকাংশ কূপের গভীরতা তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার মিটার হওয়ায় প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট।

প্রকল্প পরিচালক মো. মাহমুদুল নবাব জানান, ১৯৮৪ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় তিতাসে পাঁচ কিলোমিটার গভীরতা পর্যন্ত খননের সুপারিশ থাকলেও প্রযুক্তি ও নীতিগত উদ্যোগের ঘাটতিতে তা বাস্তবায়নে বিলম্ব হয়েছে।

বর্তমান প্রকল্পে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সিএনপিসি-এর উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন রিগ দিয়ে খনন চলছে।

প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, তিন হাজার ৫০ মিটার পেরোলেই উচ্চচাপ অঞ্চলে প্রবেশ করতে হবে, যা সামাল দিতে ১৫ হাজার পিএসাই ক্ষমতার ব্লো-আউট প্রিভেন্টার ব্যবহার করা হচ্ছে।

১৯ এপ্রিল শুরু হওয়া তিতাস-৩১ কূপ খননে প্রায় ২১০ দিন লাগবে, এবং ইতোমধ্যে প্রায় ২২ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।

একই প্রকল্পের আওতায় কুমিল্লার বাখরাবাদে বাখরাবাদ-১১ নামে আরেকটি কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে, যার গভীরতা হবে চার হাজার ৩৬০ মিটার।

দুই কূপ মিলিয়ে প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৭৯৮ কোটি টাকা। এটি আগামী বছরের ডিসেম্বর নাগাদ শেষ হওয়ার কথা। ২০২৫ সালের ২০ এপ্রিল একনেক এ প্রকল্প অনুমোদন দেয়।

দেশে গ্যাস উৎপাদন গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০১৯ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ৯৬৫ বিলিয়ন ঘনফুট (বিসিএফ), যা ২০২৫-এ নেমে এসেছে প্রায় ৬৪০ বিসিএফ-এ।

বর্তমানে দৈনিক সরবরাহ ২৬০০–২৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। যেখানে চাহিদা ৩৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট-এর বেশি। এর মধ্যে প্রায় ৯৫০ মিলিয়ন ঘনফুট আসে আমদানিকৃত এলএনজি থেকে, যা মোট সরবরাহের প্রায় ৩৫ শতাংশ।

এই প্রেক্ষাপটে কর্মকর্তারা মনে করছেন, গভীর খনন কার্যক্রম সফল হলে তা দেশের গ্যাস মজুত বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে চূড়ান্ত মজুতের পরিমাণ নিশ্চিত হবে খনন ও পরীক্ষার কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর।

সম্পর্কিত