অর্ণব সান্যাল

শীতের সকাল। একজন নারীকে খুঁটিতে বেঁধে রাখা হয়েছে। চারপাশে পুরুষদের উল্লাস। সবাই হাসছে, আনন্দ করছে। সেই হাসিমুখেই নারীর গায়ে ঢেলে দেওয়া হচ্ছে ঠান্ডা পানি!
এই ঘটনাটি ঘটেছে নতুন বছরের শুরুতে, একেবারেই সাম্প্রতিক কালে। ঘটেছে রাজধানীর বুকেই। চুরির অভিযোগ তুলে একজন নারীকে আটক করা হয়েছিল। তারপর ফৌজদারী আইনের তোয়াক্কা না করে একদল পুরুষই শুরু করে দেয় বিচার। শাস্তি দেওয়া সাব্যস্ত হয়। সেই শাস্তি হিসেবে নির্ধারিত হয়, শীতের সকালে গায়ে ঠান্ডা পানি ঢেলে দেওয়া।
এই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। যা হয় এখন, ঘটনা ফেসবুকে না আসলে তো আর কর্তৃপক্ষের নড়া-চড়া ওতটা জোরেশোরে হয় না। যা হোক, শেষে থানা-পুলিশ জানায়, গুলশানের নদ্দা এলাকার মোড়ল বাজারে এ ঘটনাটি ঘটে। চুরির অভিযোগ তুলে শীতের সকালে প্রচণ্ড ঠান্ডায় ওই নারীকে খুঁটিতে বেঁধে বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেঁধে শরীরে ঠান্ডা পানি ঢেলে নির্যাতন করা হয়। এ অপরাধে সম্পৃক্ত কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়, মামলাও দায়ের হয়।

এ ধরনের ঘটনা এমন একটি দেশে ঘটেছে, যেখানে ২০২৫ সালে ৫৬৯টি নারী ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ সময় হত্যা করা হয়েছে ৬৩২ নারীকে। এই সংস্থার প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট ২৮০৮ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ১২৩৪ কন্যা শিশু এবং ১৫৭৪ নারী রয়েছে।
অর্থাৎ, বাংলাদেশের নারীরা এখনো সেই সঙীন অবস্থার মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে। নারীর প্রতি নির্যাতন, নিপীড়ন–কোনো কিছুর প্রাবল্য কমেনি, বরং বেড়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নারীর প্রতি পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা ২০২৫ সালে ঘটেছে ৫৬০টি। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৫২৩। ধর্ষণের ঘটনা ২০২৪ সালে ছিল ৪০১, ২০২৫ সালে হয়েছে ৭৪৯। আর নারীর প্রতি যৌন হেনস্থার ঘটনা ২০২৪ সালে ছিল ১৬৬, ২০২৫ সালে হয়েছে ১৯৩।
মানে, নারীর প্রতি নির্যাতনের সব ক্ষেত্রেই শুধুই এগিয়ে যাওয়া! অন্তত, নারীর প্রতি নির্যাতন, নিপীড়নে এ দেশের মানুষের ক্লান্তি খুব একটা নেই। এমন অক্লান্ত পরিশ্রমের ফল তো মেলাই উচিত। এবং সেটাই মিলছে। এতটাই যে, নারীদের ধর্ষণ, হত্যা, যৌন হেনস্থা–সবকিছুতেই আগের বছরকে পেছনে ফেলা গেছে।
কিন্তু কেন নারী নির্যাতনের পরিমাণ এতটা বাড়ছে এই দেশে? এর অন্যতম কারণ হলো–দেশে নারীদের মানসিকভাবে কোণঠাসা করে ফেলার দীর্ঘদিনের প্রকল্পটি এখন আগের চেয়ে জোরদার হয়েছে। একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে, বছরখানেক সময় ধরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের প্রতিনিধিত্ব কেমন যেন অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে, বা অদৃশ্য করে দেওয়া হচ্ছে। এটি রাজনীতিতে যেমন, অর্থনীতিতেও তেমন, সমাজেও তেমন।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এখন সামনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছে। তাদের নারী প্রার্থীদের তালিকা বেশ ছোট। পুরুষদের তুলনায় একেবারেই অকিঞ্চিৎকর বলা চলে। আবার রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিনির্ধারণী ক্ষেত্রেও আমরা নারীদের কিছুটা এড়িয়ে চলতে দেখছি। এমনকি মত গ্রহণ না করায় বা গুরুত্ব না দেওয়ায় অনেক নারী রাজনীতিকের দল থেকে পদত্যাগ করার উদাহরণও সাম্প্রতিক সময়ে ঢের। এক কথায়, নারীদের রাজনীতিতে প্রয়োজনে ব্যবহার এবং স্বীকৃতি দেওয়ার সময়ে পুরোপুরি পরিহারের সংস্কৃতি দেখা যাচ্ছে।
রাজনীতি বাংলাদেশের ক্ষমতা কাঠামোর অন্যতম ভিত। তাই রাজনীতিতে যখন নারীকে কোণঠাসা করার চেষ্টা চলে, সেটি ক্ষমতা কাঠামোতেও একই প্রভাব ফেলে। আর ক্ষমতা কাঠামোতে নারীকে উপেক্ষা করার মাধ্যমে, দেশের সমাজ কাঠামোতেও সমরূপ চিত্রের প্রতিফলন ঘটে। অর্থনীতিতেও নারীকে দুর্বল করার চেষ্টা চলতে থাকে। নারীকে বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে, তার এত আয়ের প্রয়োজন নেই। বলা হচ্ছে যে, তারা কেবলই পুরুষের সহযোগী। এবং এভাবে নারীকে একেবারে ঘরে ঢুকিয়ে ফেলার প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষভাবে ‘হুমকি’ হিসেবে ব্যবহার করা হয় নির্যাতন, নিপীড়ন ও হেনস্তাকে।
যেকোনো শারীরিক আক্রমণের ঘটনা একজন ব্যক্তির শরীরে প্রভাব ফেলার সাথে সাথে, তা সমাজের সমমনা আরও অসংখ্য ব্যক্তির মনে প্রভাব ফেলে। একজনের বিরুদ্ধে একটি বিরূপ ঘটনা ঘটিয়ে আরও ১০০ জনকে দমিয়ে দেওয়ার এই উপায় সারা দুনিয়ার বিভিন্ন সমাজেই ঘটে থাকে। আমাদের দেশে সেটি অনেকদিন ধরেই ঘটছে নারীদের বেলায়। এখন তার প্রাবল্য যে বেড়ে গেছে, তা বোঝাতে তো পরিসংখ্যানই যথেষ্ট!
নারীদের ঘরে ঢুকিয়ে দেওয়ার এই রাজনীতি আমাদের দেশে সম্প্রতি শুরু হয়েছে বেশ হিসাব করেই। তাই শুরুতেই এই বঙ্গের নারী স্বাধীনতার পক্ষের প্রতীকী ব্যক্তিদের নিয়ে প্রথমে নেতিবাচক প্রচার শুরু হয়। এভাবে ধীরে ধীরে, লিঙ্গ হিসেবেই নারীকে এক ধরনের হেয় করার মানসিকতা গড়ে তোলা হয়। তুমুল পুরুষতান্ত্রিক সমাজ সুযোগ পেয়ে তাতে গা ভাসায়। দেশের নারীদের একটি অংশও এতে জ্বালানি জোগায়, নারী হয়েই নারীদের বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করে দেয়। এ প্রক্রিয়ার উত্তমরূপে ব্যবহার হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো, চলছে ধুন্ধুমার স্লাটশেমিং!
আসলে আমরা সবাই মিলে এমন একটি দেশ ও সমাজ তৈরি করেছি, যেখানে নারী মুখ ফুটে নিজেদের অধিকারের দাবি তুললেই তা হয়ে যায় বেয়াদবি! এই দৃষ্টিভঙ্গি পুরুষেরাই গড়ে তুলেছে, কেবলই নিজেদের পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতা কাঠামোকে ধরে রাখার স্বার্থে। এখনকার যে হাওয়া নারীদের ঘরে ঢুকিয়ে দিতে চাইছে, সেটি আরও উৎসাহ পাচ্ছে মূলত সমাজের পোশাকি আচরণের নিচে প্রবাহিত প্রবল পুরুষতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণেই। ফলে নারীর বিরুদ্ধে তৈরি করা ভয়ের পরিবেশের অন্ধকার গাঢ় হচ্ছে আরও।
অন্যদিকে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারও আস্ফালনে যতটা আগ্রহী, প্রতিকারে ততটা নয়। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের মতো আর কোনো সরকারে হয়তো নিকট অতীতে এতজন অধিকারকর্মী ছিলেন না। এ দেশে অধিকারকর্মীরা প্রায় সময়ই আন্দোলন, প্রতিবাদে সামনের কাতারে থাকেন। তো তারা সরকার চালালে, সেটি ভালোই চলার কথা ছিল। অথচ তারা সরকারে থাকা অবস্থাতেই দেশটায় নারীদের প্রতি নির্যাতন, নিপীড়ন বাড়ছে। দেখা যাচ্ছে কোণঠাসা করার প্রক্রিয়া। কী আইরনি!

তা এমনটা হবে নাই বা কেন? এই সরকার এতগুলো সংস্কার কমিশন করল। কিন্তু নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের বেলাতেই কেমন যেন গা-ছাড়া ভাব! ২০২৫ সালের ১৯ এপ্রিল নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এই প্রতিবেদনে ৩ ধাপে মোট ৪৩৩টি সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সুপারিশগুলো হচ্ছে: সংসদে সমানসংখ্যক নারী প্রতিনিধি সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত করা; সব কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে নীতিমালা প্রণয়ন ও অভিযোগ কমিটি গঠন; বিয়ের সর্বনিম্ন বয়স ১৮ বছর নির্ধারণ; উত্তরাধিকারে নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করতে আইনের সংশোধন; ঐচ্ছিক অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রণয়ন; ছয় মাসের পূর্ণ বেতনের বাধ্যতামূলক প্রসূতি ও দত্তকজনিত ছুটি; বৈবাহিক ধর্ষণকে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি; যৌনকর্মীদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি; গণমাধ্যমে ৫০ শতাংশ নারী অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ; স্থায়ী নারী কমিশন প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি।
এগুলো যে খুব নতুন কোনো সুপারিশ, তা নয়। এসবের মধ্যে অনেকগুলোকেই বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে নেওয়া যেত প্রাথমিকভাবে। অথচ একটি সুনির্দিষ্ট পক্ষের হুঙ্কারেই যেন চুপসে গেল পুরো সরকার। এতটাই যে, এ নিয়ে আর কথা বলারই প্রয়োজন বোধ করে না সরকার। ভাবটা এমন, যেন তারা কোনো নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন গঠনই করেনি কখনো!
একটি দেশের সরকারের অবস্থাই যদি এমন ভঙ্গুর হয়, তবে আর বৃহৎ নারীসমাজ কীভাবে নিরাপদবোধ করবে? সরকারই যদি নিজের সুবিধার জন্য নারী সমাজকে এড়িয়ে চলতে চায়, তাহলে কি নারীবিরোধীরা আরও উৎসাহী বোধ করবে না?
হ্যাঁ, করাই উচিত। তাই আমাদের বাংলাদেশে নারীদের পরিস্থিতি এখন অনেকটা ওই খুঁটিতে বেঁধে রাখার মতোই হয়ে যাচ্ছে। আর নারীদের খুঁটিতে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখার এই কাজে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তা করছে সরকার, সমাজ, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো–সব! অথচ, পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫১ শতাংশ নারী। দেশের শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ ৪২ দশমিক ৭ শতাংশ। তা এত বিপুল পরিমাণ মা-বোনকে খুঁটিতে বেঁধে রাখলে দেশটা এগোতে পারবে তো?
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

শীতের সকাল। একজন নারীকে খুঁটিতে বেঁধে রাখা হয়েছে। চারপাশে পুরুষদের উল্লাস। সবাই হাসছে, আনন্দ করছে। সেই হাসিমুখেই নারীর গায়ে ঢেলে দেওয়া হচ্ছে ঠান্ডা পানি!
এই ঘটনাটি ঘটেছে নতুন বছরের শুরুতে, একেবারেই সাম্প্রতিক কালে। ঘটেছে রাজধানীর বুকেই। চুরির অভিযোগ তুলে একজন নারীকে আটক করা হয়েছিল। তারপর ফৌজদারী আইনের তোয়াক্কা না করে একদল পুরুষই শুরু করে দেয় বিচার। শাস্তি দেওয়া সাব্যস্ত হয়। সেই শাস্তি হিসেবে নির্ধারিত হয়, শীতের সকালে গায়ে ঠান্ডা পানি ঢেলে দেওয়া।
এই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। যা হয় এখন, ঘটনা ফেসবুকে না আসলে তো আর কর্তৃপক্ষের নড়া-চড়া ওতটা জোরেশোরে হয় না। যা হোক, শেষে থানা-পুলিশ জানায়, গুলশানের নদ্দা এলাকার মোড়ল বাজারে এ ঘটনাটি ঘটে। চুরির অভিযোগ তুলে শীতের সকালে প্রচণ্ড ঠান্ডায় ওই নারীকে খুঁটিতে বেঁধে বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেঁধে শরীরে ঠান্ডা পানি ঢেলে নির্যাতন করা হয়। এ অপরাধে সম্পৃক্ত কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়, মামলাও দায়ের হয়।

এ ধরনের ঘটনা এমন একটি দেশে ঘটেছে, যেখানে ২০২৫ সালে ৫৬৯টি নারী ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ সময় হত্যা করা হয়েছে ৬৩২ নারীকে। এই সংস্থার প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট ২৮০৮ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ১২৩৪ কন্যা শিশু এবং ১৫৭৪ নারী রয়েছে।
অর্থাৎ, বাংলাদেশের নারীরা এখনো সেই সঙীন অবস্থার মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে। নারীর প্রতি নির্যাতন, নিপীড়ন–কোনো কিছুর প্রাবল্য কমেনি, বরং বেড়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নারীর প্রতি পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা ২০২৫ সালে ঘটেছে ৫৬০টি। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৫২৩। ধর্ষণের ঘটনা ২০২৪ সালে ছিল ৪০১, ২০২৫ সালে হয়েছে ৭৪৯। আর নারীর প্রতি যৌন হেনস্থার ঘটনা ২০২৪ সালে ছিল ১৬৬, ২০২৫ সালে হয়েছে ১৯৩।
মানে, নারীর প্রতি নির্যাতনের সব ক্ষেত্রেই শুধুই এগিয়ে যাওয়া! অন্তত, নারীর প্রতি নির্যাতন, নিপীড়নে এ দেশের মানুষের ক্লান্তি খুব একটা নেই। এমন অক্লান্ত পরিশ্রমের ফল তো মেলাই উচিত। এবং সেটাই মিলছে। এতটাই যে, নারীদের ধর্ষণ, হত্যা, যৌন হেনস্থা–সবকিছুতেই আগের বছরকে পেছনে ফেলা গেছে।
কিন্তু কেন নারী নির্যাতনের পরিমাণ এতটা বাড়ছে এই দেশে? এর অন্যতম কারণ হলো–দেশে নারীদের মানসিকভাবে কোণঠাসা করে ফেলার দীর্ঘদিনের প্রকল্পটি এখন আগের চেয়ে জোরদার হয়েছে। একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে, বছরখানেক সময় ধরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের প্রতিনিধিত্ব কেমন যেন অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে, বা অদৃশ্য করে দেওয়া হচ্ছে। এটি রাজনীতিতে যেমন, অর্থনীতিতেও তেমন, সমাজেও তেমন।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এখন সামনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছে। তাদের নারী প্রার্থীদের তালিকা বেশ ছোট। পুরুষদের তুলনায় একেবারেই অকিঞ্চিৎকর বলা চলে। আবার রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিনির্ধারণী ক্ষেত্রেও আমরা নারীদের কিছুটা এড়িয়ে চলতে দেখছি। এমনকি মত গ্রহণ না করায় বা গুরুত্ব না দেওয়ায় অনেক নারী রাজনীতিকের দল থেকে পদত্যাগ করার উদাহরণও সাম্প্রতিক সময়ে ঢের। এক কথায়, নারীদের রাজনীতিতে প্রয়োজনে ব্যবহার এবং স্বীকৃতি দেওয়ার সময়ে পুরোপুরি পরিহারের সংস্কৃতি দেখা যাচ্ছে।
রাজনীতি বাংলাদেশের ক্ষমতা কাঠামোর অন্যতম ভিত। তাই রাজনীতিতে যখন নারীকে কোণঠাসা করার চেষ্টা চলে, সেটি ক্ষমতা কাঠামোতেও একই প্রভাব ফেলে। আর ক্ষমতা কাঠামোতে নারীকে উপেক্ষা করার মাধ্যমে, দেশের সমাজ কাঠামোতেও সমরূপ চিত্রের প্রতিফলন ঘটে। অর্থনীতিতেও নারীকে দুর্বল করার চেষ্টা চলতে থাকে। নারীকে বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে, তার এত আয়ের প্রয়োজন নেই। বলা হচ্ছে যে, তারা কেবলই পুরুষের সহযোগী। এবং এভাবে নারীকে একেবারে ঘরে ঢুকিয়ে ফেলার প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষভাবে ‘হুমকি’ হিসেবে ব্যবহার করা হয় নির্যাতন, নিপীড়ন ও হেনস্তাকে।
যেকোনো শারীরিক আক্রমণের ঘটনা একজন ব্যক্তির শরীরে প্রভাব ফেলার সাথে সাথে, তা সমাজের সমমনা আরও অসংখ্য ব্যক্তির মনে প্রভাব ফেলে। একজনের বিরুদ্ধে একটি বিরূপ ঘটনা ঘটিয়ে আরও ১০০ জনকে দমিয়ে দেওয়ার এই উপায় সারা দুনিয়ার বিভিন্ন সমাজেই ঘটে থাকে। আমাদের দেশে সেটি অনেকদিন ধরেই ঘটছে নারীদের বেলায়। এখন তার প্রাবল্য যে বেড়ে গেছে, তা বোঝাতে তো পরিসংখ্যানই যথেষ্ট!
নারীদের ঘরে ঢুকিয়ে দেওয়ার এই রাজনীতি আমাদের দেশে সম্প্রতি শুরু হয়েছে বেশ হিসাব করেই। তাই শুরুতেই এই বঙ্গের নারী স্বাধীনতার পক্ষের প্রতীকী ব্যক্তিদের নিয়ে প্রথমে নেতিবাচক প্রচার শুরু হয়। এভাবে ধীরে ধীরে, লিঙ্গ হিসেবেই নারীকে এক ধরনের হেয় করার মানসিকতা গড়ে তোলা হয়। তুমুল পুরুষতান্ত্রিক সমাজ সুযোগ পেয়ে তাতে গা ভাসায়। দেশের নারীদের একটি অংশও এতে জ্বালানি জোগায়, নারী হয়েই নারীদের বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করে দেয়। এ প্রক্রিয়ার উত্তমরূপে ব্যবহার হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো, চলছে ধুন্ধুমার স্লাটশেমিং!
আসলে আমরা সবাই মিলে এমন একটি দেশ ও সমাজ তৈরি করেছি, যেখানে নারী মুখ ফুটে নিজেদের অধিকারের দাবি তুললেই তা হয়ে যায় বেয়াদবি! এই দৃষ্টিভঙ্গি পুরুষেরাই গড়ে তুলেছে, কেবলই নিজেদের পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতা কাঠামোকে ধরে রাখার স্বার্থে। এখনকার যে হাওয়া নারীদের ঘরে ঢুকিয়ে দিতে চাইছে, সেটি আরও উৎসাহ পাচ্ছে মূলত সমাজের পোশাকি আচরণের নিচে প্রবাহিত প্রবল পুরুষতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণেই। ফলে নারীর বিরুদ্ধে তৈরি করা ভয়ের পরিবেশের অন্ধকার গাঢ় হচ্ছে আরও।
অন্যদিকে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারও আস্ফালনে যতটা আগ্রহী, প্রতিকারে ততটা নয়। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের মতো আর কোনো সরকারে হয়তো নিকট অতীতে এতজন অধিকারকর্মী ছিলেন না। এ দেশে অধিকারকর্মীরা প্রায় সময়ই আন্দোলন, প্রতিবাদে সামনের কাতারে থাকেন। তো তারা সরকার চালালে, সেটি ভালোই চলার কথা ছিল। অথচ তারা সরকারে থাকা অবস্থাতেই দেশটায় নারীদের প্রতি নির্যাতন, নিপীড়ন বাড়ছে। দেখা যাচ্ছে কোণঠাসা করার প্রক্রিয়া। কী আইরনি!

তা এমনটা হবে নাই বা কেন? এই সরকার এতগুলো সংস্কার কমিশন করল। কিন্তু নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের বেলাতেই কেমন যেন গা-ছাড়া ভাব! ২০২৫ সালের ১৯ এপ্রিল নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এই প্রতিবেদনে ৩ ধাপে মোট ৪৩৩টি সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সুপারিশগুলো হচ্ছে: সংসদে সমানসংখ্যক নারী প্রতিনিধি সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত করা; সব কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে নীতিমালা প্রণয়ন ও অভিযোগ কমিটি গঠন; বিয়ের সর্বনিম্ন বয়স ১৮ বছর নির্ধারণ; উত্তরাধিকারে নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করতে আইনের সংশোধন; ঐচ্ছিক অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রণয়ন; ছয় মাসের পূর্ণ বেতনের বাধ্যতামূলক প্রসূতি ও দত্তকজনিত ছুটি; বৈবাহিক ধর্ষণকে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি; যৌনকর্মীদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি; গণমাধ্যমে ৫০ শতাংশ নারী অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ; স্থায়ী নারী কমিশন প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি।
এগুলো যে খুব নতুন কোনো সুপারিশ, তা নয়। এসবের মধ্যে অনেকগুলোকেই বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে নেওয়া যেত প্রাথমিকভাবে। অথচ একটি সুনির্দিষ্ট পক্ষের হুঙ্কারেই যেন চুপসে গেল পুরো সরকার। এতটাই যে, এ নিয়ে আর কথা বলারই প্রয়োজন বোধ করে না সরকার। ভাবটা এমন, যেন তারা কোনো নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন গঠনই করেনি কখনো!
একটি দেশের সরকারের অবস্থাই যদি এমন ভঙ্গুর হয়, তবে আর বৃহৎ নারীসমাজ কীভাবে নিরাপদবোধ করবে? সরকারই যদি নিজের সুবিধার জন্য নারী সমাজকে এড়িয়ে চলতে চায়, তাহলে কি নারীবিরোধীরা আরও উৎসাহী বোধ করবে না?
হ্যাঁ, করাই উচিত। তাই আমাদের বাংলাদেশে নারীদের পরিস্থিতি এখন অনেকটা ওই খুঁটিতে বেঁধে রাখার মতোই হয়ে যাচ্ছে। আর নারীদের খুঁটিতে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখার এই কাজে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তা করছে সরকার, সমাজ, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো–সব! অথচ, পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫১ শতাংশ নারী। দেশের শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ ৪২ দশমিক ৭ শতাংশ। তা এত বিপুল পরিমাণ মা-বোনকে খুঁটিতে বেঁধে রাখলে দেশটা এগোতে পারবে তো?
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা