Advertisement Banner

মোদি-শাহের চিত্রনাট্যে মমতায় মহারাষ্ট্র মডেলের মঞ্চায়ন

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
মোদি-শাহের চিত্রনাট্যে মমতায় মহারাষ্ট্র মডেলের মঞ্চায়ন
প্রতীকী ছবি: এআই দিয়ে নির্মিত

পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা হারানোর মাত্র এক মাসের মাথায় ভেঙে পড়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস। তার দলের বিদ্রোহী সাংসদরা আইনি প্যাঁচ এড়াতে নতুন একটি দলে যোগ দিয়েছেন।

তৃণমূল থেকে লোকসভা নির্বাচনে সাংসদ হওয়া ওই ২০ জন পাশের রাজ্য ত্রিপুরার এমন একটি দলে যোগ দেওয়ার কথা বলেছেন, যার অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন আছে। খোদ ত্রিপুরার অনেকেই বলেছেন, তারা এমন কোনো দলের নাম কখনো শোনেনি।

ত্রিপুরায় নিবন্ধিত হলেও প্রায় সম্পূর্ণ অজ্ঞাত একটি রাজনৈতিক দল এনসিপিআই। ২০ জন বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদ সরাসরি বিজেপিতে না গিয়ে এই দলের সঙ্গে একীভূত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর দলটি আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে।

এই ঘটনাকে ঘিরে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। কারণ বিশ্লেষকদের মতে এটি দলত্যাগ বিরোধী বিধান ও সংসদীয় নিয়মের ইচ্ছাকৃত অপব্যবহারের উদাহরণ।

বার্তা সংস্থা পিটিআইকে দেশটির নির্বাচন কমিশনের একজন প্রাক্তন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদরা স্বল্প পরিচিত এনসিপিআই-এর সাথে একীভূত হওয়ার পরিকল্পনা এমন ‘উদ্ভাবন’ যার কোনো ভারতের দলত্যাগ বিরোধী আইন বা জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের কোথাও নেই।

অপরদিকে অন্যান্য সূত্র সংবাদ সংস্থাটিকে জানিয়েছে, লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা দলছুটদের স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দলত্যাগী সাংসদ এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন উপদল-উভয় পক্ষেরই বক্তব্য শুনবেন।

এনসিপিআই কেমন দল?

ভারতের বাংলা সংবাদপত্র আনন্দবাজার লিখেছে, গত রোববার সন্ধ্যায় দিল্লিতে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে দেখা করে ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অব ইন্ডিয়া বা এনসিপিআই। সংবাদমাধ্যমটি বলছে, ত্রিপুরার রাজনীতি সম্পর্কে খোঁজ রাখা কেউই দলটি সম্পর্কে বিশেষ কোনো তথ্য দিতে পারেনি।

তবে ভারতের নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে, দলটির নাম ‘এনসিপিএন’। ২০২৩ সালে রেজিস্টার্ড আনরেকগনাইজড পলিটিক্যাল পার্টি (আরইউপিপি) হিসেবে নির্বাচন কমিশনের তালিকাভুক্ত হয়।

‘এনসিপিএন’ ওই বছর ত্রিপুরার বিধানসভা নির্বাচনে ধলাই জেলার চৌমানু এবং ঊনকোটি জেলার কৈলাসহর কেন্দ্রে প্রার্থী দিয়েছিল। পেয়েছিল ৮২২টি ভোট। তবে এই দলের প্রতিষ্ঠাতা কে বা কারা, তা এখনো স্পষ্ট নয়। পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলার সাঁকরাইলের একটি ভবন দলটির নথিভুক্ত ঠিকানা হিসেবে রয়েছে

কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বে তৃণমূলের ‘বিদ্রোহী’ সাংসদদের মধ্যে আছেন শতাব্দী রায়, সায়নী ঘোষ, ইউসুফ পাঠান, রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়, দীপক অধিকারী (দেব), পার্থ ভৌমিক, মালা রায়, অরুপ চক্রবর্তী।

দিল্লিতে বৈঠক শেষে বের হয়ে অরূপ চক্রবর্তী বলেন, পশ্চিমবঙ্গে ফিরে ‘এনসিপিআই’ এর দলীয় কার্যালয় খুলবেন তারা। তাদের দলের ঠিকানা পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলা।

ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, তৃণমূলের বিদ্রোহীরা আইনি প্যাঁচ এড়াতে যে রাজনৈতিক দলে যোগ দিয়েছেন, যার হদিশ গত রোববার বিকেলের আগে কেউই প্রায় জানতেন না।

মোদি-শাহের লেখা চিত্রনাট্য

তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদদের অন্য দলে যাওয়ার রাজনৈতিক কৌশলের তীব্র সমালোচনা করেছেন কংগ্রেস নেতা ও অর্থনীতিবিদ প্রসেনজিৎ বসু। আরেক দলে যাওয়ার এই প্রক্রিয়াকে তিনি ‘গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সম্পূর্ণ নৈরাশ্যজনক ও কৌশলী অপব্যবহার’ বলে অভিহিত করেছেন।

প্রসেনজিৎ বসু ঘটনাপ্রবাহটি ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরেন এবং এর সূত্রপাত পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পরবর্তী সময়ে খুঁজে পান। সংবাদমাধ্যম দ্য ফেডারেলের এক আলোচনায় তিনি বলেন, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পরাজয়ের পরে দলের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতার দাবি নিয়ে আলোচনায় যেতে অস্বীকার করেন। তার পরিবর্তে ইভিএমে কারচুপি ও নির্বাচনী ফল কারসাজির অভিযোগ তোলেন।

প্রসেনজিৎ বসুর মতে, সেখান থেকেই প্রথম ভাঙন শুরু হয়। তৃণমূলের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি বিধায়ক মূল দল থেকে আলাদা হয়ে বিধানসভায় একটি পৃথক গোষ্ঠী গঠন করেন এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও দলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রস্তাবিত ব্যক্তির পরিবর্তে অন্য একজনকে বিরোধী দলনেতা নির্বাচিত করেন।

প্রসেনজিতের দাবি, পুরো প্রক্রিয়াটির নেপথ্যে ছিল দিল্লি। তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সদ্য স্বীকৃত বিরোধী দলনেতা প্রকাশ্যে ভাঙনের আগে দিল্লিতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। চিত্রনাট্যটি দিল্লিতে লেখা হচ্ছিল এবং তা পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় মঞ্চস্থ করা হয়েছে।

অর্থাৎ, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-এর বুদ্ধিতেই তৃণমূল ভাঙার এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

এদিকে এনসিপিআই-র মধ্যেও এই বিষয়টি নিয়ে অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। দলের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক শান্তনু দে সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, যে তাকে এ বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি। জানালে তিনি এর বিরোধিতা করতেন। অন্যদিকে দলের সভাপতি শিউলি কুণ্ডু এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, শান্তনু আর সংগঠনের অংশ নন।

অমিত শাহ। ছবি: রয়টার্স
অমিত শাহ। ছবি: রয়টার্স

কংগ্রেস নেতা প্রসেনজিৎ এনসিপিআই-কে একটি ‘পার্কিং লট’ হিসেবে আখ্য দেন। তিনি বলেন, তৃণমূলের বিদ্রোহীর এটি এমন একটি অস্থায়ী আশ্রয়স্থল, যেখানে বিদ্রোহীরা আপাতত অবস্থান করছেন, যদিও তারে শেষ লক্ষ্য বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএতে একাত্ম হওয়া। কিন্তু রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কারণে তারা সরাসরি বিজেপিতে প্রবেশ করতে পারছেন না।

ফ্রন্টলাইন-এর অ্যাসোসিয়েট এডিটর টি.কে. রাজলক্ষ্মীও এই মূল্যায়নের সঙ্গে একমত। তিনি উল্লেখ করেন যে, বিদ্রোহী সাংসদ কাকলি দস্তিদার প্রকাশ্যে বলেছেন, তারা এনডিএর সঙ্গে কাজ করার জন্য আগ্রহী। ফলে তাদের চূড়ান্ত গন্তব্য কোথায়, তা স্পষ্ট।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এই সাংসদদের বিজেপির সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা সহজ হবে না। তিনি বলেন, “বিজেপি মূলত দুর্নীতি, হিংসা এবং আরও নানা ইস্যুকে সামনে রেখে তৃণমূলের লড়ছে। ফলে তাদের একটি গোষ্ঠী হিসেবে দলে জায়গা দেওয়া মোটেই সহজ হবে না।”

তিনি আরও বলেন, বিজেপির অভ্যন্তরেও এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি হতে পারে, কারণ যেসব বিজেপি প্রার্থী তাদের বিরুদ্ধে নির্বাচনে লড়েছিলেন, তাদের কাছে এই বিদ্রোহীরা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেই বিবেচিত।

পিটিআই জানিয়েছে, তৃণমূলের বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি স্বীকৃতি পাবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে কেন্দ্রীয় আইন মন্ত্রণালয়ের লিখিত মতামতের ভিত্তিতে।

স্পিকারের সিদ্ধান্ত যদি আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয়, তবে তা যাতে বিচারিক পর্যালোচনার সামনে টিকে থাকতে পারে, সেই কারণেই আইনি মতামত চাওয়া হবে।

লোকসভার প্রাক্তন সেক্রেটারি জেনারেল এবং ভারতীয় সংবিধান বিশেষজ্ঞ পিডিটি আচার্য সংবিধানের দশম তফসিলের ৪ নম্বর অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে বলেন, শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক দলই অন্য একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে একীভূত হতে পারে; সাংসদ বা বিধায়করা নিজেরা তা করতে পারেন না।

পিটিআইকে তিনি বলেন, যদি কোনো রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব অন্য একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে একীভূত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে সেই দলের বিধায়ক ও সাংসদদের ওই একীভবনে সম্মতি জানাতে হবে। কিন্তু সাংসদ বা বিধায়কেরা একা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে একীভূত হতে পারেন না... এটাই সাংবিধানিক বিধান।”

এখন তৃণমূলের সঙ্গে যেটি ঘটছে তার সঙ্গে ‘মহারাষ্ট্র মডেলের’ মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ২০২২ সালে মহারাষ্ট্রে শিবসেনা ভেঙে উদ্ধব ঠাকরের নেতৃত্বাধীন মহাবিকাশ আঘাড়ি সরকার পতনের নেপথ্যে বিজেপির একটি রাজনৈতিক কৌশল বা ‘চিত্রনাট্য’ কাজ করেছিল। ভারতীয় রাজনীতিতে এটিই মহারাষ্ট্র মডেল নামে পরিচিত। এই মডেলেও মোদি-শাহেরিই চিন্তাপ্রসূত বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

ওই সময় মূলত একনাথ শিন্ডেকে ঘুঁটি বানিয়ে বিজেপি শিবসেনাকে ‘ভেঙে’ দেয়। উদ্ধব ঠাকরে এক পর্যায়ে পদত্যাগ করেন। পরে নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে শিবসেনার মূল নাম এবং ‘তীর-ধনুক’ প্রতীকও একনাথ শিন্ডের উপদলকে পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে বিজেপির প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছিল বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।

ধারণা করা হচ্ছে, তৃণমূলের অবস্থাও হয়ত একই দিকে যাবে। মমতাকে হারাতে হতে পারে দলের নাম ও নির্বাচনী প্রতীক। যদি তেমনটা হয়, তাহলে মমতার তৃণমূলের কী হবে সেটা সময়ই বলে দেবে।

সম্পর্কিত