আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ৪ মাসে সারা দেশে মোট ১৮০টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে কমপক্ষে ৫৬ জন ভুক্তভোগীর বয়স ১২ বছরের নিচে।
সুদীপ্ত সালাম

রামিসা ক্লাস টু’তে, আমার মেয়েটিও ক্লাস টু’তে পড়ে। ওহ্, রামিসা তো পড়ে না। পড়ত!
আমার মেয়েটিও ঠিক রামিসার বয়সী। দেখতে অনেকটা রামিসার মতোই—ফুলের মতো ফুটফুটে। আমি ভাগ্যবান, রামিসার সঙ্গে যা ঘটেছে, তা আমার মেয়ের সঙ্গে ঘটেনি। রামিসার বাবার মতো করে আমার বলতে হয়নি—“আমি বিচার চাই না”!
রামিসার বাবাকে আশ্বস্ত করার মতো কোনো পাল্টা জবাব কি আদৌ আমাদের কাছে আছে?
কী ঘটেছে, তা সারা দেশের মানুষ জানে। বাবা-মা ও বড় বোনকে নিয়ে রাজধানীর পল্লবীর সেকশন-১১ নম্বরের মিল্লাত ক্যাম্প সংলগ্ন একটি পাঁচতলা ভবনের একটি ভাড়া বাসাতে থাকত ছোট্ট রামিসা। ১৯ মে সকালে ঘর থেকে বের হয় সে। পরিবারের অভিযোগ, ঠিক তখনই একই ফ্লোরের অপর পাশের ভাড়াটিয়া সোহেল রানা শিশুটিকে টেনে নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে যায়। সেখানে নির্যাতনের পর আলামত গোপনের উদ্দেশ্যে শিশুটিকে হত্যা করে। হত্যা ও হত্যার পরের ঘটনা বর্ণনা করা আমার জন্য ভীষণ কঠিন। ওই যে বললাম, রামিসার মতো আমারও একটি মেয়ে আছে।
সেই নৃশংস ঘটনা বর্ণনা তো দূরের কথা, পত্রপত্রিকায় পড়তেই আসলে কষ্ট হয়। কেমন যেন নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। হুট করে রামিসার বাবার কথা মনে হয়। তার কী অবস্থা? নিজের সাথে মিলিয়ে কল্পনা করার চেষ্টা চলে। রামিসা নিশ্চয়ই তার কলিজার টুকরা ছিল, আমার মতোই। মেয়ে তো বাবার কাছে রাজকন্যা, প্রাণভ্রমর, মা। বাবা কীভাবে এই শোক সইবে? বাবা কি আর ঘুমাতে পারবে?
নিজেকে বললাম, আমি সৌভাগ্যবান। রামিসা আমার মেয়ের মতো হলেও আমার মেয়ে তো নয়। সাথে সাথেই মনের গহীনে আরেকটা প্রশ্ন মোচড় দিয়ে ওঠে। রামিসা আমার মেয়ে তো না, কিন্তু তাই বলে কি কষ্ট আমার না?
এসব সাত–পাঁচ ভেবে নিজেই নিজেকে বললাম, “আমি সৌভাগ্যবান। রামিসা আমার মেয়ের মতো হলেও আমার মেয়ে তো নয়।” সাথে সাথেই মনের গহীনে আরেকটা প্রশ্ন মোচড় দিয়ে ওঠে। রামিসা আমার মেয়ে তো না, কিন্তু তাই বলে কি কষ্ট আমার না?
আমার মেয়ে বেঁচে আছে—এখনো পর্যন্ত। মেয়েকে এই দেশের সব বিপাদ–আপদ থেকে বাঁচাতে শিখিয়েছি যে, অচেনা কারও সঙ্গে কথা বলবে না। অচেনা কারও কাছে যাবে না। কেউ খারাপ কিছু করলে, কিছু বললে বাবা-মাকে সঙ্গে সঙ্গে জানাবে... ইত্যাদি ইত্যাদি। অনেক বিধিনিষেধে নিজের মেয়েকে মুড়িয়ে তাকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা করছে এই অধমের মতো আরও অনেক মেয়ের বাবাই।
ঘটনার পর ঘটনা, কিন্তু সরকারের আছে কেবল ‘কঠোর ব্যবস্থা’ নেওয়ার কিছু নিয়মিত প্রবোধ। এসব আমরা শুনছি বছরের পর বছর ধরেই। পরিবর্তন আর আসে না।
অবশ্য রামিসার সঙ্গে যা হয়েছে, তা আমাদের সব সুরক্ষা ব্যবস্থার ধারণাকে তছনছ করে দিয়েছে। অমানুষ তো আপনার-আমার পাশের ঘরেই ওঁৎ পেতে থাকতে পারে। চেহারা দেখে তো কে ভালো, কে মন্দ—বোঝার উপায় নেই। আমাদের সন্তানরা তাদের কাছে না গেলেও, তাদের সঙ্গে কথা না বললেও কিছু যায় আসে না। সুযোগ পেলেই সেসব থাবায় সব শেষ। বাবাকে এসে বলার সুযোগই নেই!
রামিসার হত্যাকাণ্ড চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, এসব শেখানো-পড়ানোতেও সব সময় রক্ষা হয় না। কারণ অপরাধীরা প্রতিনিয়ত সাপের খোলসের মতো পদ্ধতি বদলাচ্ছে। তবে হ্যাঁ, লাভ হতো, যদি আমরা সমাজটাকে শেখাতে পারতাম, শোধরাতে পারতাম। বিচারহীনতার সংস্কৃতি, অশিক্ষা ও বৈষম্য সমাজকে ভেতর থেকে ঝাঁঝরা করে ফেলেছে। আবার এই অন্তঃসারশূন্য সমাজেরই এক অংশ এ ধরনের বর্বরতার সম্মতি উৎপাদন করছে। রামিসা হত্যাকাণ্ডের খবরের নিচে কেউ কেউ তাই এই পরিস্থিতিতেও লেখে—“এত সাজসজ্জা ভালো না”!
চারদিকে তাকালে মনে পড়ে যায় শিল্পাচার্য জয়নুলের ‘সংগ্রাম’-এর কথা। স্বাধীনতার পর থেকে শুরু করে এখনও পর্যন্ত দেশে কত কত আন্দোলন হলো, রক্ত ঝরল। তারপরও সমাজ ও ন্যায় বিচারের চাকা দুটিকে কাদা থেকে তোলা গেল না। দিন দিন চাকা দুটি যেন কাদায় আরও ডুবে যাচ্ছে। রামিসার চিৎকার তারই সমার্থক হয়তো।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ৪ মাসে সারা দেশে মোট ১৮০টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে কমপক্ষে ৫৬ জন ভুক্তভোগীর বয়স ১২ বছরের নিচে। এমন ঘটনা গত বছরও ঘটেছে। ঘটেছে তার আগের বছরও। এভাবেই এ ধরনের গর্হিত অপরাধ সগৌরবে চলছেই।
কেন ঘটছেই? কারণ এমন ঘটনা প্রতিরোধের বা বন্ধ করার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ ধারাবাহিকভাবে নেওয়া হয় না। ফলে আইনি কাঠামোর প্রতি ভয় নেই, শ্রদ্ধাও নেই। এমনকি অপরাধকে অপরাধ মনে করাটাও হচ্ছে না যেন! তাই এ দেশে পত্রিকার পাতায় দেখতে হয় এমন শিরোনাম—ধর্ষণের শিকার ১১ বছরের শিশু ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা।
সরকারযন্ত্র কী করছে, কী করবে—এ নিয়ে আমাদের আশাবাদও তাই টিকছে না। ঘটনার পর ঘটনা, কিন্তু সরকারের আছে কেবল ‘কঠোর ব্যবস্থা’ নেওয়ার কিছু নিয়মিত প্রবোধ। এসব আমরা শুনছি বছরের পর বছর ধরেই। পরিবর্তন আর আসে না।
মেয়ের বাবা–মায়েরা তাই নিজেদের কন্যা সন্তানটিকে নিয়ে শঙ্কিতই থাকছে। সরকার কি তাদের অভয় দিতে পারছে? সেই চেষ্টা কতটা আসলে?
এসব প্রশ্নের স্বস্তিদায়ক উত্তর মেলে না বলেই হয়তো রামিসার বাবা যখন বলেন, ‘‘আমি বিচার চাই না, কারণ আপনারা বিচার করতে পারবেন না, আপনাদের বিচার করার কোনো রেকর্ড নেই’’, তখন আসলে অবনত মস্তকে মেনে নেওয়া ছাড়া আমাদের কোনো উপায় থাকে না।
রামিসার বাবাকে আশ্বস্ত করার মতো কোনো পাল্টা জবাব কি আদৌ আমাদের কাছে আছে?

রামিসা ক্লাস টু’তে, আমার মেয়েটিও ক্লাস টু’তে পড়ে। ওহ্, রামিসা তো পড়ে না। পড়ত!
আমার মেয়েটিও ঠিক রামিসার বয়সী। দেখতে অনেকটা রামিসার মতোই—ফুলের মতো ফুটফুটে। আমি ভাগ্যবান, রামিসার সঙ্গে যা ঘটেছে, তা আমার মেয়ের সঙ্গে ঘটেনি। রামিসার বাবার মতো করে আমার বলতে হয়নি—“আমি বিচার চাই না”!
রামিসার বাবাকে আশ্বস্ত করার মতো কোনো পাল্টা জবাব কি আদৌ আমাদের কাছে আছে?
কী ঘটেছে, তা সারা দেশের মানুষ জানে। বাবা-মা ও বড় বোনকে নিয়ে রাজধানীর পল্লবীর সেকশন-১১ নম্বরের মিল্লাত ক্যাম্প সংলগ্ন একটি পাঁচতলা ভবনের একটি ভাড়া বাসাতে থাকত ছোট্ট রামিসা। ১৯ মে সকালে ঘর থেকে বের হয় সে। পরিবারের অভিযোগ, ঠিক তখনই একই ফ্লোরের অপর পাশের ভাড়াটিয়া সোহেল রানা শিশুটিকে টেনে নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে যায়। সেখানে নির্যাতনের পর আলামত গোপনের উদ্দেশ্যে শিশুটিকে হত্যা করে। হত্যা ও হত্যার পরের ঘটনা বর্ণনা করা আমার জন্য ভীষণ কঠিন। ওই যে বললাম, রামিসার মতো আমারও একটি মেয়ে আছে।
সেই নৃশংস ঘটনা বর্ণনা তো দূরের কথা, পত্রপত্রিকায় পড়তেই আসলে কষ্ট হয়। কেমন যেন নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। হুট করে রামিসার বাবার কথা মনে হয়। তার কী অবস্থা? নিজের সাথে মিলিয়ে কল্পনা করার চেষ্টা চলে। রামিসা নিশ্চয়ই তার কলিজার টুকরা ছিল, আমার মতোই। মেয়ে তো বাবার কাছে রাজকন্যা, প্রাণভ্রমর, মা। বাবা কীভাবে এই শোক সইবে? বাবা কি আর ঘুমাতে পারবে?
নিজেকে বললাম, আমি সৌভাগ্যবান। রামিসা আমার মেয়ের মতো হলেও আমার মেয়ে তো নয়। সাথে সাথেই মনের গহীনে আরেকটা প্রশ্ন মোচড় দিয়ে ওঠে। রামিসা আমার মেয়ে তো না, কিন্তু তাই বলে কি কষ্ট আমার না?
এসব সাত–পাঁচ ভেবে নিজেই নিজেকে বললাম, “আমি সৌভাগ্যবান। রামিসা আমার মেয়ের মতো হলেও আমার মেয়ে তো নয়।” সাথে সাথেই মনের গহীনে আরেকটা প্রশ্ন মোচড় দিয়ে ওঠে। রামিসা আমার মেয়ে তো না, কিন্তু তাই বলে কি কষ্ট আমার না?
আমার মেয়ে বেঁচে আছে—এখনো পর্যন্ত। মেয়েকে এই দেশের সব বিপাদ–আপদ থেকে বাঁচাতে শিখিয়েছি যে, অচেনা কারও সঙ্গে কথা বলবে না। অচেনা কারও কাছে যাবে না। কেউ খারাপ কিছু করলে, কিছু বললে বাবা-মাকে সঙ্গে সঙ্গে জানাবে... ইত্যাদি ইত্যাদি। অনেক বিধিনিষেধে নিজের মেয়েকে মুড়িয়ে তাকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা করছে এই অধমের মতো আরও অনেক মেয়ের বাবাই।
ঘটনার পর ঘটনা, কিন্তু সরকারের আছে কেবল ‘কঠোর ব্যবস্থা’ নেওয়ার কিছু নিয়মিত প্রবোধ। এসব আমরা শুনছি বছরের পর বছর ধরেই। পরিবর্তন আর আসে না।
অবশ্য রামিসার সঙ্গে যা হয়েছে, তা আমাদের সব সুরক্ষা ব্যবস্থার ধারণাকে তছনছ করে দিয়েছে। অমানুষ তো আপনার-আমার পাশের ঘরেই ওঁৎ পেতে থাকতে পারে। চেহারা দেখে তো কে ভালো, কে মন্দ—বোঝার উপায় নেই। আমাদের সন্তানরা তাদের কাছে না গেলেও, তাদের সঙ্গে কথা না বললেও কিছু যায় আসে না। সুযোগ পেলেই সেসব থাবায় সব শেষ। বাবাকে এসে বলার সুযোগই নেই!
রামিসার হত্যাকাণ্ড চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, এসব শেখানো-পড়ানোতেও সব সময় রক্ষা হয় না। কারণ অপরাধীরা প্রতিনিয়ত সাপের খোলসের মতো পদ্ধতি বদলাচ্ছে। তবে হ্যাঁ, লাভ হতো, যদি আমরা সমাজটাকে শেখাতে পারতাম, শোধরাতে পারতাম। বিচারহীনতার সংস্কৃতি, অশিক্ষা ও বৈষম্য সমাজকে ভেতর থেকে ঝাঁঝরা করে ফেলেছে। আবার এই অন্তঃসারশূন্য সমাজেরই এক অংশ এ ধরনের বর্বরতার সম্মতি উৎপাদন করছে। রামিসা হত্যাকাণ্ডের খবরের নিচে কেউ কেউ তাই এই পরিস্থিতিতেও লেখে—“এত সাজসজ্জা ভালো না”!
চারদিকে তাকালে মনে পড়ে যায় শিল্পাচার্য জয়নুলের ‘সংগ্রাম’-এর কথা। স্বাধীনতার পর থেকে শুরু করে এখনও পর্যন্ত দেশে কত কত আন্দোলন হলো, রক্ত ঝরল। তারপরও সমাজ ও ন্যায় বিচারের চাকা দুটিকে কাদা থেকে তোলা গেল না। দিন দিন চাকা দুটি যেন কাদায় আরও ডুবে যাচ্ছে। রামিসার চিৎকার তারই সমার্থক হয়তো।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ৪ মাসে সারা দেশে মোট ১৮০টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে কমপক্ষে ৫৬ জন ভুক্তভোগীর বয়স ১২ বছরের নিচে। এমন ঘটনা গত বছরও ঘটেছে। ঘটেছে তার আগের বছরও। এভাবেই এ ধরনের গর্হিত অপরাধ সগৌরবে চলছেই।
কেন ঘটছেই? কারণ এমন ঘটনা প্রতিরোধের বা বন্ধ করার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ ধারাবাহিকভাবে নেওয়া হয় না। ফলে আইনি কাঠামোর প্রতি ভয় নেই, শ্রদ্ধাও নেই। এমনকি অপরাধকে অপরাধ মনে করাটাও হচ্ছে না যেন! তাই এ দেশে পত্রিকার পাতায় দেখতে হয় এমন শিরোনাম—ধর্ষণের শিকার ১১ বছরের শিশু ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা।
সরকারযন্ত্র কী করছে, কী করবে—এ নিয়ে আমাদের আশাবাদও তাই টিকছে না। ঘটনার পর ঘটনা, কিন্তু সরকারের আছে কেবল ‘কঠোর ব্যবস্থা’ নেওয়ার কিছু নিয়মিত প্রবোধ। এসব আমরা শুনছি বছরের পর বছর ধরেই। পরিবর্তন আর আসে না।
মেয়ের বাবা–মায়েরা তাই নিজেদের কন্যা সন্তানটিকে নিয়ে শঙ্কিতই থাকছে। সরকার কি তাদের অভয় দিতে পারছে? সেই চেষ্টা কতটা আসলে?
এসব প্রশ্নের স্বস্তিদায়ক উত্তর মেলে না বলেই হয়তো রামিসার বাবা যখন বলেন, ‘‘আমি বিচার চাই না, কারণ আপনারা বিচার করতে পারবেন না, আপনাদের বিচার করার কোনো রেকর্ড নেই’’, তখন আসলে অবনত মস্তকে মেনে নেওয়া ছাড়া আমাদের কোনো উপায় থাকে না।
রামিসার বাবাকে আশ্বস্ত করার মতো কোনো পাল্টা জবাব কি আদৌ আমাদের কাছে আছে?