অর্ণব সান্যাল

‘এমন জামা পরলে ধর্ষণ তো করবেই’
‘চলাফেরা ঠিক নাই, পোলারা কিছু কইলেই দোষ?’
‘মায়ে বুকের দুধ খাওয়ায় না, বাচ্চার অসুখ তো হইবই’
ওপরের বক্তব্যগুলো কাল্পনিক। কারও মুখ থেকে শোনা বক্তব্য নয়। তবে এসব কথা সত্যিই শোনা যায়, অহরহ। আমাদের দেশ ও সমাজের মানুষেরাই এসব বক্তব্য দিয়ে থাকেন। এবং সেসব দেওয়া হয় খুবই ক্যাজুয়ালি, যেন এমনটাই বলার কথা!
বাংলাদেশে নারীরা তাই সব সময়ই দোষের দায় নিতেই অভ্যস্ত। সাম্প্রতিক দোষটা এসেছে হামের সংক্রমণ উপলক্ষে। একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বলেছেন, এখনকার মায়েরা নাকি ফিটনেস ধরে রাখতে সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ান না! হ্যাঁ, প্রকাশ্যেই বলা হয়েছে এমন কথা। সংবাদ সম্মেলনে এমনটা বলেছেন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের।
দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার ফেসবুক পেজে এই বক্তব্যের একটি ভিডিও’ও পাওয়া যায়। তাতে জাবের বলেছেন, “সব থেকে ভয়াবহ ব্যাপার যেটা, আমাদের মায়েরা তাদের ফিটনেস ধরে রাখবার জন্য তারা সন্তানদের বুকের দুধ পান করান না। একটা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ৫৫% মা… তার এই যে পাশ্চাত্য যে সংস্কৃতি…এই অপসংস্কৃতি, যে তার সন্তানকে দুধ খাওয়ালে তার ফিটনেস নষ্ট হয়ে যাবে। এই কারণে ৫৫% মা তার সন্তানকে দুধ খাওয়ায় না।”
অবশ্য এ বিষয়ে পরে জাবের আরেক ফেসবুক স্ট্যাটাসে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, ক্ষমাও চেয়েছেন। কিন্তু এরই মধ্যে যেটি হয়েছে, সেটি হলো, শিশুদের মধ্যে হাম সংক্রমণ প্রকট আকার ধারণ করার এমন একটি ব্যাখ্যা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে, যেটি শুধু ভুলই না, বরং এক ধরনের দোষ উৎপাদনকারীও বটে। এটি এমনই এক দোষ, যা একটি নির্দিষ্ট লিঙ্গের বিশাল জনগোষ্ঠীকে সরাসরি শিশুদের মৃত্যুর কারণের কাতারে ঠেলে দিয়েছে।
জাবের এখন ভুল স্বীকার করে নিচ্ছেন। যেকোনো ভুল স্বীকার করে নেওয়াটা সব সময়ই সাধুবাদের যোগ্য। কিন্তু এর আগেই যে ক্ষতিটা হয়ে গেল, তার কী হবে? বাংলাদেশের মতো একটি দেশে ও এর সমাজে নারীদের যতটা প্রান্তিক অবস্থায় রাখা হয়, সেখানে এমন একটি মন্তব্য অনেকটা খাদের কিনারে দাঁড়ানো কাউকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার মতো। অথচ তেমনই একটি ঘটনা অবলীলায় ঘটে গেল। তাও আবার কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মাধ্যমেই, যাদের কাজই হলো একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশে রাজনীতির মাধ্যমে জনগণের উন্নতি ঘটানো। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের দায়িত্বশীল হওয়াটা অত্যন্ত জরুরি, সাথে জানাশোনাটাও। কিন্তু হলো তার উল্টোটা।
কেন এভাবে সব নারীদের উদ্দেশ্য করে এমনটা বলে দেওয়া হলো? মানে, কেন মনে হলো যে, এমন একটি সংবেদনশীল তথ্য পরীক্ষা করার প্রয়োজন নেই? কেন মনে হলো যে, বলে দেওয়াই যায়?
কারণ আমাদের দেশে নারীদের যা খুশি, তা-ই বলে দেওয়ার একটা সংস্কৃতিতে পুরুষেরা মজে গেছে দারুণভাবে। বিচারহীনতার ঐতিহ্য এক্ষেত্রে তাদের সাহায্যও করেছে বেশ। তাই এমন একটি ধারণা সমাজে আছে যে, নারীদের যা খুশি বলাই যায়! সাম্প্রতিক সময়ে নারীদের নিয়ে যেসব অনলাইন হেট ক্যাম্পেইন আমরা কিছুদিন পর পরই চলতে দেখি, সেসব দিয়েই এটি স্পষ্ট।
এ কারণেই এ দেশে ধর্ষণচেষ্টার প্রতিবাদেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের রাস্তায় নামতে হয়, আন্দোলন করতে হয়। এই যেমন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েই এমনটা চলছে এখন। গত ১২ মে রাতে ক্যাম্পাসে এক নারী শিক্ষার্থীর ওপর বহিরাগত ব্যক্তির ধর্ষণচেষ্টা ও প্রাণনাশের চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে। ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় আসামিকে গ্রেপ্তার করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত ও প্রশাসনের জবাবদিহির জন্য শিক্ষার্থীরা অবরোধ কর্মসূচি করেছে, প্রক্টর কার্যালয়ে তালা দিয়েছে। এমন একটি আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষার্থীদের একই পক্ষে থাকার কথা। কিন্তু দেখা যাচ্ছে বাদানুবাদ, উত্তেজনা। কেমন যেন একটা পক্ষ-বিপক্ষ। কেন হয় এটা? ভিকটিম নারী বলেই কি?

যদি এই দেশটায় নারীর বিরুদ্ধে অপরাধের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক সাজা নিশ্চিত হতো সব সময়, তাহলে এসব প্রশ্ন উঠত না। আন্দোলন করারও কারণ থাকে কিন্তু। যদিও নারীর প্রতি অপরাধের কমতি নেই। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বলছে, ২০২৬ সালের প্রথম ৪ মাসে মোট ১৮০ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছে। জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বখাটেদের মাধ্যমে যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেছে ৩৪টি। আবার বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২০২৫ সালে ২ হাজার ৮০৮ জন নারী ও কন্যা নির্যাতনের শিকার হয়েছে। গত বছর মোট ৭৮৬ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ৫৪৩ জন কন্যা ও ২৪৩ জন নারী।
অন্যদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুসারে, গত এক বছরে দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলার সংখ্যা ২৫ শতাংশ বেড়েছে। এ সময়ে ধর্ষণের মামলা বেড়েছে ২৭ শতাংশের বেশি। গত বছর নারী নির্যাতনের যত মামলা হয়েছে, প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ধর্ষণের অভিযোগের।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগে সারা দেশে মামলা হয়েছে ২১ হাজার ৯৩৯টি। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় ৯টি অভিযোগে মামলা করা যায়। সেগুলো হলো ধর্ষণ ও ধর্ষণের কারণে মৃত্যু, বিয়ের প্রলোভনে যৌন সম্পর্ক স্থাপন, যৌন পীড়ন, যৌতুক, আত্মহত্যায় প্ররোচনা, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, ভিক্ষাবৃত্তির উদ্দেশ্যে শিশুর অঙ্গহানি, দহনকারী পদার্থ দিয়ে সংঘটিত অপরাধ।
আর উচ্চ আদালতের তথ্য অনুসারে, গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশের ৯৯টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ১ লাখ ৩২ হাজার ১০৭টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে ৫ বছরের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৩০ হাজার ৩৬৫টি। ঢাকার ৯টি ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, ১১ হাজার ৫৬৭টি। ৫ বছরের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন ৩ হাজার ৯১টি মামলা।
সুতরাং, বোঝাই যাচ্ছে যে, নারীর বিরুদ্ধে অপরাধের বিচার কতটা দ্রুত গতিতে ঘটছে! আর এমন পরিস্থিতিতেই আরও অপরাধের সুযোগ তৈরি হয়। এমনটাই স্বাভাবিক। কারণ যদি অপরাধীরা বুঝে যায় যে, এমন অপরাধে পার পাওয়া যায়, তবে তা বারবার করবে না কেন?
সুতরাং, নারীদের ক্ষেত্রে একটি ক্রমাবনতিমূলক পরিবেশ আমরা দেখতে পাচ্ছি। বিষয়টি এমন নয় যে, হুট করে হয়েছে। কিন্তু সেক্ষেত্রে প্রতিরোধের ও প্রতিকারের কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?
হ্যাঁ, আলোচিত ঘটনা ঘটলে সরকারের পক্ষ থেকে লম্বা‑চওড়া কথা শোনা যায়। নানা আগডুম‑বাগডুম পদক্ষেপ নেওয়ার বাণী আসে। কিন্তু ক’দিন পর আবার যে কে সেই! এই দেশে যেকোনো সরকারই কেন জানি পরিস্থিতি সামলানোর এই সস্তা ফরমুলাটি শিখে ফেলে অবিশ্বাস্য দ্রুততায়। এরপর চলে প্রয়োগ। অপেক্ষা তখন কেবল কোনোমতে জনক্ষোভ প্রশমিত হওয়ার। তারপর আবার সব চলতে থাকে আগেরই পন্থায়। এমন অবস্থায় কর্তৃপক্ষীয় আশ্বাসে মানুষ ভরসা রাখবে কী করে?
নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে তাই মেনে নিতেই হয় যে, আমাদের দেশে এমন ঘৃণ্য অপরাধের বিরুদ্ধে থাকা সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিই আসলে সমস্যাযুক্ত। এসব সমস্যা একদিনে গড়ে ওঠেনি। পুরোপুরি দূর করতেও সময় লাগবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু শুরুর চেষ্টা অন্তত থাকা দরকার। অথচ নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষীয় জায়গা থেকে কিছু মৌখিক কঠোরতা ছাড়া অন্য কিছু সেভাবে মিলছে কি? বা আমাদের সমাজও কি নারীকে সর্বপ্রকারের দোষে দোষী করা ছাড়া আর কোনো কিছুতে আগ্রহী? হাবেভাবে মনে তো হয় না!

আমাদের এই বাংলাদেশে আদতে নারীদের যতটা বিমানবিকীকরণ করার চেষ্টা দেখা যায়, যতটা খেলো করার প্রচেষ্টা চলে, সেসবের ফিরিস্তি দিতে গেলে লাখ লাখ দিস্তা কাগজের প্রয়োজন হবে। কতটা খেলো, সেটি এই লেখার শুরুতে থাকা মন্তব্যগুলো আরেকবার পড়লেই বোঝা যাবে নিশ্চয়ই। এসবের মধ্য দিয়ে আদতে একটি প্রকট পিতৃতান্ত্রিক চেহারা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, যেখানে নারীকে মানুষ হিসেবেই দেখা হয় না আর।
ঠিক এমন পরিস্থিতিতেই ‘যত দোষ, নন্দ ঘোষ’-এর মতো করে দেশ, সমাজের তাবৎ সমস্যার দায় নারীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। তাই ধর্ষণ থেকে শুরু করে হামের সংক্রমণ, সবেতেই দোষী বানিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলে নারীকেই। কারণ ধরেই নেওয়া হয়েছে যে–নারীদের দোষ দিলেও দোষের কিছু নেই!
তা এই দেশটা কি তবে কেবলই নারীদের ভিলেন বানানোর কারখানাই হয়ে উঠবে? এমন প্রশ্নের উত্তর নিয়ে আমরা যত বেশি ভাবব, ততই মঙ্গল।
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

‘এমন জামা পরলে ধর্ষণ তো করবেই’
‘চলাফেরা ঠিক নাই, পোলারা কিছু কইলেই দোষ?’
‘মায়ে বুকের দুধ খাওয়ায় না, বাচ্চার অসুখ তো হইবই’
ওপরের বক্তব্যগুলো কাল্পনিক। কারও মুখ থেকে শোনা বক্তব্য নয়। তবে এসব কথা সত্যিই শোনা যায়, অহরহ। আমাদের দেশ ও সমাজের মানুষেরাই এসব বক্তব্য দিয়ে থাকেন। এবং সেসব দেওয়া হয় খুবই ক্যাজুয়ালি, যেন এমনটাই বলার কথা!
বাংলাদেশে নারীরা তাই সব সময়ই দোষের দায় নিতেই অভ্যস্ত। সাম্প্রতিক দোষটা এসেছে হামের সংক্রমণ উপলক্ষে। একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বলেছেন, এখনকার মায়েরা নাকি ফিটনেস ধরে রাখতে সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ান না! হ্যাঁ, প্রকাশ্যেই বলা হয়েছে এমন কথা। সংবাদ সম্মেলনে এমনটা বলেছেন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের।
দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার ফেসবুক পেজে এই বক্তব্যের একটি ভিডিও’ও পাওয়া যায়। তাতে জাবের বলেছেন, “সব থেকে ভয়াবহ ব্যাপার যেটা, আমাদের মায়েরা তাদের ফিটনেস ধরে রাখবার জন্য তারা সন্তানদের বুকের দুধ পান করান না। একটা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ৫৫% মা… তার এই যে পাশ্চাত্য যে সংস্কৃতি…এই অপসংস্কৃতি, যে তার সন্তানকে দুধ খাওয়ালে তার ফিটনেস নষ্ট হয়ে যাবে। এই কারণে ৫৫% মা তার সন্তানকে দুধ খাওয়ায় না।”
অবশ্য এ বিষয়ে পরে জাবের আরেক ফেসবুক স্ট্যাটাসে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, ক্ষমাও চেয়েছেন। কিন্তু এরই মধ্যে যেটি হয়েছে, সেটি হলো, শিশুদের মধ্যে হাম সংক্রমণ প্রকট আকার ধারণ করার এমন একটি ব্যাখ্যা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে, যেটি শুধু ভুলই না, বরং এক ধরনের দোষ উৎপাদনকারীও বটে। এটি এমনই এক দোষ, যা একটি নির্দিষ্ট লিঙ্গের বিশাল জনগোষ্ঠীকে সরাসরি শিশুদের মৃত্যুর কারণের কাতারে ঠেলে দিয়েছে।
জাবের এখন ভুল স্বীকার করে নিচ্ছেন। যেকোনো ভুল স্বীকার করে নেওয়াটা সব সময়ই সাধুবাদের যোগ্য। কিন্তু এর আগেই যে ক্ষতিটা হয়ে গেল, তার কী হবে? বাংলাদেশের মতো একটি দেশে ও এর সমাজে নারীদের যতটা প্রান্তিক অবস্থায় রাখা হয়, সেখানে এমন একটি মন্তব্য অনেকটা খাদের কিনারে দাঁড়ানো কাউকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার মতো। অথচ তেমনই একটি ঘটনা অবলীলায় ঘটে গেল। তাও আবার কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মাধ্যমেই, যাদের কাজই হলো একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশে রাজনীতির মাধ্যমে জনগণের উন্নতি ঘটানো। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের দায়িত্বশীল হওয়াটা অত্যন্ত জরুরি, সাথে জানাশোনাটাও। কিন্তু হলো তার উল্টোটা।
কেন এভাবে সব নারীদের উদ্দেশ্য করে এমনটা বলে দেওয়া হলো? মানে, কেন মনে হলো যে, এমন একটি সংবেদনশীল তথ্য পরীক্ষা করার প্রয়োজন নেই? কেন মনে হলো যে, বলে দেওয়াই যায়?
কারণ আমাদের দেশে নারীদের যা খুশি, তা-ই বলে দেওয়ার একটা সংস্কৃতিতে পুরুষেরা মজে গেছে দারুণভাবে। বিচারহীনতার ঐতিহ্য এক্ষেত্রে তাদের সাহায্যও করেছে বেশ। তাই এমন একটি ধারণা সমাজে আছে যে, নারীদের যা খুশি বলাই যায়! সাম্প্রতিক সময়ে নারীদের নিয়ে যেসব অনলাইন হেট ক্যাম্পেইন আমরা কিছুদিন পর পরই চলতে দেখি, সেসব দিয়েই এটি স্পষ্ট।
এ কারণেই এ দেশে ধর্ষণচেষ্টার প্রতিবাদেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের রাস্তায় নামতে হয়, আন্দোলন করতে হয়। এই যেমন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েই এমনটা চলছে এখন। গত ১২ মে রাতে ক্যাম্পাসে এক নারী শিক্ষার্থীর ওপর বহিরাগত ব্যক্তির ধর্ষণচেষ্টা ও প্রাণনাশের চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে। ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় আসামিকে গ্রেপ্তার করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত ও প্রশাসনের জবাবদিহির জন্য শিক্ষার্থীরা অবরোধ কর্মসূচি করেছে, প্রক্টর কার্যালয়ে তালা দিয়েছে। এমন একটি আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষার্থীদের একই পক্ষে থাকার কথা। কিন্তু দেখা যাচ্ছে বাদানুবাদ, উত্তেজনা। কেমন যেন একটা পক্ষ-বিপক্ষ। কেন হয় এটা? ভিকটিম নারী বলেই কি?

যদি এই দেশটায় নারীর বিরুদ্ধে অপরাধের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক সাজা নিশ্চিত হতো সব সময়, তাহলে এসব প্রশ্ন উঠত না। আন্দোলন করারও কারণ থাকে কিন্তু। যদিও নারীর প্রতি অপরাধের কমতি নেই। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বলছে, ২০২৬ সালের প্রথম ৪ মাসে মোট ১৮০ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছে। জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বখাটেদের মাধ্যমে যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেছে ৩৪টি। আবার বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২০২৫ সালে ২ হাজার ৮০৮ জন নারী ও কন্যা নির্যাতনের শিকার হয়েছে। গত বছর মোট ৭৮৬ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ৫৪৩ জন কন্যা ও ২৪৩ জন নারী।
অন্যদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুসারে, গত এক বছরে দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলার সংখ্যা ২৫ শতাংশ বেড়েছে। এ সময়ে ধর্ষণের মামলা বেড়েছে ২৭ শতাংশের বেশি। গত বছর নারী নির্যাতনের যত মামলা হয়েছে, প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ধর্ষণের অভিযোগের।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগে সারা দেশে মামলা হয়েছে ২১ হাজার ৯৩৯টি। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় ৯টি অভিযোগে মামলা করা যায়। সেগুলো হলো ধর্ষণ ও ধর্ষণের কারণে মৃত্যু, বিয়ের প্রলোভনে যৌন সম্পর্ক স্থাপন, যৌন পীড়ন, যৌতুক, আত্মহত্যায় প্ররোচনা, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, ভিক্ষাবৃত্তির উদ্দেশ্যে শিশুর অঙ্গহানি, দহনকারী পদার্থ দিয়ে সংঘটিত অপরাধ।
আর উচ্চ আদালতের তথ্য অনুসারে, গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশের ৯৯টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ১ লাখ ৩২ হাজার ১০৭টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে ৫ বছরের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৩০ হাজার ৩৬৫টি। ঢাকার ৯টি ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, ১১ হাজার ৫৬৭টি। ৫ বছরের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন ৩ হাজার ৯১টি মামলা।
সুতরাং, বোঝাই যাচ্ছে যে, নারীর বিরুদ্ধে অপরাধের বিচার কতটা দ্রুত গতিতে ঘটছে! আর এমন পরিস্থিতিতেই আরও অপরাধের সুযোগ তৈরি হয়। এমনটাই স্বাভাবিক। কারণ যদি অপরাধীরা বুঝে যায় যে, এমন অপরাধে পার পাওয়া যায়, তবে তা বারবার করবে না কেন?
সুতরাং, নারীদের ক্ষেত্রে একটি ক্রমাবনতিমূলক পরিবেশ আমরা দেখতে পাচ্ছি। বিষয়টি এমন নয় যে, হুট করে হয়েছে। কিন্তু সেক্ষেত্রে প্রতিরোধের ও প্রতিকারের কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?
হ্যাঁ, আলোচিত ঘটনা ঘটলে সরকারের পক্ষ থেকে লম্বা‑চওড়া কথা শোনা যায়। নানা আগডুম‑বাগডুম পদক্ষেপ নেওয়ার বাণী আসে। কিন্তু ক’দিন পর আবার যে কে সেই! এই দেশে যেকোনো সরকারই কেন জানি পরিস্থিতি সামলানোর এই সস্তা ফরমুলাটি শিখে ফেলে অবিশ্বাস্য দ্রুততায়। এরপর চলে প্রয়োগ। অপেক্ষা তখন কেবল কোনোমতে জনক্ষোভ প্রশমিত হওয়ার। তারপর আবার সব চলতে থাকে আগেরই পন্থায়। এমন অবস্থায় কর্তৃপক্ষীয় আশ্বাসে মানুষ ভরসা রাখবে কী করে?
নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে তাই মেনে নিতেই হয় যে, আমাদের দেশে এমন ঘৃণ্য অপরাধের বিরুদ্ধে থাকা সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিই আসলে সমস্যাযুক্ত। এসব সমস্যা একদিনে গড়ে ওঠেনি। পুরোপুরি দূর করতেও সময় লাগবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু শুরুর চেষ্টা অন্তত থাকা দরকার। অথচ নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষীয় জায়গা থেকে কিছু মৌখিক কঠোরতা ছাড়া অন্য কিছু সেভাবে মিলছে কি? বা আমাদের সমাজও কি নারীকে সর্বপ্রকারের দোষে দোষী করা ছাড়া আর কোনো কিছুতে আগ্রহী? হাবেভাবে মনে তো হয় না!

আমাদের এই বাংলাদেশে আদতে নারীদের যতটা বিমানবিকীকরণ করার চেষ্টা দেখা যায়, যতটা খেলো করার প্রচেষ্টা চলে, সেসবের ফিরিস্তি দিতে গেলে লাখ লাখ দিস্তা কাগজের প্রয়োজন হবে। কতটা খেলো, সেটি এই লেখার শুরুতে থাকা মন্তব্যগুলো আরেকবার পড়লেই বোঝা যাবে নিশ্চয়ই। এসবের মধ্য দিয়ে আদতে একটি প্রকট পিতৃতান্ত্রিক চেহারা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, যেখানে নারীকে মানুষ হিসেবেই দেখা হয় না আর।
ঠিক এমন পরিস্থিতিতেই ‘যত দোষ, নন্দ ঘোষ’-এর মতো করে দেশ, সমাজের তাবৎ সমস্যার দায় নারীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। তাই ধর্ষণ থেকে শুরু করে হামের সংক্রমণ, সবেতেই দোষী বানিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলে নারীকেই। কারণ ধরেই নেওয়া হয়েছে যে–নারীদের দোষ দিলেও দোষের কিছু নেই!
তা এই দেশটা কি তবে কেবলই নারীদের ভিলেন বানানোর কারখানাই হয়ে উঠবে? এমন প্রশ্নের উত্তর নিয়ে আমরা যত বেশি ভাবব, ততই মঙ্গল।
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা