প্রথম ও জরুরি প্রশ্ন হলো–একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষদ প্রথম থেকেই যে আয়োজন করছে, তার নাম এখন এসে কী হবে–সে সিদ্ধান্ত কেন সরকার নেবে বা সরকারকে নিতে হবে? এ বিষয়ে সরকারকে কেন এত বড় খবরদারি করতে হবে?
জোবাইদা নাসরীন

বাংলা নববর্ষকে বরণ; অর্থাৎ, পয়লা বৈশাখ উদ্যাপনকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের উদ্যাগে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র নামকরণ নিয়ে ২০২৫ থেকেই মূলত বড় ধরনের রাজনৈতিক বাহাস তৈরি হয়। বলাই বাহুল্য এর মূলে খুব শক্তিশালীভাবে কাজ করছে মতাদর্শিক লড়াই। বলে রাখা প্রয়োজন যে, ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর ইউনেসকো বৈশাখ বরণকে ঘিরে এই ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’কে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত করে। এবং এই কারণে এই মঙ্গল শোভাযাত্রার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আরও ব্যাপকতা লাভ করে। তবে ২০২৫ সালে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নাম নিয়ে শুরু হয় তর্ক-বিতর্ক। এই প্রথম এই শোভাযাত্রার নাম, আয়োজন, পরিকল্পনাতে বড় ধরনের সরকারি হস্তক্ষেপ আসে। যদিও সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছিল যে, এর মূল নাম ছিল ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’, তাই মঙ্গল বাদ দিয়ে সেটিকে তার আগের নামেই ফিরিয়ে আনা হলো।
এখন যখন বিতর্কটি ‘মঙ্গল’, আর ‘আনন্দে’তে এসে ঠেকেছে, তখন এবার এই দুটোই বাদ দিয়ে বর্ষবরণের শোভাযাত্রা ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামে অনুষ্ঠিত হবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে সরকার যাই বলুক না কেন, এ কথা বুঝতে কারোই সম্ভবত বাকি নেই যে, ‘মঙ্গল’ শব্দটিকে বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ইসলামি দলগুলোর বড় ধরনের চাপ ছিল এবং এই চাপ তারা দীর্ঘদিন ধরেই দিয়ে আসছিল। এবং এখানে আরও বলে রাখা প্রয়োজন যে, শুধু মঙ্গল শোভাযাত্রা নয়, বৈশাখ উদ্যাপন থেকে শুরু করে অনেক কিছুর ক্ষেত্রেই তাদের বিরোধিতা ছিল এবং এখনো তা জারি আছে।
আমরা জেনে গেছি এই বছর ‘আনন্দ’ও বাদ হয়েছে। রোববার সচিবালয়ে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, “এবার থেকে সরকারি সিদ্ধান্ত হচ্ছে–আমরা এটাকে ‘আনন্দ শোভাযাত্রাও বলব না, মঙ্গল শোভাযাত্রাও বলব না।” প্রশ্ন হলো–এই বিষয়ে সরকার কেন সিদ্ধান্ত নেবে? গত বছরও এই প্রশ্ন করা হয়েছিল।
নিতাই রায় চৌধুরী নিশ্চয়ই জানেন, ১৯৮৯ সালেই এটি প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ আয়োজন করে এবং সে বছর সেটি ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ হিসেবেই ছিল। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর এই শোভাযাত্রাটি আর নিছক শোভাযাত্রা হিসেবে থাকেনি। এটি হয়ে ওঠে একাধারে বাংলাদেশের বিভিন্ন ঐত্রিহ্য ও উৎসবের প্রতীক। অন্যদিকে এটিকে হাজির করা হয় সকল অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ কিংবা মঙ্গলের প্রতীক হিসেবে। উৎসবের পাশাপাশি এটি প্রতীকী সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ হিসেবে এত দিন ধরে গ্রহণযোগ্যভাবেই চর্চিত হয়ে আসছিল। এ পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯০ সালের পর আয়োজকরা এর নাম দেন মঙ্গল শোাভাযাত্রা এবং এই নামেই এটি দেশ-বিদেশে স্বীকৃতি পায়।
এত দিন ধরে এটি চারুকলা অনুষদের আয়োজন ছিল। আমরা বেশ কয়েক দিন আগ থেকেই চারুকলায় গিয়ে দিনে-রাতে শিল্পীদের পরিশ্রম দেখতাম, তাদের কাজ দেখতাম। সে দেখারও আনন্দ ছিল। এটি একেবারেই চারুকলার আয়োজন। চারুকলার সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরাই এই আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। এখন প্রথম ও জরুরি প্রশ্ন হলো–একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষদ প্রথম থেকেই যে আয়োজন করছে, তার নাম এখন এসে কী হবে–সে সিদ্ধান্ত কেন সরকার নেবে বা সরকারকে নিতে হবে? এ বিষয়ে সরকারকে কেন এত বড় খবরদারি করতে হবে? এই নাম নিয়ে গত সরকার এবং এই সরকারের এত মাথাব্যথা কেন? এটি কী কোনো সরকারি কর্মসূচি? নাকি সরকার দলীয় বা অঙ্গসংগঠনের কর্মসূচি? তাছাড়া চারুকলা অনুষদ কি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অংশ, যে তাতে সংস্কৃতিমন্ত্রীর মতামতের প্রয়োজন হবে? এই বিষয়ে সকল সিদ্ধান্ত চারুকলা অনুষদ নেবে এবং চারুকলা অনুষদ যেহেতু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষদ, সেই বিবেচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখানে মত দিতে পারে। সরকার চাইলে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় নিজেদের উদ্যোগে ভিন্নভাবে পয়লা বৈশাখ উদ্যাপনের কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুদিন থেকে চলে আসা আয়োজনে মাতবরের ভূমিকা নিতে পারে না। সরকার বলতে পারে–এতে তো মানা নেই। কিন্তু সরকার যে মাতবর এবং তার কতৃর্ত্ব সব জায়গায় দেখাতে চায়–সেটি এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় এবং এগুলো জনমনে বিরুক্তি তৈরি করে।
সরকারের কাছে আমাদের আকাঙ্ক্ষা কী? এই ধরনের আয়োজন যেন নিরাপদে উদ্যাপন করা যায়, সেটি নিশ্চিত করাই কাম্য। পাশাপাশি আকাঙ্ক্ষা থাকে–খবরদারির বিপরীতে এ ধরনের আয়োজনে যে ধরনের সহায়তা প্রয়োজন, সেটি করা। কিন্তু গত বছর থেকে এপ্রিল মাসের শুরু থেকেই উৎসবে আয়োজনের আনন্দের পরিবর্তে শুরু হয় নামকরণ নিয়ে আলোচনা এবং তর্ক-বিতর্ক। সংস্কৃতিমন্ত্রী প্রথমেই বলেছেন–মঙ্গল আর আনন্দে কোনো পার্থক্য নেই; কেন আগের অন্তবর্তী সরকার ‘মঙ্গল’ বাদ দিলেন? তাহলে মন্ত্রীর কাছেই জানতে চাই, মঙ্গলে যদি সমস্যা না থাকে, তাহলে আপনি কিংবা আপনার সরকার কেন বাদ দিলেন? সেটার ব্যাখ্যাও তো দিতে হবে। কিংবা কী এখতিয়ারে বাদ দিলেন, সেটাও খোলাসা করতে হবে।

চারুকলা প্রসঙ্গও আসে। এই আয়োজন চারুকলার। কিন্তু গত বছর থেকে দেখছি, চারুকলার ডিন সরকারের সঙ্গে বসেই একের একের পর সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, কিংবা সরকারি সিদ্ধান্ত মেনে নিচ্ছেন। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষদের আয়োজনে কেন সরকারের কাছে নতি স্বীকার করতে হচ্ছে? এই হওয়াটা কিন্তু হঠাৎ করে নয়। বরং আমরা গত তিরিশ বছরের রাজনীতিতে দেখেছি, ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে জড়িত শিক্ষকরা নিজেদের অবস্থান বিসর্জন দিয়ে ক্ষমতাসীনদের সেবাদাসে পরিণত হয়েছেন। এ কারণে সায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান হয়েও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড সরকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়েছে এবং সে অর্থে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্রমশ সংকুচিত হয়েছে।
আমরা যে বিষয়ে মনোযোগ হারাচ্ছি, তা হলো–এটি একটি উৎসব। সেই উৎসব নিয়ে যদি এই ধরনের রাজনৈতিক খবরদারি চলতে থাকে, তাহলে সেটি তো আর মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উৎসব থাকে না। সরকার যখন উৎসবের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়, তখন সে উৎসব আয়োজনে ও এতে অংশগ্রহণে মানুষ অনেকটাই ভীত থাকে, তার ভেতরে দোনোমনা ভাব তৈরি হয়। সেটি তখন আর সবার উৎসব হয়ে ওঠে না। তবে এও সত্য যে, শ্রেণিবিভক্ত এই সমাজে উৎসবের রং সবার জন্য এক হয় না। ঢাকা শহরের মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্তের বৈশাখ, আর দরিদ্রের বৈশাখ কোনোভাবেই এক হয় না, হবে না।
এত কিছুর পরও এই আয়োজন নিয়ে সরকারি হস্তক্ষেপ শুধু প্রশ্নবিদ্ধই নয়, বরং ভীতিরও কারণ। তাই বৈশাখের আয়োজনও ক্রমেই হয়ে পড়ছে আনুষ্ঠানিকতা সর্বস্ব।
লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলা নববর্ষকে বরণ; অর্থাৎ, পয়লা বৈশাখ উদ্যাপনকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের উদ্যাগে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র নামকরণ নিয়ে ২০২৫ থেকেই মূলত বড় ধরনের রাজনৈতিক বাহাস তৈরি হয়। বলাই বাহুল্য এর মূলে খুব শক্তিশালীভাবে কাজ করছে মতাদর্শিক লড়াই। বলে রাখা প্রয়োজন যে, ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর ইউনেসকো বৈশাখ বরণকে ঘিরে এই ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’কে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত করে। এবং এই কারণে এই মঙ্গল শোভাযাত্রার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আরও ব্যাপকতা লাভ করে। তবে ২০২৫ সালে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নাম নিয়ে শুরু হয় তর্ক-বিতর্ক। এই প্রথম এই শোভাযাত্রার নাম, আয়োজন, পরিকল্পনাতে বড় ধরনের সরকারি হস্তক্ষেপ আসে। যদিও সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছিল যে, এর মূল নাম ছিল ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’, তাই মঙ্গল বাদ দিয়ে সেটিকে তার আগের নামেই ফিরিয়ে আনা হলো।
এখন যখন বিতর্কটি ‘মঙ্গল’, আর ‘আনন্দে’তে এসে ঠেকেছে, তখন এবার এই দুটোই বাদ দিয়ে বর্ষবরণের শোভাযাত্রা ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামে অনুষ্ঠিত হবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে সরকার যাই বলুক না কেন, এ কথা বুঝতে কারোই সম্ভবত বাকি নেই যে, ‘মঙ্গল’ শব্দটিকে বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ইসলামি দলগুলোর বড় ধরনের চাপ ছিল এবং এই চাপ তারা দীর্ঘদিন ধরেই দিয়ে আসছিল। এবং এখানে আরও বলে রাখা প্রয়োজন যে, শুধু মঙ্গল শোভাযাত্রা নয়, বৈশাখ উদ্যাপন থেকে শুরু করে অনেক কিছুর ক্ষেত্রেই তাদের বিরোধিতা ছিল এবং এখনো তা জারি আছে।
আমরা জেনে গেছি এই বছর ‘আনন্দ’ও বাদ হয়েছে। রোববার সচিবালয়ে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, “এবার থেকে সরকারি সিদ্ধান্ত হচ্ছে–আমরা এটাকে ‘আনন্দ শোভাযাত্রাও বলব না, মঙ্গল শোভাযাত্রাও বলব না।” প্রশ্ন হলো–এই বিষয়ে সরকার কেন সিদ্ধান্ত নেবে? গত বছরও এই প্রশ্ন করা হয়েছিল।
নিতাই রায় চৌধুরী নিশ্চয়ই জানেন, ১৯৮৯ সালেই এটি প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ আয়োজন করে এবং সে বছর সেটি ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ হিসেবেই ছিল। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর এই শোভাযাত্রাটি আর নিছক শোভাযাত্রা হিসেবে থাকেনি। এটি হয়ে ওঠে একাধারে বাংলাদেশের বিভিন্ন ঐত্রিহ্য ও উৎসবের প্রতীক। অন্যদিকে এটিকে হাজির করা হয় সকল অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ কিংবা মঙ্গলের প্রতীক হিসেবে। উৎসবের পাশাপাশি এটি প্রতীকী সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ হিসেবে এত দিন ধরে গ্রহণযোগ্যভাবেই চর্চিত হয়ে আসছিল। এ পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯০ সালের পর আয়োজকরা এর নাম দেন মঙ্গল শোাভাযাত্রা এবং এই নামেই এটি দেশ-বিদেশে স্বীকৃতি পায়।
এত দিন ধরে এটি চারুকলা অনুষদের আয়োজন ছিল। আমরা বেশ কয়েক দিন আগ থেকেই চারুকলায় গিয়ে দিনে-রাতে শিল্পীদের পরিশ্রম দেখতাম, তাদের কাজ দেখতাম। সে দেখারও আনন্দ ছিল। এটি একেবারেই চারুকলার আয়োজন। চারুকলার সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরাই এই আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। এখন প্রথম ও জরুরি প্রশ্ন হলো–একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষদ প্রথম থেকেই যে আয়োজন করছে, তার নাম এখন এসে কী হবে–সে সিদ্ধান্ত কেন সরকার নেবে বা সরকারকে নিতে হবে? এ বিষয়ে সরকারকে কেন এত বড় খবরদারি করতে হবে? এই নাম নিয়ে গত সরকার এবং এই সরকারের এত মাথাব্যথা কেন? এটি কী কোনো সরকারি কর্মসূচি? নাকি সরকার দলীয় বা অঙ্গসংগঠনের কর্মসূচি? তাছাড়া চারুকলা অনুষদ কি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অংশ, যে তাতে সংস্কৃতিমন্ত্রীর মতামতের প্রয়োজন হবে? এই বিষয়ে সকল সিদ্ধান্ত চারুকলা অনুষদ নেবে এবং চারুকলা অনুষদ যেহেতু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষদ, সেই বিবেচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখানে মত দিতে পারে। সরকার চাইলে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় নিজেদের উদ্যোগে ভিন্নভাবে পয়লা বৈশাখ উদ্যাপনের কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুদিন থেকে চলে আসা আয়োজনে মাতবরের ভূমিকা নিতে পারে না। সরকার বলতে পারে–এতে তো মানা নেই। কিন্তু সরকার যে মাতবর এবং তার কতৃর্ত্ব সব জায়গায় দেখাতে চায়–সেটি এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় এবং এগুলো জনমনে বিরুক্তি তৈরি করে।
সরকারের কাছে আমাদের আকাঙ্ক্ষা কী? এই ধরনের আয়োজন যেন নিরাপদে উদ্যাপন করা যায়, সেটি নিশ্চিত করাই কাম্য। পাশাপাশি আকাঙ্ক্ষা থাকে–খবরদারির বিপরীতে এ ধরনের আয়োজনে যে ধরনের সহায়তা প্রয়োজন, সেটি করা। কিন্তু গত বছর থেকে এপ্রিল মাসের শুরু থেকেই উৎসবে আয়োজনের আনন্দের পরিবর্তে শুরু হয় নামকরণ নিয়ে আলোচনা এবং তর্ক-বিতর্ক। সংস্কৃতিমন্ত্রী প্রথমেই বলেছেন–মঙ্গল আর আনন্দে কোনো পার্থক্য নেই; কেন আগের অন্তবর্তী সরকার ‘মঙ্গল’ বাদ দিলেন? তাহলে মন্ত্রীর কাছেই জানতে চাই, মঙ্গলে যদি সমস্যা না থাকে, তাহলে আপনি কিংবা আপনার সরকার কেন বাদ দিলেন? সেটার ব্যাখ্যাও তো দিতে হবে। কিংবা কী এখতিয়ারে বাদ দিলেন, সেটাও খোলাসা করতে হবে।

চারুকলা প্রসঙ্গও আসে। এই আয়োজন চারুকলার। কিন্তু গত বছর থেকে দেখছি, চারুকলার ডিন সরকারের সঙ্গে বসেই একের একের পর সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, কিংবা সরকারি সিদ্ধান্ত মেনে নিচ্ছেন। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষদের আয়োজনে কেন সরকারের কাছে নতি স্বীকার করতে হচ্ছে? এই হওয়াটা কিন্তু হঠাৎ করে নয়। বরং আমরা গত তিরিশ বছরের রাজনীতিতে দেখেছি, ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে জড়িত শিক্ষকরা নিজেদের অবস্থান বিসর্জন দিয়ে ক্ষমতাসীনদের সেবাদাসে পরিণত হয়েছেন। এ কারণে সায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান হয়েও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড সরকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়েছে এবং সে অর্থে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্রমশ সংকুচিত হয়েছে।
আমরা যে বিষয়ে মনোযোগ হারাচ্ছি, তা হলো–এটি একটি উৎসব। সেই উৎসব নিয়ে যদি এই ধরনের রাজনৈতিক খবরদারি চলতে থাকে, তাহলে সেটি তো আর মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উৎসব থাকে না। সরকার যখন উৎসবের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়, তখন সে উৎসব আয়োজনে ও এতে অংশগ্রহণে মানুষ অনেকটাই ভীত থাকে, তার ভেতরে দোনোমনা ভাব তৈরি হয়। সেটি তখন আর সবার উৎসব হয়ে ওঠে না। তবে এও সত্য যে, শ্রেণিবিভক্ত এই সমাজে উৎসবের রং সবার জন্য এক হয় না। ঢাকা শহরের মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্তের বৈশাখ, আর দরিদ্রের বৈশাখ কোনোভাবেই এক হয় না, হবে না।
এত কিছুর পরও এই আয়োজন নিয়ে সরকারি হস্তক্ষেপ শুধু প্রশ্নবিদ্ধই নয়, বরং ভীতিরও কারণ। তাই বৈশাখের আয়োজনও ক্রমেই হয়ে পড়ছে আনুষ্ঠানিকতা সর্বস্ব।
লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়