যে সরকার জনপ্রিয়তা বোঝে, জননিরাপত্তা বোঝে না!

যে সরকার জনপ্রিয়তা বোঝে, জননিরাপত্তা বোঝে না!
প্রতীকী ছবি

‘ভালো’

‘এখন ভালো’

‘এখন যথেষ্ট ভালো’

এগুলোই হলো সরকারি বয়ানে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্যবহার করা বিশেষণাবলী। গত প্রায় দেড় বছর ধরেই কখনো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা উপদেষ্টা, কখনো প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিবেরা বা কখনো অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা উপদেষ্টারা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে এমন বিশেষণ ব্যবহার করে আসছেন। তবে ব্যবহারিক দিক থেকে এসব বিশেষণের সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন। অন্তত আমজনতার জন্য তো অবশ্যই।

জননিরাপত্তা বা সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণের উদ্বেগ দীর্ঘদিন ধরেই জারি আছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাস থেকেই এমন উদ্বেগের শুরু। দিন দিন তা গাঢ় বৈ হালকা হয়নি। কিছুদিন পরপরই নিত্যনতুন সংকট এসে হাজির হয়েছে। কখনো চুরি-ডাকাতি আতঙ্ক ছড়িয়েছে, কখনো খুন, আবার কখনো আমরা প্রকাশ্যে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করেছি। এর বাইরে ‘মব’ তো ছিল রাজার হালেই!

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। ছবি: বাসস
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। ছবি: বাসস

ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তাহীন থাকাটা বেশ কঠিনই। সাধারণ নাগরিকের তাই সার্বক্ষণিক সঙ্গী হলো–ভয়। এই ভয় নিজের পকেটের সর্বস্ব খোয়ানোর। বাড়ি খালি হওয়ার ভয়ও আছে। আর সবার ওপরে আছে বেঘোরে জান হারানোর শঙ্কা। যদিও সবকিছুর বিপরীতে সরকারি মন্তব্য কম-বেশি ‘ভালো’, ‘এখন ভালো’ বা ‘এখন যথেষ্ট ভালো’র মধ্যেই ওঠানামা করতে দেখা যায়। একেবারে নিরুপায় হলেই হয়তো সরকারি বয়ান কিছুটা মিইয়ে আসে। তবে তখন আবার ‘লজ্জিত’ হয়েই সব দায় এড়িয়ে ফেলা যায়!

কিন্তু আসলেই কি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে ‘ভালো’ কিংবা ‘মোটামুটি ভালো’ বলারও সুযোগ আছে?

কিছু পরিসংখ্যানে চোখ বোলানো যাক। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সারা দেশে চুরির ঘটনায় ৯ হাজার ৬৭২টি, ছিনতাইয়ের ঘটনায় ১ হাজার ৯৩৫টি এবং ডাকাতির ঘটনায় ৭০২টি মামলা হয়েছে। যেখানে ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল বেশ কিছুটা কম। তবে আরও কিছু বছর পিছিয়ে গেলে দেখা যাবে, ২০২৫ সালে আসলে গত ৫ বছরের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই হয়েছে। সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো, ডাকাতি আর ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলার সংখ্যা ২০২১ সালের তুলনায় বেড়ে হয়েছে প্রায় দ্বিগুণ!

এ থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা নাজুক। নাজুকতা বোঝার জন্য এটিও মাথায় রাখতে হবে যে, আমাদের দেশে মামলা করার ইচ্ছা সাধারণের মধ্য কতটুকু। এ বঙ্গে একটি প্রচলিত প্রবাদ হলো–‘বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা, আর পুলিশ ছুঁলে ৩৬’। অর্থাৎ, আমজনতার মনে পুলিশি হয়রানির ভয় ভালোভাবেই আছে। সুতরাং, একেবারে বিপদে না পড়লে এ দেশে অনেকেই নানা অপরাধের আইনি প্রতিকার পাওয়ার জন্য মামলা, মোকদ্দমায় ফাঁসতে চায় না। এটিই এ দেশের সামাজিক চিত্র। বাঘের চেয়েও ভয় বেশি এখানে পুলিশে।

আর সেই দেশেই ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলার সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে গেছে। একই সঙ্গে বাড়ছে খুনও। ২০২৬ সাল শুরু হয়েছে কেবল। অথচ প্রথম ৭ দিনেই রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে গুলিতে ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছে। খুনের ঘটনা যেমন রাজনৈতিক কারণে ঘটেছে, তেমনি ছিনতাই বা ডাকাতির মতো অপরাধের ঘটনাতেও খুন হয়েছে। এভাবে একের পর এক সহিংস ঘটনায় জনমনে ভয়ের স্থায়িত্ব ও ঘনত্ব বাড়ছে ক্রমশই।

এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। যদিও সরকারের আচরণে এমন চিত্রের ন্যূনতম প্রতিফলন দেখা যায় না খুব একটা। কর্তৃপক্ষকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করলে শুনতে হয় পেঁয়াজের দাম বিষয়ক ‘জ্ঞান’। হ্যাঁ, পেঁয়াজের দাম বেশি বেড়ে গেলে জনগণের কষ্ট হয় বটে। তবে সেটির চেয়ে তো জানমালের নিরাপত্তা বেশি জরুরি। জানই যদি না থাকে, পেঁয়াজ কিনে আর কী হবে?

নতুন বছরের প্রথম ৭ দিনেই রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে গুলিতে ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছে। ছবি: চরচা
নতুন বছরের প্রথম ৭ দিনেই রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে গুলিতে ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছে। ছবি: চরচা

অথচ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বদলে যদি কোনো জনতুষ্টিবাদী চটকদার ইস্যু এই সরকারের সামনে চলে আসে, যাতে শুধু বাগাড়ম্বর বা তর্জন-গর্জনে ফেসবুকে বেশ আলোচনা তোলা যাবে, তাহলেই দেখা যায় বর্তমান সরকারের অন্য রূপ। তখন এতটাই সক্রিয়তা পরিলক্ষিত হয় যে, মনে হয় দেশ একেবারে উল্টে গিয়ে পাল্টে যাবে! এই যেমন ইলিশ দেশের বাইরে যাবে কিনা, খেলার সাথে রাজনীতি মিশবে কিনা, ড্রোন ওড়ানো ভালো নাকি খারাপ কিংবা স্কাই বা স্কুবা ডাইভ করে বিশ্বরেকর্ড ইত্যাদি ইত্যাদি। হয়তো এসব ইস্যুও দেশ পরিচালনার জন্য ক্ষেত্রবিশেষে গুরুত্বপূর্ণ, তবে নিশ্চয়ই মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো এতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু তার পরও সরকারি গুরুত্ব বেশি পায় সেগুলোই। তাতেই মাথার দিব্যি মেলে। কারণ, ওতেই যে আসে ঢের লাইক-শেয়ার-কমেন্ট।

অর্থাৎ, বর্তমান সরকারের ‘জনপ্রিয়’ হওয়ার ঝোঁক রয়েছে। এটি ভালো। এতে বোঝা যায় যে, এই সরকারের জনগণের সরকার হওয়ার ইচ্ছাটুকু কিছুটা হলেও আছে। অবশ্য জনতার কাছে বেশি জনপ্রিয় হতে চাইলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করাটাই সবচেয়ে জরুরি। এতে উন্নতি হলে জনপ্রিয়তা যে আকাশ ছোঁবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এ ক্ষেত্রে কিছু উল্লেখযোগ্য কর্মকাণ্ড ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যেতে হবে। আর তাতেই আছে ঘাটতি।

মোদ্দা কথা হলো, সাধারণ আমজনতার মনে থাকা আস্থার সংকট দূর করতে হবে। জনতাকে নিরাপদ বোধ করাতে হবে। সেই কাজটি কখনো তর্জন-গর্জনে হবে না। ফেসবুকে একের পর এক স্ট্যাটাস দিয়েও হবে না। এমনকি নিজেকে অটোসাজেশন দেওয়ার মতো বারবার পরিস্থিতি ‘ভালো’, ‘এখন ভালো’ বা ‘এখন যথেষ্ট ভালো’ মুখস্ত বুলি আওড়েও কোনো লাভ নেই। বরং তাতে বাস্তবতা অস্বীকার করার মতো বাতুলতা ভিন্ন কিছু চিত্রায়িত হবে না।

সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করতে না পারলে বা করার চেষ্টাও না চালালে কিছুদিন পর হয়তো এ দেশের মানুষ গণহারে আক্রান্ত হতে পারে থানাটোফোবিয়া’তে। এটি এমন এক ফোবিয়া, যাতে মানুষ শুধু মৃত্যুভয় পায়। এই অবস্থার অন্য নাম ‘ডেথ অ্যাংজাইটি’। এমতাবস্থায় আক্রান্তদের মনকে আঁকড়ে ধরে মৃত্যুর প্রক্রিয়া নিয়ে দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ। নিজের বা নিজের প্রিয়জনের মৃত্যুর আশঙ্কাতেই মূলত মানুষ তখন মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে। মনে হতে থাকে, এই বুঝি আমার মরণ হলো, এই বুঝি আমার প্রিয় মানুষটা মরে গেল!

দেশ ও সমাজে অনিরাপত্তাবোধ চরমে উঠলে এ ছাড়া আর হবেই বা কী!

লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

সম্পর্কিত