হিলাল ফয়েজী

সৈয়দপুর একটি সমৃদ্ধ প্রান্তর অনেককাল ধরে। না, মহকুমা কিংবা জেলার তকমা পড়ার সৌভাগ্য হয়নি সৈয়দপুরের। ব্রিটিশ শাসকেরা পুরো ভারতবর্ষকে রেল সংযোগ জালে বেঁধে নিয়েছিল ওদের সুক্ষ্ম শোষণ বুদ্ধিতে। সেই জালের সুবাদে সৈয়দপুরে রেলস্টেশন ছাড়াও সেখানে গড়ে উঠেছিল ১৮৭০ সনে এক বৃহৎ পরিসরের রেল ওয়ার্কশপ। এটিকে কেন্দ্র করে সেই থেকে এক মধ্যবিত্ত-শ্রমিক বসতিতে গমগম-ঝলমল সৈয়দপুর।
সৈয়দপুর প্রান্তরের অর্থনীতিতে মাড়োয়ারি সম্প্রদায়ের বিশেষ ভূমিকা কযেকশত বছর আগে থেকেই। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর বিহার থেকে উদ্বাস্তু মুসলমান সম্প্রদায় বিশেষত রেলওয়ে ওয়ার্কশপকে কেন্দ্র করে সৈয়দপুরে বিশাল বসতি গড়ে। পাকিস্তানি শাসকেরা সেই ১৯৪৭ থেকেই উদ্বাস্তু বিহারি মুসলমানদের বসতি দেশের নানাপ্রান্তে পরিকল্পিত ভাবে গড়ে তোলে ভূমিসন্তান বাঙালিদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে। বিহারি উদ্বাস্তু সম্প্রদায় পাকিস্তানি শাসকদের ফাঁদে পা দেয় এবং ভূমিসন্তান বাঙালি হিন্দু-মুসলমানদের সঙ্গে বৈরিতার পরিবেশ গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
এই পটভূমিটুকুর উল্লেখ প্রয়োজন ছিল আজ ১৩ জুন, ২০২৬ এর এই কালেও। সৈয়দপুরে বিহারি উদ্বাস্তু মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল ১৯৭১ সালেও। এখনো। ভূমিসন্তান বাঙালিদের সঙ্গে পরিকল্পিত বৈরিতা সৃষ্টির ফাঁদে পড়েছিল অপরিণামদর্শী বিহারি উদ্বাস্তু সম্প্রদায়। সুতরাং সৈয়দপুর শহরে বলদর্পী দাপট ছিল বিহারি উদ্বাস্তুদের।
একাত্তরে যখন গণরায় -বিধ্বংসী পাকিস্তানি শাসকদের হিংস্র অভিযান শুরু হলো মার্চে, সৈয়দপুর সেনানিবাসের মদদে বিহারি উদ্বাস্তুরাও অপরিণামদর্শী হিংস্রতার প্রকাশে গোটা সৈয়দপুর শহরে বাঙালি গণহত্যা শুরু করে দিল। ঘরে ঘরে বাঙালিদের নিধন -উৎসবের গণহত্যা যেন। সৈয়দপুরের একালের একজন সাংবাদিক বললেন, সৈয়দপুরের নাম 'শহীদ পুর’ হওয়া যৌক্তিক হবে। একাত্তরে ঘরে ঘরে ছিল ভূমিসন্তান বাঙালির লাশ ।
ঢাকায় ২৫ মার্চ '৭১ অপারেশন সার্চলাইটের দু'দিন আগেই সৈয়দপুরে হত্যা এবং সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের পরই সৈয়দপুরের নবনির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য ডা. জিকরুল হকের নেতৃত্বে সৈয়দপুর থানা সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি গঠিত হলে বিহারিদের বড় অংশ ক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং দাঙ্গা বাধানোর অজুহাত খুঁজতে থাকে। ২১ মার্চ আব্দুর রউফ (সংসদ সদস্য) স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা লাগিয়ে জিপে সৈয়দপুর আগমন করলে অবাঙালি তরুণেরা সেই পতাকা ছিঁড়ে ফেলে। তারা আব্দুল রউফকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে। ফলত উত্তেজনা ছড়াতে থাকে ব্যাপকভাবে।
সেনাবাহিনীর মদদপুষ্ট হয়ে ২৩ মার্চ সৈয়দপুরের সর্বত্র প্রজাতন্ত্র দিবসে পাকিস্তানের পতাকা উড়িয়ে দেয় বিহারিরা। সশস্ত্র মিছিল, হিংসাত্মক স্লোগান তুলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে। বাঙালিরাও বসে থাকেনি, প্রবল চেতনা ও উদ্দীপনাবাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে।
সৈয়দপুর শহর ঘিরে থাকা বাঙালিরা জড়ো হয় হাজারে হাজারে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মদদে চলতে থাকে বাঙালি নিধন। রেলওয়ে ওয়ার্কশপের শ্রমিকসহ অগণিত বাঙালি শহীদ হয়। ২৪ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কুখ্যাত মেজর কামরুজ্জামানের নেতৃত্বে বুলেটের আঘাতে বিপুল বাঙালি নিহত হয়। ২৫ মার্চ সকাল থেকেই বিহারিরা সমগ্র সৈয়দপুরে দাঙ্গা-হাঙ্গামা লাগিয়ে দেয়। সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্ট হয় তাদের প্রতিরক্ষাবলয়।
২৫ মার্চ রাতেই গরীবের চিকিৎসক, নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য ডা. জিকরুল হককে সেনাবাহিনী ধরে নিয়ে যায়। আজও তার সন্ধান মেলেনি। তারপর শুরু হলো সৈয়দপুরে বিভীষিকার রাজত্ব। শত বছর ধরে সৈয়দপুরে বাণিজ্যবসতি গড়া মাড়োয়ারি সম্প্রদায়ের ওপর, বাঙালিদের ওপর চলল নির্মম অত্যাচার। তখন সৈয়দপুর বিমানবন্দর নির্মাণের শেষ পর্ব। সেই বিমানবন্দরের রানওয়ে নির্মাণের কাজে শত শত মাড়োয়ারি আর বাঙালিদের দিয়ে চলল গনগনে সূর্যের নিচে নির্মাণ কাজ।রেলওয়ে ওয়ার্কশপে লোহা গলানোর চুল্লিতে অজস্র বাঙালি নিশ্চিহ্ন হয় ।
এদিকে মাড়োয়ারি সম্প্রদায়কে তাকবিন্দু করল পাকিস্তানি সেনা ও বিহারিরা। বিশেষত মাড়োয়ারি পুঁজি লুন্ঠনই ছিল বিহারি গুন্ডাদের লক্ষ্যবস্তু। দেড় শতাধিক মাড়োয়ারিদের সেনানিবাসে ধরে নেওয়া হলো,ওরা আর ফিরে আসেনি। সৈয়দপুর থেকে মাড়োয়ারি সম্প্রদায়কে নিশ্চিহ্ন করতে ওরা পাতল এক বীভৎস ফাঁদ। কুটিল প্রতারণা। জানি না হিটলারের নাৎসী বাহিনী এমন প্রতারণা কৌশল ব্যবহার করত কি না!
১০ জুন, ১৯৭১। সৈয়দপুর শহর ঘুরে রিকশায় মাইকযোগে প্রচার করা হতে থাকল, ১৩ জুন একটি ট্রেন যাবে সৈয়দপুর সীমান্তের চিলাহাটি। সকল মাড়োয়ারীদের ওই ট্রেনে করে ভারতে চলে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
রীতিমত হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতোই। মাড়োয়ারি সম্প্রদায়ের মনে আশা ছিল, ফের সংশয়ও ছিল। ১৩ জুন সকাল ১০টায় চার বগির ট্রেনে ৪৩১ জন মাড়োয়ারি উঠলেন। ট্রেনটি ২ কিলোমিটার এসে থামল গোলাহাট রেলওয়ে ব্রিজে। সবাই চমকে গেল। দেশি অস্ত্র শস্ত্র নিয়ে একদল সশস্ত্র বিহারি, সঙ্গে সশস্ত্র সেনাবাহিনী। দেশি অস্ত্র দিয়ে মস্তক আলাদা করা, কুপিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা— সৃষ্ট হলো এক নারকীয় নৃশংস দৃশ্যপট। আর্তনাদ শত শত অসহায় যাত্রীর। অনেকে পাকিস্তানি সেনাদের কাছে অনুরোধ করল, তোমরা বুলেটে-গুলিতে হত্যা করো, তবু ওই তলোয়ার-চাপাতিতে নয়। সেনারা উত্তর দিল, গাদ্দারদের জন্য মূল্যবান পাকিস্তানি বুলেট নয়। তোমাদের দেশীয় অস্ত্রেই ছিন্ন ভিন্ন করা হবে। প্রায় সব যাত্রী নিহত হলো। কিছু তরুণ গাড়ী থেকে লাফিয়ে দৌড়ে বাঁচল বুলেটবৃষ্টির মধ্যেও। তাদের ক'জন এখনো সেই বিভীষিকার দুঃস্বপ্নের মাঝেও অলৌকিকভাবে বেঁচে আছে।
২০২২ ও ২০২৩ সালে তাদের সাথে সাক্ষাৎ হয়েছে অকুস্থলে। তারা কিছুই চায় না। চায় শুধু শহীদ-স্বীকৃতি। ৫৫ বছরেও বাংলাদেশে শহীদ স্বীকৃতি এখনো মেলেনি গোলাহাট গণহত্যার বিধ্বস্ত মানুষগুলোর।নিহতদের আত্মা এতটুকু স্বীকৃতি কী চাইতে পারে না!

সৈয়দপুর একটি সমৃদ্ধ প্রান্তর অনেককাল ধরে। না, মহকুমা কিংবা জেলার তকমা পড়ার সৌভাগ্য হয়নি সৈয়দপুরের। ব্রিটিশ শাসকেরা পুরো ভারতবর্ষকে রেল সংযোগ জালে বেঁধে নিয়েছিল ওদের সুক্ষ্ম শোষণ বুদ্ধিতে। সেই জালের সুবাদে সৈয়দপুরে রেলস্টেশন ছাড়াও সেখানে গড়ে উঠেছিল ১৮৭০ সনে এক বৃহৎ পরিসরের রেল ওয়ার্কশপ। এটিকে কেন্দ্র করে সেই থেকে এক মধ্যবিত্ত-শ্রমিক বসতিতে গমগম-ঝলমল সৈয়দপুর।
সৈয়দপুর প্রান্তরের অর্থনীতিতে মাড়োয়ারি সম্প্রদায়ের বিশেষ ভূমিকা কযেকশত বছর আগে থেকেই। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর বিহার থেকে উদ্বাস্তু মুসলমান সম্প্রদায় বিশেষত রেলওয়ে ওয়ার্কশপকে কেন্দ্র করে সৈয়দপুরে বিশাল বসতি গড়ে। পাকিস্তানি শাসকেরা সেই ১৯৪৭ থেকেই উদ্বাস্তু বিহারি মুসলমানদের বসতি দেশের নানাপ্রান্তে পরিকল্পিত ভাবে গড়ে তোলে ভূমিসন্তান বাঙালিদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে। বিহারি উদ্বাস্তু সম্প্রদায় পাকিস্তানি শাসকদের ফাঁদে পা দেয় এবং ভূমিসন্তান বাঙালি হিন্দু-মুসলমানদের সঙ্গে বৈরিতার পরিবেশ গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
এই পটভূমিটুকুর উল্লেখ প্রয়োজন ছিল আজ ১৩ জুন, ২০২৬ এর এই কালেও। সৈয়দপুরে বিহারি উদ্বাস্তু মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল ১৯৭১ সালেও। এখনো। ভূমিসন্তান বাঙালিদের সঙ্গে পরিকল্পিত বৈরিতা সৃষ্টির ফাঁদে পড়েছিল অপরিণামদর্শী বিহারি উদ্বাস্তু সম্প্রদায়। সুতরাং সৈয়দপুর শহরে বলদর্পী দাপট ছিল বিহারি উদ্বাস্তুদের।
একাত্তরে যখন গণরায় -বিধ্বংসী পাকিস্তানি শাসকদের হিংস্র অভিযান শুরু হলো মার্চে, সৈয়দপুর সেনানিবাসের মদদে বিহারি উদ্বাস্তুরাও অপরিণামদর্শী হিংস্রতার প্রকাশে গোটা সৈয়দপুর শহরে বাঙালি গণহত্যা শুরু করে দিল। ঘরে ঘরে বাঙালিদের নিধন -উৎসবের গণহত্যা যেন। সৈয়দপুরের একালের একজন সাংবাদিক বললেন, সৈয়দপুরের নাম 'শহীদ পুর’ হওয়া যৌক্তিক হবে। একাত্তরে ঘরে ঘরে ছিল ভূমিসন্তান বাঙালির লাশ ।
ঢাকায় ২৫ মার্চ '৭১ অপারেশন সার্চলাইটের দু'দিন আগেই সৈয়দপুরে হত্যা এবং সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের পরই সৈয়দপুরের নবনির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য ডা. জিকরুল হকের নেতৃত্বে সৈয়দপুর থানা সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি গঠিত হলে বিহারিদের বড় অংশ ক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং দাঙ্গা বাধানোর অজুহাত খুঁজতে থাকে। ২১ মার্চ আব্দুর রউফ (সংসদ সদস্য) স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা লাগিয়ে জিপে সৈয়দপুর আগমন করলে অবাঙালি তরুণেরা সেই পতাকা ছিঁড়ে ফেলে। তারা আব্দুল রউফকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে। ফলত উত্তেজনা ছড়াতে থাকে ব্যাপকভাবে।
সেনাবাহিনীর মদদপুষ্ট হয়ে ২৩ মার্চ সৈয়দপুরের সর্বত্র প্রজাতন্ত্র দিবসে পাকিস্তানের পতাকা উড়িয়ে দেয় বিহারিরা। সশস্ত্র মিছিল, হিংসাত্মক স্লোগান তুলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে। বাঙালিরাও বসে থাকেনি, প্রবল চেতনা ও উদ্দীপনাবাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে।
সৈয়দপুর শহর ঘিরে থাকা বাঙালিরা জড়ো হয় হাজারে হাজারে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মদদে চলতে থাকে বাঙালি নিধন। রেলওয়ে ওয়ার্কশপের শ্রমিকসহ অগণিত বাঙালি শহীদ হয়। ২৪ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কুখ্যাত মেজর কামরুজ্জামানের নেতৃত্বে বুলেটের আঘাতে বিপুল বাঙালি নিহত হয়। ২৫ মার্চ সকাল থেকেই বিহারিরা সমগ্র সৈয়দপুরে দাঙ্গা-হাঙ্গামা লাগিয়ে দেয়। সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্ট হয় তাদের প্রতিরক্ষাবলয়।
২৫ মার্চ রাতেই গরীবের চিকিৎসক, নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য ডা. জিকরুল হককে সেনাবাহিনী ধরে নিয়ে যায়। আজও তার সন্ধান মেলেনি। তারপর শুরু হলো সৈয়দপুরে বিভীষিকার রাজত্ব। শত বছর ধরে সৈয়দপুরে বাণিজ্যবসতি গড়া মাড়োয়ারি সম্প্রদায়ের ওপর, বাঙালিদের ওপর চলল নির্মম অত্যাচার। তখন সৈয়দপুর বিমানবন্দর নির্মাণের শেষ পর্ব। সেই বিমানবন্দরের রানওয়ে নির্মাণের কাজে শত শত মাড়োয়ারি আর বাঙালিদের দিয়ে চলল গনগনে সূর্যের নিচে নির্মাণ কাজ।রেলওয়ে ওয়ার্কশপে লোহা গলানোর চুল্লিতে অজস্র বাঙালি নিশ্চিহ্ন হয় ।
এদিকে মাড়োয়ারি সম্প্রদায়কে তাকবিন্দু করল পাকিস্তানি সেনা ও বিহারিরা। বিশেষত মাড়োয়ারি পুঁজি লুন্ঠনই ছিল বিহারি গুন্ডাদের লক্ষ্যবস্তু। দেড় শতাধিক মাড়োয়ারিদের সেনানিবাসে ধরে নেওয়া হলো,ওরা আর ফিরে আসেনি। সৈয়দপুর থেকে মাড়োয়ারি সম্প্রদায়কে নিশ্চিহ্ন করতে ওরা পাতল এক বীভৎস ফাঁদ। কুটিল প্রতারণা। জানি না হিটলারের নাৎসী বাহিনী এমন প্রতারণা কৌশল ব্যবহার করত কি না!
১০ জুন, ১৯৭১। সৈয়দপুর শহর ঘুরে রিকশায় মাইকযোগে প্রচার করা হতে থাকল, ১৩ জুন একটি ট্রেন যাবে সৈয়দপুর সীমান্তের চিলাহাটি। সকল মাড়োয়ারীদের ওই ট্রেনে করে ভারতে চলে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
রীতিমত হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতোই। মাড়োয়ারি সম্প্রদায়ের মনে আশা ছিল, ফের সংশয়ও ছিল। ১৩ জুন সকাল ১০টায় চার বগির ট্রেনে ৪৩১ জন মাড়োয়ারি উঠলেন। ট্রেনটি ২ কিলোমিটার এসে থামল গোলাহাট রেলওয়ে ব্রিজে। সবাই চমকে গেল। দেশি অস্ত্র শস্ত্র নিয়ে একদল সশস্ত্র বিহারি, সঙ্গে সশস্ত্র সেনাবাহিনী। দেশি অস্ত্র দিয়ে মস্তক আলাদা করা, কুপিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা— সৃষ্ট হলো এক নারকীয় নৃশংস দৃশ্যপট। আর্তনাদ শত শত অসহায় যাত্রীর। অনেকে পাকিস্তানি সেনাদের কাছে অনুরোধ করল, তোমরা বুলেটে-গুলিতে হত্যা করো, তবু ওই তলোয়ার-চাপাতিতে নয়। সেনারা উত্তর দিল, গাদ্দারদের জন্য মূল্যবান পাকিস্তানি বুলেট নয়। তোমাদের দেশীয় অস্ত্রেই ছিন্ন ভিন্ন করা হবে। প্রায় সব যাত্রী নিহত হলো। কিছু তরুণ গাড়ী থেকে লাফিয়ে দৌড়ে বাঁচল বুলেটবৃষ্টির মধ্যেও। তাদের ক'জন এখনো সেই বিভীষিকার দুঃস্বপ্নের মাঝেও অলৌকিকভাবে বেঁচে আছে।
২০২২ ও ২০২৩ সালে তাদের সাথে সাক্ষাৎ হয়েছে অকুস্থলে। তারা কিছুই চায় না। চায় শুধু শহীদ-স্বীকৃতি। ৫৫ বছরেও বাংলাদেশে শহীদ স্বীকৃতি এখনো মেলেনি গোলাহাট গণহত্যার বিধ্বস্ত মানুষগুলোর।নিহতদের আত্মা এতটুকু স্বীকৃতি কী চাইতে পারে না!