Advertisement Banner

রবীন্দ্রনাথ যেখানে ‘ফ্লপ’

রবীন্দ্রনাথ যেখানে ‘ফ্লপ’
নটীর পূজা সিনেমার দৃশ্য। ছবি : নীতীন বসু

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিল্পসাহিত্যের যেখানেই হাত দিয়েছেন সেখানেই ফলেছে সোনা। এক সিনেমা বাদে। সিনেমা বানাতে গিয়ে রীতিমতো অপমানিত হতে হয়েছিল তাকে। ১৯৩২ সালের ২২ মার্চ রবীন্দ্রনাথ পরিচালিত সিনেমাটি মুক্তি পায়। সিনেমা দেখে দর্শক ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। সিনেমা হলে হয়েছিল ভাঙচুর। এমনকি টিকিটের দামও ফেরত চাওয়া হয়েছিল!

চলচ্চিত্র রবীন্দ্রনাথকে বেশ প্রভাবিত করেছিল। নিজের চলচ্চিত্র ভাবনা সম্পর্কে ১৯২৭ সালে পুত্র রথীন্দ্রনাথকে তিনি বলেছেন, ‘সিনেমাতে বিশেষ বিশেষ আখ্যানকে নাচের ভাষায় প্রকাশ করার চেষ্টা করলে কেমন হয়?...সিনেমাতে আছে রূপের সঙ্গে গতি; সেই সুযোগটিকে যথার্থ আর্টে পরিণত করতে গেলে আখ্যানকে নাচে দাঁড় করানো চলে।’

১৯২৯ সালে মুরারি ভাদুড়িকেও একটি চিঠি লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাতে বলেছিলেন, ‘আমার বিশ্বাস ছায়াচিত্রকে অবলম্বন করে যে নতুন কলারূপের আবির্ভাব প্রত্যাশা করা যায় এখনো তা দেখা যায়নি...ছায়াচিত্রের প্রধান জিনিসটা হচ্ছে দৃশ্যের গতিপ্রবাহ। এই চলমান রূপের সৌন্দর্য বা মহিমা এমন করে পরিস্ফুট করা উচিৎ, যা কোনো বাক্যের সাহায্য ব্যতীত আপনাকে সম্পূর্ণ সার্থক করতে পারে।’

চলচ্চিত্রচিন্তা শুধু ব্যক্তই করেননি, চলচ্চিত্র তৈরির কাজে নেমেও পড়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ১৯৩২ সালে ‘ঠাকুর ফিল্ম কোম্পানী’ থেকে মুক্তি পায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পরিচালিত প্রথম ও একমাত্র চলচ্চিত্র ‘নটীর পূজা’। তার বয়স তখন প্রায় ৭০ বছর। কবির সহকারী ছিলেন দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর। সিনেমার চিত্রনাট্য ও সঙ্গীত পরিচালনাও করেছিলেন দিনেন্দ্রনাথ। শব্দ গ্রহণ করেন মুকুল বসু। ক্যামেরার কাজটি করেছিলেন বিশিষ্ট চলচ্চিত্রকার নীতীন বসু, সঙ্গে ছিলেন ইউসুফ মুলাজী। সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন শান্তিনিকেতনের শিক্ষার্থীরা। মোট ৫ দিন শুটিং হয়। শেষের দুদিন পরিচালনার পাশাপাশি কবি সিনেমা সম্পাদনার কাজও করেছেন।

নটীর পূজা ‘অবদানশতক’-এর একটি কাহিনী অবলম্বনে রচনা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। অবদানশতক হলো ১০০ বৌদ্ধ সাধকের কাহিনীর সংস্কৃত সংকলন। গল্পে দেখা যায় রাজার আদেশ অমান্য করে প্রাসাদে বুদ্ধপূজার আয়োজন করায় কেন্দ্রীয় চরিত্র শ্রীমতীকে শাস্তি হিসেবে প্রাণ দিতে হয়। এই কাহিনী নিয়ে রবীন্দ্রনাথ প্রথমে কবিতা লিখেছিলেন—‘পূজারিণী’। পুত্রবধূ প্রতিমা দেবী আবদার করেছিলেন, কবির ৭০তম জন্মবার্ষিকীতে ‘পূজারিণী’র একটি দৃশ্যনাট্য উপস্থাপন করতে চান। তার জন্যই কবিতাটির নাট্যরূপ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, নাম হয়—‘নটীর পূজা’। স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক নারীর আত্মমর্যাদার আলেখ্য এই নাটক।

নটীর পূজা নৃত্যনাট্যটি ১৯২৬ সালে প্রকাশিত হয়। মঞ্চে আসে পরের বছর। নাটকটি দেখে ‘নিউ এম্পায়ার’ থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা বীরেন্দ্রনাথ সরকার রবীন্দ্রনাথকে অনুরোধ করেছিলেন যেন নাটকটিকে সিনেমায় রূপ দেওয়া হয়। আর এভাবেই ‘এনটি স্টুডিও’তে ‘নটীর পূজা’-র শুটিং শুরু হয়। সম্পাদনার পর ফিল্মের দৈর্ঘ্য ছিল ১০ হাজার ৫৭৭ ফুট। ১৯৩২ সালের ১৪ মার্চ ‘চিত্রা’ সিনেমা হলে সিনেমাটি মুক্তি পায়।

সিনেমা বানানোর অভিজ্ঞতা ও কারিগরি জ্ঞান তো কবির ছিল না। অবশ্য অভিনয়ের কিছু অভিজ্ঞতা তার আগে হয়েছিল। তার নাটক ‘তপতী’ অবলম্বনে ‘ব্রিটিশ ডমিনিয়ন ফিল্মস লিমিটেড’ ১৯২৯ সালে চলচ্চিত্র তৈরি করেছিল। কবি তাতে প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। ৮ রিলের ওই ছায়াছবি দিয়েই রূপালি পর্দায় কবির অভিষেক।

যা হোক, স্বীকার করতেই হয়, ‘নটীর পূজা’ নামের নাটকটি সিনেমা হয়ে ওঠেনি। নাটকের মতো করে সিনেমা পরিচালনা করলে কি চলে! সুতরাং তা দর্শকদের একেবারেই পছন্দ হয়নি। কবির কাছের লোকজনই প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘নটীর পূজা’ যে সিনেমা হয়ে উঠছে না—সিনেমার সঙ্গে জড়িত প্রথিতযশা শিল্পী-কলাকুশলীরা কেন কবিকে বললেন না? আসলে কেউ হিমালয়-সমান রবীন্দ্রনাথকে শিল্প সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়ার স্পর্ধা দেখাননি। ১৯৩২ সালের ২২ মার্চ ‘নটীর পূজা’ হলে মুক্তি পেল। মাত্র ১৪ দিন চলেছে। দর্শকদের বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় পরে বন্ধ হয়ে যায় প্রদর্শন।

নটীর পূজা সিনেমা প্রচারের জন্য নন্দলাল বসুর করা পোস্টার ও নীতীন বুসর তোলা সিনেমার একটি দৃশ্য।
নটীর পূজা সিনেমা প্রচারের জন্য নন্দলাল বসুর করা পোস্টার ও নীতীন বুসর তোলা সিনেমার একটি দৃশ্য।

দর্শকদের সেই প্রতিক্রিয়ার একটি চিত্র ফুটিয়ে তুলেছিলেন সাহিত্যিক লীলা মজুমদার। তিনি লিখেছেন, “নিউ থিয়েটার্সের বিশেষ অনুরোধে কবি ‘নটীর পূজা’র ফিল্ম তুলতে রাজি হয়েছিলেন। সে আরেক কাণ্ড। নিউ থিয়েটার্স তখন খুব বেশি দিন প্রতিষ্ঠিত হয় নি; বাংলা সবাক চিত্রও তার নতুনত্ব হারায় নি, এমনি সময় ‘নটীর পূজা’ তোলা হলো। তাও আবার স্টেজ প্রোডাকশনের ছবি, না আছে তাতে সিনারি, না আছে যথেষ্ট জনগণোপযোগী রস-রসিকতা। শেষ পর্যন্ত যখন ছবি রিলিজ হল, জনতা রেগেমেগে চেয়ার ভেঙে, আলো ফাটিয়ে, টিকিটের দাম ফেরত চাইতে লাগল।”

লীলা মজুমদার অবশ্য এও লিখেছেন, এই ঘটনার ৩৫ বছর পর আরো একবার সিনেমাটি বোলপুরে প্রদর্শিত হয়। সিনেমা দেখে রেগে যাওয়ার কি আছে, দর্শকরা সেবার নাকি বুঝতেই পারেনি। এখানে একটি মতভেদ রয়েছে, ৩৫ বছর পর এই সিনেমা আবার কীভাবে প্রদর্শিত হতে পারে? কারণ একাধিক সূত্র থেকে জানা যায়, ১৯৪০ সালের ৭ আগস্ট নিউ থিয়েটার্সে আগুন লেগে এই ছবির প্রিন্টের সঙ্গে ‘নটীর পূজা’র নেগেটিভও পুড়ে গিয়েছিল। এখন শুধু একটি আংশিক ১৬ মিলিমিটার ফিল্ম রাখা আছে রবীন্দ্র ভবনে।

অবশ্য রবীন্দ্রনাথ বুঝতে পেরেছিলেন সিনেমার পথের পথিক হওয়ার জন্য তিনি প্রস্তুত নন। প্রস্তুত হওয়ার চেষ্টাও আর করেননি। পুরোপুরিভাবে সিনেমার পাট গুটিয়ে নিয়েছিলেন। এই যে ‘নটীর পূজা’ সফল হলো না—তা নিয়ে সম্ভবত তার দুঃখবোধ ছিল। সেই দুঃখবোধের ছায়া পড়তে দেখা যায় তার জীবনের শেষদিনগুলোতে লেখা একটি চিঠিতে। ১৯৪১ সালের ২১ জানুয়ারি শান্তিদেব ঘোষকে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘কেবল দুটি উপদেশ আমার আছে। এই আশ্রমেই তুই মানুষ, সিনেমা প্রভৃতির সংস্পর্শে কোনো গুরুতর লোভে নিজেকে যদি অশুচি করিস, তাহলে আমার প্রতি ও আশ্রমের প্রতি অপমানের কলঙ্ক দেওয়া হবে।’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ছবি : পোয়েট্রি ফাউন্ডেশন
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ছবি : পোয়েট্রি ফাউন্ডেশন

সফল না হলেও, ‘নটীর পূজা’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্টি বলে কথা! আর কোনো শিল্পকর্মকেই পুরোপুরি নাকচ করে দেওয়া যায় না। অভিজ্ঞতার সঙ্কট ছিল—এই কথা মেনে নিয়েও বলা যায়, সেসময় নটীর পূজা ‘ফ্লপ’ হওয়ার আরও কারণ থাকতে পারে। অনেকসময় কিছু সৃষ্টি সমকালীন সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়েও থাকে। নটীর পূজাও কি এগিয়ে ছিল? তখন কিন্তু সম্ভ্রান্ত পরিবারের নারীরা প্রকাশ্যে মঞ্চে আসত না। সেখানে নটীর পূজা ছিল সেই রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিবাদও। এই সিনেমায় নারী অভিনয়শিল্পীরাই প্রাধান্য পেয়েছিল। সিনেমাটি সেই সময়ের রক্ষণশীল সমাজের চোখের বালি হয়ে ওঠার এটিও একটি কারণ হতে পারে কি?

তথ্যসূত্র:

সিনেমায় রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথের সিনেমা, চণ্ডী মুখোপাধ্যায়

আর কোনোখানে, লীলা মজুমদার

রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ: আনন্দবাজার পত্রিকা (২য় খণ্ড)

চলচ্চিত্র পরিচালক রবীন্দ্রনাথ, দৈনিক সমকাল, ৫ মে ২০১৬

টিভি নাইন বাংলা, ৮ আগস্ট ২০২১

সম্পর্কিত